অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখন অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আজকালকার সংঘাত ধনী আর নির্ধনে, দ্বীনদার আর বেদ্বীনে নয়’।।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর মিগগুলো খুব নিচ দিয়ে উড়ে গিয়ে বিনা বাধায় বোমা ফেলছিল ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট ও গভর্নর হাউসে। ছোট ভাই লুত্ফুল হায়দার চৌধুরীর শান্তিবাগের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাঁর শিশু সন্তানকে দেখাচ্ছেন সেই দৃশ্য আর বলছেন, ‘দেখো দেখো, স্বাধীনতার আর বেশি দেরি নেই। দেখছ না, প্লেনগুলো কেমন নিচ দিয়ে উড়ে গিয়ে বোমা ফেলছে। কেউ বাধা দিতে পারছে না। ২৪ ঘন্টার মধ্যেই স্বাধীন হয়ে যাব আমরা। ওরা আর আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।’

যখন মুক্ত হতে যাচ্ছে দেশ, যখন অনেক রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে দেশের মানুষের জন্য আসছে কাঙ্ক্ষিত মুক্ত, বহু প্রত্যাশিত সেই স্বাধীনতা যখন নাগালের মধ্যে, এমন একটি সময়ে, ১৪ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টায় মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী যখন যাচ্ছিলেন গোসল করতে। ঠিক তখনই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ছোট ভাই দরজা খোলা মাত্রই মুখে রুমাল বাধা অবস্থায় কয়েকজন যুবক হাতের রাইফেল উঁচিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং টেবিলে রেডি থাকা দুপুরের ভাত খাওয়ার সুযোগ না দিয়েই অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে ধরে নিয়ে যান। এ যুবকদের মধ্যে যিনি সামনে ছিলেন, এক পর্যায়ে তার মুখের রুমাল খুলে যায়। তখন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাকে বলেন, মাঈনুদ্দিন তুমি? সে আবার মুখে রুমাল বাঁধতে বাঁধতে বলেন, ‘জি্, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন, কোনো ভয় নেই।’ স্বাধীনতা লাভের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে চিরকাঙ্ক্ষিত স্বাধীন দেশকে না দেখেই আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে এভাবেই বিদায় নিতে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে বাধ্যকরে-আলবদর মাঈনুদ্দিন । তিনি আর ফিরে আসেননি।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন। গল্প, কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ, গান, ভাষা বিষয়ক গবেষণা মিলিয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা একেবারে কম নয়। রক্ষণশীল এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম হলেও সাহিত্যরসিক বাবার প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর। এছাড়া ছোটবেলা থেকেই জগত্ ও জীবনের জটিল রহস্য তাঁর মনোযোগ কাড়ে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সামগ্রিক ঐতিহ্য রক্ষায় তিনি লেখায় ও বক্তৃতায় ছিলেন তত্পর। কলম ধরে ছিলেন বাঙালি ও বাংলার মূল স্রোতের অনুকূলে।অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন বিশ্লেষক। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণী প্রবন্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাঁর সময়ে দেশ ও জাতি যাতে বিভিন্ন সংকট ও সংশয় কাটিয়ে নিজস্ব শক্তি ও স্বভাবের জোরে এগিয়ে যেতে পারে সেজন্য পথ খুঁজেছেন। লিখেছেন বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক প্রবন্ধ। আজকের সময়ে এসেও তাঁর সেসব রচনার প্রয়োজনীয়তা একটুও কমেনি। এখনও তাঁর লেখা আমাদের নতুন প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

বিনম্র শ্রদ্ধা।

(সংগৃহীত)

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts