অনামিকা

অনামিকা

শৈশবে দাদীর কাছে রূপকথার অনেক গল্প মুগ্ধ হয়ে শুনতাম আর কল্পনায় রুপকথার স্বপ্নরাজ্যে চলে যেতাম। পাতালপুরীর দৈত্যের প্রাসাদে বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা সেই রাজকুমারই ছিলো তখন আমার জীবনের আইডল। রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে গিয়ে কত বিপদের সামনে পড়তে হতো রাজকুমারকে! বাঁধা ডিঙিয়ে শত্রুকে পরাজিত করে, দৈত্যের প্রাণভ্রমরাকে মারতে পারলে তবে দৈত্যের মৃত্যু। তারপর পালঙ্কের সোনার কাঠি-রূপার কাঠির স্পর্শে রাজকন্যার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে নিয়ে দৈত্যপুরী থেকে বেরিয়ে আসা রাজকুমারের বীরত্বে মুগ্ধ হতাম। বড় হয়ে নিজেও সেই রাজকুমারের মতো হবো- এমনটাই ভাবতাম। তবে সেই রাজকন্যাকে উদ্ধারের পথে অনেক ছলনাময়ীর ছলনার ফাঁদও পাতা থাকে। মানবী ও দানবীর পার্থক্য বুঝে ছলনার গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারলেই সাফল্য। নয়তো দৈত্যপুরীতে মৃত্যু অনিবার্য।

***

তরুণীর সৌন্দর্যের আকর্ষণ আমার যৌবনকালকে একপ্রকার বেপথু করে দিয়েছিল। নদীর তীর ও মানবীর মন ঘেঁষে জীবনে অনেক পথ হেঁটেছি। কিন্তু সে পথের কোন কূল-কিনারা আজো খুঁজে পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তীব্র আকর্ষণ  একাডেমিক পড়ালেখায় আমাকে অনেকটা অমনোযোগী করে তুলেছিলো।

যৌবনে নারীর টান নাড়ির মধ্যে অনুভব করেনি এমন লোক কি পৃথিবীতে আছে? বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনার সে আকর্ষণ অনিবার্য। তবে সে কামনা যদি হয় হৃদয়হীন, তাতে জ্ঞান ও প্রেমের রশি দিয়ে লাগাম টানতে হয়। না হলে বেপরোয়া সে জীবনের পরিণতি হয় অতৃপ্তি ও অনুশোচনার।

***

তারুণ্যে সঙ্গীবিহীন একাকিত্ব মানুষকে দিকভ্রান্ত করে দেয়। সঙ্গীহীন মানুষ হতাশায় ডুবে পৃথিবীতে কামনাকাতর হয়ে ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গহীন জীবন, অথচ অতিরিক্ত শারিরীক আকর্ষণ, শরীর মন উভয়কেই কলুষিত ও কলংকিত করে। এভাবে অমূল্য মানব জীবন নীতি-বর্জিত বিবেকহীনতায় ঝরে যায় ধংসের পাতালপুরিতে।

***

আজ বিশ্বখ্যাত ফরাসি গল্পকার মোপাসাঁর ’বসন্তে’ নামক একটি গল্প পড়তে গিয়ে আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। তখন আমার বয়স ছিলো এমন, যে বয়সে মানুষের দেহমনে যৌবনের আকর্ষণ থাকে দুর্ণিবার। তখন তরুণীর বাঁকা ঠোঁটের মৃদঙ্গ ও টানা চোখের কটাক্ষ মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল মন। কিন্তু যৌবনের কামনায় অস্থির মনকে আমার জ্ঞানবাবা গোপন দৃষ্টিতে ঠিকই হেফাজতে রেখেছিলেন। আর অদৃশ্য এক রক্ষাকর্তা আমাকে রক্ষা করেছিলেন আসন্ন বিপদ থেকে।

***

সেদিন ছিলো প্রখর রোদেলা দিন। লঞ্চের দোতলায় বসে খোলা রেলিং দিয়ে ফক ফক করে ঢুকছিল বসন্ত বাতাস, আর আমার কামনা-মদির মনের বসন্তকে চাঙিয়ে তুলছিলো। শাখা তিতাসের সরু বুকে বিশাল আকৃতির লঞ্চটি ছিলো অনেকটাই বেমানান। লঞ্চে চড়ে গ্রামের বাড়ি থেকে সেদিন ঢাকায় যাচ্ছিলাম। যাত্রাসঙ্গী কেউ ছিলোনা, তাই একাই বসেছিলাম লঞ্চের দোতলার রেলিং ঘেষে। লঞ্চভর্তি মানুষের ভীড়েও একাকি ও নিঃসঙ্গ বোধ করছিলাম- কবি জীবনানন্দ দাসের কবিতার মতো…

‘সকল লোকের মাঝে ব’সে

আমার নিজের মুদ্রাদোষে

আমি একা হতেছি আলাদা?

আমার চোখেই শুধু ধাঁধা ?’

***

যাহোক, শৈশব ও কৈশোরের চিরচেনা নদীর দৃশ্য বেশিক্ষণ আমার মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনি। হঠাৎ চোখ পড়ে যায় অনিন্দ্য-যৌবনা, সুঠাম-দেহী এক তরুণীর  দিকে। সে বসেছিলো আমার সামনাসামনি। দুজনের দৃষ্টি-বিনিময়ের জন্য উপযোগী জায়গায়। তার সুগঠিত দেহ-সৌষ্ঠব ছিল আকর্ষণীয়। আফ্রিকার অরণ্যের মায়াহরিণীর মতো সুউচ্চ ও সুগঠিত ছিলো তার শরীর। বাইরে ফাল্গুনের ম্রিয়মান নদী ও স্তব্ধ দুপুর, অথচ ভেতরে সেই যুবতীর দেহে যৌবনের জোয়ার। তার চোখদুটো ছিল কামনামদির ও লালসায় পরিপূর্ণ। তার নামটিও আমি জানতে পারিনি, সে আজো আমার কাছে অনামিকাই রয়ে গেছে।

আমি ফরদাবাদ থেকে আর অনামিকা তার পরের স্টেশন পূর্বহাটি থেকে লঞ্চে উঠেছিল। তার সাথে দু’তিনজন আত্মীয় ছিলো।  মনে হলো- সে শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে এসেছিলো, আজ ঢাকা ফিরে যাচ্ছে। তার ভরা যৌবনের রূপ, ভঙ্গিমা ও আঁখিঠার আমাকে কাণ্ডজ্ঞানহারা ও পাগলপারা করে হয়ে তুলেছিলো। তার সাথে কথা বলার প্রবল ইচ্ছা জেগেছিল। কিন্তু ব্যক্তিত্বহীনতা প্রকাশ পাবে ভেবে, পরিচিত হতে এগিয়ে যাইনি। কারণ, এমনও মনে হয়েছিল, আমার সারা জীবনের জন্য সে  উপযুক্ত সঙ্গী হতে পারবে না। কিন্তু আমি তার থেকে চোখ ফেরাতে পারিনি। আঁখি ইশারায় সে আমাকে তার দিকে আহ্বান করছিল, মুচকি হাসছিলো। তার লেলিহান কামনার আগুনে পুড়ছিলো আমার নিঃসঙ্গ শরীরমন। আমার মনে হচ্ছিল অনামিকা যেন আমার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে গেছে।

তিতাসের তিরতিরে জলের বুক চিরে  লঞ্চটি এগিয়ে চলেছে নাকি আটকে আছে কোন চরে , সেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি এতটা লাজুক, কিংবা ভণ্ড ছিলাম না যে, তেমন বয়সের পূর্ণযৌবনা এক সুন্দরীর আবেদনে গুটিয়ে যেতে পারি। তবে ‘চুটিয়ে বাঁচা’র সামাজিক ও মানসিক অবস্থাও আমার ছিলোনা। তাই এগিয়ে গিয়ে কথা বলে জমানো কিংবা পরিচিত হওয়া- কোনটাই শোভনীয় কিংবা ভদ্রোচিত মনে হয়নি। তাই দূর থেকে দেখেই ইশারার জবাব দেয়া। আমি মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম হেমন্তের সেই গান-

আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি
আর মুগ্ধ’য়ে চোখে চেয়ে থেকেছি…

***

জীবনে অপরিচিতা কোন মেয়ের পাল্লায় এভাবে কোনদিন পড়িনি।  আলাপ-পরিচয়হীন মেয়েদের মধ্যে এই অনামিকাই আমার জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে। পরিশেষে তার ঘটনার চমৎকার একটি পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। কাহিনীর সেই উপসংহার আমার মধ্যে যে বিস্ময়জনক অনুভূতি জন্ম দিয়েছিল, সে বিষয়টি গল্পের সমাপ্তিতেই স্পষ্ট হবে।

***

অনামিকা দুর্নিবার আর্কষণ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক পাতালপুরির দিকে। সোনারগাঁয়ের মেঘনা ঘাটে লঞ্চটি থামার পর আমরা নেমে পড়লাম। লঞ্চ থেকে নেমে আমি তাদেরকে অনুসরণ করেই  হাঁটছিলাম। অনামিকা পেছন ফিরে বারবার আমাকে দেখে নিচ্ছিলো। আমিও সম্মোহিতের মতো তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কাছে গিয়ে কথা বলার কোন সাহস পাচ্ছিলাম না। তার চোখে-মুখে ও ভাব-ভঙ্গিমায় বেপরোয়া যৌবনের লালসা প্রকাশ পাচ্ছিল। আমিও যৌবনের নেশার ঘোরেই আরশোলার মতো রঙিন কাচপোকার পিছু নিয়েছিলাম।

***

লঞ্চ থেকে নেমে আমরা একই বাসে উঠলাম। গাড়িতে বসেও দৃষ্টি বিনিময় হলো বেশ কয়েকবার। আনামিকা বসেছিলো আমার সামনের সিটে। জানালার গ্লাসে চোখ রাখলেই একজন অন্যজনকে দেখতে পেতাম। চোখ পড়লেই ফিক করে হেসে ফেলতো সে।

যানবাহনে যাতায়াতের সময় জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্যে  দৃষ্টি মেলে দেয়া আমার ভ্রমণ-স্বভাব। তখন আবহমান বাংলার রূপ, অপরূপ সৌন্দর্য ও মানুষের বিচিত্র জীবন প্রণালী দেখে পেরিয়ে যায় সময়। কিন্তু সেদিন মুহূর্তের জন্যেও সে সুযোগ হয়ে উঠেনি। অনামিকার কামনামদির ভঙিমা বাইরে তাকানোর ফুসরৎটুকুও দেয়নি আমাকে। তার কামুক দৃষ্টি ও চঞ্চল হাসি গাড়ির চেয়েও বেগবান করে তুলেছিল আমার মন। বাসের শেষ গন্তব্য ছিলো গুলিস্তান। যাত্রাবাড়ি এসে থামতেই সে সঙ্গীদের সাথে বাস থেকে নেমে পড়ল। আমার গন্তব্য ছিল গুলিস্তান। অথচ আমিও সেদিন যাত্রাবাড়িই নেমে পড়লাম। তারা রাস্তা পার হয়ে উত্তর পাশে গেলো। আমিও তাদের অনুসরণ করে উল্টো পথে চলতে শুরু করলাম। আমার এক সাহিত্যিক বন্ধু প্রায়ই বলে থাকে- নারীর জন্য সে জীবনের অধিকাংশ সময়ই নাকি উল্টো পথে হেঁটেছে। যাহোক, নিরাপদ দূরত্বে থেকে আমিও তার পেছন পেছন হাঁটছিলাম। সেই চপলা তন্বী আমাকে ঠিকই দেখে নিয়েছিল। তার সঙ্গীদের একটু পেছনে থেকে একটু পর পর ফিরে ফিরে আমার দিকে তাকাচ্ছিল আর মুচকি হাসছিল আর ইশারা করছিল।

***

শৈশবের রূপকথার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলোম আজকের কাহিনী। আধুনিক এক রূপকথার গল্পের নায়কের মতো আমিও আজ গুলিস্তান ভুলে এক মায়াবিনীর গেছনে যাত্রাবাড়ি থেকেই যাত্রা করলাম অজানা এক পাতালপুরির দিকে। হরিণীর চপল চাহনী আমার আকাঙ্ক্ষাাকে আরো চাঙিয়ে দিচ্ছে। কোন এক দুষ্ট আত্মা যেনো আজ ভর করেছে আমার উপর। এই প্রথম একটু ভয় পেলাম ও বিচলিত অনুভব করলাম। ফুটপাত দিয়েই হাঁটছিলাম, হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হলো আমাকে। সামনে তাকিয়ে দেখি- অনামিকা তার হাতের ইশারায় আমাকে আহবান করছে অনেকটা বেপরোয়াভাবে। তার চোখ যেন এখন রক্তাক্ত হয়ে গেছে । কারণ, আজ আমাকে তার চাই-ই চাই। পাতালপুরীর অতল গহবরে টেনে নিয়ে আমার রক্ত শুষে পান করতে হবে তার। হঠাৎ এই ছলনাময়ী যুবতী যেন ভয়ঙ্কর সুন্দর কোন দানবীর রূপ ধারণ করলো। সে রূপে ভৌতিক গল্পের কদাকার কিংবা বীভৎস কোন  রূপ ছিল না; ছিল লোভাতুর ললনার কামনার অগ্নিশিখা। বিকেলের এই শহরতলীর রাস্তায় যুবতী রাজহংসীর মতো ঘাড় বাঁকিয়ে আরব্যরজনীর কোন কামুকীর চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। যৌবনের লালসায় টলোমলো এক আধুনিক নারীর কামনামদির রূপ। আধুনিক রূপকথার ছলনাময়ী আজ চোখ ঠারে ও হাত ইশারায় আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পাতালপুরীর  অতল গহবরে। কোন একটি চরম পরিণতি যেন আজ আমার জীবনে অনিবার্য। যৌবনবতী নারীদেহের লেলিহান শিখায় উন্মত্ত হয়ে ঘোরলাগা রক্তিম চোখে আমিও চেয়ে আছি; পতন-উন্মুখ পতঙ্গের মতো উড়ে গিয়ে আগুনে পুড়ে মরার জন্য। বেঘোরে সেই বিকেলের বাসনা যখন আমাকে টেনে নিয়ে চলছিল,

ঠিক সেই মুহূর্তে আমাকে বিস্মিত ও  দণ্ডায়মান করে দিয়ে হঠাৎ রাস্তায়, আমার ঠিক সামনে, অন্ধ, অথচ চক্ষুষ্মান এক বাউল তার একতারা বাজিয়ে গেয়ে উঠল লালন সাঁইজির  বিখ্যাত বিচার গান-

মন সহজে কি সই হবা,

চিরদিন ইচ্ছা মনে আ’ল ডিঙায়ে ঘাস খাবা-

ড্যাবের ’পর মুগুর পড়লে সেই দিন গা’ টের পাবা…..”

জহির আহমেদ

Author: জহির আহমেদ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment