অসহিষ্ণু সমাজ ও আমরা

পাবলিক বাসের গায়ে লেখা থাকে ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’। আবার নীতিকথা হিসেবে জেনেছি ‘জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো’। দুটো বাক্য পরস্পর বিপরীতমুখী হলেও দুটোরই উদ্দেশ্য মহৎ। ব্যক্তি যদি নিজে অন্যের সঙ্গে ভালো-মধুর ব্যবহার করেন আর ওই ব্যবহারে যদি কারো মন ভরে কিংবা গলে যায় তবে কেবল ওই ব্যক্তির কেন, তার চৌদ্দগুষ্টির সুনাম করবে। ঠিক তেমনি নীচু বংশের কেউ যদি মহৎ কাজের স্বাক্ষর রাখেন সমাজে, রাষ্ট্রে কিংবা বিদেশে, তখন তার বংশকে ছাপিয়ে তিনি নিজেই মহিয়ান-উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। দুটোর ব্যাখ্যা যেভাবেই দেই না কেন, শেষ পর্যন্ত আমি ভালো তো জগ ভালো এ কথাই প্রতিষ্ঠিত হয়।

মানুষ কথায় কথায় বলে, ‘ভালো হতে পয়সা লাগে না’। কথাটা যেমন সত্য, আবার নিজের মধ্যে ভালোত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে পয়সার চেয়ে অনেক বড় কিছু লাগে। যারা সংযমী, ত্যাগী, ধৈর্যশীল, উদার, সহনশীল ও নিরহঙ্কারী তারা মানুষের সঙ্গে সাধারণত খারাপ ব্যবহার করেন না। প্রশ্ন উঠতে পারে, ব্যবহার ভালো করার জন্য কি কোনো স্কুলে বিশেষ ট্রেনিং নিতে হয়? ট্রেনিং তো লাগেই। পারিবারিক বনেদিপনা ও সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে কাজ করে। পারিবারিক শিক্ষা, চারদিকের পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যক্তিকে ভালো কিংবা খারাপ ব্যবহারের দিকে ধাবিত করে। যে ব্যক্তি অহিংস, উদার, কষ্টসহিষ্ণু এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল, তার ব্যবহার ভালো হওয়াই স্বাভাবিক। ধরুন বিক্রেতা কোনো জিনিসের দাম বললেন একশ টাকা, ক্রেতা বললেন সত্তর টাকা। বিক্রেতা রেগে বললেন, দাম একশ টাকাই, এক পয়সাও কম হবে না। নিলে নেন, না নিলে চলে যান। কিংবা অসহায় যাত্রী কন্ডাক্টরকে বললেন, ভাই আমার কাছে বাসভাড়া নেই। কন্ডাক্টর যাত্রীকে সঙ্গে সঙ্গে বলবেন ওই ব্যাটা, এখনই বাস থেকে নাম। অথবা অফিসে দেরি করে যাওয়ায় বস বললেন, এমনিতেই সারাদিন অফিসে বসে গল্প করেন আর ঝিমান, তারপরে আবার দেরি করে আসেন এইভাবে কি চলে।

আরো উদাহরণ দেয়া যায়, তরমুজের মধ্য-মৌসুমে ক্রেতা গেল তরমুজ কিনতে। বিক্রেতা দাম হাঁকলো একশ বিশ টাকা। ক্রেতা বললেন, আশি টাকা! বিক্রেতা মহাবিরক্তি নিয়ে বলল, আশি টাকায় তরমুজ! আপনি এই সিজনে প্রথম তরমুজ কিনতে আইলেন তো, তাই দাম জানেন না। ক্রেতা রগচটা এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। বিক্রেতার কথায় তার আঁতে ঘা লেগেছে। উল্টো প্রশ্ন করলেন, আমি এই সিজনে কোনো তরমুজ কিনিনি, আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন? বিক্রেতা গলা চড়িয়ে বললেন, কিনলে এমন ফালতু দাম বলতেন না। মুহূর্তে দুজনের মধ্যে মারামারি লাগার উপক্রম হয়। পরে আশপাশের লোকজন এসে দুজনকে থামিয়ে দেয়।

এক সকালে এক ক্রেতা মতিঝিলের ফুটপাতে শার্ট দেখছিলেন অনেকটা বেখেয়ালে বাঁ হাত দিয়ে। দোকানি তেড়ে এসে বললেন, কেবল দোকান খুললাম আর আপনি কাপড়ে বাঁ হাত লাগিয়ে অপবিত্র করে ফেললেন। আমার সারাদিনের ব্যবসা মাটি কইরা দিলেন। ক্রেতা নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, আমার হাত তো পরিষ্কার। বিক্রেতার উত্তর, আরে মিয়া বাঁ হাত কখনো পরিষ্কার থাকে। তা হইলে তো অই হাত দিয়াই খাইতেন। এবার ক্রেতা বললেন, যার ডান হাত নেই সে তো বাম হাত দিয়ে খায়। এবার দোকানি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, কথা বাড়াইয়েন না। যান এখান থেকে। এভাবে দু’জনের সঙ্গে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।

বৃটিশ শাসনামলে যশোর থেকে কলকাতায় এক ব্যক্তি কেরানির চাকরি করতেন। তিনি প্রায়ই ট্রেন ফেল করতেন, যার কারণে অফিসে পৌঁছতে দেরি হতো। বস জিজ্ঞেস করতেন, কেন তার দেরি হলো। কেরানি অতি বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিতেন, নিউলি ম্যারেড স্যার। এ ঘটনার পরবর্তী ১০ বছরে যতবার কেরানি ট্রেন ফেল করেছে আর বস তাকে দেরির কারণ জিজ্ঞেস করেছেন উত্তর একই, নিউলি ম্যারেড স্যার। বস বিষয়টি এনজয় করতেন। তাই তার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাননি। গ্রামে-গঞ্জে তরকারিতে ঠিকমতো লবণ না হলে কিংবা রান্না একটু এদিক-সেদিক হলে স্বামী বউয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, পেটায়। আর শহুরে ভদ্র পরিবারে স্ত্রীর রান্নায় কোনো ত্রুটি হলে স্বামী রসিকতা করে। এক ভদ্রলোক বিয়ের দেড় যুগেও শ্বশুরবাড়িতে রাত কাটায়নি কিংবা শ্বশুরের কাছ থেকে কোনো যৌতুক আনেনি। আবার কেউ সারাজীবন শ্বশুরবাড়িতে কাটায়। শ্বশুরের সম্পত্তি দখল করে। যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ মিলিত হয়ে স্ত্রীকে আগে নির্যাতন এবং পরে হত্যা করে। আবার এমনও স্বামী আছে নিজে না খেয়ে স্ত্রীকে খাওয়ান, স্ত্রীকে নরম বিছানায় শুতে দিয়ে নিজে ফ্লোরে ঘুমান। স্ত্রীর রোগমুক্তির জন্য সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেন। কেউ কেউ স্ত্রীকে আদর করে ডাকেন ‘আমার জান’ ‘সখী’ কিংবা নিজের দেয়া কোনো বিশেষ নামে। আবার কেউ কেউ কথায় কথায় ছোটলোক, ইতর, ছোটজাত, ফকিরনির ঝি, এমনকি ‘মাগি’ও অহরহ বলে থাকেন। মা-বাপ তুলে গালাগাল দেন যখনতখন। চুলের মুঠি ধরে চড়-থাপ্পড় মারা তো মামুলি ব্যাপার।

একবার বাসে এক যাত্রী গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে জানালার পুরোটা নিজের দখলে নিয়ে নিল। সামনের সিটের যাত্রী জানালার গ্লাস সরাতে চাইলেই তিনি বাধা দিলেন। লেগে গেল দু’জনের মধ্যে ঝগড়া। এমনও অনেক যাত্রী আছেন, পেছন থেকে আপনাকে না বলেই আপনার পাশের জানালাটি ধপাস করে বন্ধ করে দেবেন। অথচ তিনি কিন্তু বলতে পারতেন, জানালার অর্ধেকটা খুলতে পারি কি? এমন কথা যে কেউ বলেন না, তা নয়। কন্ডাক্টর হয়তো যাত্রীকে কড়া ভাষায় বলল, ভাই ভেতরে চাপেন। যাত্রী প্রতিউত্তরে বললেন, ব্যাটা, দুই টাকা বেতনের চাকরি করিস, তোর এত সাহস আমাকে ভেতরে যেতে বলিস। জানিস আমি কী করতে পারি। এক্ষুনি ফোন করে তোকে পুলিশে দিতে পারি ইত্যাদি। এ ঘটনায় যখন বাসের মধ্যে হইচই পড়ে গেল, তখন হয়তো চালক বাস থামিয়ে দিলেন। মহাযানজটের শহরে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরো বেড়ে গেল। কেবল তাই নয়, আমরা এতোটাই অসহিষ্ণু যে, পঞ্চাশ-একশো টাকার জন্য মানুষ হত্যা করি।

আমাদের যাপিত জীবনে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। কিন্তু আমরা নিজেরা কি কখনো ভেবেছি যে, অন্যের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা যায় কি না। যিনি দুর্ব্যবহার করেন এবং যিনি শিকার হন মানসিক, এমনকি শারীরিক ক্ষতি হয় দুজনারই। তাই আমাদের উচিত নিজেদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা। পাশাপাশি শপথ নেয়া, জীবনে কারো সঙ্গে আর দুর্ব্যবহার করব না। কিন্তু ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’, ‘স্বভাব যায় না ম’লে আর ইল্লত (ইজ্জত) যায় না ধুইলে’ আমাদের অবস্থা এখন এমনটাই দাঁড়িয়েছে। আমরা ব্যক্তি হিসেবে যেমন অসহিষ্ণু, আমাদের সমাজ ও রাজনীতিও অসহিষ্ণু । আমাদের বাঁচার উপায় কী।

এক ব্যক্তি এক বয়স্ক রিকশা চালককে রসিকতা করে বললেন, চাচা ভালো হওয়ার জন্য ৪০ বছর চেষ্টা করলাম, ভালো হতে পারলাম না। রিকশা চালক চাচা রাগত চোখে পেছনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি কীভাবে ভালো হবেন, আপনার চারপাশের মানুষজন কি ভালো।’ রিকশা চালককের এই কথায় অনেক তাৎপর্য বহন করে। তারপরেও আমাদের ভালো হতে হবে নিজের দায়িত্বে, পরিবার ও সমাজের জন্য, দেশের জন্য।

অভাব, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অসহিষ্ণুতা, ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট ইত্যাদি মানুষকে দিন দিন দুর্ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্ব্যবহার যাদের মজ্জাগত, তাদের ব্যাপার অবশ্য আলাদা। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী? আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করতে পারি, হওয়ার সুযোগ না পাই দাতা হাতেম তাই, কিন্তু মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার তো করতে পারি। ভালো ব্যবহার যেমন মানুষ মনে রাখে, কেউ যদি দুর্ব্যবহারের শিকার হন তবে তা মনে রাখেন আজীবন। কারণ দুর্ব্যবহারের স্মৃতি হচ্ছে অনিরাময়যোগ্য দগদগে ঘা-এর মতো।

আসুন আমরা সৌজন্যবোধ, মানবতাবোধ হৃদয়ে জাগ্রত করি। অন্যের উপকারে নিজেকে বিলিয়ে দেই। হতে চেষ্টা করি বিনয়ী ও নিরহঙ্কার। পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করি সর্বত্র। ভয় দেখিয়ে জয় করার চেয়ে ভালোবাসা ও ব্যবহার দিয়ে কাউকে জয় করাই শ্রেয়। এতে প্রথমে রক্ষা পায় ব্যক্তি নিজে, পরে পরিবার ও সমাজ। ব্যবহারে বংশের পরিচয়, ব্যবহারেই নিজের পরিচয়।

Author: সালাম সালেহ উদদীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment