অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম চারণকবি মরমী কবিয়াল বিজয় সরকার: প্রসঙ্গ কথা

কবিয়াল বিজয় সরকার

নড়াইল বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার একটি। বেশ ছোটখাটো, অনুন্নত, জেলা হিসাবে নড়াইল কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়নি। সেটা হয়তো রাজনৈতিক কারণে। বড় মাপের কোন রাজনৈতিক নেতার অভাব, স্থানীয়ভাবে যাঁরা আছেন ব্যক্তি কলহে নিজের উন্নতিও করতে পারেননি, আর জেলার উন্নতিও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আজ অবধি তাদের কারণে। আমি ঐ নড়াইলের একজন, তবু নড়াইল আমার প্রিয় জেলা। শান্ত ছিমছাম, গাছগাছালীতে ভরপুর, কৃষি নির্ভর জেলার একটি আমার নড়াইল। নানা অনুন্নয়নের ও অপ্রাপ্তির মাঝে নড়াইলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশাল যা নিয়ে নড়াইল তথা বাংলাদেশ গর্ব করে থকে। আমি গর্বিত হই যখন দেখি এই নড়াইলে জন্ম উপমহাদেশের বিখ্যাত সেতারবাদক পন্ডিত রবি শঙ্কর আর পৃথিবী খ্যাত নৃত্যগুরু উদয় শঙ্কর আমাদের নড়াইলের সন্তান। কমল দাস গুপ্ত, যিনি নজরুলের গানের সুরশ্রষ্টা, লেখক ও নাট্যকার ঔপন্যাসিক নীহারঞ্জন গুপ্ত, বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ শেখ, স্বাধীতা পদকপ্রাপ্ত শহীদ বুদ্ধিজীবী এস বি এম মিজানুর রহমান, সৈয়দ নওশের আলী, আরেক কবিয়াল মোসলেম উদ্দিন বয়াতী, আর এসএম সুলতান এর কথা কেনা জানে। আর হালে আমাদের মাশরাফি যার নড়াইল এক্সপ্রেস নামটি নড়াইলের পরিচয় বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা বৈচিত্রতায় ভরা মানুষের জন্ম তো আমাদের নড়াইলে। আজ এই নড়াইলের এমন একজন ব্যক্তির কথা লিখব বলে ভাবছি যাকে আমরা খুব বেশী মনে করিনা, তাঁকে হয়তো আমরা তেমন অনেকে মনে রাখিনা অথচ তাঁর সহজ সরল লেখনী ও উপস্থপনায় তিনি নিজের স্বকীয়তাকে তুলে ধরেছেন নানা গুণীদের তালিকায়। স্মরণের জানালায় কখনও কখনও উঁকি দেয় যে নাম তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুরস্রষ্টা উপমহাদেশের অন্যতম চারণ কবি বিজয় সরকার, কবিয়াল পাগল বিজয়।

তাঁর আসল নাম বিজয় কৃষ্ণ অধিকারী। কবি ভক্ত ও স্থানীয় লোকদের কাছে যিনি পাগল বিজয় বা বিজয় সরকার হিসেবে পরিচিত। নড়াইলের ডুমদি গ্রামে দরদী ও মরমী গানের এই চারণ শিল্পী ও কবি ১৯০৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৩০৯ বঙ্গাব্দের ৭ই ফাল্গুন জন্ম গ্রহণ করেন। বিজয় সরকারের পিতার নাম নবকৃষ্ণ বৈরাগী ও মাতার নাম হিমালয়া কুমারী। পিতামহের নাম গোপাল চন্দ্র বৈরাগী। বিজয় সরকারের পাবিরারিক উপাধি ছিল বৈরাগী। কিন্তু  তিনি নিজে তার পারিবারিক উপাধি ত্যাগ করে অধিকারী উপাধী গ্রহণ করেন। যদিও কবিয়াল হিসাবে খ্যাতি অর্জনের সাথে সাথে তার অধিকারী উপাধিও মুছে গিয়ে বিজয় সরকার নামে পরিচিত লাভ করেন।  

জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি নড়াইলে, তিনি বেড়ে উঠেছেন এখানে। স্থানীয় টাবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। ঐ সময়ে পড়াশোনার ফাঁকে নেপাল বিশ্বাস নামক একজন  শিক্ষকের কাছে যাত্রা গানের উপযোগী নাচ, গান ও অভিনয় শিখেন। বৈচিত্রভরা জীবনের বিচিত্রতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাশ করতে তিনি বেশ কয়েকটি স্কুল পাল্টান। জীবনের ঝোঁক আর ভালোবাসার কারণে তিনি যেখানে গেছেন সেখানেই তিনি একাধিক শিক্ষকের কাছে আবিষ্কৃত হয়েছেন একজন শিল্পী হিসেবে, গায়ক ও অভিনেতা হিসেবে। কৈশরে বাবা হারানোর কারণে তার আর পড়ালেখা চালিয়ে বেশী দূর যাওয়া সম্ভব হয়নি। ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে এন্ট্রান্স পাশ করতে পারেননি তিনি।  

পড়া লেখা কম জানা থাকলেও ঐশ্বরিক দানে তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও  গায়ক ছিলেন। তাঁর গান যেমন মর্মস্পর্শী তেমনি হৃদয় বিদারক, পাশাপাশি ভাবগাম্ভীর্য ও ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতায় সহজ সরল ভাষায় রচিত সুর ও ছন্দের এক যাদুকরী দোলায় ছন্দময়তায় ভরপুর। তিনি ছিলেন কবি গানের সম্রাট। তার কবিগান  রাতের পর রাত মোহবিষ্ট করে রাখত নানা বয়সী শিক্ষিত অশিক্ষিত, হিন্দু, মুসলমানসহ নানা ধর্ম বর্ণের মানুষকে।

জানা যায় তিনি স্থানীয় স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতার কাজ করেছেন। কিছুদিন তিনি নায়েবের কাজও করেছেন। জীবনের বৈচিত্রতায় তিনি লোকগান ও আধুনিক গানের চর্চা করতেন। ১৯২৫ সালে গোপালগঞ্জের কবিয়াল মনোহর সরকারের কাছে কবিগান শেখেন এর বেশকিছু দিন পর রাজেন্দ্র সরকারের সংস্পর্শে আসেন এবং তার কাছেও কবিগানের তালিম নেন তিনি।

বিজয় সরকার ১৯২৯ সালে নিজেই একটি গানের দল করেন। নানা এলাকায় কবিগানের আসর জমিয়ে খুব দ্রুত তিনি কবিয়াল হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। চারিদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ভাটিয়ালী গানের উপর ভিত্তি করে ধুয়া গানের জন্য তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর জনপ্রিয়তা ও নাম ডাক এত ছড়িয়ে পড়ায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লী কবি জসীমউদ্দিন, মরমী লোক সংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহম্মদসহ নামকরা অনেক কবি ও বরেণ্য মানুষের ভালোবাসা, সান্নিধ্য ও আর্শিবাদ লাভ করেন।

বিজয় সরকার কমবেশী ৪০০ সখি সংবাদ এবং ধুয়া গান রচনা করেন। যার মধ্যে কিছু  আমাদের দেশে ও কিছু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও তার লেখা ছাপা হয়।  তার কবিগান বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর সৃষ্ট কবি গান পরিবেশন করে ব্যাপকভাবে দর্শক শ্রোতার জনপ্রিয়তা লাভ করেন। কথিত আছে তিনি বাংলাদেশ ও ভারত মিলে প্রায় ৪০০০ আসরে কবিগান পরিবেশন করে ব্যাপক সাড়া তুলেছিলেন। তার সৃষ্ট গান ছাড়াও তিনি রামায়ন গান পরিবেশনে বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ব্যক্তি জীবনে দুই স্ত্রী বীনাপানি ও প্রমোদা অধিকারীকে নিয়ে সংসার করেছেন। তাঁর দুইটি ছেলে আছে যারা এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়াতে বসবাস করেন আর মেয়ে বুলবুলি অধিকারীও ভারতে বসবাস করেন। আর পালিত ছেলে জীবন অধিকারী বসবাস করছেন বিজয় সরকারের জন্মভূমি ও চারণ ভূমি নড়াইলের ডুমদি গ্রামে।

  

কবি তার নিজেস্ব ধারায় ও সুরে রচনা করেছেন অসংখ্য মরমী গান। যার মধ্যে রয়েছে জীবনের সরল চাওয়া পাওয়া। বিশেষ করে তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে –

এ পৃথিবী যেমন আছে, তেমনই ঠিক রবে

সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে।

এছাড়া এই মর্মস্পর্শী গাণের স্রষ্টা  তার স্ত্রী বীনাপাণির অকাল মৃত্যুর খবর জানতে পেয়ে গানের আসরে বসেই লিখলেন আরেক মর্মস্পর্শী গান “পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে, সেকি আমায় ভুলবে কখনো’। আরো গেয়েছেন – তুমি জানো নারে প্রিয় তুমি মোর জীবনের সাধনা।  এরকম অস্যংখ্য গান। যার কয়েকটির উল্লেখ না করলে নয়। যেমন-

নক্সীকাঁথার মাঠেরে

সাজুর ব্যথায় আজো কাঁদে রুপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশি………………

আষাঢ়ের কোন ভেজা পথে …………….

কি সাপে কামড়ালো সাপুড়িয়ারে

আমি জ্বলিয়া পুড়িয়া মরলাম বিষে……………..

খেলত পাখি সোঁনালী খাঁচায়, বলতো কত কি আমায়, বসে রুপালী আড়ায়।

আগে যদি জানতাম পাখির মন, ও সে করিবে এমন, তারে দিতাম না এ মন; কে এমন দরদী আছে , বলে দিতে আমার কাছে, পাখি আমার গেছে কোন বনে।।

জংলা পাখি করল সর্বনাশ, এখন শুধু হাই হুতাশ, কোথায় করব তার তালঅাশ, বনের পাখি বনে গেলে, আমার বুকে দিয়ে বিষম শেল, তারে আরকি ফিরে পার জীবনে।

পাখির মায়ায় পড়ে কত লোক, পেল আমার মত শোক, সদা জল ভরা দুই চোখ; অসীম গগনের পাখি, তারে আপন ভেবে কেন ডাকি, পাগল বিজয় কাঁদে বসে বিজনে।।

বিজয় সরকার ২ সহস্রাধিক গানের স্রষ্টা ও সুরকার। তিনি নিজেই অধিকাংশ গানের গায়ক। তিনি তার নিজেস্ব সুর ও সুরের মর্ছনায় গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে গেয়েছেন এসকল গান। গ্রাম বাংলার বিরহী মনের আকুল আকুতিতে যখন মন কেঁদে ওঠে তখনই বিজয় সরকারের গান বিরহী হৃদয়ের শূন্যতায় সুরের আবেশে মোহবিষ্ট করে আজও  সহজ সরল আবেগী মানুষকে।

এছাড়া চারণ কবি সম্রাট বিজয় সরকার লিখেছেন-

নবী নামের নৌকা গড়, আল্লাহ নামের পাল খাটাও

বিসমিল্লাহ বলিয়া মোমিন

কুলের তরী খুলে দাও।

কিংবা আল্লাহ রসুল বল মোমিন

আল্লাহ রসুল বল

এবার দুরে ফেলে মায়ার বোঝা সোজা পথে চল।

জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল নামটা কি

পাশাপাশি লিখেছেন

আমি কৃষ্ণ বলিয়া এ জীবন পরান সই-রে

ওই যমুনার নীড়ে………………

বার্ধ্যক্যজনিত কারণে ১৯৮৫ সালের ২ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়াতে পরলোকগোমন করেন আধ্যাত্মিক ও অসাম্প্রাদায়িক চেতনার এই কবি । কেউটিয়াতেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।  

চেতনা ও চৈতন্যে যে কবিয়াল আমাদের দোলা দিয়ে গেল তার কথা আসলে আমরা কতটুকু মনে রেখেছি? মনে রাখা উচিত বলেই প্রতিনিয়ত আমাদের ভাবনার গভীরে তাঁকে স্থান দিতে হবে। তাঁর গান বেশী বেশী করে প্রচার করে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে। তিনি আমাদের মাঝে আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু তাঁকে আমরা প্রতিনিয়ত পেতে পারি তাঁরই লেখা, সুর করা মরমী গানের চর্চা করে, প্রচার করে। এরই অংশ হিসেবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে সম্মানিত করে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। স্বীকৃতির দায়ভারে মুক্ত না হয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার সৃষ্টিকর্মকে গণমানুষের হৃদয়পটে স্থান করিয়ে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করাই সময়ের দাবী।

আমাদের চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতার কবি, কবিয়াল পাগল বিজয় সরকার বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।

সৈয়দ মাসুদুর রহমান
সৈয়দ মাসুদুর রহমান

 

Author: সৈয়দ মাসুদুর রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment