আগুনের পরশমনি  ছোঁয়াও প্রাণে

আমার  মনে পড়ে। বারবার মনে পড়ে ঐতিহাসিক  সেই দিনটির কথা। সেদিন নিজ বাসভবনের বহিরাঙ্গনে  সবুজ চত্বরে বৃক্ষছায়ায় দাঁড়িয়ে  জাতির জনক পাশ্চাত্যের একদল সাংবাদিকের  প্রশ্নবানের মুখে অবিচল দাঁড়িয়ে  বলেছিলেন ,“স্বাধীনতা বিনে কে বাঁচিতে চায়?” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশিষ্ঠ মিডিয়া পন্ডিতের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে পাল্টা প্রশ্ন রেখেছিলেন, “জর্জ  ওয়াশিংটন কী ফরাসী সেনাশক্তি পাশে নিয়ে যুদ্ধ করেননি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্যে”?

সেদিন ছিল ২৩ মার্চ ১৯৭১, পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। মার্কিন সরকারের সার্বিক সহায়তা ‍ও বিশেষ সামরিক প্রযত্নে বিকাশিত সৌর্যবীর্যবান  রণকুশলী পাকিস্তানী সেনাশক্তি হিংস্র নখদন্ত বিস্তার করে ঢাকা মহানগরীর মুক্তিপাগল জনগণকে বন্দী করে রেখেছিল।  অগণন  ভবন শীর্ষে উচ্চকিত ছিল কামান  ও রিকয়ারলেস রাইফেল। সেই ভরসায় উড়ছিল চাঁদ তারা খচিত  পাকি পতাকা। গানশীপ চক্কর দিচ্ছিল মাথার  ওপরের  আকাশে। অন্যদিকে  শতবর্ষের  গূঢ় ষড়যন্ত্রের  জাল ছিন্ন করে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান  আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের ঐক্য চেতনায়। ভেদাভেদের সব প্রাচীর ধ্বসে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ভবনসহ বহু বেসরকারী ভবন শীর্ষে উড়ছিল  আজাদীর স্বপ্ন বিভাসিত  নবরচিত  লালসবুজ পতাকা । ’৪৩ এর মন্বন্তরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এঁকেছিলেন চলন্ত লাশের ছবি।ক্ষুধার আগ্রাসনে যাদের  ধর্ম বর্ণ গোত্র বিলীন হয়েছিল।  বিনা বিপ্লবে সমতা নেমে এসেছিল  উপবাসী মানুষের কাতারে।আর আলোচিত সময়ে বঙ্গবন্ধু এঁকেছিলেন শতবর্ষের বঞ্চনাক্লিষ্ট ধর্ম বর্ণের ব্যবধান বিবর্জিত লড়াকু মানুষের  সংগ্রামী মিছিলের চিত্র। “ মানুষের গড়া  প্রাচীর ভাঙিয়া করিয়াছি একাকার/ আঁধার রাতের  বোরখা উতারি এনেছি আশার ভাতি। আমরা সেই সে জাতি”।

অসাম্প্রদায়িক জাতীয়  চেতনায় ফিরে আসা বাঙালিকে “ পৃথিবীর প্রথম স্বাধীন  বঙালি রাষ্ট্র  অর্জনের  নবচেতনায় উজ্জীবিত- উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভ্রান্ত পদক্ষেপে বাঙালি আবার লক্ষভ্রষ্ট হোক,  বঙ্গবন্ধু চাননি সেটা। বঙ্গবন্ধু চাননি “জালিয়ান ওয়ালাবাগ ট্রাজেডি”র  পুনরাবৃত্তি ঘটুক।বঙ্গবন্ধু চাননি  নেতাজীর  স্বপ্নভঙের মতো আর এক বিষাদভরা উপাখ্যান রচনা করে বাঙালির স্বাধীনতার অভ্যুদয়কে শতবর্ষ পিছিয়ে দিতে।তাই তার প্রতিটি উচ্চারণে,  শব্দচয়নে  এত সতর্কতা! লাগসই প্রশ্নবাণের বূহ্য রচনা করে পশ্চিমা মিডিয়া  সৈনিকরা ভেবেছিল তাদের বাকচাতুরির মুখে ভ্যাবাচাখা খেয়ে মুজিব এমন কোন বেফাঁস কথা বলে ফেলবেন যাতে গানশিপ থেকে গোলা ছুটে এসে ভবনে উড্ডীন পতাকায় বিভাসিত  স্বপ্নের কিশলয়টাকে থেতলে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব সংবাদ সৃষ্টি করবে। কিন্তু তাদের সে  আশা পূর্ণ হয়নি । বরং পাশ্চাত্য মিডিয়ার চৌকস  খেলোয়াড়রাই সম্মোহিত হলেন বাঙালি জাতিস্রষ্টার  প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে। ৭ মার্চের ভাষণে রাজনীতির কবি  তাঁর রণকৌশল আংশিক উন্মোচন করেছিলেন ।বাকিটা প্রকাশ করলেন সেদিন। যুদ্ধ জয় করতে দরকার জনবল অস্ত্রবল মনোবল মন্ত্রবল। তেমনি দরকার মিত্রবল। বঙ্গবন্ধু মাও যে দঙ- ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কাছে শিখেছিলেন গেরিলা যুদ্ধের  কৌশল।  জর্জ ওয়াশিংটনের কাছে শিখেছিলেন যুদ্ধজয়ের  আর এক মন্ত্র।মিত্রবল !

“আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে। এ জীবন পূন্য কর দহনদানে!আমার এই দেহখানি তুলে ধরো /তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ কর|”


আগুনের পরশমনির ছোঁয়া পেলো   তারুণ্য  প্রদীপ্ত লক্ষ  প্রাণ ।৩০ লক্ষ  তাজা প্রাণ  পূর্ণ হ’ল  সেই দহনে। কে বলে মানুষ কেবল নিজের জন্যে বাঁচতে চায় ? যারা চায় একা সব কিছু ভোগ করতে, সেই ভোগী মানুষরাই শোষক ।তারা কেবল নিজের অর্জনে তুষ্ট নয়। তারাই লুন্ঠনকারী। তারাই স্বৈরাচার! তাদের অন্তরাত্মার  অকাল প্রয়াণ ঘটে। বেঁচে থাকে হিটলারের মতো,  মুসোলিনীর মতো, কিংবা  চেঙ্গিশ বা ইয়াহিয়ার মত কোন পশু। তারা অবলা পঙ্গু অসহায় অক্ষম দুর্বলদের  নিধন নির্মূল করে  “ সার্ভাইবাল  অবদি  ফিটেষ্ট তত্ত্বের  জন্যে প্রাণপাত করে। তারই বিপরীতে  অবস্থিত, “সকলের তরে সকলে  মোরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে”, এই  মানবিক দর্শন ও তার সারথীরা । সেই পরার্থ বাঁচা এবং পরার্থ  জীবন উৎসর্গকারী মহাপ্রাণদেরই অবদান  আমাদের স্বাধীনতা। যে ৩০ লক্ষ  মহাপ্রাণ  উৎসর্গে বাঙালি পেয়েছে তার স্বাধীন স্বদেশ, নড়াইলের  সফল  মেধাবী তরুণ  সাঈফ মীজানুর রহমান তাঁদেরই একজন।

অবিভক্ত বাংলায় তেতাল্লিশের মন্বন্তরে  পঞ্চাশ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষুধার তান্ডবের কাছে হার মেনেছিল।দ্বিতীয় মহাসমরে ব্রিটিশ ভারতবর্ষে মোতায়েন  সেনাবাহিনীর গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে বাংলার ধনী কৃষকদের শস্য ভান্ডার উজাড় করে দরিদ্র মানুষের পেটে লাথি মেরেছিল।খাদ্যপণ্য এতটাই মহার্ঘ্ হয়েছিল যে, কচু ঘেচু অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে দরিদ্রজন  প্লেগ আক্রান্ত ইঁদুরের মতো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল।ধনী কৃষক খাদ্যের কালোবাজারি করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল।সেই প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েছিল আগুনের পরশমনণ ছোঁয়া  দুর্বার কৃষক আন্দোলন।হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খৃষ্টানের সেই মিলিত সংগ্রামের নামই তেভাগা আন্দোলন। নড়াইলের  জমিদার পুত্র অমল সেন ছিলেন সেই ভুবন কাঁপানো  মহাসংগ্রামের  অন্যতম পুরোধা। তাঁর ছায়া অনুসরণ করে তেভাগা আন্দেলনের উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল  নড়াইলের  চিত্রা  নদীর তীরে।সেই ঝাপ্টায় সিক্ত হয়েছিল নড়াইলের  আরও  অনেক উদার মুক্তমনের মানুষের সাথে  কৃষকের বন্ধু আফসার উকিলের দরদী মন। উকিল সাহেব শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়ে কংগ্রেস  ত্যাগ করে নড়াইলে গড়ে তুলেছিলেন আওয়ামি লীগের  বলিষ্ঠ সংগঠন। তাঁর  জেষ্ঠপুত্র সাঈফ মীজান স্কুল  জীবন থেকেই  মুজিব আদর্শের সৈনিক হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে সক্রিয় হয়েছিল।নড়াইলে  অসাম্প্রদায়িক সমাজ সচেতনার ছটা ছিল এতটাই বিস্তৃত ও প্রসারিত যে  বহু ঝড় ঝাপ্টার মধ্যেও  সাম্প্রদায়িক  সহিংসতার বিষবৃক্ষ কখনও  চিত্রা বিধৌত মৃত্তিকায়  শিখড় ছড়াতে পারেনি।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাত থেকে হানাদার প্রতিরোধে দক্ষিণ বাংলায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সুসংগঠিত ধারায় বলবান হয়ে প্রায় তিনদিন যশোর ক্যান্টনমেন্ট অবরোধ করে রেখেছিল তাও উৎসারিত ও পরিচালিত হয়েছিল নড়াইল থেকেই। সাঈফ মীজান সে সময় অসাম্প্রদাকি চেতনার আর এক তীর্থ পিরোজপুরে কর্মরত ছিল। মহাকূমা প্রশাসনের অন্যতম কুশিলব ম্যাজিস্ট্রেট।তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল অস্ত্রাগার ও ট্রেজারি। মীজান ইচ্ছা করলে একা ভালো থাকার জন্যে অন্য দশটা আমলার মত  সুবিধবাদের পন্থা অনুসরণ করতে পারতো। কিন্তু আমি সাঈফকে স্কুল জীবন থেকে চিনতাম।সে সংগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার পাত্র ছিল না। সে শুধু নিজের জন্যে বাঁচতে চায়নি।

পুরো এপ্রিল মাস পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুত হয়েছিল হানাদারদের সাথে মোকাবেলার জন্যে।মিজান অস্ত্রাগার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। কোষাগার অবারিত রেখেছিল।  চরম ত্যাগের জন্য প্রস্তুত করেছিল নিজেকেও!

৫ মে ছিল সেই  অগ্নিপরীক্ষার দিন! মীজান অনড় অবিচল ছিল তাঁর প্রত্যয়দীপ্ত শপথের শরশয্যায়।অভিমন্যুর মত বলেছিল, ‘হে মৃত্যু তমি আসো, আমার দুয়ার খোলা তোমার জন্যে, আমিপ্রস্তুত’ ! “মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান!”

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts