আজ পহেলা বৈশাখ

আজ পহেলা বৈশাখ ফিরোজ শ্রাবন

গাছে গাছে আমের মুকুল দেখে ভাবি পহেলা বৈশাখ এলো বলে। গ্রামে একটা সুন্দর ব্যাপার হল প্রকৃতি আপনাকে বলে দেবে এখন কোন কাল চলছে গ্রীষ্ম, বর্ষা, নাকি শরৎকাল। তবে অনেকে হয়ত ১৪২৫ বঙ্গাদে এসে বলবেন, এখন প্রকৃতির রূপ নির্ণয় করা কঠিন । সত্যি কথা যাই হোক, গ্রামে আমরা সাধারণত গাছের মুকুল দেখেই ভাবতাম বৈশাখ এলো বলে। কিন্তু কবে আসবে তা জানার জন্য বড়দেরকে প্রতিনিয়ত বিরক্ত করতে হত । কারণ পহেলা বৈশাখ মানে কিন্তু বৈশাখীমেলা । আমি সব কিছু ভুলতে পারি বৈশাখীমেলার কথা ভুলতে পারবো না । শৈশবের এই আনন্দের দিন কি ভোলা যায়? পহেলা বৈশাখ মানে পান্তা ইলিশ । এই সংস্কৃতি গ্রামে আরও বেশি দৃশ্যমান, সাথে নানান রকমের ভর্তা। শহর জীবনে পান্তা ইলিশের সাথে যোগ হবে রকমারি সব খাবারের আয়োজন। আর গ্রামে পহেলা বৈশাখ এর সাথে যোগ হবে শুভ হালখাতা । সারা বছরের হিসেব নিকেশ এর ইতি টানবে দোকানি আর গ্রাহক বা খদ্দের যাই বলি, তিনি সারা বছরের দোকানের বাকি টাকা শোধ করে দেবেন। মিষ্টি এবং দধি দিয়ে খদ্দেরকে দোকানি আপ্যায়ন করবেন । কত সুন্দর এই পদ্ধতি । সহজ সরল লেনদেন, কোন জঠিল অংক নাই। কিন্তু আজকাল শহরে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন মূল্য ছাড় দেখে সত্যিই ভয় লাগে যে আসলেই পণ্যের আগের দাম  কত ছিল। আরও ভয় লাগে যে, পহেলা বৈশাখে যদি ধরা খাই মানে ঠকে যাই তাহলে সারা বছরই ঠকতে হবে যে কোন লেনদেন-এ। তাই পহেলা বৈশাখে আমি ব্যবসায়ীদের বলতে চাই, দয়া করে বছরের প্রথম দিন লক্ষীদেরকে, মানে খদ্দেরকে ঠকাবেন না।

আমাদের সত্যিকারের সংস্কৃতি গ্রামের মানুষ যদি ধরে না রাখতো তাহলে  শহর ও তা থেকে বঞ্চিত হত। কারণ শহর তো সংস্কৃতি ধারণ করে, লালন করে না। পহেলা বৈশাখের মেলায় শহরে বা গ্রামে যেখানেই যাই ভাবনা কিন্তু একটাই, মেলায় কেনাকাটা।  আর কেনাকাটার জন্য টাকার জোগাড় করার চিন্তাটাও মাথায় রাখতে হয় । আমার শৈশব-এর কথা বলি, ‘এবার মেলা থেকে অনেক ভাল মানের আম কাটার ছুরি কিনবো । নরমাল ছুরিগুলো দুই/তিন টাকা সে ছুরিতে ধার থাকেনা।  তাই আম ছিলতে কষ্ট হয়। আর মাটির ব্যাংক কিনবো এই জন্য যে আবার টাকা জমাবো আগামী বছর মেলায় কেনা কাটা করার জন্য। তাছাড়া আইসক্রিম খাব, প্লাস্টিকের বাস কিনবো । এই বাস দড়ি দিয়ে টেনে চালাতে হয়। অদ্ভুত সুন্দর এই প্লাস্টিকের বাস। যে সব বাসে মানুষ চড়ে ঢাকা যায় ঔ গাড়ি গুলো হয়ত এমনই হবে এমন ভাবনা ভাবতে অনেক ভাল লাগত। সত্যিকারের বাসে করে যেদিন ঢাকা যাব ঔদিন বুঝতে পারবো আসলে সত্যি বাস আর প্লাস্টিকের বাসের মধ্যে পার্থক্য কি।’ তো সব কিছু মিলে বেশ কিছু টাকার দরকার। বর্তমানে আমার কাছে যে টাকা আছে হিসেব করে দেখি তা দিয়ে ছুরি,বাস আর মাটির ব্যাংক কিনলে পুতুল নাচ দেখার আর সুযোগ থাকবে না। তাই মায়ের কাছে আগাম বায়না, মা মেলার দিন আমাকে ১০ টাকা দিবা কিন্তু।  মাও সায় দেয়, ‘দেখা যাক।’ আমি আবারও বলি, ‘দেখা যাক না, অবশ্যই দিবা কিন্তু ঠিক আছে?’ মায়ের উত্তর, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ দিন গণনা শুরু । এখন যেমন বিশ্বকাপ খেলার দিনক্ষণ গণনা করা হয়। তখন আমরা গুনতাম মেলা বা ঈদের দিন আসতে আর কতদিন বাকি। শুধু ঘরে নয়, প্রতিবেশীদের থেকেও খবর নিতাম পহেলা বৈশাখ আর কতদিন পরে। ঘরে যে দিনপঞ্জি ছিল তাতে শুধু ইংরেজী তারিখ দেখা যেত, বাংলা কোন দিনপঞ্জি ঘরে ছিলনা।

অবশেষে আজ পহেলা বৈশাখ । সকাল থেকে চারিদিকে সাজ সাজ রব। সাধ্যমতো রঙিন কাপড় পরে সবাই দলবেঁধে মেলায় চলেছে । এত আয়োজন যেন সবার মনে  আজ আনন্দের বন্যা। আজ এই মেলা যেন মহামিলন এ পরিণত হয়েছে। বাঁশের বাঁশির প্যাঁ পুঁ আওয়াজ যেন বিষন্নতা কে কাটিয়ে খুশির জানান দিচ্ছে। চারিদিকে আজ যেন খুঁশির সমাহার। মেলায় পৌঁছানোর পরের কথা কি বলবো, কোন দোকানে যাব কোনটা আগে কিনব তার যেন আর তর সইছিলনা।  অনেক খেলনার ভীড়ে টাকার দিকে তাকালে কোনটা রেখে কোনটা যে বাদ দেই তা নিয়ে ভীষণ মন খারাপ হতো । তাছাড়া মেলা শেষ হলে তো আর টাকা থাকলেও কিনতে পারবো না। অবশেষে অনেক দামাদামি করে একটা ছুরি কিনলাম, মাটির ব্যাংক আর প্লাস্টিকের বাস । হাতে যে টাকা আছে তা দিয়ে আর  তেমন কিছু কেনার সামর্থ্য আমার হতনা। তাই আগামী মেলায় অনেক অনেক টাকা জমিয়ে অনেক অনেক খেলনা, বাঁশি, আইসক্রিম কিনবো। আট আনা দিয়ে নয়, দুই/পাঁচ টাকা দামের প্যাকেট আইসক্রিম কিনে খাব এই প্রত্যাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসা।

আমার এই অনেক অনেক  খেলনা আসলেই আর কেনা হতনা । এভাবেই মেলা আসতো আবার চলেও যেত । আর স্বপ্নের সাথে বসবাস করতাম । এখনও স্বপ্ন দেখি, মেলায় যাব অনেক কিছু কিনবো। তবে কনকচাঁপার গানটা শুনে মনে হয়, ‘বাঁশি কই আগের মত বাজে না মন আমার তেমন কেন সাজেনা। তবে কি ছেলেবেলা অনেক দূরে  ফেলে এসেছি ।’

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন

 

 

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment