আবিদ আজাদের কবিতা : শিল্পের বাগানবাড়ি

আবিদ আজাদ

পরিপূর্ণ অর্থেই বৃহত্তর বাংলা এক উর্বর ভূমি ষড়ঋতুর পরিচর্যায় আর হাজারো নদনদীর দানে সমৃদ্ধ বাংলার মাটিতে জন্মে অসংখ্য রকমের গাছপালাশস্যাদি বাংলার সাংস্কৃতিক উঠোনে ধারাবাহিকভাবে জন্মলাভ ঘটে শত কবিশিল্পীকথাশিল্পীনাট্যকারের

আবিদ আজাদ বাংলার উর্বর উঠোনে জন্ম নেয়া তেমনি এক শক্তিমান কবির নাম তাঁর হাতে অন্যান্য ধরনের সৃষ্টিসহ রচিত হয়েছে বহু কবিতা তাঁর কবিতা বৈচিত্র্যে ভরপুর, পাশাপাশি শিল্পগুণে সমৃদ্ধ এক সহজাত কাব্যপ্রতিভা নিয়ে তিনি কবিতা লিখে গেছেন একের পর এক ফলে তাঁকে কষ্টকল্পনার কষ্ট করতে হয়নি একই কারণে তাঁর কবিতা গীতল, মোলায়েম, সুন্দর উপভোগ্য তাঁর সৃষ্টির মাঝে অক্ষমের জোরাজুরি নেই, পাঠকঠকানো উপরচালাকি নেই সহজাত কাব্যপ্রতিভার সাথে আধুনিক কবিতার বিস্তারিত পাঠ এবং পরীক্ষানিরীক্ষার সাধনা তাঁকে শক্তিমান কবি হয়ে উঠতে সফল সহায়তা দিয়েছে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, তিনি দশকের অন্ধগলিতে পথ হারাননি তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে দশকের অন্ধগলি একপাশে ফেলে রেখে উৎকৃষ্ট কবিতার প্রশস্ত পথ ধরে হেঁটেছেনযার পায়ের নিচে উর্বর পুরাতন মাটি, মাথার উপর বাধাহীন আকাশ এবং দুপাশ খোলা হাওয়া মাটির আত্মীয়গন্ধ,আকাশের উদার সৌন্দর্য এবং মুক্তহাওয়ানির্গত বিশুদ্ধ অক্সিজেন তাঁর কবিতার মধ্যে ঠাঁই নিয়ে তাদের করে তুলেছে প্রকৃতির মতো সচ্ছল সুন্দর সে সৃষ্টির মধ্যে আছে শ্রান্তিহরণিয়া গাছের ছায়া, নদীর ¯স্রোত, বনভূমি ছুঁয়ে আসা প্রান্তরের হাওয়া

 

কবি হিসেবে আবিদ আজাদের একাধারে অনেক কবিতা লিখেছেন এবং উৎকৃষ্টমানের অনেক কবিতা লিখেছেন পরিমাণের ব্যাপকতা গুণগত উৎকর্ষের এমন সুসমন্বয় কম কবির হাতেই ঘটে থাকে আবিদ অনেক কবিতা লিখেছেন এবং অনেক রকমের বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন; কবিতা নিয়ে  বহু ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষাও করেছেন বিস্মিত হতে হয় দেখে যে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর হাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে ভালোবাসার কবিতা, রাজনীতির কবিতা, প্রকৃতির কবিতা, স্বপ্নের কবিতা, দুঃস্বপ্নের কবিতা, গণমুখী কবিতা, একান্ত ব্যক্তিঅনুভবের কবিতা, স্বদেশপ্রেমের কবিতা, স্বাধীনতার কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, রাজনৈতিক ভন্ডামি বিরোধী কবিতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কবিতা, স্মৃতিস্না কবিতা, ব্যক্তিস্মরণের কবিতা, জীবনের কবিতা, মৃত্যুভাবনার কবিতা, বিজ্ঞানচেতনার কবিতা, এমন আরও প্রকারভেদ চিহ্নিত করা সম্ভব তিনি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কবি তিনি যা দেখেছেন, যা বুঝেছেন, যা সঠিক বলে জেনেছেন, যা বিশ্বাস করেছেন, তা কবিতায় তুলে ধরেছেন নান্দনিক সৌন্দর্যে এবং সুগভীর পরিচ্ছন্নতায় তিনি রাজনীতির কবিতা লিখেছেন, কিন্তু দলবাজি তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি তিনি মুক্তিযুদ্ধের কবিতা লিখেছেন, কিন্তু মিথ্যা আবেগকে প্রশ্রয় দেননি তিনি ভন্ডামির বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিবিশেষকে কটাক্ষ করেননি এবং শিল্পের সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হতে দেননি তিনি প্রেমের কবিতা লিখেছেন, বিচ্ছেদযন্ত্রণার কবিতা লিখেছেন কিন্তু স্থূল আবেগকে জয়ী হতে দেননি তাঁর কবিতায় নারীবিদ্বেষ নেই, ধর্মবিদ্বেষ নেই তিনি পুরুষ হলেও তাঁর কবিতায় পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের ছাপ নেই তিনি প্রতীকী কবিতা রচেছেন, পরাবাস্তব কবিতা রচেছেন, রোমান্টিক কবিতা রচেছেন, ন্যারেটিভ কবিতা রচেছেন,  দীর্ঘায়তন কবিতা রচেছেন, স্বল্পায়তন কবিতা রচেছেন কিন্তু কোনো ইজমের দাসত্ব করেননি প্রত্যক্ষতঃ অন্যকোনো কবির অনুসৃতি নেই তাঁর কবিতায় তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কবিতা লিখেছেন কিন্তু  স্থূল ভাষা কাচা আবেগ পরিহার করেছেন তাঁর প্রেমের কবিতা, প্রকৃতির কবিতা, সমাজভাবনার কবিতা, পরিহাসধর্মী কবিতাসকল প্রকার কবিতার ভাষা গঠনশৈলী নান্দনিক সৌন্দর্যে উজ্জ্বল উপভোগ্য বিষয় ভাবনায় তাঁর গভীরতা বিস্ময়কর এবং একইসাথে তাঁর প্রকাশভঙ্গি প্রাতিস্বিকতায় অনন্যসুন্দর তিনি অনেক বড় ব্যাপক কোনো বিষয়কে একটি ক্ষদ্রায়তন কবিতায় তুলে ধরতে এবং একটি সূক্ষ অনভূতিকে দীর্ঘায়তন কবিতা করে তুলতে সমানভাবে সমর্থ উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর হাতে রচিত সৃষ্টি শৈল্পিক সৌকর্যে মানোত্তীর্ণ একদিকে তিনি সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে প্রবল সাবলীলতায় কবিতা লিখেছেন, অন্যদিকে কবিতায় প্রাণের গভীরতা অক্ষুণ্ন রেখেছেন তাঁর কবিতা কৌষ্ঠকাঠিন্যময় নয়, তরলও নয় তাঁর কবিতা দুর্বোধ্য নয়, সহজ পদ্যও নয় তিনি যুৎসই শব্দ নির্বাচনে সুদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন কিন্তু শব্দ নিয়ে অহেতুক জোরাজুরি করেননি, শব্দের ধাঁধা সৃষ্টি করেননি কবি হিসেবে এটি তাঁর গভীর শক্তিমত্তার পরিচয়বাহী

 

কবি হিসেবে আবিদ আজাদের একটি বিরাট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তিনি একজন সহজাত প্রতিভার অধিকারী কবি গুণী চিত্রশিল্পী যেমন তুলির দুএকটি সহজ আঁচড়ে অত্যুৎকৃষ্ট মানের ছবি এঁকে দিতে পারেন, আবিদ আজাদ তেমনিভাবে সাধারণ শব্দে সহজ বাক্যে অসাধারণ কবিতা সৃষ্টিতে সমর্থ তাঁকে কষ্টকল্পনা কিংবা কাঠামোগত উপরচালাকির আশ্রয় নিতে হয়নি তিনি পরিচিত চিত্র সহযোগে নতুন চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন আবার তাঁর সমস্ত সহজসৃষ্টির আবেদন বারবার পাঠেও ফুরিয়ে যায় না

 

যে বাড়িতে থাকো তুমি

ইচ্ছে করে একদিন খুব বিকেলবেলায় এসে ভীষণ আদর করে

বাড়িটাকে কোলে তুলে নিই

ইচ্ছে করে দুহাত ধরে মাথার ওপর তুলে নাচাই

কোমর ধরে দুলুনি দিই দুলুনি দিই

ঘুম পাড়িয়ে রাখি আমার একলা হুহু বুকের কাছে

ইচ্ছে করে হাসাই ওকে পাঁজাকোলের শিশুর মতো ভীষণ হাসাই

(তোমার বাড়ি/ ঘাসের ঘটনা)

 

এই কবিতা বাংলা সাহিত্যে একেবারে নতুন এবং অতুলনীয়ভাবে সুন্দর একটি বাড়ির কল্পচিত্রে তিনি গভীরনিবিড় ভালোবাসার ছবি এঁকে দিয়েছেন অভূতপূর্ব শৈল্পিক সৌন্দর্য হৃদয়িক মমতার উপকরণের সুসমন্বিত ব্যবহার ঘটিয়ে ভালোবাসার মানুষটি যে বাড়িতে বসবাস করে, সেই বাড়িটিকে কোলে নিয়ে আদর করার দৃশ্যকল্প একইসাথে অভূতপূর্ব এবং অনন্যসুন্দর এই কবিতার আবেদন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়

 

আবিদ আজাদের কবিতার অন্যতম গুণ হচ্ছে তাদের শরীরে জড়িয়ে থাকা মমতার আস্তরণ আবিদ আজাদ ভালোবাসা ভরা বিশালায়তন হৃদয়ের কবি অনিঃশেষ মায়া মমতার ভান্ডার তাঁর হৃদয়মন তিনি বিষয় নির্বাচনে বুদ্ধি প্রজ্ঞার আশ্রয় নিয়েছেন; কিন্তু যখন সেসবকে কবিতা করে গড়ে তুলেছেন, তখন সেসব সৃষ্টির পরতে পরতে, ভাঁজে ভাঁজে, শরীরে প্রাণে সহজ স্বাভাবিকতায় জড়িয়ে গেছে, মিশে গেছে, লেপ্টে গেছে, তাঁর ভালোবাসাভরা হৃদয়ের মায়া মমতা আবিদ আজাদের কবিতা মানেই গভীর আন্তরিকতার স্পর্শমাখা ছবি সেসব সৃষ্টির কোথাও উপেক্ষা নেই, সস্তাচালাকি নেই, অবজ্ঞা নেই, মিথ্যারঙ নেই আল মাহমুদের কবিতার সর্বত্র যেমন বলিষ্ঠ সোনালি পৌরুষের ছাপ, আবুল হাসানের কবিতার সর্বত্র যেমন আন্তরিক বেদনার নিবিড় ছোঁয়া, আবিদ আজাদের কবিতার শরীরে প্রাণে তেমনি গভীর মমতার রেশমী আস্তরণ আবিদ আজাদ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কবি, অনেক ভালোবাসার কবি, অনেক দেশপ্রেমের কবি আর সেজন্যই তাঁর কবিতা এতটা হৃদয়ছোঁয়া,– এতটা অন্তরঙ্গ

 

এইবেলা রৌদ্রে তোমাকে বিছিয়ে দিয়ে যাই

এইবেলা গ্রীষ্মের আলোছায়ার ভিতরে

তোমাকে একটু ছড়িয়ে দিয়ে যাই

এইবেলা শীতের কুয়াশায় তোমাকে একটু জাগিয়ে দিয়ে যাই

বসো, একটু নরোম হয়ে বসো,

নতুন পাতার মতো গোছগাছ হতেহতে ফের

হাওয়ায় একটু এলোমেলো হয়ে বসো

এইবেলা একটু রোদের দিকে আর

একটু ছায়ার দিকে কাত হয়ে থাকো

এইবেলা তোমাকে সামন্য তোলপাড় করে দিয়ে যাই

(এইবেলা / আমার মন কেমন করে)

 

আবিদ আজাদ তাঁর অনুভবের আন্তরিকতায় দারুণভাবে সত্যনিষ্ঠ এক কবি তিনি নিজের বিশ্বাস নিয়ে কখনো লুকোচুরি করেননি কবিতার সাথে অথবা কবিতার পাঠকের সাথে নদী যেমন তার আপনগতিতে সহজঅটল, সূর্য যেমন তার আলোবিকিরণে স্বভাবআপোসহীন, আবিদ আজাদ তেমনি তাঁর অন্তরের বিশ্বাসে অন্তরঙ্গঅবিচল তিনি সাহসীও বটে উপলব্ধির সত্য, অনুভবের সত্য, বিশ্বাসের সত্য, অভিজ্ঞতার সত্য, কবিতায় উপস্থাপনে তাঁর নির্ভীকতা সহজেই চোখে পড়ে তাঁর কোনো ইজমম্যানিয়া বা দলান্ধতা কিংবা গোষ্ঠীপ্রীতি ছিল না বলে কবিতা ছাড়া আর কারো কাছে তিনি দায়বদ্ধ ছিলেন না এটি তাঁর আপনসততায় সাহসী হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ ছিল তিনি ভালোবাসার কবিতা লিখেছেন, বিচ্ছেদের কবিতা লিখেছেন, পরিহাস স্যাটায়ারধর্মী কবিতা লিখেছেন সব ধরনের কবিতাতেই তাঁর আন্তরিক সততার সোনালি ছাপ এমবোস ছবির মতো সেঁটে গেছে একজন মধুকণ্ঠী গায়ক মেলাডিয়াস সুরের গান গাইলে স্বাভাবিক প্রত্যাশা মতোই সেখানে তার কণ্ঠের মিষ্টতা উপভোগ্যতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে; আবার তিনি যদি কোনো রাগপ্রধান গান করেন, তার কণ্ঠের যাদু সেগানকেও মিষ্টতার মাধুর্যে ভরে তোলে তার কণ্ঠে রাগপ্রধান গানওএমনকি সাধারণ শ্রোতার কাছেও, উপভোগ্য হয়ে ওঠে আবিদ আজাদের প্রেমভালোবাসার কবিতা তো বটেই, তাঁর প্রতিবাদের এবং পরিহাসের কবিতাগুলোও তাঁর সহজাত আন্তরিকতার নিবিড় স্পর্শে মোলায়েম পরিশীলিত তিনি দুএকটি কবিতায় যেখানে এমনকি কোনো গালিবাচক বিশেষণ ব্যবহার করেছেন, ব্যবহারগুণে তাও হয়ে উঠেছে উপভোগ্য, নান্দনিক ব্যঞ্জনায় মনোরম এবং কাব্যালংকার হিসেবে অপরিহার্য তিনি তাঁর পরিহাসেস্যাটায়ারেও উজ্জ্বল প্রাতিস্বিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁরআমার অক্ষমতার গল্পকিংবাএখন যে কবিতাটি লিখব আমিকবিতাগুলো তারই উৎকৃষ্ট প্রমাণ

 

সেই কবিতাটি যখন পড়বে কোনো বজ্জাত অধ্যাপক

আমি জানি তার মনে পড়বে তার হওয়ার কথা ছিল পুলিশ

কিন্তু তিনি হয়ে গেছেন অধ্যাপক

সেই কবিতাটি যখন পড়বেন কোনো এক পত্রিকার সম্পাদক

আমি জানি তখন ঘুমের মধ্যে তার মাথার ভিতর থেকে

বেরিয়ে আাসবে একটি ছায়ামূর্তি

আর তার মনে পড়বে তার হওয়ার কথা ছিল

সওদাগরি অফিসের একাউন্টেন্ট

কিন্তু তিনি হয়ে গেছেন সম্পাদক

(এখন যে কবিতাটি লিখব আমি/ আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি)

 

আবিদ আজাদ শব্দের ব্যবহারে এবং চিত্রকল্প সৃষ্টিতে উজ্জ্বল অভিনবত্ব ঈর্ষণীয় সক্ষমতার সাক্ষর রেখেছেন বিশেষতঃ চিত্রকল্প সৃষ্টিতে তাঁর তুলনা অন্ততঃ তাঁর দশকের কবিদের মধ্যে নেই চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্প সাজিয়ে তিনি কবিতাকে করে তুলেছেন অজস্র দৃশ্য কল্পচিত্রের নান্দনিক সমাহার তবে তাঁর চিত্রকল্প শুধু চোখ দিয়ে দেখার বিষয় নয়, একইসঙ্গে অন্তর দিয়েবুদ্ধি দিয়েসেসবের শৈল্পিক ব্যঞ্জনা উপভোগ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর চিত্রকল্প মানে সংবেদনশীল পাঠকের জন্য গভীরনিবিড় মর্মচিত্র বাহ্যিকভাবে নয়নাভিরাম দৃশ্যের মধ্যে তিনি পুরে দিতে পারেন অনেক বেদনা; বিচ্ছেদের দৃশ্যকল্পের মধ্যে প্রবাহিত করে দেন অনিঃশেষ মাধুর্য তাঁর কবিতা তথ্য দেয় বটে, কিন্তু সরবরাহকৃত তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সরবরাহের কৃৎকৌশল কবিতার অর্থের চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ্য হয়ে ওঠে কবিতায় প্রবাহিত নান্দনিক রসের মাধুরী এবং উদ্ভাসিত শৈল্পিক সৌন্দর্যের বর্ণালী পাঠক কবিতা পাঠ করতে করতে একসময় সেই মাধুরী বর্ণালীর নন্দনকাননে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন এবং সেখান থেকে কাব্যার্থের উঠোনে যেতে চায় না মুগ্ধমন

 

.

সবুজ পাতার স্লিভলেসপরা হে লাল গোলাপ,

আমাকে তোমার পায়ের গোড়ালি দের্খিয়েদেখিয়ে

আবার পাগল করো

আমি বসেবসে দেখি তোমার আহিল্লোলিত কোমরের কাছে

নাচের ছাত্রীর মতো বসে আছে ভোর

(হে গোলাপ /আমার মন কেমন করে)

.

মুক্তিযুদ্ধ, তুমি আমার সেই অক্ষমতার গল্প যা

আমি কাউকে বলি না

কেবল সেই অক্ষমতাকে একটা নিঃসঙ্গ নৌকোর দুলুনির মতো

বুকের মধ্যে চেপে রেখে

আমি আমার নিজের মাতৃভূমির মতোই কুয়াশাময় হয়ে

বসে থাকি নিজের ভিতরে

(আমার অক্ষমতার গল্প / আমার অক্ষমতার গল্প)

 

আবিদ আজাদ আপোসহীনভাবে সৌন্দর্যানুরাগী শক্তিমান কবি উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প কল্পচিত্র সহযোগে সৌন্দর্য ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা তাঁর নেশা এবং কাজে তাঁর সক্ষমতা সাফল্য দুই ঈর্ষণীয় তিনি কখনো একটিদুটি, কখনবো অজস্র উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প কল্পচিত্রের সমাবেশ ঘটিয়ে কবিতার শরীরপ্রাণ সৃষ্টি করেছেন কখনো কখনো কিছু অতিকথন ঘটেছে, কিন্তু  উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প কল্পচিত্রের অভিনবত্ব মনোহারিত্ব পাঠকের মনে আকর্ষণ ধরে রেখেছে ধারাবাহিক অব্যর্থতায় মাতাল করামাতোয়ারা করাঅভিভূত করাশত শত উপমাউৎপ্রেক্ষাচিত্রকল্পকল্পচিত্রের স্রষ্টা আবিদ আজাদ সৌন্দর্যের প্রভা বিকিরণে, নান্দনিকতার রস সরবরাহে, অর্থের ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে এবং হৃদয়হরণিয়া মাধুর্যের অফুরন্ত সঞ্চয় নির্মাণে সেসব কাব্যালংকার সোনালি সফলতায় উত্তীর্ণ কবিতাপাঠের সময় পাঠকের মন এসব উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প কল্পচিত্রে এসে মুগ্ধতায় আটকে যেতে যায় কখনো কখনো কবিতার বক্তব্যের চূড়ায় পৌঁছানোর চেয়ে এসব সৌন্দর্যের ভাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতার সবখানি উপভোগ করতে লোভী হয়ে ওঠে মন যেসব পাঠকের আবিদ আজাদের কবিতা এখনও সেভাবে পড়া হয়ে ওঠেনি, তাদের জন্য বেশ কটি কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যায়

.

নৌকার গলুইর মতো একা, হে আমার ছেলেবেলা, রাজহাঁস

তোমাদের ভিতরে সিল্কের সেই পুকুরের জল

আজো ডানা ঝাড়ে নাকি? ঝরে নাকি পাখার সাদায়

শেফালির গন্ডদেশ রাঙা করা বালকের হাত?

(ফেরাও অথবা ভেঙে ফেলো/ ঘাসের ঘটনা)

.

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে যুদ্ধ শেষের

ভাঙা একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি

তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে

স্কার্টপরা বুড়ি বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা

(যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না/ বনতরুদের মর্ম )

.

বিষণ্নতায় ধোয়ামোছা দিন, চিবুক নোয়ানো ঝোরা

ঝরছে হাওয়ায় শজিনার বনে পল্লবপলিথিন

আমার স্মারক নীলিমাপ্লুত ফণিমনসার চূড়া

অবসর ওগো অবসর ওগো বিপুল সুদূর দিন

(গতপ্রেমিকা/ ঘাসের ঘটনা)

.

বাড়ি মানেরেলিঙে স্তনের ওপর ভার রেখে মেয়েমানুষের মতো

ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যোৎস্না

বাড়ি মানেরেলিঙে স্তনের ওপর ভার রেখে মেয়েমানুষের মতো

ঝুকে থাকা আলুথালু ছায়া

বাড়ি মানেমুখের কাছে এলোমেলো চুল

ছুটছে হাওয়া

যেন কেউ আসবে,

ফিরে আসবে..

(বাড়ি মানে / বনতরুদের মর্ম)

.

আমি আমার ছেলের এইনানানাবলেওঠা অস্বীকারের মধ্যে

হঠাৎ আমার অস্তিত্বে কেঁপেওঠা দুলুনির মতো শব্দ শুনতে পাই

শুনতে পাই ব্রাশফায়ারের সাদা লিফলেটের মতো উড়তে থাকা

ঝাঁকঝাঁক বকের পালকের বাতাসে ভেসে যাওয়ার শব্দ

শুনতে পাই জ্যোৎস্নারাত্রির ভিতর দিয়ে শীতের এক নদীর

কিনার ধরে এগিয়ে চলা নৌকো আর জলের শরীরের শব্দ

(আমার অক্ষমতার গল্প/ আমার অক্ষমতার গল্প)

.

আমার অটোগ্রাফ নিতে এসেছে বাগানের এক ডজন স্মার্ট জিনিয়া

ওরা খিলখিল করতেকরতে একজন আরেকজনের গায়ে হেলে পড়তেপড়তে বলল,

আমরা একগাছের বান্ধবী সবাই,

এবারই ভর্তি হয়েছি ভার্সিটিতে, একই ডিপার্টমেন্টে;

আমাদের সবার জন্যে একটা কিছু লিখে দিন,

খুব মজা করতেকরতে আমরা হোষ্টেলে ফিরে যাব ষ্টাফবাসে

 

কী লিখব আমি এই বারোটি ঝলমলে জিনিয়ার আরক্ত খাতায়?

(আমার অটোগ্রাফ নিতে এসেছে/ আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)

 

আবিদ আজাদ আমৃত্যু রাজধানী শহরে বসে কবিতা লিখেছেন ফলে তাঁর কবিতায় আধুনিক জীবনের তথা নাগরিক উঠোনের অনুষঙ্গ এসেছে ব্যাপক মাত্রায়; কিন্তু কবিতার ভাঁজে ভাঁজে খাঁজে খাঁজে পাহাড়সমুদ্রনদীহাওরআকাশের তারাসন্ধ্যার গোধূলিগ্রামের স্মৃতি খচিত হয়ে তাদের করে তুলেছে আধুনিক শিল্পের বাগানবাড়ি একারণেই আবিদ আজাদের কবিতা কংক্রিটের নীরস উঠোন হয়ে যায়নি, তা হয়েছে গাছপালাশোভিত আধুনিক অট্টালিকা

বাড়িটা সম্পূর্ণ তৈরী হতে আরো কিছু দিন যাবে;

বারান্দার থামগুলি সিমেন্টের সবল কোমর

ধরে দাঁড়িয়েছে সবে, লোহার পাঁজর ধরে প্রাণ,

আমি ভাবি কবে এই থামগুলি ডানা মেলে উড়ে যাবে দূরে

সুনসান মেঘ দেখেদেখে কবে শোঁ শোঁ স্বর তুলে

নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে বৈশাখের চিলের মতন

 

আমি ভাবি ছোটছোট ভেন্টিলেটরের দল কবে

সুন্দর পাখির ঝাঁক হয়ে লাফিয়ে উঠবে হাওয়ায়হাওয়ায়

দেয়ালের কাছে কাছ থেকে মুক্তি চেয়ে নিয়ে ছাদখানি

পুলকেপুলকে ভেসে যাবে চন্দ্রডোবা ভোরে;

জ্যোৎস্নার ঝরনার সাথে দোল খাবে বাধাবন্ধহারা

জানালার ব্যাকুল কপাট;

হাতে বোনা বাগানের গাছপালা ভুলিয়ে আনবে সব রকমারি পাখি,

রাশি রাশি লাল নীল রঙের ফড়িং

প্রজাপতিদের চালে কম্পমান হালকা দিন লতার অরব কমনীয়

(ভবিষ্যৎ বাড়ি / ঘাসের ঘটনা)

 

আবিদ আজাদ আমৃত্যু কবিতার এই অনন্যসুন্দর বাড়ি নির্মাণের কাজ করে গেছেন তিনি তাঁর সৃষ্টি নিয়ে যে স্বপ্ন ব্যক্ত করেছেন কাব্যজীবনের শুরুতে, তা আগাগোড়া ফলে উঠেছে তাঁর হাতে তাঁর অকাল মৃত্যুর পর আমরা দেখতে পাই আধুনিকতার উপকরণে তৈরী তাঁর কবিতার বাড়ি সবুজের সচ্ছলতায় প্রাণবন্ত পাখির কাকলিতে মুখর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায় সেবাড়িতে প্রবেশ করলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়, ইচ্ছে করে তার বাতায়নে বসে থেকে, তার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে, তার বারান্দায় পায়চারি করে, অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিতে সেবাড়ির নির্মাণ কারুকাজ দেখে চোখ জুড়ায়, তার প্রশস্ত প্রাঙ্গণে প্রবাহিত আলোহাওয়া মনে শান্তির সুনিবিড় পরশ বোলায়, তার গাছপালায় ছন্দেতালে উচ্চারিত কথাকাকলি শুনে মন ভরে যায় আবিদ আজাদের কবিতায় আবহমান বাংলা বিবর্তনে ধারায় অগ্রসর আধুনিক বাংলার অন্তরবাহিরের সমন্বিত ছবি ফুটে উঠেছে নান্দনিকতার রূপরসরঙ মেখে

আমিনুল ইসলাম
আমিনুল ইসলাম

 

 

Author: আমিনুল ইসলাম

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment