আমাদের চেতনায় মে দিবস

চিন্তা করা যায় আজ থেকে প্রায় একশত একত্রিশ বছর আগের কথা। ভাবতেই কেমন শিহরণ সৃষ্টি হয় রোমকূপে। সজারুর কাটার মতো খাড়া হয়ে যায় শরীরের সমস্ত পশম । কেমন ছিল সেই সময়ের সেই দিনটি?  একটু ঘুরেই আসি সেই স্মৃতিময় রক্তাক্ত  হে মার্কেট থেকে।

১৮৮৬ সালের কথা। আমেরিকার শিকাগো শহর। শহরের ‘হে’ নামক মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি জানায়। সেই সুবাদে সিদ্ধান্ত নেয়, মে মাসের  ১ তারিখ থেকে দৈনিক আটঘণ্টা কাজ করবে। আটঘণ্টার বেশি কোন শ্রমিক কাজ করবে না এই দাবি নিয়ে শ্রমিকরা হে মার্কেটে একত্রিত হয়।  

শ্রমিকরা আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামে। তখন শ্রমিকদের ঘিরে থাকা পুলিশের উপর অজ্ঞাতনামা কে বা করা বোমা হামলার করে। এরপর তৎকালীন বুর্জোয়া শ্রেণি, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি, ক্ষমতাসীন সরকার ও তাদের সহযোগীরা নির্বিচারে শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে থাকে। শ্রমিকদের রক্তে রক্তস্নাত হয় হে মার্কেটের প্রশস্ত চত্বর। মারা যায় অনেক শ্রমিক। সেই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে হে মার্কেটে মে মাসের চার তারিখে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে শ্রমকিরা।

সেই আয়োজনে শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশ গুলি চালিয়ে আরো প্রায় ২০ জন শ্রমিককে হত্যা করে। নিষিদ্ধ করা হয় সব ধরনের সমাবেশ, শোভাযাত্রা। সিটি কাউন্সিল হুকুম জারি করে হে মার্কেটসহ সমস্ত শিকাগো শহরে।

শহর জুড়ে শুরু হয় পুলিশী নির্যাতন ধর-পাকড়ের অসহনীয় তান্ডবলীলা। পুলিশ হত্যার মিথ্যা অভিযোগে প্রাণ দিতে হয় আরো আটজন তুখোড় শ্রমিক নেতাকে। এদের মধ্যে চারজনকে ঝুলানো হল ফাঁসিতে, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হল। কিন্তু ছয়মাস পর ওই তিনজনকেও মানবাধিকার লংঘন করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় এবং বাকি ১ জন ফাঁসির আগের দিন পুলিশী নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যঅ করেন। কিন্তু সেদিনের সেই নির্যাতন ও বর্বরতা কিছুতেই রোধ করতে পারেনি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাকে।

আটঘন্টা কাজ করার ন্যায্য দাবি নিয়ে টগবগে জ্বলে ওঠা শ্রমিকদের অধিকার অভ্যুত্থানকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কোন অশুভ শক্তি। তাই তারই ফলশ্রুতি স্বরূপ আজ আট ঘন্টা শ্রমের সময় নির্ধারণ হয়েছে। তাই হে মার্কেটের শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে প্রতিবছর মে মাসের ১ তারিখ পালিত হয় আন্তর্জাতিকভাবে মে দিবস।

সেদিনের সেই শ্রমিকেরা বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমাদের দিয়ে গেলেন আটঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি। অথচ আমরা এখন আটঘণ্টা নয়, দশ ঘণ্টা নয়, একটানা বার ঘণ্টাও কাজ করে চলছি অবলীলায়। এটা কি ঠিক হচ্ছে? প্রশ্ন শ্রমিক মালিক এবং সকলের কাছে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিৎ এ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা। যেমন ওভার টাইমের নামে অধিক শ্রম দিয়ে যাচ্ছি কলুর বলদের মতো।

মালিকপক্ষ তাদের সুবিধা ভোগ করছে বিভিন্ন ছলচাতুরি দ্বারা । শ্রমিকপক্ষ এখনো অবলীলায় নির্যাতিত হচ্ছে, কিন্তু কিছু করার নেই। এই যদি হয় আমাদের মালিক শ্রমিকের সম্পর্ক তবে কেন সেদিনের সেই ত্যাগ? কেন রক্ত দেওয়া, জীবন দেয়া? কেন? আসুন আমরা তাদের আত্মদানের প্রতি সম্মান রেখে নিজেরা সতর্ক হই, অন্যকে সতর্ক করি, আটঘণ্টা কর্ম করি, সুন্দর জীবন গড়ে তুলি। তবেই সেদিনের সেই আত্মদান, মহতী ত্যাগকে সত্যিকারের মূল্যায়ণ করা হবে।

মে দিবসের তাৎপর্য আমাদের অনেক শ্রমিক মা বোনেরা জানেই না । জানে না যে, কতবড় ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা আটঘণ্টা কাজ করার স্বীকৃতি পেয়েছি। তারা জানেই না যে, আটঘণ্টা কাজ করব তার বেশি কাজ করব না এটা আমাদের অধিকার। এই অধিকার আমাদের দিয়ে গেছেন ত্যাগের মাধ্যমে, রক্তের মাধ্যমে, জীবনের মাধ্যমে।

১৮৮৬ সালের ঘটনার পর ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বর গেস্ট লুইতে আমেরিকার ‘ফেডারেল অব লেবার’ এর অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ১৮৯০ সালের ১ মে থেকে গোটা আমেরিকার শ্রমিক সমাজ তাদের অধিকার আদায়ের স্মারক পালন করবে।

১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালন করার প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে।

১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহিত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসে দাঙ্গার ঘটনা ঘটে।  পরে ১৯০৪ সালে আর্মস্টারডম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মে দিবস পালন উপলক্ষে একটা প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং দৈনিক আটঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে ১ মে তারিখে মিছিল, শোভাযাত্রার আয়োজনে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল ও শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়নের) প্রতি আহ্বান জানানো হয় । এবং সেই সাথে মে দিবস উপলক্ষে ১ মে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণারও দাবি জানানো হয়। অনেক অনেক দেশ তখন ১ মে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। মে দিবসে তারা কোন কাজ করেন না হে মার্কেটের শ্রমিকদের আত্মদানের সম্মার্থে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টরপন্থী সংগঠন তাদের দাবি দাওয়া জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসেবে বেছে নেন। কিছু কিছু জায়গায় শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুন জ্বালানো হয়। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশই মে দিবসকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করে। সেই সাথে মে দিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজেরও আয়োজন করা হয়।

ভারত ১৯২৩ সাল থেকে মে দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশও যথাযথ মর্যাদায় এই দিবসটি পালন করে থাকে। আর্জেন্টিনায় ১৮৯০ সালে প্রথম শ্রমিক দিবস বা মে দিবস পালন করা হয় এবং ১৯৩০ সাল থেকে ১ মে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। বলিভিয়া, ব্রাজিল সম্মানের সাথে পালন করে মে দিবস। অবশ্য কানাডা ও আমেরিকা সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালন করে। ১৮৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী জন স্পারও ডেভিড থমসন সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার কানাডার শ্রম দিবস ঘোষণা করেন। আজকের উন্নত বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শক্তিশালী রাষ্ট্র । এক অর্থে শাসন শোষণ আধিপত্য যাই বলি না কেন তাদের অবস্থানই প্রথম।  সেদিনের সেই ত্যাগের বিনিময়ে শ্রমিকদের অধিকার স্থাপন করার নজিরবিহীন নিদর্শন হয়ে আছে সারাবিশ্বে শিকাগো শহরের হে মার্কেট। আমরা বাংলাদেশী, আমরা মনে প্রাণে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি তাদের- হে মার্কেটে নিঃস্বার্থভাবে যারা জীবন দান করে আজকে দিয়ে গেছেন বিশ্বব্যাপী আট ঘন্টা কাজ করার স্বীকৃতি। আমরা বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তাদের দানের জন্যই আজকে আমরা শ্রমের যে সুবিধা পেয়েছি তা যথাযথ পালনের অঙ্গীকার করি মে দিবসে। সবাই এক হই। একতাই শক্তি, একতাই বল এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারন করি, সুন্দর ও শান্তির পৃথিবী গড়ি।

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Author: ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment