আমাদের সুবোধ কি সত্যি পালিয়ে যাচ্ছে?

সুবোধ তুই পালিয়ে যা

“সুবোধ তুই পালিয়ে যা” শিরোনামে নিচের প্রতীকী  দেয়াল চিত্রগুলো কিছুদিন বেশ আলোচনায় ছিলো। এখনো মাঝেমধ্যে অন লাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় এগুলো নিয়ে লেখালেখি হয়। রাজধানীর আগারগাঁ ও মহাখালিসহ কয়েকটি জায়গায় রাস্তার পাশের দেয়ালে এই গ্রাফিতিগুলো আঁকা ছিলো।

আগারগাঁর সামরিক যাদুঘরের দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলো মিরপুর থেকে বাসে আসা-যাওয়ার সময় আমার মতো অনেকেরই চোখে পড়তো।

চিত্রগুলো রহস্যপূর্ণ। দেখে বোঝা যায় আনাড়ি হাতের নয়, বরং দক্ষ ও মেধাবী শিল্পীর কাজ।

স্বদেশে দুর্বৃত্তের কাছে সহজ-সরল ও সুবুদ্ধিসম্পন্ন ভালো মানুষের পরাজয় এ চিত্রগুলোতে প্রতীকিভাবে বোঝানো হয়েছে, বুঝিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তবে প্রতিবাদের ভঙ্গিটা চমৎকার।

দুর্বুদ্ধির বিরুদ্ধে এমন প্রতিবাদ কেউ করতেই পারে। স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রতিবাদ বিচিত্ররূপে হবে- এটাই স্বাভাবিক। চিত্রগুলোর মধ্যে আধুনিকতা ও চিন্তাশীলতার ছোঁয়া আছে। প্রতিবাদের ব্যতিক্রমী শৈল্পিক প্রয়াসকে প্রতিটি সুনাগরিকের স্বাগত জানানো উচিত। কিন্তু আমরা চোখ-মুখ বন্ধ করে রাখতে পছন্দ করি।

***

কিছু দিন আগে একটি খবর দেখলাম, সুবোধ গ্রাফিতির দুর্বোধ্য শিল্পীকে গোয়েন্দারা খুঁজছে। রহস্যময় এ দেয়ালচিত্রগুলো মনে হয় সরকারের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কে বা কারা এগুলো আঁকছে, সরকার তাদের খুঁজে বের করতে চায়। এমনও হতে পারে, সরকার তাদের খুঁজে বের না করলেও, অন্তত এসব আঁকাআঁকি বন্ধ করতে চায়। উল্লেখ্য যে, আগারগাঁয়ের চিত্রগুলো এখন আর নেই। মুছে ফেলা হয়েছে। এভাবেই হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে এই শহরের সুবোধ বালকেরা।

***

কয়েক বছর আগে বিমান বাহিনী যাদুঘরের দেয়ালে আঁকা হয়েছিলো বিশ্বের বিখ্যাত বিভিন্ন মনিষীর মহামূল্যবান বেশ কিছু বাণী। যেমন: এপিজে আব্দুল কালামের একটি বাণী,

“স্বপ্ন তা নয়, যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। বরং স্বপ্ন হলো তা, যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।” চেতনা জাগিয়ে দেয়া এ রকম অনেক বাণী স্পষ্ট ও রঙিন কারুকাজে বড় বড় অক্ষরে দেয়ালে লেখা ছিলো।

আমার মতো অনেক যাত্রী যানবাহনে বসে কিংবা ফুটপাত দিয়ে  হেঁটে আসা-যাওয়ার পথে এ বাণীগুলো পড়তো। এগুলো পড়ে আমরা মুগ্ধ হতাম- জ্ঞানলাভ করতাম। বাণীগুলো আমাদের মধ্যে সুবোধকে জাগিয়ে দিতো।

বছর খানেক হলো, এ বাণীগুলোও কালো কালি দিয়ে মুছে দেয়া হয়েছে। প্রায়ই দেয়ালের দিকে তাকিয়ে লেখাগুলোর জন্য মনটা খারাপ হয়ে যায়। স্মরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু বিধ্বংসী ঝড়ে নিভে গিয়ে নিকষ কালো আঁধারে ঢেকে রয়েছে আলোর প্রদীপগুলো। আমরা নির্বাক হয়ে এখন সেদিকে তাকাই-  আর নিরুত্তাপ চোখে শুধু হতাশার কালো রঙ দেখি!

কিন্তু কি অপরাধ ছিলো মানুষের মধ্যে ‘সুচিন্তা জাগ্রত করা’ সেই অমিয় বাণীগুলোর!?

আমাদের সুবোধ কি আসলেই পালিয়ে যাচ্ছে?

দুর্বৃত্তের প্রতাপে সুবোধেরা কি ভয় পেয়ে পালাতেই থাকবে?

জহির আহমেদ

Author: জহির আহমেদ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment