আমার আগামি আমার সন্তান

amar agami amar shontan afroza aditi

সামান্য কারণে মারমুখী হয়ে উঠছে শিশুরা। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে, একসঙ্গে খেলতে খেলতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে শিশুদের। মা-বাবা-অভিভাবক-শিক্ষক কারও কথা শুনতে চাইছে না। বেশিরভাগ সময় নিজের মধ্যে ডুবে থাকছে নিজে। রাত জেগে কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ব্রাউজ করছে। লেখাপড়া করছে না হয়তো, করছে না হোম-ওয়ার্ক; এই অবস্থায় বেশিরভাগ সময় বকাবকি করা হয় শিশুকে। কখনও কখনও নানা রকম শাস্তিও দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে খবরের কাগজে দেখা যায় শ্রেণিকক্ষে শিশুকে নির্যাতন করেছে তার শিক্ষক । এই নির্যাতন যে সে নির্যাতন নয় একেবারে শয্যাশায়ী, কখনও হাসপাতাল কখনও বা সে রক্তাক্ত ভীতসন্ত্রস্ত। শিশুকে কেন নির্যাতন করা ? নির্যাতন বা শাস্তি দিলেই কী তারা কিছু শিখবে ? তারা ঠিকমতো লেখাপড়া করবে ? তারা কী সুস্থ নাগরিক হয়ে দেশের সেবা করতে পারবে? তারা কী ভালো গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে ? এই কথাগুলো ভাববার বিষয়।

 অনেকের বদ্ধমূল ধারণা শিশুকে শাস্তি দিলেই শিশু মানুষ হবে! কিন্তু তা কী  হয়? হয় না; হবেও না। শিশুকে শাস্তির সঙ্গে সঙ্গে আদর যত্ন ও সম্মান দিতে হবে। শিশুরও মান-অপমান বোধ আছে; আছে মানবিক বোধ এবং তা জন্মের সময় থেকেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু বিকশিত হতে থাকে এবং তা সঠিকভাবে  বিকশিত করার দায়িত্ব পরিবারের। শিশুকে যত্নের সঙ্গে বড় করার দায়িত্ব বাবা-মা এবং পরিবারের তারপরে শিক্ষকের; সমাজের দায়িত্বও খুব একটা ফেলনা নয়। বর্তমানে সমাজে অস্থিতিশীল, বন্ধ্যা অবস্থা বিরাজ করছে এবং শিশুরাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বেশি; তাই শিশুকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে পরিবারকে। এই সময় বাবা-মা-অভিভাবক-শিক্ষকদের দায়িত্বও অনেক। শিশুকে শুধু বকাবকি বা শারীরিক শাস্তি দিলেই অভিভাবকদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না! তারা যেন বিপথে না যায় তা দেখার দায়িত্বও অভিভাবকদের।  

  শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। অনেক সময় অনেক পরিবারে দেখা যায় শিশুকে মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা দিতে, আবার মাত্রাতিরিক্ত শাসন করতে! এর কোনটাই ঠিক নয়। যেমন অনেক অভিভাবকের ধারণা শাস্তি দিলেই শিশু সুনাগরিক হয়ে বেড়ে উঠবে; তেমনই আবার অনেকের ধারণা শিশুকে তার ইচ্ছামতো চলতে-ফিরতে এবং কাজ করার স্বাধীনতা দিলেই সে সুস্থ সুন্দর চিন্তা ভাবনার অধিকারী হয়ে সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে। এই দুটি চিন্তাধারার কোনটিই ঠিক নয়। কোনকিছু মাত্রাতিরিক্ত দেওয়া শিশুর পক্ষে ক্ষতিকারক। জীবনের চলার পথে কোনটি ঠিক কোনটি বেঠিক সেটি তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। শিশুদের ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেই সব কিছু বুঝতে পারে তারা। ছোট বেলায় পড়েছি গল্পটি:

চুরির দায়ে ধরা পড়েছে এক কিশোর। কিশোরটি বড় হয়েছে মাসির কাছে। কিশোরটির বাবা-মা না থাকায়  অতিরিক্ত আদর দিয়ে বড় করেছে তাকে মাসি। ঐ কিশোরটির চুরির অভ্যাস ছিল ছোট থেকেই। মাসির কাছে নালিশ আসলেও মাসি কিছুই বলেননি। পরে বড় ধরণের অপরাধের জন্য বিচারে শাস্তি হলো যখন, তখন বিচারপতির কাছে মাসির সঙ্গে কথা বলার অনুমতি চাইল কিশোরটি। মাসি কাছে এলে ‘কানে কানে কথা বলবে’ বলাতে মাসি তাঁর কান এগিয়ে দিলেন কিশোরটির মুখের কাছে আর ঐ কিশোরটি কামড় দিয়ে মাসির কান কেটে নিয়ে বলল, তুমি যদি প্রথম থেকে শাসন করতে তাহলে আজ এই অবস্থায় আসতে হতো না।

গল্পটি এমন কিছু নয় তবুও এই গল্পে বাবা-মা-অভিভাবকদের শিক্ষণীয় বিষয় আছে। শিশুর অপরাধ জানামাত্র অপরাধের সত্যাসত্য যাচাই করা এবং তাকে উচিত অনুচিত বিষয়টি বুঝিয়ে বলা। শিশুকে বুঝিয়ে বললে সে বুঝবে। শিশু অবস্থা হলো সেই অবস্থা যাকে গলানো সোনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একজন স্বর্ণশিল্পী যেমন সোনার তাল ছাঁচে ঢেলে তিলতিল পরিশ্রমে একটি গহনা তৈরি করে তেমনি একটি শিশুকে তিলতিল পরিশ্রমের মাধ্যমে সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে হয়। বাবা-মা-শিক্ষক হলেন সেই শিল্পী যারা তাদের দীর্ঘ পরিশ্রমে একজন সুনাগরিক উপহার দিতে পারেন রাষ্ট্রকে।      

 বেশিরভাগ বাবা-মা-অভিভাবক চাকরি করেন এবং অণু পরিবারে বসবাস করার জন্য শিশুকে গৃহপরিচারিকার হেফাজতে রাখতে হয়; তাদের কাছেই বড় হয় শিশুরা। যেসব পরিবারে দাদি, নানি বা একান্ত কোন আপনজন না থাকে এবং শিশুকে  গৃহপরিচারিকার কাছে রেখে যেতে হয় সেই পরিবারের বাবা-মা-অভিভাবককে খুবই সতর্ক থাকতে হবে কারণ গৃহপরিচারিকা বেতন নিয়ে কাজ করে; তারা অশিক্ষিত কিংবা নামমাত্র স্বাক্ষর করতে পারে। তাদের হেফাজতে সন্তানকে রাখলেও কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে সময় দিতে হবে তাকে। তার কোন আবদার কিংবা কোন অভিযোগ আছে কিনা তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শিশুর আবদার থাকতে পারে, থাকতে পারে অভিযোগও; তা সুকৌশলে মিটিয়ে নিতে হবে, কিংবা কখনও দেখা যায় কোন কোন শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে অযথা কথা বলছে; এর কারণ শিশুবয়সে সব সময় নিজের আপনজনকেই কাছে পেতে চায় তারা। এতে বাবা-মা-অভিভাবকদের বিরক্ত হলে হবে না, শান্ত ধীরস্থিরতার সঙ্গে কাজের কথা, কর্মক্ষেত্রের কথা সব বুঝিয়ে বলতে হবে তাকে। তাদের বুঝিয়ে বললে সব বুঝতে পারে। শিশুকে বড় করে তোলার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে একজন শিশু শুধু নিজের আদরের সন্তান নয়, সে এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নাগরিক। তাকে সুনাগরিক করে গড়ে তোলা বাবা-মা-অভিভাবকসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ – সবাই চায়।  

  শিশুকে নিয়ে ভাবনা ও করণীয় :

১. যে সব বাবা-মা চাকরি করেন, বাড়ি ফেরার পরে শিশুকে সময় দিতে হবে; সারাদিন কী করেছে তা শুনতে হবে

২. শিশুর কথায় মনোযোগ দিতে হবে

৩. শিশুকে ভালো গল্প কবিতা ছড়া শোনাতে হবে। বড় বড় মনীষীদের জীবনী শোনাতে হবে। একটু বড় হলে বই দিতে                  হবে; বই পড়ার অভ্যাস করাতে হবে

৪. এখন কম্পিউটার, মোবাইলের যুগ। অনেক বাবা-মা শিশুকে কম্পিউটার, মোবাইল দিয়ে বসিয়ে রাখেন; এটা ঠিক নয়। এতে শিশুর চিন্তাধারার বিকশিত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে একপেশে হয়ে যেতে পারে

৫. ছুটির দিনে শিশুকে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে; যাতে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে

৬. শিশুকে পিটুনি দেওয়া ঠিক নয়; তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে। কাজের ভালোমন্দ বুঝিয়ে দিলে সে ভালোমন্দ সম্পর্কে জানতে পারবে। অর্থাৎ একটা কাজের যে দুটো দিক আছে তা উপলব্ধি করতে পারবে

৭. শিশুকে সম্মান দিতে হবে তাহলে সে অন্যকে সম্মান দিতে শিখবে

৮. শিশু কোন প্রশ্ন করলে তার সঠিক জবাব দিতে হবে। যদি কোন প্রশ্ন তাদের উপযোগী না হয় তাহলে একটু ঘুরিয়ে তার জবাব দিতে হবে কিংবা বুঝিয়ে বলতে হবে, পরে বলা হবে; এখানে বকাঝকা করলে হিতে বিপরীত হবে

৯. শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে

১০. শিশুকে না বলা শিখাতে হবে

১১. তাকে বুঝতে দিতে হবে যে চাইলেই সব পাওয়া যায় না

১২. শিশুর সামনে অশালীন ব্যবহার, অশালীন কথাবার্তা বলা ঠিক নয়

১৩. পরিবারের সকলকে সময় ও আইন মেনে চলতে হবে তবেই শিশু সময় ও আইন মেনে চলার শিক্ষা নিতে পারবে  

১৪. শিশুর সামনে অধৈর্য হলে চলবে না এতে সেও অধৈর্য হবে

১৫. কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আলোচনা, কিংবা বাবার হাতে, মায়ের হাতে সন্তান হত্যা বা এই ধরণের কোনরকম আলোচনা শিশুর সামনে করা উচিত হবে না কখনও

১৬. খবরের কাগজে এসব খবর বেশি বেশি আসছে তাই খবরের কাগজ তাদের হাত থেকে দূরে রাখাই শ্রেয়। তাদের উপযোগী পত্রিকা রাখতে হবে

১৭. শিশুকে অন্যের সম্মুখে বকাঝকা করলে সে আহত হয়। মুখে কিছু না বললেও সে পরবর্তীতে অন্তর্মুখী হয়ে যায়। কখনও কখনও কলহপরায়ন, আগ্রাসী হয়ে ওঠে

১৮. ভাঙা পরিবারের শিশুর চিন্তা একপেশে হয়ে যেতে পারে তাই সম্পর্ক ভেঙে ফেলার আগে উভয়কেই চিন্তা করতে হবে।  বাবা-মা, উভয়কেই প্রয়োজন শিশুর। শিশুকে সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে বাবা-মা দুজনেরই প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করা

১৯. মিথ্যা ভাষণ, মিথ্যা দর্শন শিশুর জন্য ক্ষতিকর

২০. শিশুর মতামত আগ্রহ ভরে শুনলে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা গড়ে ওঠে

 বর্তমানে খুব অস্থির বন্ধ্যা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দিন। এই যাপিত জীবনে শিশুরা অনুসরণ করতে পারে এমন কোন দৃষ্টান্ত রাখতে পারছে না ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র। পূর্বে স্কুলে নীতিকথামূলক কবিতা গদ্য পড়ানো হতো। শিশু বয়স থেকেই হাতেখড়ি হতো নীতিকথা মূলক বাক্য দিয়ে- যেমন ‘সদা সত্য কথা বলিবে’, ‘পরের দ্রব্য না বলিয়া লওয়া উচিত নয়’ ‘ বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করিবে,’ ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে নীতিকথামূলক শব্দাবলী দেখতে-শুনতে পাওয়া যায় না। শিশুর সামনে এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে যা শিশুর সুনাগরিক হওয়ার পথে সহায়ক!   

 নানাবিধ কারণে একজন মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যায় তার শৈশবের অধিকার। সম্প্রতি সেভ দ্য চিলড্রেন ‘ স্টোলেন চাইল্ডহুড বা চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব – ২০১৭’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে ‘শিশুমৃত্যুর হার, অপুষ্টি, শিক্ষাবিহীন শিশুর হার, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, অপ্রাপ্ত বয়সে বাচ্চা প্রসব ও শিশুর প্রতি সহিংসতা’- এ গুলোর ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে বাংলাদেশে শিশুদের অবস্থান ভালো নয়। এই প্রতিবেদনে সরকার অনুমোদিত ২০১৬-২০১৭ সালের তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে বলা যায় যে আমাদের দেশে শিশুরা তাদের খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, শিক্ষাসহ অন্যান্য প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটি শিশুর যা যা প্রাপ্য তা দিতে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র অপারগ ফলে শৈশব হারিয়ে জীবন বিমুখ ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে অপরাধ জগতে পা রাখছে শিশুরা। তুচ্ছ কারণে রাগারাগি করে বাড়ি থেকে চলে গিয়ে অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে শিশুরা। পত্রিকায় প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে শিশু-গ্যাং-এর খবর; একজোট হয়ে চলাফেরা করে ১০/১২ জনের দল। এরা ছোটখাট অপরাধ থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত করে থাকে। সামান্য কারণে বন্ধুকে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। বড় কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে শৈশবেই তারা বড়দের ভাবনা ভাবতে বাধ্য হয়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। কখনও অন্তর্মুখী কখনও বা বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। অগ্রজের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে শিশুদের। শিশু বিপথে গেলে পরিবারের তো ক্ষতিই, ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের। সুনাগরিক থেকে বঞ্চিত হবে রাষ্ট্র। শিশুদের বিপথ থেকে ফেরানোর জন্য পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রকে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু পরিবার নয়, সমাজ নয় কিংবা রাষ্ট্রও নয়, সুনাগরিক পেতে হলে যৌথভাবে কম-বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে।        

afroza aditi আফরোজা অদিতি
আফরোজা অদিতি

 

Author: আফরোজা অদিতি

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment