আমার আব্বা

Mlvi Afsar Uddin Ahmed

আমার আব্বা জনাব আফসার উদ্দিন আহম্মেদ এক জ্যোতির্ময় মানুষ। একজন মানুষের মধ্যে কত অসাধারণ গুণ থাকতে পারে তা আব্বাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। সাদা হাসোজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছ্বল, ঠোঁটের কোণে সব সময় যেন এক চিলতে হাঁসি উকি দিচ্ছে। সদালাপি, মিষ্টভাষী, পরোপকারী, বন্ধুবৎসল, শান্তশিষ্ট ধীর অমায়িক স্বভাবের একজন মানুষ।

লেখক হুমায়ূন আহম্মেদের লেখায় পড়েছিলাম, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা সাধারণভাবে জন্মগ্রহণ করে অন্যের উপর অসাধারণ প্রভাব ফেলে। আমার আব্বা ছিলেন তেমনিই একজন মানুষ। যেখানে যার সঙ্গে ওনার আলাপ হয়েছে তার সাথে ওনার সখ্য হয়েছে। তিনি ছিলেন হ্যামিলনের বংশীবাদক। সবাই ওনার ব্যবহারে মুদ্ধ হতেন। মানুষকে আকর্ষণ করার এক দুর্দমনীয় শক্তি ছিল আব্বার মধ্যে।

পিতা হিসাবে আব্বা ছিলেন অত্যন্ত স্নেহবৎসল। আমরা ছয় ভাই বোন। ভাইবোনদের মধ্যে আমি ছোট। ছোটবলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। আব্বার সাথে নড়াইলে চিত্রা নদীতে গোসল করতে যেতাম। কি অপরিসীম যত্নে মমতায় আব্বা সাবান দিয়ে গা পরিষ্কার করে দিয়ে গামছা দিয়ে সারা শরীর ও মাথা মুছিয়ে দিতেন। আমি অনেক বড় হয়েও আব্বার কাছে গা মুছতাম। আমি যদি পড়ে যাই, আব্বা আমার গায়ের উপর হাত দিয়ে শুতেন। ঘাম মুছিয়ে দিতেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে পাখা দিয়ে বাতাস করতেন।

আব্বা পেশায় ছিলেন এ্যাডভোকেট। তখন আব্বার প্রচুর পসার ছিল। অভাব কি আমরা কখনও বুঝিনি। আব্বা কোর্ট থেকে যখনই ফিরতেন, যে মৌসুমে যে ফল হত আব্বা প্রচুর নিয়ে আসতেন। আর মাকে বলতেন, ‘আমার ছেলে মেয়েকে চোখ ভরে খেতে দেও। ওদের বাঁধা দিও না।’

আব্বা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। নড়াইল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আব্বা। আব্বা ‘৫২’ এর ভাষা আন্দোলনে  সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন। কারাবরণ করেছেন বহুবার। তেভাগা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নড়াইলের এমন কোন রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল না যেখানে আব্বার পদচারণা ছিল না। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়িটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মিলনমেলা ছিল। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাড়িতে গিয়েছেন। আমার নানা বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার স্পীকার ও প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রী ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকে বহু স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আমরা বড় হয়েছি।

আমার আব্বার বাজার করার নেশা ছিল প্রচুর। বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটা আমাদের বাড়িতে আসতো। বড় মাছ বাজারে আসলে আমাদের বাড়িতে খবর পাঠানো হতো। আব্বা ডালা ভরে মাছ কিনতেন। প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে সকালে কলাপাতায় করে মাখন নিয়ে আসতো। রোজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে বড় গামলায় করে গরম রসগোল্লা নিয়ে আসতো পরিমল দা। ছোট বেলায় সুধীর দা আমাদের চুল কেটে দিতেন। আব্বা, আমি, ছোট আপু, ছোটদা, সবাই পাশাপাশি বসে চুল কাটতাম। আমরা ভাই-বোনেরা যখন যে ঢাকা থেকে বাড়িতে যেতাম আব্বা চার মোরগ নিয়ে বাসায় যেতেন। পাড়ার চাচারা আব্বাকে ঠাট্টা করে বলতেন, ভাইজান হ্যাপি, পপী, মোহন, খোকন কি বাসায় এসেছে?

আব্বা যে শুধু আমাদের খাওয়াতেন তা নয়, আত্নীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, কেউ বাদ যেত না। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়িতে প্রচুর আমন্ত্রিত। আত্নীয়স্বজন, খালাতো, মামাতো, চাচাতো, ভাই বোন, দূর সম্পর্কের মামা, চাচা, খালা আমাদের বাসায় বছরের পর বছর থাকতেন। বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা, এইটের বৃত্তি, ম্যাট্রিক, আই.এ বি.এ পরীক্ষার সেন্টার ছিল নড়াইলে। নড়াইলের গ্রামাঞ্চলের অনেক ছেলে মেয়ে আমাদের বাড়িতে  থেকে পরীক্ষা দিত। আব্বা প্রচুর বাজার করতেন। আর মা পরম মমতায় তাদেরকে খাওয়াতেন। তাই আমরা ভাই বোনেরা ছোটবেলা থেকেই এক অনাবিল সামাজিক পরিবেশে বড় হয়েছি।

আব্বা অংকে ছিলেন অসাধারণ ভালো। অত্যন্ত মেধাবী, স্মৃতিশক্তি অসাধারণ, বাচনভঙ্গী অসম্ভব সুন্দর। অনেক জটিল জটিল অংক আব্বা মুখে মুখে করে ফেলতেন। কোন কথা তিনি কখনও ভুলতেন না। একদম হুবহু যে কোন ঘটনা বর্ণনা করতে পারতেন, দিন-খন-তারিখ-সময় ধরে বলতেন।

অসম্ভব সুন্দর বক্তৃতা দিতেন। অনর্গল সাবলীলভাবে বলে যেতে পারতেন। যেটা পরবর্তীতে আমরা ভাই বোনেরা পেয়েছি। হাস্যরসিক ছিলেন। যে কোন কথা উনি সুন্দর করে রহস্য করে বলতেন। অনেক জোক জানতেন। যার কারণে উনি যেখানে যেতেন সে জায়গাটা আনন্দময় হয়ে উঠতো। সাধারণ কথা অনের সুন্দর করে রস দিয়ে বলতেন।

ছোটবেলায় আমাদের অসুখ হলে আব্বা সারারাত মাথার কাছে বসে থাকতেন। রাত দুপুরে এমরান ভাইয়ের আব্বার কাছ থেকে হোমিওপ্যাথ ঔষুধ এনে খাওয়াতেন। বলতেন স্নেহ নিম্নগামী। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সেটা আমরা সব ভাই বোনরা আব্বা থেকে পেয়েছি।

আব্বা খুব ধার্মিক ছিলেন। কখনও এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করতেন না। যেখানে যে পরিস্থিতিতে থাকতেন, সে অবস্থায় নামাজ পড়তেন। সকালে ঘুম ভাঙ্গতো আব্বার কোরআন শরীফ তেলাওয়াতের শব্দ শুনে।

আমি যখন রোকেয়া হলে থাকতাম আব্বা আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। সমস্ত চিঠি ছিল উপদেশে ভরা। সদালাপী হও, মিষ্টভাষী হও, তোমার ব্যবহারে কেউ যেন কখনও কষ্ট না পায়। কখনও কারো প্রতি অন্যায় করো না। উপকার করতে না পারো, অপকার করবে না। নামাজী হও। নিয়মিত নামাজ পড়বে। আব্বা বলতেন “মা আব্বা মারা যাবার পর সন্তান যদি কবরের কাছে গিয়ে বলে, হে আল্লাহ্‌ আমার মা বাবাকে ক্ষমা করে দাও” আল্লাহ্‌ তা করেন। কিন্তু সেটা নামাজ ব্যতিরেকে হয় না। আজও নিয়মিত অনেক সময় নামাজ পড়া হয় না। নিজেকে তখন বড় বেশী অপরাধী মনে হয়।

খেলাপড়ায় আব্বা ছিলেন অসাধারণ। গ্রামের স্কুলে পড়ে যেমন ছিলেন বাংলায় ভাল, তেমন ইংরেজীতে। পরবর্তীতে কোলকাতায় লেখাপড়া করেছেন। আব্বার ইংরেজীতে লেখা অনেক চিঠি আমার কাছে আছে। ইংরেজীতে পাশ করা কেউ এত ভালো ইংরেজী জানে কিনা আমার সন্দেহ আছে। জীবেনে কখনও ক্লাসে সেকেন্ড হননি। ভাল ছাত্র হিসাবে এলাকায় অসম্ভব সুনাম ছিল।

পাড়ার বা নড়াইলের যে কেউ আব্বার কাছে আসলে আব্বা উদার হাতে তাদের সাহায্য করতেন। কখনও টাকা দিয়ে, কখনও কথা দিয়ে, কখনও বিনা পয়সায় মামলা করে দিয়ে। কত মামলা যে আব্বা বিনা পয়সায় করেছেন তার কোন হিসাব নেই। কত মানুষ যে আব্বার দ্বারা উপকৃত হয়েছে তা বলা সম্ভব নয়।

তাইতো আব্বা যেদিন না ফেরার দেশে চলে গেলেন সেদিন নড়াইলে শোকে মূহ্যমান হয়ে গিয়েছিল। সবাই এক সাথে বলেছিলেন, বড় ভাল মানুষ চলে গেলেন। নড়াইল এক জন ভালো মানুষকে হারালো।

আব্বা আপনি চলে গেছেন। আপনার ছেলে মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তারা প্রতিনিয়ত আপনার কথা মনে করে চোখের পানি ফেলে। আব্বা আপনি যেখানেই আছেন জানি ভাল আছেন। ভাল থাকবেন।

শারমিনা পারভিন
শারমিনা পারভিন

Author: শারমিনা পারভিন​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment