আমার আমি..৩

আমার আমি ফিরোজ শ্রাবন
আমার মায়ের ছিল ভীষণ পান খাওয়ার নেশা । আর আমার ছিল মায়ের পান চিবিয়ে মিহিন করা সেই অংশের । মা যেমন মাছের মাথার বাকি অংশ আবার আমিও মায়ের পানের বাকি অংশ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম।  তবে মা আমার মত এত ব্যস্ত হতো না যেমনটা আমি হতাম । ভাত খেয়ে পান না পেলে মা নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে করতো । আর একটা শখ মায়ের ছিল ঈদের কাপড় নিজের পছন্দের মত করে নেবার। আব্বা বাজার থেকে তিনটা চারটা কাপড় নিয়ে আসত । মা পছন্দ মত বাছাই করে যেটা বা যে দুইটা পছন্দ তা রেখে দিত। । এত সুখ এই পাকিজা প্রিন্ট, ২৫০ টাকার এর শাড়িতে এখন দুই হাজার টাকায় ও হয়ত মিলবে না। আমাদের অনেকগুলো হাঁস ছিল । হাঁস এত খাবার খেত মনে হয় পুরো বাড়ির  উঠানের সব ধান খেয়ে ফেলবে। তাই তাদেরকে পাহারা দেবার জন্য লম্বা লাঠি নিয়ে পাহারা দেয়া হত। পালাক্রমে সবাই করতো এ কাজ। আমি মাঝে মাঝে চাঁচাতো ভাই বোনদের সাথে শামুক কুঁড়াতে যেতাম হাঁসের খাবারের যোগান দিতে। আবার যদি আমাদের রাখাল অসুস্থ হত তখন গরুর দেখভালও আমিই করতাম । ঘুড়ি ওড়াতে আমার খুব ভাল লাগত আর ডাঙ্গুলি খেলা। কিন্তু ঘুড়ি বানাতে পারতাম না । যাও পারতাম তা আকাশে উড়তে চাইতো না মনে হত, সে এখনও উড়তে শেখেনি। আমার চাঁচাতো ভাই হাফিজ দাদার কাছ থেকে দুই/ তিন টাকা দিয়ে তাই ঘুড়ি কিনে উড়াতাম। আমরা সাধারণত ভাইদেরকে দাদা বলে সম্বোধন করতাম । আমি নিশ্চয়ই একদিন ঘুড়ি বানাতে পারব এই আশায় বুক বাধতাম। তবে এই দুই/তিন টাকা যোগাড় করা আমার জন্য কঠিন  ছিল না । কারণ আমি বাজার করতাম। আর বাজার করে দরাদরি করে যে টাকা বাঁচাতাম সেটা নিজের মনে করে, আমার চাঁচাতো ভাই ফুলমিয়ার মুদি দোকানে জমাতাম। তাই পছন্দের ঘুড়ি কিনতে অসুবিধা হত না । আবার বাজারের টাকা কিছু বেঁচে গেলে মাকে বলে আমি নিয়ে নিতাম। ছেলেবেলায় যতদিন বাজার করেছি আমি মোটামুটি ধনীই ছিলাম। কারণ টাকা জমানোর পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ টাকা। আর ঔ টাকা আমাকে নগদ না দিয়ে ফুলুদাদা আমাকে একটা ঘড়ি কিনে দিল। মা জানতো সে আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছে। ছোটবেলায় আমরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিলাম। আমি আর আমার ভাতিজা ফয়সাল এক পক্ষে আর অন্য পক্ষে ছিল দবির আর তার ভাতিজা নঈম। আমাদের সাথে মারামারিতে তারা পেরে উঠতো না। তবে পারিবারিকভাবে আমরা পরিবারের কাছে সমর্থন পেতাম না যেটা তারা পেত। পারিবারিক সমর্থন পেতে হলে মারামারিতে হারতে হবে। তাই বলে পারিবারিক সমর্থন না পেলেও আমরা জিততেই চাইতাম। সমস্যা ছিল আর এক চাচাত ভাইকে নিয়ে। সে ছিল আমাদের অভিভাবক । তাই আমরা মারামারি করলে সে দুই পক্ষকে মিলিয়ে দিত আর বিনিময়ে সবাই মিলে তাকে টাকা দিতে হত।  যে টাকা দিয়ে আমরা সবাই মিলে খেতাম। মাঝে মাঝে মনে হত মারামারি করে টাকা নষ্ট করার কোন মানে হয় না । কিন্তু মারামারি কিভাবে যেন লেগেই যেত। নাকি আবুল দাদা লাগিয়ে রাখত বুঝতে পারতাম না। কারণ মারামারি করলেই তার লাভ। এতে আমাদের আসলেই কোন হাত ছিল না।
ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন​


চলবে

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts