আমার আমি ৪

আমার আমি ফিরোজ শ্রাবন

প্রাইমারিতে যখন পড়তাম তখন খুব ইচ্ছা করতো এ্যাসেমব্লিং এ আমি জাতীয় সংগীত গাইব আর সবাই আমার সাথে কোরাস গাইবে। স্কুলের স্যারেরা জানতেন না আমি জাতীয় সংগীত গাইতে পারি। তো হঠাৎ একদিন সেই সুযোগটা আসলো আর আমি ও চেষ্টা করলাম। কিন্তু মনের মত গাইতে পারলাম না । তবুও আমি তখন থেকে প্রায় প্রায়ই গাওয়ার সুযোগ পেতাম সামনে দাঁড়িয়ে গাইবার জন্য। ক্লাসের ফাঁকে কোন স্যার যদি বলতো, ‘যা তো পানির জগটা ভরে নিয়ে আয়’ তখন কি যে ভাল লাগত।  ঐদিন মনে হত স্যার নিশ্চয়ই আমাকে পছন্দ করে তা না হলে কেন আমাকে পানি আনতে বলবে। আমার ধারণা প্রায়ই মিথ্যে হত। কারণ স্যার ক্লাসের পড়া না পারলে আর ভাল বাসতো না । এক জগ পানি নিশ্চয়ই পড়া না পারার জন্য যথেষ্ট নয়। তব্ওু আশা বেধে রাখতাম আবারও যদি পানি এনে দেবার সুযোগ পাই তাহলে নিশ্চয়ই স্যারের আরো ঘনিষ্ট হতে পারবো। কিন্তু সে সাধ যেন পূরণ হবার নয়। স্যারদের গলার আওয়াজ এত দরাজ ছিল যে, ক্লাসে হইচই হলে স্যার শুধু বলতো, ‘কি হচ্ছে এখানে’। আর সবাই চুপ কোন টু শব্দটি নেই। এখনকার স্যারদের গলায় অনেক সুর, এত সুরেলা কথা বলে যে বিশেষ করে মেয়েরা স্যারদেরকে এখন আর ভয় পায় না। বিড়ালের বাচ্চাদের মত স্যারদের চারপাশ ঘিরে থাকে। আর আগের মত স্যারেরা আর চিৎকার ও দেয় না।  ফিস ফিস করে কি যেন বলার চেষ্টা করে । শিক্ষকদেরকে ভক্তি শ্রদ্ধার কথা আর কি বলব। একটা গল্প বলি, চিটাগাং এর এক শিক্ষককে তার ছাত্র বলছে, ও মাষ্টার তোমাকে আমার বাবা ডাকে। এ কথা শুনে শিক্ষক এর তো মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমি শিক্ষক আর আমাকে তুমি করে বলে। দাঁড়া, তোর বাপের কাছে বলবো। ছেলের বাবা বাদশাহ আলমগীর এর কথা শিক্ষকের কাছ থেকে সব শুনে বললো, তুমি ছাত্রের কি হও? শিক্ষক বললো, আমি ওর শিক্ষক। এবার বাবা বললো, আমি ওর কি হই? উত্তরে শিক্ষক বললেন, বাবা। এবার ছাত্রের বাবা হেসে হেসে বললেন, আরে মিয়া আমি ওর বাবা তবুও আমাকে তুমি করে ডাকে আর তুমি তো মিয়া শিক্ষক তাও ক্লাসের না প্রাইভেট।

আমরা ক্লাসের ফাঁকে চাকতি খেলতাম আর এই খেলাটা খেলতে সবাই সুযোগ পেত না। কারণ স্কুলে চাকতি ছিল মাত্র দুইটা। লাইব্রেরীতে ক্লাস শেষ করে টিফিস শুরু হলে যে আগে যেতে পারতো স্যার তার হাতেই চাকতি দিত । আর যদি কেউ ভাল ছাত্র কিন্তু দেরি করে চাকতি চাইতে যেত তব্ওু সে আগে খেলার সুযোগ পেত। আমার কাছে মনে হয় ভাল ছাত্রদের আলাদা একটা পাওয়ার আছে । তা না হলে আমার পাশ করতেই কষ্ট হয় আর সেই একই বই পড়ে অন্যরা এত ভাল মার্কস পায় কীভাবে?  বাবা আমাকে প্রায়ই অভয় দিতেন, দেখ ওদের কি চারটা চোখ, চারটা হাত? আমি বলতাম না। তখন বাবা বলতেন, তাহলে তোমার রেজাল্ট কেন ওদের মত নয়। আমি বাবাকে বোঝাতাম, আমি কম বয়সে স্কুলে ভর্তি হয়েছিতো তাই আমি ওদের সাথে পারি না। প্রাইমারীতে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল রফিক। তার সাথে আমি সবকিছুই শেয়ার করতাম। কিন্তু আজব ব্যাপার তার সাথে গত ২৫ বছর আমার দেখা হয় না। তখন আমি ক্লাস ফোর-এ পড়ি। ১৯৮৮ সাল। হঠাৎ চারদিকে বন্যা শুরু হল । ধানক্ষেত মাঠ তলিয়ে রাস্তা ঘাট তলানো শুরু হল। আমরা ভীষণ দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম।  চারদিকে শুধু পানি আর পানি । স্কুল বন্ধ হয়ে গেল । আমাদের বাড়ির সামনের জমি তলিয়ে যাওয়ায় মনে হল বাড়ির সামনে যেন মহাসমুদ্র। বাড়ির পাশে উঁচু জমিতে আমরা যেখানে গোল্লাছুট খেলতাম তাও তলিয়ে গেল। ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। বাড়িতে আমার সংগ্রহে যত গল্পের বই ছিল তা বেশ কয়েকবার রিভিশন হয়ে গেল। কিন্তু পাঠ্যবই তেমন ভাল লাগত না । স্যারদের যদি পড়া না দিতে পারি তাহলে পড়ে কি লাভ। রাতে প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখতাম যে আমার সহপাঠি সবাই স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যাদের সাথে নিয়মিত গোল্লাছুট খেলতাম তাদের সাথেও আর দেখা হচ্ছে না। এই জ্বালা যেন প্রাণে সইছিল না। তবে অনেক ভাল লাগত  দেখে যে, যে মাছ দেখতাম পুকুরে বা খালে সে মাছ এখন আঙিনায়। আঙিনায় মাছ আর ক্ষেতের ফসল পানিতে তলিয়ে সবকিছু যেন মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। যাদের নিজ¦স্ব নৌকা আছে তাদের সুখের কোন সীমা নাই। আর যাদের নাই তারা যেন এই মহাসমুদ্রে কূল কিনারাহীন । আমাদের একজন প্রাইভেট টিউটর ছিলেন। যদিও মাত্র কয়েকদিন তিনি আমাদের পড়িয়েছেন। কিন্তু প্রতিবেশী হওয়াতে তার সান্নিধ্য পাওয়া কঠিন ছিল না। তিনি দেখতে ছিলেন অনেক সুদর্শন। এই সুদর্শন মানুষটি গ্রামের ধুলাবালির মাঝে কীভাবে এত সুন্দর ভাবে পরিপাটি থাকত তা আমার মাথায় আসতো না। আমি প্রায়ই ভাবতাম তাকে প্রশ্ন করবো কিন্তু সাহস পেতাম না। আর তার ছিল চমৎকার গানের গলা । ”মরমিয়া তুমি চলে গেলে দরদি আমার কোথা পাব কারে আমি এ ব্যাথা জানাব”। বিভিন্ন স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হত। এই আমন্ত্রণ বা নিমন্ত্রণকে, তিনি কোনভাবেই ঠেকাতে পারতন না। আর তার  প্রশংসার পাল্লা ছিল অনেক অনেক ভারী। তাকে দেখে মনে হত, আচ্ছা আমিও যদি তার মত করে গাইতে পারতাম। তো প্রায়ই তার মত করে চেষ্টা করতাম। কিন্তু সে চেষ্টার পরিণতি বড়ই ভয়ংকর। ঘটনাটা এমন যে সবাই খেতে বসবে সবার সামনে প্লেট দেয়া হয়েছে। আর আমি বসেই ভাতের প্লেটে টোকা দিয়ে গান গাইছি। হঠাৎ বিশাল একটা আওয়াজ হল আর আমি জ্ঞান হারানোর মত অবস্থা। আমি বুঝতে পারলাম ভাত খেতে বসে গান গাওয়ার চেষ্টা আব্বার পছন্দ হয়নি তাই এই আওয়াজ। যাই হোক প্রলয়ংকারী বন্যায় আমাদের বাড়ির সামনের বিল যেন অথৈ সাগর আর সেই সাগরে আমাদের সেই স্যার নৌকা নিয়ে বিলের দক্ষিণ প্রান্তে চলে যেতেন । আর গান ধরতেন মরমিয়া তুমি চলে গেলে..আর নৌকা ধীরে ধীরে উত্তরে অর্থাৎ বাড়ির দিকে আসতে থাকতো। এত চমৎকার গান আর সুন্দর পরিবেশ সত্যিই আজও মন হারিয়ে যায়! আমি ভাবি এমন একজন গায়ক কেন রেডিও বা টিভিতে গাইলো না! তার কি কোন ব্যাখ্যা আছে? নাকি প্রতিভাকে মানুষ অযত্নে অবহেলায় হারিয়ে ফেলে তার উত্তর আজও জানতে পারলাম না। আমার কাছে মনে হয়, যারা দেখতে অনেক সুন্দর বা অনেক জনপ্রিয় তাদের ভক্তের সংখ্যা নিশ্চয়ই অনেক বেশী। তবে তারা যখন ভক্তদেরকে স্থান দিতে শুরু করে তখন বোধহয় তাদের নিজেদের অস্তিস্ত বিলীন হয়ে যায় বা বিলীন হতে শুরু করে। তা না হলে এত জনপ্রিয় মানুষ কেন অযত্নে হারিয়ে যায়।

চলবে———

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন

 

 

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts