আমার আমি ৫/ফিরোজ শ্রাবন

আমার আমি ফিরোজ শ্রাবন

প্রতিদিন রুটিন মতো সব ভাইবোন একসাথে পড়তে বসা আর বিকেল হলে হাত মুখ ধুয়ে হারিকেনের চিমনী ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসা অনেক বিরক্তিকর ছিল। আবার জোৎন্সারাতে যখন নিজেকে দেখতাম পড়ার টেবিলে আর বাড়ির অন্যরা উঠানে গল্প আর খেলায় মত্ত তখন নিজেকে বন্দী পাখি মনে হত। তাই শুধু  অপেক্ষা করতাম কখন রাতের খাবারের জন্য ডাক আসবে। রাতের খাবার খেয়ে আবার পড়তে বসলে পড়ার টেবিলেই ঘুম চলে আসত। আর বই বন্ধ করে বসে থাকতাম কখন যেন ঘুমের মধ্যেই বিছানায় চলে যেতাম নিজেও জানতাম না। সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখতাম নিজের বিছানায় আর অবাক হতাম । বড় হয়ে সিনেমায় দেখে সিওর হয়েছি যে মা ঘুমের মধ্যে কোলে করে বিছানায় পৌঁছে দিতেন। মাঝে মাঝে যদি আব্বা বাড়িতে না থাকত ঔদিন রাতে একটু খেলার সুযোগ পেতাম । একদিন আমাদের বাড়িতে এক আত্মীয় একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে আসলো। সবুর তালুকদার এর জারি আবার শারমীন মুনির এর জারি তারপরে আব্দুল আলী গাড়লীর জারি এগুলো শুনে খুব মজা পেলাম। জারির গানগুলো এমন। ”সাপে ধরিলরে সাপে মারিলরে আব্দুল আলী গাড়লিরে সাপে নিল ভাইরে উড়াইয়া”। আমি ও সাথে সাথে গাইতাম । আমি আগে থেকেই গান বা গজল গাইতে পারতাম। রাতে যেদিন মা একটু অবসর পেত আমাকে গজল শোনাত আর আমি মুখস্থ করতাম। আমার বড় দুলাভাই খুব সুন্দর গজল গাইতে পারতেন, ‘ওগো নবী সরোয়ার তুমি হাবীব ও আল্লার ত্রিভূবনের পেয়ারা তুমি অসীম তোমার সন। তখনও সে আমার দুলাভাই হয় নাই। আমাদের বাড়ির পাশের মাদ্রাসায় তিনি পড়তেন এবং বিভিন্ন সময়ের ওয়াজ মাহফিল-এ তিনি গজল গাইতেন। তার গজল শুনে আমি মুগ্ধ হতাম এমন সুন্দর গলা যার, তিনি নিশ্চয়ই অসাধাণ একজন মানুষ। পরবর্তীতে তিনি আমাদের বড় দুলাভাই হন।এখন তিনি একজন স্বনামধন্য মাওলানা। অনেকেই এই মাওলানা মুজিবর রহমান জিহাদীর ওয়াজ শুনে থাকবেন এবং মুগ্ধ হবেন বলে আমার বিশ্বাস। বড় দুলাভাইকে আব্বা অনেক পছন্দ করতেন আর মা ও, তাই তিনি আমাদের দুলাভাই হন। আব্বা বলতেন, ‘আমার জানাজা নামাজ যেন আমার বড় জামাই পড়ায়।’ বড় আপার বিয়ে হয়ে যাওয়াতে আমরা একরকম অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম। পড়ায় ফাঁকি দেয়া এখন তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। আর মায়ের কাজের চাপ আরো বেড়ে যাওয়ায় আমাদের পড়ায় ফাঁকি দেয়ার সুবিধা আরো বেড়ে গেল।  যখন আমি থ্রিতে পড়তাম তখনও কিন্তু এ বি সি ডি পুরোপুরি লিখতে পারতাম না। তবে বাংলা রিডিং পড়তে পারতাম। নিউজ পেপার বা যে কোন নতুন বা পুরানো ম্যাগাজিন পেলেই আমি পড়তাম। তখন দৈনিক ইত্তেফাক এ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রায়ই নিউজ হতো। সেগুলো পড়ে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যেত। আমাদের কুশলা মাদ্রাসায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর অফিস এ প্রতিদিন নিউজ পেপার রাখতো আর আমি পড়ার সুযোগ পেতাম কারণ ওই অফিসের প্রধান যিনি ছিলেন তিনি ছিলেন আমার ক্লাসমেট বোরহান এর বাবা । তাছাড়া তিনি অত্যন্ত নরোম এবং ধার্মিক স্বভাবের ছিলেন তার কাছে সবাই পড়ার সুযোগ পেত। এখনকার সময়ে অনেকেই দেখি একটা পত্রিকা কিনে মনে হয় সব নিউজের স্বত্ত্ব তিনি কিনে ফেলেছেন। কাউকে দেখতে তো তিনি দেনই না বরং এমন ভাবে তাকান যেন কেউ উঁকি দেবার আর সাহস না রাখে । যেমন পরীক্ষার হলে আমরা কাউকে সহজে দেখতে দিতাম না। প্রশ্ন দিয়ে খাতা ঢেকে রাখা আমাদের সততার এক অন্ন্য দৃষ্টান্ত ছিল । একবার পঞ্চম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষায় আমি একটা প্রশ্নের উত্তর পারছিলাম না। মোটামুটি সব প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ তো আমি রিভিশন দিচ্ছি এমন সময় খেয়াল করলাম আমার পাশের বেঞ্চে আমাদের ক্লাসের ফার্ষ্টবয় লিটন জোরে জোরে খাতা রিভিসন দিচ্ছে। আমি তার রিভিশন শুনে শুনে প্রায় ছয় সাত লাইন লিখে ফেললাম। আর মোটামুটি সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়ে গেল। এমন করে নকল করে নিজেকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেলাম । এ স্বভাব এখনও আছে । যেমন এখনও যে কোনো গানের লিরিক আমি এক থেকে দুইবার শুনেই পুরো গান লিখে ফেলতে পারি । গানের ক্লাসে বসির স্যার সবাইকে বলতন, ‘যারা পুরো গান তুলতে পারো নাই তারা ফিরোজ-এর খাতা থেকে তুলে নিও। আশা করি সে পুরো গান তুলে ফেলেছে।’ ইতিমধ্যে সন্মানের সাথে প্রাইমারী পাশ করলাম। আমার প্রিয় স্কুল ছেড়ে প্রিয় স্যারদেরকে ছেড়ে সিক্সে ভর্তি হলাম মাঝবাড়ি হাইস্কুলে। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশে সামান্য পরিচিত আর অসামান্য অপরিচিতদের সাথে হাইস্কুল জীবন শুরু  হল । আমি সিক্সের ক্লাসরুমে বসে আমার প্রাইমারী স্কুলের কথা ভাবতে লাগলাম । আর ক্লাসমেটদের সাথে প্রাইমারীর গল্প শেয়ার করতাম । তারা সত্যিই নিষ্ঠুর তা না হলে কেউ বলে, ‘যা বেটা তোর এখনও প্রাইমারীর ঝুল যায় নাই।’ এর মানে হচ্ছে, আমি কেন সিক্সে পড়ে প্রাইমরীর কথা ভাবছি। তাদের আড়ালে আমি বার বার মনে করার চেষ্টা করতে থাকলাম যে প্রাইমারি স্কুলে আমি পাঁচটি বছর কাটিয়েছি সেই স্কুল কি আমায় মনে রাখবে? তাছাড়া স্কুলের বেঞ্চে ছুরি দিয়ে কেঁটে লিখে রেখেছি, ‘বিদায় ছোট ভাইবোনেরা .ইতি ফিরোজ।’ সে লেখা কি তারা মুছে ফেলবে । আর তারা কি আমায় মনে রাখবে যে আমি ঔ স্কুলের প্রিয় ছাত্র ছিলাম। নাকি আমার লেখা মুছে ফেলে তারা নতুন করে তাদের নাম লিখে রাখবে। তারা যদি আমার নাম মুছে ফেলে তাহলে তারাও তো একদিন আমার মতো অতীত হয়ে যাবে এটা কি তারা জানে না। তাছাড়া আমার নামটা বেঞ্চে থাকলে তো তাদের কোন ক্ষতি নেই। তারা তো চাইলে পাশের কোন জায়গায়তে তাদের নাম লিখতে পারে সেক্ষেত্রে তাদের নামও থাকলো সাথে আমার নামটাও। এই ভরসা ছাড়া আপাতত আর কোন উপায় সত্যি, আমার জানা ছিল না।

ফিরোজ শ্রাবন​

চলবে———

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts