আমার আমি

আমার আমি ফিরোজ শ্রাবন

আমার বাবা সরকারী জব করতেন। গৃহস্থালীও ছিল আমাদের । আমাদের বেশ কয়েকটা গরু ছিল, রাখলও ছিল। যাকে বলে মাঠ ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু। আমাদের জমিতে যে ধান হত তা দিয়ে আমাদের সারা বছরের চাল তো হতোই আবার কিছু বিক্রিও করতাম। তবে সব বছর সমান ফসল হত না । মাঝে মাঝে মন্বন্তরও হত। উত্তরবঙ্গে যাকে বলে মঙ্গা। মন্বন্তর এর বছরগুলোতে আর রাতে উঠানে গল্প বা কিচ্ছার আসর বসত না । আশেপাশের সবাই বিভিন্নরকম ভাবে কষ্টের দিনগুলি দ্রুত পার করতে চাইত। আর যে বছর প্রচুর ফসল হত উঠানে ধানের মলনে  আমিও শরিক হতাম । গরুদের পেছনে পেছনে হাঁটতে খুব ভাল লাগত কিন্তু গরুগুলো আমাকে পেলেই হাঁটা বন্ধ করে দিত। তাই সে সুযোগ থেকে আমাকে বড়রা অব্যাহতি দিত। চারিদিকে শুধু ধান আর ধান । মা সারারাত ধান সেদ্ধ করত। আর সকালে উঠান লেপে সেগুলো রোদে শুকাতে দিত। ঐদিন গুলোতে স্বাভাবিক খাবার দাবার রান্না করা মার জন্ন্য অনেক কঠিন ছিল । কখনও কখনও আমরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলতাম । মা বুঝতো আর কিভাবে যেন খুব দ্রুত রান্না করতে পারত। আর আমরাও মায়ের ধৈর্যের কাছে মাথা নত করতাম। ইদানিং আমার মেয়ের মাকেও দেখি নিমিষেই কিছু একটা রান্না করে ফেলছে। মাকে ভোলা অসম্ভব!  মা যেন বিভিন্ন্ কাজে-কর্মে বা পারিপার্শ্বিক ঘটনায় তাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি এখনও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারি না। হয়ত এজন্যই আমার মেয়ের মাও দ্রুত রান্না করতে পারে।  আমাদের গোয়ালের গরুর দুধ দিয়ে আমি প্রতিদিন প্রায় তিন বেলা ভাত খেতাম কারণ তরকারির ঝাল আমার জন্য কিছুটা কান্নার কারণ হত । আর তাই বেশিরভাগ সময়েই দুধ ভাত খেতাম। তবে আস্তে আস্তে আমি ঝাল ভাত খেতে শুরু করলাম। আর মাছের মাথাটা নিজের দখলে নেবার চেষ্টা করতে লাগলাম। শুধু ইলিশ মাছের মাথা ছাড়া। কারণ, ইলিশ মাছের মাথা আব্বার ভীষণ পছন্দের ছিল। আর আব্বা ও ছিল মায়ের ভীষণ পছন্দের। আমি কাতল মাছের মাথা পছন্দ করতাম । তবে পুরো মাছের মাথা আমি খেতে পারতাম না । তাই কিছু অংশ খেয়ে বাকি অংশ মাকে দিতাম বা রেখে দিতাম।  মা পরে খেয়ে নিত। একবার পুরো মাছের মাথা খেয়ে ফেললাম, মার জন্য রাখা হল না । মা মাথার বাকি অংশ খুঁজে না পেয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে আমি বললাম, মা হয়ত বিড়াল খেয়েছে । সেই থেকে আমি পুরো মাথা খেতে পারলেও না পারার ভান করতাম।

চলবে————

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts