আমার দেখা ঈদ/ অনুপা দেওয়ানজী

আমাদের যুগে আমরা কী ঈদ, কী দুর্গাপূজা, কী নববর্ষ সব ধরণের উৎসব খুব  খোলামেলাভাবেই উদযাপন করতে করতে বড় হয়ে উঠেছি। ধর্ম সেখানে কখনোই প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতো না। সবাই সবার ধর্ম বিশ্বাসের ওপরে  গভীর আস্থা বা শ্রদ্ধাবোধের মধ্যে বেড়ে উঠেছি। মূলত পরিবার, পরিবেশ আর শিক্ষাঙঙ্গন থেকে আমরা এই শিক্ষার মূলমন্ত্র পেতাম ।

ভিন্ন সম্প্রদায়ের  ধর্মীয় উৎসবের প্রতি পরস্পরের এই  নির্মল অংশগ্রহণ আমাদের দিয়েছে অফুরন্ত এক সজীবতা আর অসাম্প্রদায়িক এক  মনোভাব।

কালের প্রবাহে আমি  যেন কোথায় হারিয়ে ফেলেছি  সেই সব দিনগুলি। মনে মনে ভাবি, কিভাবে হারালো আমার দেখা সেইসব আন্তরিক দিনগুলি?
   প্রতি বছর  ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই সারা দেশে উৎসব শুরু হয়।
 নগর জীবনে ঈদের আনন্দটা ঠিক মনের মতো করে উপলব্ধি করা যায়না ।কারণ বেশির  ভাগ লোকেরই তখন ঈদের আগেভাগে গ্রামে যাবার তাড়া থাকে। এজন্যে নগরীতে ঈদ আসার আগেই মানুষের চাপ কমে যায়।
মাসভর  রাত জাগা আর  আলো ঝলমল সরগরম বিপনীবিতানগুলির দরজা্গুলি তখন বন্ধ। ফুটপাতে হকারদের চেঁচামেচি, পথচারীদের  দৌড়াদৌড়ি নেই, রাস্তাঘাট বলতে গেলে একরকম ফাঁকা। কেমন যেন খাঁ খাঁ করা এক শূন্যতা এসে জুড়ে বসে নগরে।

তারপরেও নগরজীবনের ব্যস্ততার রেশ ধরে ঈদের  আনন্দও যেন নগরে এক ব্যস্তরূপ নিয়ে ধরা দেয়।  
আমার ছোট্টবেলায়  দেখা ঈদের আনন্দের সাথে  নগরের ঈদের আনন্দ আমি কিছুতেই মেলাতে পারি না।কারণ আমি গ্রামের এক সহজ সরল পরিবেশে বড় হয়েছি।

ছোট্টবেলার ঈদের কথা মনে এলেই আজো  মনে পড়ে প্রতিবেশি সোলেমান কাকীর কথা। কাকী ঈদের আগের দিন আমাদের ডেকে পাঠাতেন    হাতে মেহেদি পড়িয়ে দেবার জন্যে। সেই মেহেদি এখনকার মতো পলিব্যাগে মোড়া কোন মেহেদি নয়।  গাছ থেকে টাটকা সবুজ পাতা পেড়ে সেই পাতার মাঝখানের শিরাটা ফেলে দিয়ে খয়েরের সাথে তা পাটায় মসৃণ করে পেষা হোত।  কাকী পরম যত্নে নিজের হাতে সেই মেহেদি আমাদের সবার ছোট্ট ছোট্ট হাতের তালুতে গোল করে এঁকে দিতেন। সেই সাথে পাঁচটা আংগুল আর নখেও লাগিয়ে দিতেন ।
রাতে আমরা সেই মেহেদি ধুতাম না। সকালে উঠে ধুয়ে হাতে তেল লাগাতাম আর  দেখতাম কার হাত কতটা লাল হয়েছে।

সকাল হলেই সবচেয়ে ভালো ফ্রকটা পরে বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যেতাম। প্রথমেই  যেতে হোত রহমান কাকাদের বাড়িতে।রহমান কাকার স্ত্রী হেলেন কাকিমা ছিলেন ঢাকার মেয়ে। দেখতে ভারি সুন্দর ছিলেন।সেই সাথে তিনি রান্নাও করতেন  অপুর্ব।ঈদের দিনে নূতন শাড়িতে তাঁকে কি যে সুন্দর লাগতো।

আমরা গেলেই কত কিছু যে আদর করে নিজের হাতে পরিবেশন করে খাওয়াতেন। ঘন দুধে বানানো দুধ সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, সেমাইয়ের জর্দা, পোলাউ, কোর্মা,রেজালা আরো কত কি?

এর পরে সোলেমান    কাকাদের বাড়ি হয়ে অধ্যাপক পাড়া ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যখন ফিরতাম তখন দেখতাম কলেজের পিয়ন বসে আছে আমাদের প্রতীক্ষায় তাদের বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাবে বলে।
এদিকে ঘুরে ঘুরে সবার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করে আমাদের আর কোথাও যেতে বা   খেতে ইচ্ছে করতো না। কিন্তু মা বলতেন ওদের বাড়ি থেকেও ঘুরে আসো। নইলে ওরা মনে কষ্ট পাবে।মার হুকুম  অমান্য করার প্রশ্নই ওঠেনা।

পিয়নের সাথে ওদের বাড়িতে গেলে দেখা যেতো ওদের পাড়ার লোকদের সেকী  আদর আর আতিথেয়তা!সে এক বিশাল কারবার। সবার আবদার তাদের বাড়ির সেমাইও আমাদের খেতে হবে।তাদের সেমাই হোত হাতে পাকানো সেমাই। সেই সেমাই ছিলো বেশ মোটা মোটা। দু চামচ খেলেই আমাদের পেট ভরে যেতো।

তবে এখনকার বাবা মায়েদের মতো তখনকার বাবা মায়েরা পারলেও ছেলেমেয়েদের   দশ বারোটা করে ঈদের পোশাক বা পূজোর পোশাক কখনোই কিনে দিতেন না।এতে একটা সংযমের শিক্ষা দেওয়ার দৃষ্টান্ত ছিলো।

বর্তমান নাগরিক জীবনে  দেখি ঈদের আনন্দ বা পূজোর আনন্দ মানেই ছেলেমেয়েদের  একগাদা নতুন পোশাক কিনে দেবার প্রবণতা। আগে ঈদ বা পূজোর  মানেই ছিলো মানুষে মানুষে এক অকৃত্রিম হৃদ্যতা।অন্য সময় না পারলেও ঈদ বা পূজোর আনন্দের  দিনে সবাই সবার খোঁজ নিতো।

এখন  পাশের ফ্ল্যাটের একা, নিসঙ্গ মানুষটি ঈদের দিন বা পূজোর দিনগুলি কিভাবে উদযাপন করছে তার খবর নেবারও বুঝি কারো হাতে সময়  নেই।
কিসের এত ব্যস্ততা এই প্রজন্মের আজো বুঝে উঠতে পারি না।  নগর জীবনে ঈদ বা পূজোর আনন্দও যেন তাই নগর দুয়ারে এসেই  ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে ত্রস্ত পায়ে প্রস্থান করে।

অনুপা দেওয়ানজী
অনুপা দেওয়ানজী

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts