আমায় ডেকোনা, ফেরানো যাবেনা

চলে গেলেন শিল্পী লাকী আখন্দ। সত্যিই হাজার ডেকেও তাকে আর ফেরানো যাবে না। তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।  টানা আড়াই মাস হাসপাতাল জীবন শেষে আরমানিটোলার নিজ বাসায় ফিরেছিলেন এই শিল্পী  গত সপ্তাহে। দীর্ঘদিন ফুসফুসে  ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি হলে তার ক্যান্সারের কথা  ধরা পড়ে

আর তার শেষ পরিণতি ঘটল কাল  শুক্রবার।  দুপুরের পর থেকে  তাঁর শরীরের অবনতি ঘটে। তাঁকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয়  মিটফোর্ড হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।তখন  সন্ধ্যা সাড়ে ছটা। মৃত্যুকালে  শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর

লাকী আখান্দ ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন  ঢাকার পাতলা খান লেনে জন্মগ্রহণ করেন ৫ বছর বয়সেই  বাবার কাছ থেকে সংগীত বিষয়ে হাতেখড়ি নেন। তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টেলিভিশন এবং রেডিওতে শিশু শিল্পী হিসেবে সংগীত বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।  মাত্র ১৪ বছর বয়সেই এইচএমভি পাকিস্তানের সুরকার এবং ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ভারতের সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজের নাম যুক্ত করেন। তিনি একাধারে বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক তিনি ব্যান্ড দল হ্যাপী টাচএর সদস্য।  বাংলাদেশ বেতার এর পরিচালক (সংগীত) হিসেবে কাজ করেছেন তিনি

১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে  তাঁর প্রথম একক অ্যালবামলাকী আখন্দবের হয়।  অ্যালবামের বেশ কয়েকটি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু ১৯৮৭ সালে ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের মৃত্যুর পরপর সংগীত জগৎ  থেকে অনেকটা স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান নেন তিনি।

এরপর লম্বা  এক দশকের  নীরবতা শেষে লাকী আখন্দ ১৯৯৮পরিচয় কবে হবেবিতৃষ্ণা জীবনে আমারঅ্যালবাম দুটি নিয়ে আবারো ফিরে আসেন

কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’, ‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’, ‘পাহাড়ি ঝরনা’, ‘নীল নীল শাড়ি পড়ে’, ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশসহ অসংখ্য গানের সুরারোপ সংগীতায়োজন করেছেন এই গুণী  শিল্পী

কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠেযেখানে সীমান্ত তোমার’, আইয়ুব বাচ্চুরকি করে বললে তুমি’, হাসানেরহৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা মতো সময়জয়ী গানের সুরকার  তিনি

ব্যান্ডতারকা জেমসের এই বিখ্যাত  ‘লিখতে পারিনা কোনো গান আজ তুমি ছাড়াগানটির সুরসংযোজনা সংগীতপরিচালনা করেছেন লাকী আখন্দ

লাকী আখন্দের অ্যালবামের উল্লেখযোগ্য কিছু গান হলো– ‘এই নীল মণিহার, ‘আমায় ডেকো না’ ‘রীতিনীতি কি জানি না’, ‘মা মনিয়া’, ‘আগে যদি জানতাম’, ‘হৃদয় আমার’, ‘সুমনা’, ‘তোমার স্বাক্ষর আঁকা

একসময় আমায় ডেকো নাগানটি তিনি শিল্পী সামিনা চৌধুরীকে উপহার দেন এবং সামিনা চৌধুরী তাঁর একক অ্যালবামে  গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী লেখা লাকী আখন্দের সুরারোপ করা এই বিখ্যাত গানটি গানটি সংকলন করেন

লাকী আখন্দের সুরারোপিত গান এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনায় মূখর্ হয়ে উঠত যা সবাইকে  সহজে মুগ্ধ করত। তিনি ছিলেন  সুরের জাদুকর।   সফটমেলোডি, মেলোরক, হার্ডরক যেটাতেই হাত দিয়েছেন সেটাই হয়ে উঠেছে এক একটি মাস্টার পিস

এক সময়  টেলিভিশনের লাইভ প্রোগ্রামে তাঁকে দেখা গেছে; মেয়ে মাম্মিন্তিকেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের সঙ্গে

লাকী আখন্দের অ্যালবামের তালিকা

  •         কী আখান্দ (১৯৮৪)
  •         পরিচয় কবে হবে (১৯৯৮)
  •         বিতৃষ্ণা জীবনে আমার (১৯৯৮)
  •         আনন্দ চোখ (১৯৯৯)
  •         আমায় ডেকোনা (১৯৯৯)
  •         দেখা হবে বন্ধু (১৯৯৯)
  •         তোমার অরণ্যে

অসুখ ধরা পড়ার পর  ঢাকার চিকিৎসা শেষে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর চিকিৎসার জন্য  পাঁচ লাখ টাকা অর্থ সাহায্য করেছিলেন তখন। থাইল্যান্ড থেকে ফিরে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতাল বারডেমে চিকিৎসা নেন। পরে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। মাসেরও বেশি সময় সেখানে থাকার পর এপ্রিল পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নিজ বাসায় ফেরেন শুক্রবার সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন

এই কিংবদন্তী শিল্পীর অকাল প্রয়াণে ‘রক্তবীজ’ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত।

 

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts