আমিনুল ইসলামের কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ

আমিনুল ইসলাম​

আজ ২৯ ডিসেম্বর রক্তবীজ ওয়েব পোর্টালের নিয়মিত লেখক কবি আমিনুল ইসলামের জন্মদিন। রক্তবীজ পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক শুভেচ্ছা

 

আমিনুল ইসলামের কবিতার মূল আলোচনায় যাবার আগে টি এস এলিয়টেরঐতিহ্য ব্যক্তিগত প্রতিভা’ (T.S. Eliot: Tradition and Individual Talent) নামক বিখ্যাত প্রবন্ধ থেকে কিঞ্চিৎ উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে ইতিহাসবোধ সম্পর্কে তিনি বলেছেন,- ‘ইতিহাসবোধ  হল এমন এক চেতনা যা পৃথক পৃথকভাবে ঐতিহ্য চেতনা সীমাহীন চেতনা এবং দুটির পরস্পর সমন্বয়, যা একজন লেখককে ঐতিহ্যিক করে তোলে ইতিহাস চেতনার মানসিকতাকে বলা যায় যে, তা একজন লেখকের দায়িত্বকে তার সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কালের স্রোতধারায় তা সুক্ষভাবে সচেতন করে তোলে।(’১)  এই ইতিহাসবোধের চেতনা থেকেই আমিনুল ইসলাম হয়েছেন ঐতিহ্যিক আর এই চেতনার মানসিকতা কবিকে করেছে সচেতন এবং লেখক সত্বায় হয়েছেন দায়িত্ববান আমিনুল ইসলামকে আমার কেন জানি মনে হয়  গন্তব্যবাদী কবি অন্তত গন্তব্যের কাছাকাছি যাবার কিংবা থাকবার মনোবাঞ্ছা তাঁর যেন চিরকালীন তাঁর  গন্তব্য শেকড়ের দিকে ইতিহাস ঐতিহ্যের দিকে তাঁর চিন্তাচেতনা আর কবিসত্বার একটা লোগোতিনি ঐতিহ্যের সন্তান, ইতিহাসের বরপুত্র একদিকে ঐতিহ্য তাঁর কবিতার বহিরাঙ্গ, তো অন্যদিকে ইতিহাস তাঁর অন্তঃসার আমিনুল ইসলামের কবিতায়  ইতিহাস চেতনা দেখে মনে হয়, কবি নিজেকে অহংকারী করে তুলছেন তাঁর অতীত পুরুষের সোনালি জমিন উড্ডীন করে আবার কখনো মনে হয়, তিনি তাঁর কবিতাকে অমরত্ব দিতে চান সেই অতীতের ছোঁয়া দিয়ে এক্ষেত্রে সাহিত্যাচার্য কবি মোহিতলাল মজুমদারের একটি কবিতার কথা মনে পড়ল তাঁর কবিভাগ্য নিয়ে বলেছেন

 

আমার স্বপন যাহাওরা তা সফল করে,

আমার কাহিনী যাহা, ইতিহাসে তাই গড়ে

আমার বাঁশীর সুরে অতি দূর দূরান্তরে

পুরী মহাপুরী কত উঠে পড়ে থরে থরে!(২)

 

এই চারটি চরণের মাঝে আমার প্রবন্ধের শিরোনামের একটা নিগূঢ়তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব আমিনুল ইসলামের সমস্ত কাব্যস্বপন যেন সফলতা পায় ইতিহাস চেতনায় কবিতার কাহিনী গড়ে দেয় ইতিহাস তাঁর কাব্যবাঁশরীর লালিত্য সুর যেন সেই ঐতিহ্যবীণায় বাঁধা তাঁর কাব্যবৈভব হল ইতিহাসের বৈভব তাঁর কাব্যবৈভব হল ঐতিহ্যের বৈভব বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রাবন্ধিক . সফিউদ্দিন আহমদ আমিনুল ইসলামকে বলেছেন, শিকড়বৈভবের কবি তিনি তাঁরঅামিনুল ইসলাম : শিকড়বৈভবের কবিপ্রবন্ধে বলেছেন ‘‘আমিনুল ইসলামের কবিতায় আমাদের মহিমান্বিত অতীত গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য শাণিত প্রাণিত হয়ে ফিনিক্স আর ইকারোসের মতো জেগে ওঠে তিনি যেন স্পন্দিত বুকে, গর্বে গর্বিত হয়ে বলতে চান যে আমরা পাশ্চাত্য বা অন্য কোন জাতির প্রতিধ্বনি বা কণ্ঠস্বর নইআমাদের পায়ের নিচে হিমালয়ের মতো শক্ত একটি ভিত্তি আছে ভিত্তিতে একবার স্বকীয়তার স্পর্ধাভরে দাঁড়ালেই আমরা সমগ্র বিশ্বে গর্বিত জাতি হিসেবে পরিচিত হবো আমরা চিনতে পারবো আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতিকে, আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে আমরা হিমালয়ের শীর্ষচূড়া দেখবো,  আকাশভরা সূর্যতারা দেখবো, সাগরপ্রান্তর সবই দেখবোবিশ্বের সাথে বিশালত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হবোতবে দেশের মাটিতে পা রেখে এজন্যই দেখা যায় আমিনুল ইসলামের কবিতায় যেমন আছে ঐতিহ্যের টান, তেমনি আছে বর্তমানের অবস্থান ভবিষ্যতের সোনালি ফসলের আহ্বান।’’(৩)  তাঁর বলার যথার্থতা পাই প্রায় প্রতিটি কবিতার শরীর জুড়ে তিনি জাতিক আন্তর্জাতিক ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যবহার তাঁর কবিতায় যেভাবে করেছেন, তা অতুলনীয়  আমিনুল ইসলামের এই ইতিহাস ঐতিহ্য চেতনা কবিতায় সরাসরি আসেনি, এসেছে তাঁর জীবনচেতনার উৎস সেঁচে কবি যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন অর্থাৎ শৈশব কৈশোর কেটেছে, তা বলতে গেলে আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ঐতিহ্যগাথার চারণভূমি আমিনুল ইসলাম গৌড় আর বরেন্দ্রভূমির সন্তান তিনি সুযোগ্য সন্তানই বটে তিনি তার কবি জীবনের শুরু থেকেই বরেন্দ্রভূমি তথা প্রাচীন বঙ্গভূমি এবং বঙ্গসভ্যতার কাব্যিক  পুননির্মাণ এবং উপস্থাপনকে তার কবিতার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন তার কবিতার বিষয় হয়ে, শরীর হয়ে, প্রাণ হয়ে, উপমা হয়ে, চিত্রকল্প হয়ে, উৎপ্রেক্ষা হয়ে বারবার এসেছে বরেন্দ্র অঞ্চলের নানা প্রসঙ্গ দোয়াব, হরিকল, সমতট, রাঢ় বরেন্দ্রীর ইতিহাস, কিংবদন্তী, ঐতিহ্য, নদ-নদী, প্রত্নস্থাপত্য, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস উপাখ্যান, কৃষি অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, প্রবাদবচন, লোকসংগীত প্রভৃতি আমিনুল ইসলমের কবিতার শরীরপ্রাণ গঠনে উপকরণ হয়ে উঠে এসেছে আমিনুল ইসলাম তার উৎসভূমিকে দেখেছেন একান্ত আপনার করে দেখা দূর থেকে দেখা নয় কারণ কবির শৈশব কৈশোর কেটেছে এই আবাসভূমিতে কবি তার চারপাশে জোর করে কিছু  খোঁজেননি কবির সহজ উক্তি যার প্রমাণ— ‘’কবিতা কীভাবে এবং কতটা জীবনের কথা বলেকতটা গভীরভাবে আমাদের চারপাশের শৈল্পিক ছবি আঁকেসেটুকু নিয়েই আমি তৃপ্ত থাকতে ভালোবাসি’’ (৪)

 

এবার একটু পেছনের কথাও বলা দরকার অবশ্য তা প্রাসঙ্গিকও বটে চর্যাপদকর্তাদের মধ্যে যাঁদের স্থান শীর্ষে তাঁদের বাস ছিল বরেন্দ্র এলাকায় মুহম্মদ আবু তালিবের মতে কানুপা, শবরী, লুইপা, সরহপা প্রভৃতি বরেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা ছিলেন আর তাঁদের পদ বা গানে বরেন্দ্র বন্দনা এসেছে ঘুরে ফিরে শুধু তাই নয়, ‘রামায়ন’, ‘মহাভারতথেকে শুরু করে সন্ধ্যাকর নন্দীররামচরিত’, ভবিষ্যপুরাণপ্রভৃতি কাব্যে বরেন্দ্রভুমি বিভিন্নভাবে বর্ণিত বন্দিত হয়েছে সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর রামচরিত কাব্যে বরেন্দ্রকে পৃথিবীর শির বলে অবিহিত করেছেন শুধু তাই নয়, প্রাচীনকাল থেকে আদ্যাবধি ইতিহাস গ্রন্থসহ সাহিত্যের সকল শাখাকে বরেন্দ্রভূমির উজ্জ্বল্যগাঁথা বিভিন্নভাবে আলোকিত করে এসেছে আর সবচেয়ে বেশি আলোকিত করেছে কাব্যভূবনকে  অবশ্য তা এসেছে কোন না কোন বিশেষ কারণে কতকটা খণ্ডিতভাবে।তবে এক্ষেত্রে কবি আমিনুল ইসলাম ব্যতিক্রম তিনি আপদমস্তক বরেন্দ্র অঞ্চলের ধুলাবালি আর কাদামাটিতে গড়া মানুষ তার কাব্যিক সত্বার বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে বিশাল বরেন্দ্রভূমি তিনি ব্যতিক্রম এই জন্যেই যে, তিনি এক্ষেত্রে শুধু কবিতাকেই মহিমান্বিত করেননি, মহিমান্বিত অনেক ক্ষেত্রে করেছেন বরেন্দ্রভূমিকেও কবির কাব্য ভাবনায় এসবের ছাপ কীভাবে এলো তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিজেই একটি প্রবন্ধে তিনি বলেছেন –‘‘আরেকটি বিষয় আমার জীবন কবিতার ক্ষেত্রে সত্য হয়ে আছে তা হলো আমার বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ, দেশবিদেশের ইতিহাসভূগোলনৃতত্ত্ব পাঠ এবং আমার ভাবনায় কবিতায়সেসবের ছাপ আমি প্রায় সমগ্র বাংলাদেশ দেখেছি আমি সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, বেহুলার ভিটা, রামসাগর, নীলসাগর, মহীপালের দিঘি, দিবর দিঘি, কুসুম্বা মসজিদ, ভিমের পান্টি, কান্তজীর মন্দির, উয়ারীবটেশ্বর, ময়নামতিশালবনবিহার, শাহজালালের মাজার, জীবনানন্দ দাশের জন্মভিটা, পতিসরশিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিস্থান, সোনারগাঁও, বিভিন্ন জমিদারবাড়ি/রাজবাড়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং খালবিলনদীসমুদ্র দেখেছি তার সাথে দেখেছি ভারত, থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্কের বহু ঐতিহাসিক শহর স্থান এবং জানার চেষ্টা করেছি এসব স্থানের মানুষের অতীতবর্তমান আমার কাব্যভাবনার ওপর এসব দর্শন পঠনের প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে এবং তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচকতায় আমি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত নিয়ে দীর্ঘকবিতা লিখেছি: আমি সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, বেহুলার ভিটা, মহিপালের দিঘি, দিবর দিঘি, কুসুম্বা মসজিদ, উয়ারীবটেশ্বর, ময়নামতিশালবনবিহার প্রভৃতিকে প্রচ্ছদ করে লিখেছি দীর্ঘতর কবিতা; আমি তুরস্কে বসে একাধিক কবিতা লিখোছ; লিখেছি থাইল্যান্ডঅস্ট্রেলিয়াইন্দোনেশিয়ায় বসেও অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় সিডনির ব্লু মাউন্টেন দেখতে যাই সেখানে একজন আদিবাসী(Aboriginal)কে দেখি তিনি ব্লু মাউন্টেনে বাঁশি বাজিয়ে খাবারের অর্থ উপার্জন করতেন (হয়তো এখনও করে যাচ্ছেন) এরাই অস্ট্রেলিয়ায় অরিজিনাল মানুষ, ঠিক আমেরিকায় যেমন রেড ইন্ডিয়ানগণ এরা এখন নিজবাসভুমে পরাজিত এবং অস্তিত্বহীন হওয়ার পথে বাংলাদেশের আদি মানুষদের একটি ধারা নৃতাত্ত্বিকভাবে অস্ট্রালয়েড ব্লু মাউন্টেনে সেই অ্যাবরজিন্যাল (অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী) কে দেখে সাথে সাথে বিষয়টি আমার মনে পড়েছিল তার গায়ের রঙ এবং মুখাবয়ব কালো বাঙালিদের মতোই আমি আমার ভারত, মালেশিয়া, ফিলিপাইন্স, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট প্রচ্ছদে দেশপ্রেমের দীর্ঘ কবিতা লিখেছি আমার কবিতায় জাতীয় ভূগোলের পাশাপাশি অথবা সংমিশ্রিত হয়ে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ভূগোল, মিথ ইতিহাস বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক উৎস সন্ধানের পাশাপাশি আমি তার আন্তর্জাতিক যোগসূত্রটিও খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছি বিস্তৃত ভূগোলে শেকড়ের সন্ধান আমার অন্যতম প্রধান কাব্যঅন্বেষা’’ (৫)  কবির এই স্বীকারোক্তি আমার আলোচ্য বিষয়কে পাঠকের কাছে নিশ্চয় সহজ করে তুলবে তবে আমাদের বলতে আর দ্বিধা থাকবার কথা নয় যে, আমিনুল ইসলাম চর্যা পদকর্তাদের যোগ্য উত্তরসূরী, আর আমাদের অহংকারও

 

অবশ্য এই অলোচানায় খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে উপনিবেশবাদ এবং উত্তরউপনিবেশবাদের প্রসঙ্গও এসে পড়ে সাহিত্যেশিল্পে এবং প্রায় সবখানে ইউরোপীয় আধুনিকতার ধারণার  সাথে জড়িয়ে আছে উপনেশবাদী প্রভুত্বমূলক মন এবং যুক্তি  ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীউপনিবশেবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের উপনিবেশিত রাষ্ট্রসমূহের উপনিবেশপূর্ব  ইতিহাসঐতিহ্যশিল্পসাহিত্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে উপনিবেশিত জাতিসমূহের মধ্যে নিজেদের সাহিত্যসংস্কৃতিইতিহাসঐতিহ্য সম্পর্কে  হীনমনা করে তুলেছিল এমনকি এসব উপনিবেশিত দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এসব দেশের শিক্ষিতমানুষ এবং বিশেষত লেখকবুদ্ধিজীবীগণ সেই হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হতে পারেননি তারা রয়ে গেছেন উপনিবেশবাদী শিল্পসাহিত্যইতিহাসজ্ঞানের অন্ধ ভক্ত এটি আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং ভারত উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রসমূহের জন্য প্রায় কমবেশি প্রযোজ্য ভারত উপমহাদেশ দুশো বছর বৃটিশদের অধীনে ছিল সময় তারা শুধু ভারতবর্ষকে শাসন শোষণই করেনি, এর ইতিহাসঐতিহ্যশিল্পসাহিত্যকে পাল্টে দিতে প্রয়াস পেয়েছে তারা বৃটিশপূর্ব ভারতীয় ইতিহাসকে নানাভাবে বিকৃত করেছে হিন্দুমুসলমানের মধ্যে বিভাজন পারস্পারিক ঘৃণার সৃষ্টি করেছে বৃটিশরা আসার আগে ভারতবর্ষ  নন্দনভাবনায়, সঙ্গীতে, শিল্পকর্মে, কবিতায়, স্থাপতে, প্রকৌশলে কত উন্নত ছিল তার প্রমাণ অজন্তাইলোরা, কালিদাসের মেঘদূত, শাহজাহানের তাজমহল, তানসেনআমীর খসরুমির্জা গালিবদের সঙ্গীতকাব্যসাহিত্য এবং এমন আরও কত অজ¯্র কীর্তি ইউরোপের কোথাও সিন্ধুসভ্যতার তুলনা ছিল না সেই যুগে কিন্তু বৃটিশ ইতিহাসবিদবুদ্ধিজীবীদার্শনিকধর্মতত্ত্ববিদগণ তাদের বিভিন্ন লেখায় ভারতীয় সবকিছুকে হীনমর্যাদায় উপস্থাপন করেছে তাদের হাতে বিশেষত মুসলমান সুলতান¤্রাটনবাবগণ মসিলিপ্ত ভাবমূর্তিতে চিত্রিত হয়েছেন তাদের দ্বার প্রভাবিত হয়ে ভারতীয় ইতিহাসবিদবুদ্ধিজীবীদার্শনিকধর্মতত্ত্ববিদগণের একটি বড় অংশ সেই উপনিবশেবাদী অপতৎপরতায় নিজেদের সামিল করেছেন এভাবেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদউপনিবেশবাদ উজ্জ্বল মহিমা অর্জনে সফল হয়েছে এখনও আমাদের মধ্যে অনেক লেখকবুদ্ধিজীবীসিভিল সোসাইটির সদস্য আছেন যারা নিজ জাতি, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে হীন ধারণা পোষণ প্রচার করে আত্মতৃপ্তি পান এবং নিজেদের আধুনিক, আলোকিত, প্রগতিশীল বলে আত্মজাহির করেন   হচ্ছে  উপনিবেশিত মন উপনিবেশী শক্তি চলে গেছে , কিন্তু তাদের শিল্পগত সাংস্কৃতিক কুপ্রভাব রয়ে গেছে যা আমাদের গভীর হীনমন্যতায় জড়িয়ে রেখেছে  ফ্রাঞ্জ ফানোঁ, এডওয়ার্ড সাঈদ প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিকগবেষকের গবেষণামূলক লেখায় উপনিবেশবাদ, প্রাচ্যবাদ, উত্তরউপনিবেশবাদ, বিউপনিবেশিকরণ প্রভৃতি ধারণা সবিস্তারে বিভিন্ন দৃষ্টান্ত সহকারে আলোচিত হয়েছে ফ্রাঞ্জ ফানোঁ তাঁরজাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কেশিরোনামের প্রবন্ধে বলেছেন, ‘‘ উপনিবেশবাদ একটি অধিকৃত দেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ওপর শাসন চাপিয়েই সন্তোষ্ট থাকে না; সম্ভবত ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট প্রমাণাদি দাখিল করিনি উপনিবেশবাদ একটি গোষ্ঠীকে কব্জা করে তাদের মস্তিষ্ক থেকে সমস্ত রূপরস সারবস্তুকে নিংড়ে নিয়েই সন্তোষ্ট থাকে না, একধরনের স্বেচ্ছাচারী যুক্তি দেখিয়ে উপনিবেশবাদ নিপীড়িত জনগণের অতীত ইতিহাসের দিকে হাত বাড়ায়, তাকে বিকৃত করে, কলঙ্কিত করে এবং ধ্বংস করে প্রাক ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এই অবমূল্যায়নের প্রচেষ্টা আজকে একটি দ্বান্দ্বিক গুরুত্ব লাভ করেছে’’(৬) উপনিবেশবাদী অবমূল্যায়ন মিথ্যাচারজনিত কলঙ্ক থেকে নিজেদের ইতিহাসশিল্পসাহিত্যঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিকধর্মীয় অবস্থান পরম্পরাকে মুক্ত করে সঠিক আলোয় উপস্থাপনের মাধ্যমে উপনিবেশবাদ শেখানো আরোপিত আত্মগ্লানি হীনমন্যতা থেকে মুক্তি লাভের প্রচেষ্টার  নাম বিউপনিবেশিকরণ বা ডিকলোনাইজেশন এতে করে শুধু শিল্পসাহিত্যইতিহাসই উপনিবেশবাদী মিথ্যা প্রোপাগান্ডা থেকে মক্ত হবে না, উপনিবেশিত মনও মুক্তি লাভ করবে সংক্ষেপে এই হচ্ছে উত্তরউপনিবশেবাদী মতবাদ

 

বৃটিশ আমালেই উপনিবেশবাদবিরোধী প্রচেষ্টা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন লেখনীতে লক্ষ করা গিয়েছিল কিন্তু আমাদের বহুকথিত আধুনিক কবিসাহিত্যিকদের বড় অংশই রয়ে গেছেন উপনিবেশিত মনের অধিকারী অবশ্য জসীমউদদীন এবং আল মাহমুদ উত্তরউপনিবেশিক মানসিকতার দুই বড় কবি নব্বই দশকে আবির্ভূত কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় উত্তরউপনিবেশবাদের গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায় তাঁর বহু কবিতায় আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য যথাযথ মহিমায় উপস্থাপিত হয়েছে আমিনুল ইসলাম অবশ্য কোথাও কখনো দাবি করেননি যে তিনি উত্তরউপনিবেশিক কবি অথবা উত্তরউপনিবেশবাদ তাঁর পছন্দের বিষয় উপনিবেশবাদ বিষয়ে তাঁর কোনো রচনাও আমার চোখে পড়েনি  কিন্তু তাঁর অজ¯্র কবিতায় কখনো বাংলাদেশ, কখনো ভারত উপমহাদেশ, কখনবো এশিয়ার ইতিহাসঐতিহ্য এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যেসব খুব সহজেই উত্তরউপনিবেশবাদের সাথে মিলে যায়

 

এখানে বলে নেয়া ভালো যে আমিনুল ইসলাম অতীতচারী কবি নন অতীত তার বিষয়ও নয় ইতিহাস আলোচনাও তার বিষয় নয় তিনি ইতিহাস সচেতন, কালসচেতন এবং ঐতিহ্যসচেতন কবি তিনি বসবাস করেন বর্তমানে; তার চোখদুটো ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত তিনি অতীত থেকে আলো নিয়ে বর্তমানকে আলোকিত করেন এবং ভবিষ্যতের যাত্রাপথে সেআলোকে পথচেনার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে চান  তিনি কোনো ঐতিহাসিক কবিতা রচনা করেননি কোনো কিংবদন্তীর বর্ণনা দিতেও লেখেননি কোনো কবিতা তিনি ইতিহাসকিংবদন্তীঐতিহ্যকে তার কবিতার ঐশ্বর্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন ইতিহাসঐতিহ্যমিথ  কখনো মূলবিষয়ের সাথে অঙ্গীভূত হয়েছে, কখনো চিত্রকল্প নির্মাণে, কখনো উপমা সৃষ্টিতে, কখনোবা সময়চেতনা জ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়েছে এতে করে তার কবিতা অনেক বেশি ঐশ্বর্যময়, সৌন্দর্যমন্ডিত এবং ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে উঠেছে অবশ্যই তিনি উদ্দেশ্য নিয়েই এসব ব্যবহার করেছেন সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে, এখন রাজনৈতিকভাবেস্বাধীনকিন্তু মানসিকভাবেউপনিবেশিতবাঙালি জাতিকে তার শেকড়ের সঠিক সন্ধানে আকৃষ্ট অনুপ্রাণিত করা এবং তার গৌরবের স্থানগুলোর ওপর আলো নিক্ষেপ করা বৃটিশরা দুশো বছর ভাবত উপমহাদেশকে শাসন শোষণ করে অবশেষে চলে গেছে কিন্তু তারা উপমহাদেশের মানুষের মনে যেউপনিবেশ রেখে গেছে, তা আজও এদেশের উচ্চশিক্ষিত মানুষের একটা বড় অংশকেউপনিবেশিত মনএর অধিকারী করে রেখেছে  উপনিবেশিত মন নিয়ে বাঙালি দ্রুতই ভুলে যায় তার অতীত ইতিহাস এটা আত্মঘাতি ব্যাপার ইতিহাসঐতিহ্য বিস্মৃত হলে আত্মাভিজ্ঞান অর্জনেও মারাত্মক ভ্রান্তি ঘাটতি রয়ে যায় আমিনুল ইসলাম বাঙালির বিস্মৃতিপরায়ণার বিষয়টি খুবই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন কবিজীবনের প্রথম দিকে লেখা তারশেকড়ছুঁয়েনামক কবিতায় প্রথমেই তিনি আত্মজিজ্ঞাসার সুরে বলেছেন,

 

চরের যোনিতে মুথাঘাসের মতোই কি জন্ম

আমার? নাকি আমি কোনো মহাকুলবৃক্ষের

গাঢ় প্রাণরস আর দুর্যোগবৈরী বীর্য বয়ে চলেছি

সত্তায়–যার শেকড় আফ্রিকার বাওবাব বৃক্ষের

মতো ছড়িয়ে আছে মহাকালের মৃত্তিকায়?

অথবা দারুচিনিদ্বীপসন্ধানী কোনো সাহসী

বিহঙ্গের চঞ্চুবাহিত বীজ হতেই কি নবরূপে

জন্ম আমার পিতৃবৃক্ষের– যা কিনা মাতৃজঠরের

মতো পেয়েছিল শ্যামল বদ্বীপের উর্বর আঁধার?

(শেকড়ছুঁয়ে / মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

অতঃপর তিনি নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিভিন্নজনের কাছে গেছেন কারও কাছেই উত্তর মেলেনি কারণ প্রায় সকলেই অতীতবিস্মৃতিতে বিভোর হয়ে আছেন ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়, ভাগ হয় বাংলা অতঃপর ১৯৭১ সালে খন্ডিতবাংলার স্বাধীনতা লাভ কিন্তু  আসলে তো বাংলা বাঙালির ইতিহাস এটুকু কালপরিসরে সীমায়িত নয় ভূখন্ড হিসেবে  বাংলার ইতিহাস লক্ষ  বছরের অথবা কোটি বছরের ইতিহাস জাতি হিসাবে বাঙালির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের বাঙালিরাই তো বাংলার প্রধান আদিবাসী  অথচ সাহিত্যসংস্কৃতির অঙ্গনে, নাটকে, সিনেমায়, উপন্যাসে, গল্পে, কবিতায়, গানে, প্রচার মাধ্যমে লাখো বছরের কোটি বছরের বাংলাভূগোলের ছবি অনুপস্থিতপ্রায় এদেশের বড় কবি, তুখোড় নাট্যকার, প্রখ্যাত ইতিহাসবিশারদ কারও লেখাতেই বাঙালি জাতির ইতিহাসঐতিহ্য তার দীর্ঘ পরম্পরায় এবং সোনালি মহিমায় উপস্থাপিত হয় না কারণ, উপনিবেশিত মনে সেই প্রেরণা সাহস আসে না ফলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাসঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেই বড় হচ্ছে এই নিয়ে তার খেদোক্তি:

 

আমার মৃত্তিকার মাঝে এতটুকু ফাঁক নেই

অথচ এই নিয়ে বিশারদের হাতেও ধুলো ওড়ে;

কবিশ্রেষ্ঠ গান শোনান নগদের; নাট্যকারের কাছে

মুখ খুলে অপবাদে বিদ্ধ আমি আপাদমস্তক;

শিল্পকলার উঠানে বনসাইয়ের পাশঘেঁষে

তরুণ সংস্কৃতিকর্মী আর আমার নিজের চোখ

বাহান্নোর রক্তাক্ত উঠোন ঘেঁষে

দূরান্ধের মতো আটকে আছে সাতচল্লিশে

 

আমার স্কুলপড়য়া মেয়ের একটা খেয়ালী প্রশ্নের

জবাব সংগ্রহে এত ঘাঁটাঘাঁটি, এতটা ধর্ণা!

রক্তোজ্জ্বল হলেও তার কৌতূহল নিবৃত্তিতে

আমার এই সঞ্চয় যথেষ্ট নয় মোটেও;

এখন এই আমি আর কার কাছেই বা যেতে পারি?

(শেকড়ছুঁয়ে / মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

এমন অভিজ্ঞতা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আমিনুল ইসলাম  আপন কবিতার ভুবনে ইতিহাস ঐতিহ্যকে সাথে নিয়ে  পথ চলেছেন কিন্তু পূর্বেই বলেছি তার কবিতা ইতিহাসচেতনার হলেও ইতিহাসের নয় তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমের কবিতার মধ্যে ইতিহাস, কিংবদন্তী, লোককাহিনী, রূপকথা প্রভৃতির অনুষঙ্গ জুড়ে দিয়েছেন  আমিনুল ইসলামের কবিতা যতটা অনুভব করবার, ঠিক ততটাই বিশ্লেষণ করবার তিনি আত্মনিষ্ঠ কবি, তবে আত্মকেন্দ্রিক বলা যাবে না আসলে তিনি যে জাতের কবি, তাতে ইতিহাস ঐতিহ্যবিলাসী না হয়ে উপায় নেই অর্থাৎ ইতিাহস ঐতিহ্যের উপমা  তাঁর কাব্যের কারুকাজমাত্র নয়, ইতিহাসেই কাব্য তাই আমার বলতে ইচ্ছা করে তিনি ইতিহাসের বরপুত্র কারণ এত বেশি করে ইতিহাস নির্ভর কবিতা বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে খুব কম কবিই রুয়েছেন এই ক্ষেত্রে আমিনুল ইসলাম শীর্ষস্থানীয় একজন তবে সবচেয়ে বড় কথা, এই ইতিহাসচেতনা বা ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যবহার কখনই আরোপিত বলে মনে হয়নি রয়েছে স্বাভাবিক গতিময়তা তাঁর কবিতায় জাতিক আন্তর্জাতিক ইতিহাস এসেছে পাশাপাশি এই ঘরানার একাধিক কবিতা রয়েছেস্বপ্নের হালখাতাকাব্যগ্রন্থে যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলপিছিয়ে যাওয়া মানুষনামক কবিতা এটি এমন একটি কবিতা, যেখানে শিরোনামের আদ্যোপান্ত নিহিত আছে এই কবিতার আর একটি মজা হল, পাঠ করবার সৌখিনতা এর গাঁথুনি, শব্দ চয়ন, আবার সেই সাথে ইতিহাস চয়ন হয়েছে অসাধারণ দক্ষতায় এর শুরু এক মেজাজে আর শেষ হল অন্য চূড়ায় কবি শুরু করেছেন

 

কবিতা প্লাবনে ভাসে; প্রাণহীন ছোটগল্প;

কে পড়ে নভেল! নাটক মুনাফা খোঁজে;

…………………

সবুজ ব্যাগ নিয়ে আমিও অনেকদিন

নগরনিবাসী;

কোন্ তরিকায় আজ আমার সমস্ত রাত মার্বেলদুপুর!

আমার বিছানা সোলেমানিতখ্ত হয়ে

প্রায়শ ঘুরে আসে সত্যবতীর ঘাট

বেহুলাবাসর হয়ে দখলদরোজা!

 

কবিতাটির প্রস্তুতিপর্ব দেখে সহজেই অনুমান করা যায় কবি বড় কিছুর ইঙ্গিৎ দিতেই যাচ্ছেন বাঙালি জাতির অহংকারের দিকগুলো কবি তুলে আনতে চাচ্ছেন সুকৌশলে আর তিনি আফসোস করছেন, এর পরেও আমার কেন এতটা পিছিয়ে আছি জাতি হিসাবে আমরা কেন পিছিয়ে পড়ছি, তার একটা ফিরিস্তি বলা যেতে পারে এই কবিতা তিনি নিজের জাতিসত্তার সাথে অন্য জাতিসত্তার ইতিহাস মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন যোগ্য নৃতাত্ত্বিক হিসাবে তিনি বাঙালি জাতির উৎসের সন্ধান করেছেন বাঙালির জাতির একটা অংশ অস্ট্রালয়েড কবি অস্ট্রেলিয়ার ব্লু মাউন্টেইনে সেখানকার আদিবাসীকে দেখেছেন এবং তার চেহারায় গায়ে ঘ্রাণে বাঙালি জাতির সত্তার ঘ্রাণ পেয়েছেন চর্যাপদের আমলের শবরশবরীদের আদি বাঙালির সাথে সিডনীর আদিবাসী সাইমনের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছে, বলা যায় আবিষ্কার করেছেন তিনি এই জাতিতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের বিষয়টি অতীতের সাথে বর্তমান, এশিয়ার ভূগোলের সাথে অস্ট্রেলিয়ার ভূগোল এবং আদিবাসী মানুষের সমুদ্রপথে যাতাযাতের দৃশ্যযোগে অভিনব চিত্রকল্পে   চমৎকার শিল্পনৈপুণ্যে কবিতা করে তুলেছেন কবিতার গায়ে মউমউ করে উঠেছে প্রত্নঘ্রাণ ; কবিতার শরীরে অলংকার হয়ে উঠেছে ইতিহাসঐতিহ্য; কবিতার প্রাণ হয়েছে ব্যাপ্ত মহাকাল  তিনি অতীতকে বর্তমান করে তুলেছেন মহাকালের নীরবতা কথা বলে উঠেছে বর্তমানের উঠোনে

 

আমি ঘুরি পথে প্রান্তরে;

সিডনির ব্লু মাউন্টেনে

কৃষ্ণকায় আদিবাসি সাইমনকে দেখে

মনে হয়েছিল

পুরনো পুঁথির মতো গায়ে তার পরিচিত ঘ্রাণ;

যেন সে আমারই সেই আদিবংশধর

শিমুলের ফুল গুজে চেয়ে থাকতো শবরীর চুলের খোঁপায়;

তুফানের ঢেউ লেগে নৃতাত্ত্বিক তরীখানা

পর্বতের কোল ছেড়ে

ভিড়েছিল একদিন করতোয়া তীরবর্তী বৃক্ষের পাড়ায়!

আমি তার পাশে বসে উঠিয়েছে বেশ কিছু ছবি;

আমি কি বাতিকগ্রস্থ?

নাকি আমার রয়েছে কোন অদ্ভুত ইন্দ্রিয়

যা আমাকে জাগিয়ে দেয় ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে নিদ্রিত উঠোনে

 

সত্যিই আমিনুল ইসলামের আছে এক অদ্ভুত ইন্দ্রিয়, যা তাঁকে জাগ্রত রাখে ঘুমন্ত ইতিহাস পাড়ায় তাইতো কবি ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্টামের গভীর জঙ্গলে শুনেছেন রাঙামাটির শ্যামা আর কোকিলের গান তিনি শ্যামদেশের গিনিময় কাঞ্চনবুরীতে কাওয়াই ব্রীজ আর আত্মত্যাগী সৈন্যদের সমাধিফলক দেখে মনে করেছেন নিজ দেশের দেশপ্রেমিক আর আত্মত্যাগীদের কথা তিনি খুঁজেছেন ঈশা খাঁর বীরত্বের নিশানা, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, মজনু শাহের নাম তিনি ভীত সন্ত্রস্থ, কারা মুছে ফেলতে চাচ্ছে এঁদের নাম অথচ ‘‘ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে যা আমাদের যুগিয়েছে অসম সাহস”। এই কবিতার শেষে কবির  আর্তচিৎকার ভেসে আসে এইভাবে

 

হে সোমপুর বিহারের শূন্য মহাকাল!

হে পুন্ড্রবর্ধনের আলোকআঁধারি!

হে সোনামসজিদের স্বর্গময়ী ছায়া!

তোমরা আমাকে নাও

অতীতের পুত্র আমি ভুল করে এসে গেছি

বিস্মৃতিপ্রিয় একজন শ্যামরঙ জনতার একচোখা উঠোনে

 

বাঙালি জাতির বয়স নিয়ে একাধিক রকমের মতামত রয়েছে তবে একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, রাঢ় এবং বরেন্দ্র হচ্ছে বাংলার প্রাচীনতম ভূখন্ড বাঙালির ইতহাস অথবা উৎসের সন্ধান করতে গেলেই প্রথমে আসে রাঢ়বরেন্দ্রীর নাম ভাগ্যান্বেষণ কিংবা রাজ্য লিপ্সার বশে আমাদের এই ভূখন্ডে এসেছে অনেক পরাশক্তি এদের মধ্যে কেউ ধন সম্পদ লুণ্ঠন করে পালিয়ে গেছে নিজদেশে আবার কেউ বরেন্দ্রভূমির প্রেমে পড়ে থেকে গেছেন চিরদিনের মত আমাদের বরেন্দ্রীর সংস্কৃতি কেউ বুকে ধারণ করে নিয়ে গেছেন স্বভূমে, আবার কেউ তার নিজের সংস্কৃতি নিয়ে এসে মিশিয়েছেন বরেন্দ্রীর দেহমনে এইভাবে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে নতুন সভ্যতা নতুন জনপদ বনজঙ্গল সাফ করে গড়ে উঠেছে নতুন জনবসতি বরেন্দ্রীর বিভিন্ন নদীর তীরে গড়ে ওঠে অনেক জনপদ বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা মিলে তৈরি হয়েছে নতুন সংস্কৃতির ধারা কবি আমিনুল ইসলাম তার কবিতায় এই সংস্কৃতি ধারার ছবি এঁকেছেন চমৎকারভাবে

০১.

একদিন  বরেন্দ্রের ভাতের সুঘ্রাণে

সমুদ্র জঙ্গল ভেঙে এসেছিল মুগ্ধপায়ে

তুর্কীচীনমগআরবিমঙ্গলতাতার;

আজও সেই মুগ্ধছাপ গাঙেয় তল্লাটজুড়ে রয়েছে নিভৃতে;

তারাও গিয়েছে নিয়ে নকশীকাঁথার বুক, যমুনার প্রেম

মধ্যপ্রাচ্যে, মহাচীনে, আফ্রিকার গহীন অন্তরে

সঙ্গোপনে বাতি জ্বেলে অম্লান আজো তা ঝড়ঝঞ্ঝা রুধি

(সরল অভিজ্ঞান/ মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

০২.

বদলগাছীর রোড ধরে আসে মহাকালের গান;

ধর্মং শরণাং গচ্ছামি, বুদ্ধং শরণাং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণাং গচ্ছামি,

পেছনে শ্রীজ্ঞান অতীশের ছায়া

(ভোরের হাওয়ায় ভাসে বাংলাদেশ/ মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

বরেন্দ্র অঞ্চলের মূল অধিবাসীরা পণ্ড্র, দ্রাবিড়, শবর, অষ্ট্রিক, কিরাত পরবর্তীতে এদের জাতীয়তাভিত্তিক  নাম বাঙালি যাদের গায়ের রং প্রায় শ্যামল বা কৃষ্ণকায় তারা পশু শিকারী, মৎস্য শিকারি এবং কৃষক তাদের হাতে গড়ে উঠেছে প্রাচীন সভ্যতা তাই তাদের বাদ দিয়ে বরেন্দ্রীর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না বাংলা ভূখন্ডের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন অংশ রাঢ় বরেন্দ্র বরেন্দ্রর আদিবাঙালিরা শবরশবরী তাদের হাতেই বাংলাসাহিত্যের শুভসূচনা যা চর্যাপদ নামে খ্যাত তখন বরেন্দ্র অঞ্চলে আখ বা ইক্ষু বা পুন্ড্র এবং শিমুল ছিল বৃক্ষ ছিল প্রচুর পরিমাণে শবরীরা শিমুলফুল মাথায় দিতে সাজতো এবং কার্পাস তুলা দিয়ে তৈরী কার্পাসিকা পরিধান করতো স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে এর  ভাষাসাহিত্যসংস্কৃতির অবদান সবচেয়ে বেশি বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন সূচিত করে পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে ফুল দেয়া হয় শহীদ মিনারে কবি শবরীদের সেই ফুল আর ভাষা শহীদদের স্মরণে দেয়া ফুলের মধ্যে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার যোগসূত্র রচনা করেছেন এবং এই পথেই বাঙালি জাতির কবির পরিচয় সূত্র খুঁজেছেন

 

তাই তো ফাগুন এলে আমার বোন পলাশের মালা গাঁথে,

এবং আমি আমার যুবতীর খোঁপায় দিই প্রস্ফুটিত লাল;

আর উদাস দুপুরে খুঁজে ফিরি

আমাদের অস্ট্রিক আত্মীয়ের পদচিহ্ন

যে তার যুবতীকে নিয়ে

বরেন্দ্রীর শিমুলচিহ্নিত ইতিহাসের রাঙাপ্রান্তরে লুকিয়ে আছে

(শিমুল চিহ্নিত ভালোবাসা/ শেষ হেমন্তের জোছনা)

 

বাঙালির সভ্যতার মূলে আছে তার সুজলাসুফলা নদীবহুলা ভূগোল এবং তার মুখের ভাষা সে আজীবন ভালোবেসেছে তার মুখের জবান ভাষাকে তাই কোনো রক্তচক্ষুর ভয়েই সে তার মুখের ভাষাকে জলাঞ্জলি দেয়নি রৌরব নরকের ভয়ও তাকে ভীত করতে পারেনি আর্য রাজারা বাঙালিকে নানা নেতিবাচক হীন বিশেষণে  আখ্যায়িত করেছে তার মুখের ভাষাকে নরকে যাবার অন্যতম কারণ বলে হুমকি দিয়েছে কিন্তু বাঙালি তার মুখের ভাষা ত্যাগ করেনি বরং অনুকূল পরিবেশে পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত, আরবী, ফার্সী ভাষায় লিখিত ধর্মপুস্তক সাহিত্যকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে সুলতানী আমলে বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি অনার্য বাঙালির মুখের ভাষা নাগরিকদের প্রায় সর্বজনীন ভাষা হয়ে উঠেছে  আমিনুল ইসলামের বিভিন্ন কবিতায় বাঙালি বাংলা ভাষা বিকশিত হয়ে ওঠার দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এবং উপভোগ্য শিল্পসফলতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আর সেখানেও আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের  জয়জয়কার কারণ বাংলাভাষা সাহিত্যের বিকাশ সাধন সম্পর্কিত সঠিক ইতিহাস জানাও নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব যাতে করে তারা ইতিহাস বিকৃতির ইতিহাস দ্বারা বিভ্রান্ত না হয় কারণ এটাই দুর্ভাগ্যজনক সত্য যে এসব নিয়ে বহু মিথ্যাচার ঘটেছে অতীতে অজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞতা দুটোই ক্ষতিকর

কানসাটের মাটিতে স্তব্ধ জোছনায় কান পাতলে শুনতে পাবে

গৌড়সভায় বেজে চলেছে কবিয়াল নরেশ শীলের গান

অথবা

পরাগল খাঁকে পাশে বসিয়ে মহামতি সুলতান শুনে যাচ্ছেন

কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতÑ

তাঁহান আদেশে মালা মস্তকে ধরিলা

কবীন্দ্র পরম যতেœ পাঁচালী রচিলা।।’’

(ঢাকার মেয়ে চন্দনাকে/ শরতের ট্রেনে শ্রাবণের লাগেজ)

 

বাংলাদেশের অন্যতম এক নদী মহানন্দা এর কোলেই হেসে খেলে কেটেছে আমিনুল ইসলামের শৈশব তার অনেক কবিতায় এই নদী এসেছে নানা প্রসঙ্গে নদী কবির বড় আপন আর তাইতো মহানন্দাকে নিয়ে লিখলেন দীর্ঘ কবিতামহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম বইও প্রকাশিত হল এই কবিতার শিরোনামেই আমরা যেন কবিতার রাজ্যেও পেয়ে গেলাম এক নতু অদ্বৈতমল্ল বর্মনকে এই কবিতায় কবি মহানন্দার চারপাশে গড়ে ওঠা জনজীবনকে এঁকেছেন চমৎকারভাবে মহানন্দা সেতুকে কবি বলেছেন ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের প্রশস্ত কাঁধ যার নীচে ৭১ শহীদ হন তিনি কবিতা শেষে কবির হাহাকারও ব্যক্ত হয়েছে আমরা যে উজানের শাপে অভিশপ্ত কবি বলেছেন— ‘উজানের শাপে মালোদের নৌকাগুলো ধরেছে চুলোর পথআবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ তথা বৃহত্তর রাজশাহীর ঐতিহ্য  ‘সবুজ সুস্বাদু সোনাবাহারি আমের কথাও আমিনুল ইসলাম আনতে ভুলেননি এক্ষেত্রে ধন্য রাজশাহী, ধন্য রাজশাহীর আমমহানন্দাশিরোনামে আর একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা স্থান পেয়েছেতন্ত্র থেকে দূরেনামক কাব্যগ্রন্থে ঐতিহাসিকদের মতে, প্লাইওসিন যুগে বরেন্দ্রীর অন্যতম প্রধান নদী মহানন্দার জন্ম মহানন্দার জন্ম প্রসঙ্গেমহানন্দাশীর্ষক কবিতায় আমিনুল ইসলাম যা বলেন, তাতে লক্ষাধিক বছরের পুরোনো বঙ্গভূমির কথাই প্রকারান্তরে ব্যক্ত হয় এই কবিতায় কবি জাতি হিসেবে বাঙালির মহাকালের উঠোনে যাপিত জীবনের ধারাবাহিক ছবি তুলে ধরেছেন যা দেখে  বঙালি তার পথপরিক্রমা, অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য, শাসনকর্তার পরিবর্তন, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে এবং বর্তমানের উঠোনে দাঁড়িয়ে মহাকালের বিশাল ভূগোলটি দেখে নিতে পারে আমিনুল ইসলামের শক্তিমত্তা এখানেই যে তিনি ইতিহাসঐতিহ্যমিথকে কবিতার উপকরণ করেছেন তবে শৈল্পিক দক্ষতাগুণে সেসব উপকরণ অসাধারণ উপমাচিত্রকল্পউৎপ্রেক্ষার সোনালি অলংকারে উন্নীত হয়েছে ফলে তার কবিতা নান্দনিক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে

 

দেবরাজের বরে নাকি পুণ্ড্র বরেন্দ্র,

তুমি কি সেই আর্শীবাদ গাঢ় প্রাণরসে?

সর্পিলী যদিও শরীর, অমৃত আনন্দ

বাতাস বাজালে বাঁশি তরঙ্গ নূপুর হয়ে অন্তর প্রকাশে

প্লাইওসিন দিনে যখন ওষ্ঠাগত প্রাণ

মহলড্রিম জলকন্যা ভরাকুম্ভ কাঁখে লয়ে পুণ্ড্রে এলে নেমে

কত মারি খরা তাপ টানে পাত্রখান

অফুরান জলসত্র, অকাতর তুমি আরো অনার্যের প্রেমে

(মহানন্দা/ তন্ত্র থেকে দূরে)

 

আমিনুল ইসলামের আর একটি মিথনির্ভর সোনালি কবিতার নামবেহুলার ভিটা কবিতাটি নিম্নরূপ:

 

মহাকালের বুকে ধূসর আঁচলে আবৃত স্তন

স্তন হতে চুঁয়ে নামা দুধ

ঝরনার মতো মিশে যায়

কালের করতোয়ায়

সেই জল পান করে দুই তীরে বেড়ে ওঠে শিশুরা

তাদের পরনে ইস্কুলড্রেসের মত ভালোবাসার ইউনিফ্রম

(বেহুলার ভিটা/ জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)

 

এই কবিতা কলেবরে ছোট হলেও আবেদনে বিশাল বাঙালি জাতির প্রধানশক্তি তার প্রেম এই প্রেমই তাকে টিকিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত নদীমাতৃক উঠোনে চাঁদ সওদাগর, বেহুলা, লখিন্দর এরা বাঙালিই আদি বংশধর এসব মানুষ প্রকৃতির কাছে হার মানেনি মৃত্যুর কাছেও স্বীকার করেনি পরাজয় সাপেকাটা লখিন্দরকে বাঁচিয়ে তুলতে বেহুলা স্বর্গপুরীতে নেচেছিল ফিরিয়ে এনেছিল পতির প্রাণ বাঙালির এই প্রমেসত্তা এত প্রবল যে সে কখনো অন্যজাতির উঠোন বা রাষ্ট্র আক্রমণ হানতে যায়নি কোনো লুণ্ঠনে বা শোষণে যায়নি অন্য কোনো দেশ বাঙালির এই প্রেমিক শান্তিবাদী সত্তার প্রতিফলন দেখা যায় তার কবিসত্তা বাউলসত্তার মাঝে সবচেয়ে বেশি বেহুলার শান্তিবাদী প্রেমসত্তা বাঙালির জাতিসত্তার মৌলিক উপকরণ হয়েছে  এখনে কবি মহাকালকে নারী হিসাবে দেখেছেন রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বেহুলার ভিটা আর প্রেম ভালোবাসার কেন্দ্র কিংবদন্তীর বেহুলাকে তিনি বর্তমান বাঙালি জাতির সত্তায় জননীসন্তানের সমান্তরালে উপস্থাপন করেছেন অতীতে ঘটনার ওপর নির্মিত মিথ পুনর্গঠিত হয়ে বর্তমানের বিরাজমানতায় উন্নীত হয়েছে

 

ইতিহাসঐতিহ্যকিংবদন্তী থেকে উপকরণ নিয়ে অনেক শিল্পসফল কবিতা রচেছেন আমিনুল ইসলাম তাঁর তেমনি একটি প্রেমের কবিতার নামতুমি হলে সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কিংবদন্তী, পুন্ড্রনগরের বেহুললখিন্দরের লোককাহিনী সহযোগে বর্তমান বিশ্বায়নশাসিত সমাজের নারীর উদ্দেশ্যে রচিত কবিতাটি ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প কল্পচিত্রের অলংকারে একটি কালজয়ী প্রেমের কবিতায় উন্নীত হয়েছে তার সাথে  এসেছে আমন ধান, শিমুল পলাশ জবাফুল, গাঙের ভাসান প্রভৃতি অনুষঙ্গ  কথা ঘুরিয়ে বলা যায়, একটি কালজয়ী কবিতা রচনায় তিনি অত্যন্ত সফলভাবে কালজয়ী মিথলোককাহিনীইতিহাসের উপকরণ ব্যবহার করেছেন বাংলার প্রাচীন ভূগোল, বর্তমান শস্যক্ষেত্র, বিশ্বায়নপ্রভাবিত বর্তমান সময়, বিশ্বাসনির্ভর অতীত একসাথে কথা বলে উঠেছে একটি ক্ষুদ্রায়তন কবিতার মুখে কবিতায় বর্তমান বাঙালি নারীকে অতীতের বাঙালি নারীর সমৃদ্ধ পরম্পরায় মানবিক বৈশিষ্ট্যে দেখার গ্রহণের বাসনা পরিস্ফুটিত হয়েছে এই বাঙালি অতীতের বাঙালি এই বাঙালি বর্তমানের বাঙালি এই বাঙালি আগামী দিনের বাঙালি একথায় এই বাঙালি আবহমান বাঙালি বিশ্বায়নের সর্বগ্রাসী ¯্রােতে বাঙালির আবহমানকালের ইতিহাসঐতিহ্যমিথ বাঙালিকে সংস্কৃতিকে রক্ষার রক্ষাকবচ , এমন ভাবব্যঞ্জনা কবিতাটির পরতে পরতে ঝংকৃত হয়ে উঠেছে শৈল্পিক সুচারুতায় নান্দনিক সৌন্দর্যে বাঙালিজাতির ইতিহাসঐতিহ্য পুনর্নিমিত হয়ে ঐশ্বর্যমন্ডিত বর্তমানে উন্নীত হয়েছে  কবিতাটি আমিনুল ইসলামের যুগপৎ ঐতিহ্যপ্রীতি এবং কাব্যকুশলতার সোনালি সাক্ষর

 

ছুটে আসে বিশ¡ঢল, শিকড় বিপাকে;

নগ্ন নিতম্ব হাসে হাজারে হাজারে;

আমি তো তাদের নয়, চেয়েছি তোমাকে,

গড্ডলিকায় ব্যতিক্রম মুক্ত বাজারে!

 

তোমার চেতনা রাঙা শিমুল পলাশ

তোমার মনন জুড়ে আমনের রঙ

আমিও শিখেছি দ্যাখো শব্দঘন চাষ

আমাকে কিনিবে কোন্ ছিনালির ঢঙ!

 

তোমার আঁচলে মাখা প্রতœঘন ঘ্রাণ

চিরায়ত ক্ষুধা নিয়ে মাতাল আমিও

দেহে ধরেছি দ্যাখো লখিন্দর প্রাণ

ভাসি যদি সে ভাসানে তুমিও নামিও

 

আমি তো স্বয়ং আছিলাগিবে না ফুল

তুমি হলে সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল

(তুমি হলে সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল/ কুয়াশার বর্ণমালা)

 

বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ বা কবিতা ধ্রুব নক্ষত্র হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে যার বিষয়, প্রকরণ, উপস্থাপন, ভাষাসহ বিভিন্ন কিছু, যা গ্রন্থ বা কবিতাগুলোকে উল্লেখযোগ্য করে রেখেছে বর্তমানে এর সাথে আর একটি কবিতা যোগ হল— ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি  কবি আমিনুল ইসলামেরপথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’  এই ধারার কবিতা বলতে গেলে এই ধারার কাব্যমাল্যে এক নতুন তাজা পুষ্পের সংযুক্তি ঘটলো সূচীত হল কবিতার ভূবনে নতুন দিগন্তের এতদিন বাংলাদেশের কাব্যভূবন হয়তো অপেক্ষা করছিলো এমন একটি কবিতার জন্য যে কবিতার থাকবে নিজেকে নিয়ে অহংকার করার আস্পর্ধাপথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’  এমন একটি কবিতা যেখানে জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের সমস্ত অহংকারের দ্বীপ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের সমস্ত ঐতিহাসিক দলিল তথা অহংকার গ্রথিত হয়েছে এখানে আমি বিশ্বাস করি, এখন কিংবা তখন, যখনই হোক না কেন, একদিন আলোচনার সামনে আসবে কবিতা আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রকৃতি জীবন্ত উপমার ব্যবহার আলাদা স্বতন্ত্র বিশ্লেষণের দাবি রাখে জীবনানন্দ দাশকে আমরা পাই প্রধান ইন্দ্রিয়বোধের কবি হিসাবে বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়পাঠকের কাছে তাঁর একতটি মাত্র দাবি: সেটি এই যে তিনি চোখ খোলা রাখবেন কেননা জীবনানন্দের জগৎ প্রায় সম্পুর্ণরূপে চোখে দেখার জগৎ তাঁর কাব্য বর্ণনাবহুল, তাঁর বর্ণনা চিত্রবহুল, এবং তাঁর চিত্র বর্ণবহুলএটুকু বললেই জীবনানন্দের কবিতার জাত চিনিয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে এদিক দিয়ে দেখলে আমিনুল ইসলামের জগৎও চোখে দেখবার জগৎ তাবে তা অবশ্যই ইতিহাস ঐতিহ্যের নিরিখে আর তা উপমায় ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি আরো বেশি করে ইন্দ্রিয়বোধের কবি হয়ে উঠেছেন জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন যেভাবে ইতিহাস, ঐতিহ্যের ব্যবহার হয়েছেপথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থিও পথেই সৃষ্টি তবেপথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’  সৃষ্টি হয়েছে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে; বনলতা সেন সেভাবে হয় নি আমিনুল ইসলাম শুরুতেই পণ করেছিলেন, প্রেমের তুলিতে বাংলাদেশের গৌরবগাঁথা আঁকবেন আর আমিনুল ইসলাম যেহেতু বরেন্দ্রভূমির সন্তান, তাই তার তুলিতে বরেন্দ্রভূমির ছবিই বারবার আসা স্বাভাবিক তাছাড়া প্রাচীন সভ্যতার যাকিছু নিয়ে আজ আমরা গর্ব করি তার বেশিরভাগই বাংলাদেশের এই অংশে অবস্থিত যার ফলেই হয়তো সম্ভব হয়েছে এমন সার্থক ফসল ফলানো তিনি এই কবিতায় পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নিয়ে যখন কথা বলেছেন, তখন তা শেকড়সন্ধানী গভীরতায় এবং সাফল্যের সোনালি ব্যঞ্জনায় আকাশচুম্বী মহিমা ধারণ করেছে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ছিল একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় অতীশ দীপঙ্করের মতো বিশ্বখ্যাত পন্ডিত এখানে শিক্ষকতা করেছেন অতঃপর জ্ঞানের মশাল নিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন সুদূরের চীনদেশ আজ বাংলাদেশ থেকে আমরা জ্ঞান আহরণে ইউরোপ আমেরিকা যায় আর দেড়হাজার বছর আগে যখন ইউরোপ ছিল অজ্ঞানতার অন্ধকারে, আমেরিকা আবিস্কৃতই হয়নি, তখন এদেশেই গড়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয় এবং জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত একাধিক পন্ডিত ঐতিহ্যসন্ধানী কবি আমিনুল ইসলাম সেই সোনালি দিনের কথা শুধু স্মরণ করিয়েই দেননি, সেই গৌরবের ইতিহাসকে বাঙালি জাতির জাতিসত্তার সাথে একাকার করে তুলেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, কিংবদন্তী, প্রেম এবং বর্তমানের সাথে অতীতকে একাকার রঙে রঞ্জিত করে তিনি জাতির স্মৃতির দরোজায় নক করে তাদের পায়ের নিচের সোনালি মাটির দিকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন এটা অতীতচারিতা নয়, আত্মপরিচয় সম্পর্কে আগাগোড়া সচেতন হওয়া

 

কথায় কথায় আমরা এসে গেছি পাহাড়পুর পাহাড় নেই,

পর্বত নেই;  আছে শুধু পাহাড়সমান অতীতের সোনালি গৌরব

এখানে এলে ঘাড় হতে নেমে যায় বোঝা; যখন দিনের আসনে

অন্ধকারের পা, তখন এখানেই জ্বলে উঠেছিল নাক্ষত্রিক দীপের

মশাল; বাতিওয়ালার দল সেই মশাল হাতে পাড়ি দিয়েছিল

অসীমিত জলবক্ষে নিয়ে উর্বরতার উপাদান যেভাবে মেঘমালা

ছুটে যায় দেশদেশান্তর সে আলোয় উদ্ভাসিত তারা; অথচ

আমাদের চোখে আজ আঁধারের গুঁড়ো ছিটোয় উত্তরের হাওয়া

এবং আপনাবিস্মৃতি!

(পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীনগন্থি/ পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি)

 

শব্দ নয়,  যেন একের পর এক গৌরবগাথা সাজিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে কাব্যপিরামিড উপমা মজবুত, কংক্রিট অথচ সবার খুব কাছের; ওজনে হার মানায় অথচ জগদ্দল নয় উপমার তোরণ দিয়ে, উপমার গালিচা টপকে আবার উপমা সজ্জিত বাহনেই কবি পথিকরূপ পাঠককে তার কাঙ্খিত লক্ষে যেতে প্রলুব্ধ করেন আর তখনই টুপ করে  বলে ফেলেন কবির আসল কথা মোটকথা, কবির বলাটা পোক্ত তথা যোগ্য আসন বা বিশ্বাসযোগ্য করবার লক্ষ্যেই এই আয়োজন পাঠককে থামিয়ে দেন কবি, এতক্ষণ কী দেখলেন বা কী শুনলেন এবং কেন, এর তালাশে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তীতুল্য কবিতাগুলোর সমগোত্রীয়পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’  বলার আর একটি কারণ হল, আমিত্ববোধ তবে এই আমিত্ব নজরুলেরবিদ্রোহীর আমিত্ব নয় আমিত্ববোধ বাংলা, বাংলাদেশ, আর বাঙালির আমিত্ববোধ আমাদের এই জনপদ কেন গৌরবের, কেন আমার এত অহংকার পদে জন্মগ্রহণ করে, তারই বিজয়গাঁথা এই কবিতা পুরো বাংলাদেশের পুঞ্জিভূত গৌরব এর আগে একই কবিতার ফ্রেমে কেউ আনেন নি হয়তো সাহস করেন নি আমিনুল ইসলাম সেই অর্থে শুধু সাহসী নন, দুঃসাহসীও বটে সার্থকও যেখানে বিভিন্ন কাব্যিক অনুসঙ্গে এসেছে, ইতিহাস,ঐতিহ্য,প্রতœতত্ত্ব যা নিয়ে আমাদের অহংকার, ভূখন্ডের বাসিন্দা বলে আসলে তিনি প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, উয়ারিবটেশ্বরও নিয়ে যে কাব্যিক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তা বাঙালি জাতিকে তার শেকড়ের কাছে নিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে , প্রাণিত করে ইউরোপ যখন অন্ধকারে তখন আমাদের বর্তমান নওগাঁ জেলার বদলগাছিতে গড়ে উঠেছিল সোমপুর বিহার নামক  বিশ্ববিদ্যালয় তখন আমাদের কুমিল্লার ময়নামতিতে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন নামের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ময়নামতিতে পাওয়া গেছে নানাবিধ ধাতব মুদ্রা এবং স্বর্ণরৌপ্যের অলংকার সম্প্রতি নরসিংদীর উয়ারিবটেশ্বর নামক স্থানে নামহারা প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিস্কৃত হয়েছে তা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে বাঙালির ইতিহাস শুধুমাত্র এক হাজার বছরের ইতিহাস নয় তার ইতিহাস অনেক অনেক বেশি পুরোনো শুধু চাঁদ সওদাগরের কিংবদন্তী নয়, পুণ্ড্রবর্ধন, উয়ারি বটেশ্বর , ময়নামতি এসব স্থান একসময় ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র পার্শ¦বর্তী থাইলান্ডসহ সুদূর রোম পর্যন্ত যাতায়াত করতো বাণিজ্যজাহাজ

 

দ্যাখোআমরা পার হয়ে এসেছি যমুনা; পা ঠেকেছে প্রাচীন

এক নগরীর ধ্বংসাবশেষে মাটি খুঁড়ে তোলা কোনো নামহারা

সভ্যতার ধূসর কঙ্কাল; এই লোহা, এই ব্রোঞ্জএই যে পাথর

এসবই সেযুগের জ্ঞানের ফসল: বিস্তারিত নদী ছিলসমুদ্রও

সুদূরে ছিল না অনেক বছর আগে শহর ছিল প্রেম প্রাণের

ঠিকানা; কিছুটা পিছিয়ে হয়তবা তারা ছিল প্রস্তরযুগের মেধা;

সত্য তবুশুধুই শিকারি নয়সওদাগর ছিল তারা আর ছিল

মৃত্তিকার ব্যবহারে দক্ষ কারিগর চোখ বুঁজে দ্যাখোশহরের

কোলঘেঁষা বিস্তীর্ণ বন্দরে শরতের সোনালি প্রভাতে নোঙর

করেছে কত বিদেশি জাহাজ; মাল নিয়ে আবার দিয়েছে পাড়ি

সুদূরের রোমান সাম্রাজ্য কিংবা স্বল্পদূরে শ্যামদেশ; রাতের

তারারা দিনের সিগন্যাল হয়ে হেসেছে আকাশে যুগের

বিশ্ববাণিজ্য তবে অভিনব  নয়যেমন নতুন নই আমিতুমি

অথবা সুমনা

(পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি / পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি)

‘‘এযুগের বিশ্ববাণিজ্য তবে অভিনব নয়যেমন নতুন নই আমিতুমি অথবা সুমনা।’’এই কথাগুলো বর্তমানের উপযোগী করে ইতিহাসের পুননির্মাণে আমিনুল ইসলামের দক্ষতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তিনি বাঙালি জাতিকে এবং সেই সাথে  বিশ্বাবাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, আজকের বিশ্ববাণিজ্যে বাঙালি জাতি ইউরোপআমেরকিার তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও সুদূর অতীতে সে বিশ্ববাণিজ্যে নেতৃত্ব দিয়েছিল এভাবেই তিনি বর্তমান বাঙালি জাতির পায়ের  নিচে সহ¯্রবছরের সমৃদ্ধ ভূমি রচে দিতে চেয়েছেন এটি কেবল ইতিহাসচর্চা নয়, হচ্ছে ইতিহাসের আড়ত থেকে গৌরবের ইটসিমেন্টচুনসুরকি দিয়ে বর্তমানের সুদৃশ্য মজবুত অট্টালিকা নির্মাণ এবং তার দেয়ালগুলো কিংবদন্তীলোককাহিনীসত্য ঘটনার হীরাজহরতচুনিপান্না অলংকৃতকরণ এর ভিত্তি যেমন মজবুত, এর চেহারাও তেমনি নয়নাভিরাম এভাবে তিনি একদিকে বাঙালিকে তার গৌরবের বিষয়গুলো সনাক্তকরণে অনুপ্রাণিত করেছেন, অন্যদিকে নিজের কাব্যসাধনাকে সোনালি সাফল্যে উন্নীত করেছেন তিনি বাঙালি জাতির উপনিবেশিক ভুলশিক্ষা থেকে অর্জিত মানসিক হীনমন্যতাকে দূর করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন।। এভাবেই তিনি বাঙালি জাতিকে উপনিবেশিত মনের কারাগার থেকে মুক্ত করে নিজের সুবর্ণভূমিতে দাঁড় করানোর প্রয়াস পেয়েছেন কোনো কূপমন্ডকতা নয়, কোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ নয়,  কোনো বিশেষ ধর্মীয়  প্রচারণা নয়, তিনি ইতিহাসের বিশাল আয়নায় জাতিকে তার স্বরূপ দেখে নিতে অনুপ্রাণিত করেছেন যাতে করে সে যথার্থ আত্মাভিজ্ঞানে ঋদ্ধ হয়ে ওঠে,  তার সামনের পথচলা দিশা না হারায় সে যেন নতুন করে নয়াউপনিবশেবাদের দ্বারা বিভ্রান্ত না হয় এই আত্মাভিজ্ঞান জাতি হিসেবে তাকে আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাশীল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তুলবে

 

তবে আমিনুল ইসলামের মৌলিকত্ব এবং শ্রেষ্ঠত্ব এখানে যে তিনি লক্ষ বছরের বাংলার প্রাণের সুরটি তার কবিতায় ধারণ করেছেন সফলভাবে এবং শিল্পিত মাত্রায় ভারত উপমহাদেশ বা বাংলা কিংবা বৃহত্তর বরেন্দ্র ভূখন্ড অতীতে নানারকম দুর্যোগ এবং হুমকির সম্মুখীন হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ তার ইতিহাস জুড়ে রচে আছে নানা কালো অধ্যায় কিন্তু বাঙালি শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে তার নৃতাত্ত্বিক এবং ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সাময়িক পরাজয় কাটিয়ে সে স্বস্থানে থিতু হয়ে উঠেছে কালের পরিবর্তনে সদানীরা নদীর নাম হয়েছে করতোয়া, পুন্ড্রবর্ধন হয়েছে মহাস্থানগড় বা বগুড়া, গৌড় হয়েছে মালদহ বা অন্যকিছু, সোমপুর হয়েছে বদলগাছি বা পাহাড়পুর কিন্তু বাঙালি রয়ে গেছে বাঙালি বাঙালি আজীবন অতিথিপরায়ণ শত্রুকেও সে বঞ্চিত করেনি তার আতিথেয়তা থেকে আমিনুল  ইসলাম যেন পেছনের শিক্ষা নিয়েই সামনের সোনালির ভবিষ্যতগাঁথা গাঁথতে চান তিনি বার বার ফিরে গেছেন আপন গৌরবের দিকে পাল আমলে পালদের পরাজিত করে অনার্য বাঙালি কৈবর্তগণ কর্তৃক বরেন্দ্র অঞ্চলে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিা করা হয় ধরা  যেতে পারে সেটাই বাঙালির প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ রাষ্ট্রটির দীর্ঘস্থায়ী হয়নি তবু তা বাঙালির জন্য গৌরবের নওগাঁ জেলার পতœীতলায় সেই গৌরবের স্মারক এখনো বিদ্যমান আছে দিবর দিঘিতে স্থাপিত বিজয়স্মারকটির নাম দিব্বক স্তম্ভ আমিনুল ইসলাম সেই  ঘটনাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেবনভোজনশিরোনামে  যে প্রেমের কবিতা রচেছেন, তাতে করে প্রেমাতিরিক্ত ব্যঞ্জনায় বাঙালির গৌরবের দিন ফ্লাশব্যাক হয়ে ফিরে এসেছে প্রেমের মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে কবি এই ইতিহাসকে উপমা অর্থাৎ কাব্যালংকার হিসেবে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেনপুঁজির বেদীতে হাসে স্টুয়ার্ট মিলএই চিত্রকল্পটি দ্বারা তিনি পাশ্চাত্যের অর্থলিপ্সার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন এবং তার পাশে বসিয়েছেন প্রণয়নিবিড় প্রাচ্যহৃদয় এভাবে তিনি উত্তরঔপনিবেশিক মন নিয়ে প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠত্বকে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন এখানে  মার খেয়েছে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ এবং অরিয়েন্টালিজম সুপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে উত্তরউপনিবেশবাদ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই সবকিছুর নান্দনিক সংযোজন কবিতাটিকে গভীরনিবিড় ব্যঞ্জনায় অনিঃশেষভাবে ঐশ্বর্যমন্ডিত করে তুলেছে  কবিতাটি

 

কি লাভ বলো বৃত্তের ভূগোল পুষে রেখে উটপাখিপ্রাণ?

তার চেয়ে সেই ভালোনিয়ে আসো ফ্লাশব্যাক যাযাবর দিন

পুঁজির বেদীতে হাসে স্টুয়ার্ট মিল; আর অভুক্ত শিশুর

মতো একপাশে পড়ে আছে প্রাচ্য হৃদয় প্রতিদিন দেখা,

অথচ হইনি আমরা দিগন্তের ছবি ফিতাবাঁধা সিদ্ধান্তের

মতো আর কতো ঝুলে রবে আমাদের একদফা দাবি?

আমার বক্ষভরা জবাফুল জেনেও সন্ধ্যাবতীর শরীর

নিয়ে তুমিই বা আর কতোদিন থাকবে বসে আঘাটায়?

 

দ্যাখো আজ সোমপুর বিহারে সবুজসঙ্কেত হয়ে জমে ওঠে

বনভোজনের দিন! এসো আমরা দুজনে রচি শতকের

গন্ধেশ্বরীর ঘাট সবুজ আঁচলের সুতোয় হাতে বেঁধে

দিলে বনভোজনের রাখি, লজ্জাভাঙা গৌরবের ছাপ

এঁকে দেবো আমিও ক্ষতি কি বিজয় হলে কৈবর্তশাসন

যদি দিব্বক স্তম্ভ দেখে ভাবী মগজ মানে এদিনের প্রেম!

(বনভোজন/ শেষ হেমন্তের জোছনা)

 

এই কবিতার শেষাংশে প্রেমের ভাষার অবকাঠামোর ওপর  ইতিহাস ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ নান্দনিক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে ‘‘দ্যাখো আজ সোমপুর বিহারে সবুজসঙ্কেত হয়ে জমে ওঠে /বনভোজনের দিন! এসো আমরা দুজনে রচি শতকের/গন্ধেশ্বরীর ঘাট।’’ চরণগুলোতে ইতিহাসচেতনা, সময়চেতনা এবং দেশপ্রেম জীবন্ত ব্যঞ্জনায় সোচ্চার হয়ে উঠতে চেয়েছে

 

ইতিহাসঐতিহ্যমিথের পুননির্মাণকালে আমিনুল ইসলাম আরেকটি কাজ দক্ষতার সাথে করেছেন, তা হলো বাঙালির প্রেমিকসত্তার নবায়ন অথবা পুনর্নিমাণ বাঙালি তার মূল পেশায় কৃষক তবে হৃদয়গতভাবে আজন্ম প্রেমিক আমিনুল ইসলাম তার একাধিক কবিতায় বাঙালিজাতির এই প্রণয়ীসত্তাকে উদ্ভাসিত কওে তুলেছেন বাঙালি একদিকে  কালসাপে কাটা শরীর নিয়ে হয়ে উঠেছে মৃতুঞ্জয়ী লক্ষ্মীন্দর, তেমনি সাইক্লোনঘূর্ণিঝড় আর মহাজোয়ারে নাকানিচুবানি খেতে খেতে হয়ে উঠেছে অকূল গাঙজয়ী পদ্মানদীর মাঝি সে আজীবন প্রেমিক তার প্রেমিক সত্তা সর্বজয়ী তাইতো সকল ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা, পুরোহিতের অনুশাসন, রাষ্ট্রের জেলজুলুম, আর পরকালের শাস্তির ভয়কে তুচ্ছ করে সে আজীবন ভালোবেসে এসেছে তার সঙ্গীকে তাই বাঙালির প্রাণের সত্তাটি তার প্রেমিকসত্তা এই কবিরপথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থিকাব্যগ্রন্থে আরও বেশকিছু কবিতা রয়েছে যেখানে কবি প্রেমের তুলিতে ছবি আঁকতে ব্যবহার করেছেন ইতিহাসের জমিন যেমন, তুর্কী মেয়ের জন্য, তোমাকে দেখার সাধ, ব্লু মাউন্টেনে দাঁড়িয়ে, পিপাসার জল, লালন সূত্র,  সহ আরও কিছু কবিতায় একটি গ্রন্থে যদি এতগুলো কবিতায় ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ব্যবহার সাবলীল ভাবে থাকে, তবে আমিনুল ইসলামকে আর নতুন করে চিনতে হয় না, তিনি কোন জাতের কবি সারাবিশ্বজুড়ে আজকাল বিলাসিতা আর ভোগবাদের স্রোত  এখন প্রেমানভূতি সেভাবে প্রশংসিত নয় কিন্তু আমিনুল ইসলাম অনেকটা স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে বাঙালির প্রেমিকসত্তার পুনর্জাগরণ ঘটাতে প্রয়াস পেয়েছেন এবং এক্ষেত্রে ইতিহাসআর মিথ হয়েছে তার প্রধান কাব্যঅস্ত্র তিনি তারভালোবাসার পদাবলীনামক কবিতায়লখিন্দরকায়া’ ‘বেহুলাদুপুরপ্রভৃতি সমাসবদ্ধ শব্দ  সৃষ্টি করেছেন যা উপমার স্তর পার হয়ে উৎপ্রেক্ষায় উন্নীত হয়েছে এসকল শব্দ ঐতিহাসিক গভীরতা লোকাকহিনীর ব্যঞ্জনা নিয়ে কবিতাকে  প্রভূত পরিমাণে সমৃদ্ধ করে তুলেছে

 

নদীর শরীরে আজ বাসা বাঁধে জলাশয়সুখ

প্রেম কি যে অপ্রেম দ্বিধায় পেয়েছে রাজত্ব

ঠোঁট দেখে ভয় হয়ঠোঁট না কি বেমারের মুখ!

দিন ছোটে, ছোটে রাত,– এই ছোটা অন্ধগলিত্ব

তবু প্রাণের ঘাঁটি আমার লখিন্দরকায়া

বেহুলাদুপুর তুমি অক্সিজেনে মেখে ধুপছায়া

(ভালোবাসার পদাবলী/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ)

 

কবিহৃদয় যেন বারবার আছড়ে মরে সময়ের কাছে, কবির প্রেমিকসত্তা বিভিন্ন ভঙ্গিমায় এঁকে চলেন একই বিষয়ের নানা বৈশিষ্ট্যের বিচিত্র ছবি বলতে চান শিক্ষা নাও শিক্ষা নাও, আমাদেরই অতীত গৌরব থেকে আর এই অতীত গৌরবের ঢিবিগুলো যে শুধু বনভোজনের জায়গা নয়, আমোদের নিজেকে হারাবার জায়গা নয়, এখানে নিজেকে শানিত করবারও জায়গা বটে; তাই কবি যেন বারবার বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের বেভুলা সত্ত্বাকে যেন কবির এক অমোঘ দায়িত্ব আসলে আমিনুল ইসলামের কাব্যসমগ্র জুড়ে এই বিষয়গুলোই এসেছে নানাভাবে যার উদাহরণ দিয়ে প্রবন্ধের সমাপ্তি টানা যাবে না কখনো তা শুধু ইতিহাস হয়ে, কখনো ঐতিহ্য হিসাবে,  আবার কখনো তা প্রেমের আবহে কবি যেন সুযোগ পেলেই গেয়ে ফেলেন তার উদ্দিষ্ট গান বলতে গেলে আমিনুল ইসলাম আমাদের ইতিহাসের পাখি, ঐতিহ্যের পাখি, আর এক কথায় আমাদের গৌরবগাঁথা গায়বার পাখি এই গৌরবগাঁথা গায়তে গিয়ে কবি গেয়ে ফেললেন আর এক অমূল্য গাঁথা তবে তা প্রেমের তুলিতে ইতিহাসের পথ ধরে বিজয়সেনের রাজধানীতে প্রেমিকাকে নিয়ে আবার ইতিহাসকেই স্বাক্ষী রেখে রচনা করলেন অমর কবিতা এই কবিতার উপমা এতবেশি করে প্রাণোজ যে, পাঠক তা উপভোগের সময় শিহোরিত না হয়ে পারে না সার্থক কবি, সার্থক বিজয়নগর কবি শুরু করেছেন এভাবে

 

শরতের রোগা সকালটা মাতোয়ারা ঘ্রাণেকাঁচাধানের সবুজ গন্ধ; তার সঙ্গে দ্রবীভূত

তোমার উষ্ণতার নিকোটিন; দুপাশে সারিবদ্ধ গাছ, ধানক্ষেত, উপরে শাদাকালো

আকাশ-‘মোগলে আজম’-এর দর্শক সবাই, সবার চোখে সেলিমের চোখ, আনারকলি

অধর; সম্রাট আকবর পরাজিত সবখানি পথসারাটা সময় গাড়ির জানালা ফুঁড়ে

তোমার আমার নিঃশ্বাস পদ্মাযমুনার সম্মিলিত স্রোত হয়ে মিশে যায় ইলামিত্রের

এমবোস স্কেচ আঁকা ভূগোলে অথচ আমি জড়িয়ে ধরিনি বাহু, চুমু দিইনি ইচ্ছুক

অধরে! আমাকে টানছিলো মঞ্চ; আমাকে টানছিলো সম্বর্ধনা; আমাকে টানছিলো সময়!

(বিজয় সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা/ প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

অতঃপর ইতিহাসকিংবদন্তীর রাজধানীর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূগোলে উপস্থিতি, নতুন চোখে পুরোনো ভূগোল দর্শন এবং অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে নেয়া:

 

আর ততোক্ষণে এবং সেটা অনেক বছর পর, আমরা দুজন বিজয় সেনের রাজধানী

বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে; আমাদের পায়ের নিচে গণইতিহাসের

গণকবর, বিচ্ছিন্ন করোটি চাপাকান্না; আমাদের মাথার ওপর সন্ধ্যার শামিয়ানা,

আমাদের চারপাশে অন্ধকারের বিশ্বস্ত পাহারা; আমাদের দিকে তাকিয়ে নীরব পদ্মার

জলে ভেজা পুরাতন প্রেম; আমি তোমার বুকের ওঠানামা টের পাচ্ছি, লোনা উত্তেজনা

ছুঁয়ে যাচ্ছে শান্তসাঁঝের পৌরুষ! প্রবল বাতাসের বেগ কিন্তু তা রূপ নিচ্ছে না ঝড়ে!

এমন অবস্থায় আগে হলে আমি তোমাকে  শ্রাবণঝড়ের পদ্মা করে তুলেছি; এমন

অবস্থায় আগে হলে তোমাকে ভূকম্পরোধক ভূমিকম্পের বাড়ি করে তুলেছি! অথচ

আজ শুধু সাড়াহীনতা, আজ শুধু ননপারফরমেন্স যদিও তোমার ঠোঁটের কাছে আমার

ঠোঁট, তোমার বুকের কাছে আমার বুক; আমাদের মনের দেয়ালে অভিন্ন স্মৃতির

সাঁওতালী আল্পনা!

(পূর্বোক্ত)

 

কবিতাটির উপসংহার আরও তাৎপর্যপূর্ণ যেখানে তিনি অনার্য বাঙালির রাজনৈতিক বিজয়, তার প্রেমিকসত্তার বিজয় এবং সেই বিজয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলনা করে তার মান নির্ণয় করেছেন কবির ইতিহাসচেতনার সাথে স্বজাত্যবোধ, ভাবনার আন্তর্জাতিকতা এবং দেশপ্রেম একাকার হয়ে অভিনব উপভোগ্যতার স্বাদে নান্দনিকতার পেয়ালায় উপচে উঠতে চেয়েছে

 

কিন্তু এইবার কেন এই ব্যতিক্রম? আমি কি তোমার কাছ থেকে সরে এসেছিলাম?

আমাকে কি ডেকে নিয়েছিলো অন্য কোনো প্রেম? ভালোবাসা কি এশিয়ার নদী যে

খুলে দেয় উজানের মুখ নব প্লাবনের আগমনে আবেদনে? হয়তোবা প্রশ্নেরও

উত্তর আছে কিন্তু তথ্য অধিকার আইন যাই বলুক, যতই যুক্তি তুলে ধরুক ট্রান্সপারেন্সি

ইন্টারন্যাশনাল, এটা জানার সুযোগ পাবে না অন্য কেউ শুধু তুমি জেনে রেখো

ইউরোপের নানা ক্লাবে খেলেও মেসি যেমন আর্জেন্টিনার, আইপিএলে কাউন্টিতে খেলেও

সাকিব যেমন বাংলাদেশের, বিজয় সেনের রাজধানী বিজয়নগরের ধূসর ধংসাবশেষে

দাঁড়িয়ে থাকা হে অনার্য রাজকন্যা, প্রণয়ের পতাকা হাতে আমিও তেমনি তোমার!

(পূর্বোক্ত)

 

বিজয় সেনের রাজধানীকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমন কবিতা দ্বিতীয়টি আর আছে কিনা আমার তা জানা নেই এখানে শুধু বিজয় সেন বা তার রাজধানী মুখ্য নয়, এখানে জড়িয়ে আছে গৌড়চূড়ামণির কবির আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তাইতো তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে এত দরদমাখা আর প্রাণময় কবিতা শুধু হয়ে থাকেনি প্রেমের কবিতা, হয়ে উঠেছে একটা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা কবি নিজেও হয়ে উঠেছেন আমাদের অহংকারের প্রতীক তিনি নিজেকে, নিজের দেশকে, জাতিকে সম্মানিত করবার কবিও বটে

 

ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমিনুল ইসলাম যতটা দুঃসাহসিক, ততটাই অভিনব অবশ্য এই দুঃসাহসিক হবার অধিকার তার আছে কারণ, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বাসের ভূমিতে আর যে বিশ্বাস আত্মগৌরবের রশ্মিতে উজ্জ্বল এখানে উল্লেখ্য, আমিনুল ইসলামের ইতিহাসচেতনা, ঐতিহ্যবোধ শুধু তার নিজ জন্মভূমির আঙিনায় সীমাবদ্ধ নয় তিনি গভীরভাবে দেশপ্রেমিক কবি, তবে তিনি আধুনিক উচ্চশিক্ষিত মানুষ হিসেবে ভাবনায় মননে আন্তর্জাকিতাকে ধারণ লালন করেন তার ভাবনায় বা ভালোবাসায় কোনো কূপমন্ডূকতা নেই তিনি বিশ্বের সাথে যুক্ত হয়েই আপন স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন তার কবিতায় অষ্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, তুরস্ক, ইউরোপের ভূগোল মানুষ স্থান লাভ করেছে আত্মীয়তার ব্যঞ্জনায় তিনি বিশ্বইতিহাস বিশ্বঐতিহ্যকে আত্মীকরণ করে নিয়েছেন

 

ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে অবশেষে তোমার কাছে পৌঁছেছি সাবিহা,

সেজন্য বিধাতাকে ধন্যবাদ আষাঢ়ের নদীতে বানডাকার মত যখন

আমার শরীরে যৌবনের কানাকানি শুরু, তখনই আমি তোমার কথা

শুনেছিলাম তুমি নিশ্চয় ভুলোনিতোমার গালের একটি কালো তিলের

জন্য সমরখন্দ আর বোখারা বিকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আমারই পূর্বসূরী

হাফিজ আশ্চর্য যে সেদিন তুমি তাকে পাত্তাই দাওনি….

(সাবিহাতোমার কাছে/ পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি)

 

যদি প্রশ্ন ওঠে আমিনুল ইসলাম তার ইতিহাসঐতিহ্যমিথ চেতনার ব্যবহারে কতটুকু কব্যিক সফলতা দেখাতে পেরছেন, তবে আমার উত্তর হবে তিনি তা পেরেছেন ঈর্ষণীয় মাত্রায় তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে এবং সুপ্রযুক্তভাবে মিথ ইতিহাসের উপদানসমূহ ব্যবহার করেছেন সেকারণে তার কবিতা কোথাও আড়ষ্ঠ হয়ে ওঠেনি কিংবা ঝুলে পড়েনি নান্দনিক সৌকর্যের সাথে একধরনের স্মার্টনেস বজায় থেকেছে সর্বত্র তাছাড়া তার কবিতার সবচেয়ে বড়গুণ বিষয়বৈচিত্র্য প্রকরণবৈচিত্র্য কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে এবং কত বিচিত্র ভঙিমায় তিনি কবিতা লিখেছেন, তা নিয়ে লিখতে গেলে বিশাল আয়তনের আলাদা আরেকটি রচনা হয়ে যাবে তার উপস্থাপনাভঙ্গি বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়ায় এক একটি কবিতার স্বাদ এক এক ধরনের কখনো প্রতীক,কখনো তুলনা, কখনো চিত্রকল্প, কখনো উৎপ্রেক্ষা, কখনো প্রতিতুলনায় ব্যবহৃত হয়েছে মিথইতিহাসের নানাবিধ অনুষঙ্গ অধিকন্তু, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবিতায় প্রেমের রস থাকায় সেগুলো সহজেই নিবিড়ভাবে উপভোগ্য হতে পরেছে তিনি ইতিহাসঐতিহ্যকে বিষয় হিসেবে কম ব্যবহার করেছেন, বেশি ব্যবহার করেছেন বিষয়ের অনুষঙ্গ অথবা কাব্যালংকার হিসেবে এতে করে তাঁর কবিতার গভীরতা, সৌন্দর্য এবং ব্যঞ্জনা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি   পর্যন্ত যেসকল কবিতাংশ উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলো প্রসঙ্গেও একইকথা প্রযোজ্য তথাপি তার ব্যবহারকৌশলের প্রমাণস্বরূপ আরও কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যায়

.

বাঁশির সুরে কান দিয়ে

নাচে

চম্পা চামেলী

ঘুঙুরের রুনুঝুনু ছড়িয়ে পড়ে জলে

জল কই?

জল তো দেখি না!

বিলের কিনার ঘেঁষে

বনের কবর ছুঁয়ে

বাঁশি চলে গেছে

যেখানে ঘুমিয়ে আছে

অশোকের ঘোড়া

আরো দূরে

যেখানে ঘুমিয়ে আছে

প্লাইওসিন দিন

(বাঁশি/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ)

 

এই কাব্যাংশে কোটি বছর আগের প্লাইওসিন দিন যখন সাগরের গর্ভ থেকে উঠে এসেছিল রাঢ়বরেন্দ্রভূমি, যীশু খ্রীস্টের জন্মের আগের ভারতীয় সম্রাট মহামতি অশোক, রূপকথার  বাইজী বা নৃত্যশিল্পী চম্পাচামেলী প্রভৃতি ঐতিহাসিক কিংবদন্তী ভিত্তিক চরিত্র উঠে এসেছে কবি বাজতেথাকা বাঁশিটির সাথে সাথে এসবের যোগসূত্র রচনা করেছেন বাঁশিটি কালের বা মহাকালের বাঁশি সময়কে চিত্রিতক রতে গিয়ে কবি ইতিহাসকিংবদন্তীকে চমৎকার চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছেন  

.

যেব্যথা ইস্তানবুলে রচে আছে গভীর হুজুন

অথবা যেব্যথা কাঁদে সোমপুর বিহারের ইঁটে

তেমন কিছু কি আজ ঘ্রাণে পায় পেঁচা বা শকুন?

প্রবল ভূতের কিলপ্রেম খোঁজে বিকৃতির ভিটে

(শীত এসে কড়া নাড়ে ধোঁয়া ওঠা হেমন্তের দ্বারে/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ)

 

এই উদ্ধৃতিটিও অসাধারণ সুন্দর চিত্রকল্প রচনা করেছে হুজুন একটি বিষণ্ন অবস্থার আরবি নাম  কবি ইস্তানবুল শহরে মানবচোখের আড়ালে বিরাজিত হুজুন এবং পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে বিরাজিত বিষাদময়তার  মধ্যে সেতু রচনা করেছেন এই বিরল বিষণœতা কেন এবং কিভাবে তার উদ্ভব এই সঙক্রান্ত কোনো ইঙ্গিৎ নেই এখানে একধরনের রহস্যময়তা আছে  রহস্যময়তা কবিতার প্রাণ  কবি ইতিহাসমিথঐতিহ্যকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন কবিতায় বিষয় পরিস্ফুটনে এবং  কবিতার সৌন্দর্য প্রাণ সৃষ্টিতে

 

.

বিস্মৃতবাঁশের কেল্লা, জলে ভাসে আলাওল নাম

কালের করাত হাসে; বটভায়া, দ্যাখো দফারফা!

সুরের অরিশ ভুলে প্রেমেভরা নগরের ধাম

শেরাটনে হয়ে ওঠে কৌটিল্যের গোপন মুনাফা

পাহাড়পুরের সোনা চূর্ণরেণু কালের ধুলায়

সেধুলায় ধুলিচাপা মাঝিহীন গন্ধেশ্বরীঘাট

শ্রীজ্ঞানের পাঠশালা উড়ে যায় শিমুলতুলায়

শিক্ষার্থী বিকেল ফেরে বুকে নিয়ে বনসাইপাঠ

(মেঘের মিনারে বসে দেখা/ প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

আলোচ্য কবিতায়াংশে অনেককটি কল্পচিত্র মিলে একত্রে একটি অসাধারণ সুন্দর অতুলনীয়ভাবে অর্থসমৃদ্ধ একটি চিত্রকল্প রচনা করেছে আমাদের গৌরবের ইতিহাস, মিথ, ঐতিহ্যিক বিষয়াবলী হারিয়ে যাচ্ছে অথচ সেসব রক্ষা করা সচেতন কার্যকর প্রয়াস নেই কবি বিষয়চি অপরিসীম দরদ সহকারে এবং অতুলনীয় কাব্যনৈপুণ্যে উপস্থাপন করেছেন ইতিহাস বিষয়ে অসচেতন এবং ঐতিহ্যবিমুখ হওয়ার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম স্বদেশস্বজাতির প্রকৃত পরিচয় জানতে পারছে না তারা জ্ঞানের উঠোনে বনসাইয়ের মতো বেড়ে উঠছে এই বিষয়টি ‘‘শ্রীজ্ঞানের পাঠশালা উড়ে যায় শিমুলতুলায় / শিক্ষার্থী বিকেল ফেরে বুকে নিয়ে বনসাইপাঠ।’’ এই অসাধারণ সুন্দর চিত্রকল্পের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে আমিনুল ইসলাম এখানে ইতিহাসঐতিহ্যের ব্যবহারে দুর্দান্ত শৈল্পিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন

.

আমি পাগলায় কান দিয়ে

শুনে নিচ্ছি আলকাপের নাভিশ্বাসের শব্দ

আমি সোমপুর বিহারে বসে

শুনে নিচ্ছি ভিক্ষুদের সমবেত সামগান

আমি চলনবিলে বসে

শুনে নিচ্ছি সওদাগরের প্রণয়ীবধূর গলা

আমি শুনে নিচ্ছি

সবুজ ঢেউয়ে বেজে ওঠা আবদুল আলীমের সুর

আমি দেখে নিচ্ছি

আকাশের আরশিতে পড়া লালনমনের ছায়া

 

এই কবিতাংশে অনেককটি চিত্রকল্প রয়েছে প্রতিটি চিত্রকল্পই ইতিহাসকিংবদন্তীলোককাহিনীর উপকরণে তৈরী হয়েছে কিন্তু এখানে নির্মাণ কৌশল একেবারেই আলাদা  কবি নিজেই প্রতিটি চিত্রকল্পের  অংশ হয়েছেন এখানে অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ হয়ে উঠতে চেয়েছে একদিকে ইতিহাসঐতিহ্যের বিলুপ্তি দশার জন্য কবির  বেদনা, অন্যদিকে সেসব আঁকড়ে ধরার নাছোড় বাসনা উভয়বিধ মানসিক অবস্থার ছবি নির্মিত হয়েছে

উপরের উদাহরণগুলো দেখে নিশ্চিকভাবে বলা যায় যে ইতিহাসকিংবদন্তীঐতিহ্যিক উপকরণের কাব্যিক ব্যবহারে আমিনুল ইসলাম প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এতে করে একদিকে তার গভীর ঐতিহ্যপ্রীতি এবং অন্যদিকে অসাধারণ কাব্যকুশলতার সাক্ষর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে

 

আসলে আমিনুল ইসলামের জাতীয় সত্তা আর তার কবিতার সত্তা অভিন্ন জাতীয় সত্তার উপাদানগুলোর মধ্যে অনেকগুলো উপকরণ দেখা যায় যেমনঐতিহাসিক, ঐতিহ্যিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি আমিনুল ইসসলামের কবিতায় এই উপাদানগুলো খুবই আবিষ্ট হয়ে আছে সেইদিক থেকে বিচার করলে তিনি আমাদের জাতিসত্তার কবিও বটে তবে জসীমউদদীনকে যে অর্থে বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি বলব, আমিনুল ইসলামকে সেই অর্থে নয় জসীমউদদীন বাংলাদেশকে এঁকেছেন যেই ক্যানভাসে, আমিনুল ইসলাম তাকে সেই ক্যানভাসে আঁকেননি তাঁর ক্যানভাসের ব্যবহৃত তুলি আমাদের আত্মগৌরবের তুলি তাছাড়া কবির কাছে সময় অনন্ত কারণ কবির ধারণায় নিরঙ্কুশ বর্তমান বলে কিছু নেই সব বর্তমানই নিরত অতীত হচ্ছে কবিতার আবেদন যেহেতু চিরন্তন, সুতরাং সেকারণেই কবিকে ত্রিকালের মধ্যে বাস করতে হয়।(৮) আমাদের আলোচ্য কবিও বাস করেছেন সেই ত্রিকাল ধরে আপন বলয়ে এজরা পাউন্ড লিখেছেন, ‘‘লন্ডনের মত আর কোন শহর পৃথিবীতে নেই লন্ডনে অবস্থান করলে একটি নাগরিক জীবনের অহংকার এবং গর্ব অনুভব করা যায়।’’  আমিনুল ইসলামও যেন  তাঁর আপন ইতিহাস ঐতিহ্য দিয়ে সরাসরি কিংবা আড়ালে আবডালে বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের মত দেশ পৃথিবীতে আর একটিও নেই এখানে অবস্থান করলে একটি ঐতিহাসিক জীবনের অহংকার এবং গর্ব অনুভব করা যায়

 

আমিনুল ইসলাম বিশেষভাবে বাঙালি জাতির এবং বৃহত্তর অর্থে এশিয়াবাসীর মুক্ত কণ্ঠস্বর হয়ে কথা বলেছেন প্রায় সকল ধর্মের উৎপত্তি স্থল প্রাচ্য, পৃথিবীর অধিকাংশ প্রসিদ্ধ সভ্যতাগুলোই প্রাচ্যের মাটিতে জন্ম বিকাশ লাভ করেছিল অথচ ইউরোপের বুদ্ধিজীবীপন্ডিতেরা এশিয়ার ইতিহাসঐতিহ্য এবং মানুষ ইউরোপের ইতিহাসঐতিহ্য মানুষের তুলনায় নিম্নমানসম্পন্ন, এমন অন্যায্য দাবি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন বিষয়টি এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাতওরিয়েন্টারিজমগ্রন্থে সবিস্তারে এবং বহু উদাহরণসহ আলোচিত হয়েছছে।(৯) আমিনুল ইসলাম সেইপ্রাচ্যবাদখন্ডন করে তার বিপরীতে এশিয়ার  ইতিহাসঐতিহ্যসংস্কৃতি মানুষকে উজ্জ্বল আলোয় উপস্থাপন করেছেন তাঁর অসংখ্য কবিতায় নিবন্ধে যাবৎ যে সকল উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, প্রায় সবগুলোয় সেই অন্যায়প্রাচ্যবাদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়, আমিনুল ইসলাম প্রাচ্যকে উপস্থাপন করেছেন তার সর্বজনীন মহিমায়, অখন্ডিত সত্যে ধর্ম, ভাষা কিংবা ভূগোলের বিভাজন তাঁর প্রাচ্যপ্রেমকে খন্ডিত করেনি

 

ডাকে শোনো ওই নগদের দিন রাত

উৎসাহে তার ঘরছাড়া ইউরোপ

ল্যাটিন প্রাণেও প্রসারিত সেই হাত

যেখানেই পায় ঝোপ বুঝে মারে কোপ

 

পৃথিবী ভোলে কি আঁধারের সেই বন

আলোর আশায় উদ্গ্রীব শত চোখ?

পুবের দুহাতে ভোরের উদ্বোধনÑ

সকল দুনিয়া আলোর উৎস হোক

 

ভুলিনি এবং ভুলবো না কোনোদিন

যুগসূচনার সোনাঝরা সেই বাঁক

আলেয়ার আলো হলে হোক সুরঙিন

আমাদের দিন শপথে শাণিত থাক্

 

তোমার দুচোখে সিন্ধুর অববাহিকা

আমার দুচোখে তাজমহলের ছবি

মঞ্চে নগ্ন হোক্ না নায়ক নায়িকা

আড়ালে বিবেক বেহুলাদিনের কবি

(শাশ্বতিকী/ প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

আমিনুল ইসলাম চিন্তভাবনায় অনেক অগ্রগামী মানুষ তার কবিতায় তার ভাবনার মতো অগ্রগামী পাঠক সমান্তরালভাবে প্রাগ্রসর হলে তার কবিতার এসকল বিষয় উপলব্ধি করা এবং এসবের স্বাদ আস্বাদন করা সহজ হবে আমিনুল ইসলাম হয়তো সেই ভাবনা থেকে তার কবিতাসমগ্র এর ভূমিকায় তার ইতিহাসঐতিহ্যপ্রীতি বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন কারণ পাঠককে পেছনে ফেলে লেখকের একাকী এগিয়ে যাবার উপায় নেই তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু তাই বলে পাঠকের ধীরগতির জন্যে লেখক তার নিজস্বতাকে জলাঞ্জলি দিতে পারেন না অন্নদাশঙ্কর রায়এর ভাষায়– ‘‘পাঠক হয়তো প্রস্তত নন, হতে সময় লাগবে লেখক তা বলে লেখা বন্ধ করে বসে থাকবেন না, পাঠকের মুখ চেয়ে লেখার মান খাটো করতে পারবেন না সব লেখা সকলের জন্য হলেও সকলে সব লেখার জন্য প্রস্তত নন যিনি যখন প্রস্তুত হবেন তিনি তখন উপভোগ করবেন লেখক আপাতত তাঁর সৃষ্টির দায় থেকে মুক্ত হতে চান, যে দায় তাঁকে লেখক হতে বাধ্য করেছে।’’(১০) আমিনুল ইসলামকেও যে দায় কবি হতে বলতে গেলে বাধ্য করেছে, তা হল তাঁর আত্মগৌরব তাঁর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস তাঁর কবিতায় যা এসেছে কখনো সরাসরি ইতিহাস বা ঐতিহ্য হিসাবে, কখনো উপমা হিসাবে, আবার কখনো অলংকার হিসাবে একটি চিত্রশিল্পে বিভিন্ন রঙের আলাদা আলাদা করে কোনোবিশেষতা থাকে না, যার তাৎপর্য থাকে সকল রঙের সামগ্রিকতায় কিন্তু মজার বিষয় আমিনুল ইসলামের কবিতায় ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যবহার এতটাই স্বচ্ছভাবে হয়েছে যে, যার তাৎপর্য আলাদা আলাদাভাবেও নির্ণিত হতে পারে পাঠকের এক্ষেত্রেও একটা অতিরিক্ত পাওয়া বলা যেতে পারে তাই আর বলতে দ্বিধা থাকবার কথা নয় যে, আমিনুল ইসলাম ইতিহাস সচেতন কবি, দেশপ্রেমিক কবি, নিজেকে, নিজের দেশকে, নিজের জাতিকে একটা যোগ্য সম্মানের জায়গায় বসাবার কবি এত নিবিড়ভাবে যা আগে কেউ ভাবেনি তবে সবচেয়ে বড় কথাটি এই যে তিনি কবিতায় ইতিহাস ঐতিহ্যকে ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত শিল্পিতভাবে নান্দনিক সৌকর্যে ফলে ইতিহাসঐতিহ্যের উপকরণগুলোকে তাদের বিষয়গৌরব বাদ দিয়ে যদি শুধু  কবিতার সৃজনের উপকরণ অলংকার হিসেবেও গ্রহণ করা হয়, সেক্ষেত্রেও সেগুলো সাহিত্যমূল্যে অমূল্য হয়ে থাকবে আমিনুল ইসলামের ইতিহাসচেতনা কাব্যবোধ একই মালায় গাঁথা শৈল্পিক  সুচারুতায়

 

তথ্যসূত্র:

.       T.S. Eliot: Tradition and Individual Talent, Sacred Wood,1933

. মোহিতলাল মজুমদার: মোহিতলালকাব্যসম্ভার: স্বপনপসারী কবিভাগ্য মিত্র ঘোষ, কলকাতা

. . সফিউদ্দিন আহমদ: উৎসের সন্ধানে, সমাচার প্রকাশনী, ঢাকা প্রথম প্রকাশ ২০১৬

. আমিনুল ইসলাম: ‘আমার কবিতা: কাছের কেন্দ্রদূরের পরিধি’, কবিতাসমগ্র, অনন্যা: ঢাকা২০১৬

. আমিনুল ইসলাম: বিশ্বায়ন বাংলা কবিতা অন্যান্য প্রবন্ধ;  আমার কবিতা লেখার পেছনে

             মুক্তদেশ প্রকাশনী, ২০১০–  ঢাকা

. ফকরুল চৌধুরী সম্পাদিত: উপনিবেশবাদ উত্তরঔপনিবেশিক পাঠ, আগামী প্রকাশনী,

             ঢাকা: দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১১

. বুদ্ধদেব বসু: জীবনানন্দ দাশ: বনলতা সেন, কালের পুতুল

. হাসান হাফিজুর রহমান: কবিতার বিষয়বস্তু আধুনিক কবি কবিতা, বাংলা একাডেমি,

             দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩

. ফয়েজ আলম: এডওয়ার্ড সাঈদ এর অরিয়েন্টালিজম: র‌্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা

               দ্বিতীয় প্রকাশ: ২০০৭

১০. অন্নদাশঙ্কর রায়: লেখকের দায়িত্ব

১১. আমিনুল ইসলাম: কবিতাসমগ্র: পরিবর্ধিত সংস্করণ: ২০১৬, অনন্যা, ঢাকা

১২. আমিনুল ইসলাম: প্রণয়ী নদীর কাছে, লেখাপ্রকাশ, ঢাকা; প্রকাশকাল ২০১৬।

মঈন শেখ
মঈন শেখ

 

 

Author: মঈন শেখ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment