আমিনুল ইসলামের কবিতা শিল্পপ্রজ্ঞা ও বিশ্বায়নের মিথষ্ক্রিয়া

শিল্পীর রুচি সব সময় একই স্রোতে প্রবহমান না-ও হতে পারে। কেননা, শিল্পীকে তার চারিপাশের সবকিছু নিয়েই ভাবতে হয়, আত্মস্থ করতে হয় সমকালীন যন্ত্রণা। সুস্থিত কল্পনার মধ্যদিয়ে ধ্যানী হতে হয়। যে কারণে একজন প্রকৃত শিল্পীর মূল লক্ষ্য হতে পারে শিল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সজাগ থাকা। শিল্পীর জন্য শিল্পের সম্মোহন এবং যুথবদ্ধ জীবন প্রণালীর নিবিড় পাঠও জরুরি। শিল্পের দায় যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি শিল্পীও দায়মুক্ত নন। সম্ভবত এটি উপলব্ধি করেই আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন, ‘জীবন সম্ভবত বিশৃঙ্খল। শিল্প তাকে শৃঙ্খলা দ্যায়।’ শিল্পের জন্ম ইতিহাসের দিকে তাকালে এ সত্যটিই যেন প্রতিভাত হয়। অন্যদিকে প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হকের মতে, ‘শিল্পের মূল উৎস- কালের রুচি, যুগের অভিঘাত এবং শিল্পীর সংবেদনশীল মন।’… ‘যুগের অভ্যাস ও আচরণ যতই আকর্ষণীয় এবং ফলপ্রসূ হোক না কেন, বহুব্যবহারে এক সময় তা ক্লিশ হতে থাকে।’ সঙ্গত কারণেই পরিবর্তিত এ অভিঘাত শিল্পীর মনোজগৎকে করে তোলে সংশয়ী। শিল্পীর এই সংশয়ীচিত্তেই জন্ম হয় শিল্পপ্রজ্ঞার। কবি আমিনুল ইসলাম এ-ঘরানারই জাতক। কবিতার মিথষ্ক্রিয়ায় তিনি নিজস্ব সংস্কৃতির নবতর উপস্থাপনকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যা তার শিল্পপ্রজ্ঞার সাক্ষ্যবাহী। অপরদিকে বাংলা কবিতায় ‘চলমান পদ্ধতি’ পাশ কাটিয়ে বিশ্বায়নের যে বিবিধ তিনি তুলে এনেছেন, তাতে তার কবিতা ‘বিশুদ্ধ কল্পনা এবং মৌলিক চিন্তার যুগ্ম স্বাক্ষর’ হিসেবে পাঠকের চিন্তায় অনুরণন তোলে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ‘তৃতীয় বিশ্বের কবিতার সঙ্গে একালখণ্ডের বাংলা কবিতার একটি আত্মিক মিল পাওয়া যায়। এই তুলনামূলক পাঠ বাংলা কবিতার বহুমাত্রিক চরিত্রকে বুঝতে সাহায্য করে’ বৈকি। আমিনুল ইসলামও বিশ্বের নানাবিধ ‘খটকা’ থেকে উত্থিত বোধের রসায়ন করেন। বিশ্বরাজনীতি, বাণিজ্য, অভিবাসন, মানবতা, সংস্কৃতিসহ নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অসঙ্গতি উপলব্ধি করেই তিনি জন্ম দেন নবতর বৈশিষ্ট্যের কবিতা। লুইসের ভাষায় ‘কবি একটি উপমা, রূপক, সমাসোক্তি কি উৎপ্রেক্ষার আশ্রয়ে এমনভাবে কোনো চিত্রনির্মাণ করেন, তা পাঠকের সামনে উন্মোচিত করে নতুন অভিজ্ঞতার আবরণ- এই প্রক্রিয়া হচ্ছে সজীবতা, প্রাণময়তা।’ আমিনুল ইসলামের কবিতায়ও নতুন অভিজ্ঞতাজারিত। তার কবিতা থেকে পাঠ নেয়া যেতে পারে-

 

রবিঠাকুরের রামকানাই নই, তবু কী করে অস্বীকার করি

ডাল ভাঙে-পত্রপুষ্প উড়ে যায়,

তলে তলে টান পড়ে শেকড়েও!

অথচ কেন যে টিকে থাকি পুরানা ছাতিম?

এ কৃতিত্ব কার শেকড়ের না মৃত্তিকার

এ প্রশ্নের ভার উড়ে গেছে ক্যাটরিনা-ঝড়ে

এমত জ্ঞানে

আঁকড়ে থাকার নিন্দাটুকু ক্ষেপণাস্ত্র হয়ে

ছিদ্র করতে চায়

ক্যাটরিনার নাভি দেখে ফুলে ওঠা বুক।

 

আর মিডিয়ার এই রামরাজত্বে

কে পারে সেসবে কান না দিয়ে?

তারপরও তুমি শেকড়ে সরবরাহ নবায়ন করো!

 

বিবিসি-সিএনএন-স্টার ওয়ার্ল্ড

এরা কার কথা বলে?

পাখির টক শো কানে তোলো তুমি;

ঘরে নিই আমিও।

 

‘পাখির টক শো’ কবিতায় আমিনুল ইসলাম যে চিত্রকল্প মাধুর্য ফুটিয়ে তোলেন তা লুইসের উপলব্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, নাগরিক জীবন, আমলাতন্ত্র, প্রেম কিংবা প্রেমহীনতা ইত্যাদি ক্রমক্ষয়িষ্ণু বোধকে ব্যঞ্জিত করেন শিল্পের সুষমায়। উপমান চিত্রের শরীরে আরোপ করেন নবত্ব, চমৎকারিত্ব ও মাধুর্যগুণ, আর কবিসৃষ্ট চিত্রকল্পে পাঠক নতুন দ্যোতনার সন্ধান পান। আবার মাঝে মধ্যে তিনি আত্মজিজ্ঞাসু হয়ে ওঠেন। যদিও ‘সব সময় ওই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর সাজানো থাকে না শিল্পে-সাহিত্যে-দর্শনে এমনকি বিজ্ঞানেও।’ কিন্তু কবি নিঃসন্দেহে দাঁড়াতে পারেন প্রবল স্রোতের বিপরীতে। অঙ্গুলি নির্দেশ করতে পারেন সমাজের ক্ষতের দিকে। কেননা, প্রকৃত মনীষার অধিকারী কবিই পারেন স্ব-কালের আর্থ-সামাজিক অবস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যক্তির মনোবিকারকে চিহ্নিত করতে। আমিনুল ইসলামের কবিতা পাঠের মধ্যদিয়েই তাকে একজন প্রাজ্ঞসর মনীষী হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে।

 

‘না ছুঁয়ে- না মেপে- না খুলে- না চেখে ভালোবাসাবাসি অতীতের

আধুলি হয়ে ঠাঁই নিয়েছে কিউপিডের কয়েন মিউজিয়ামে- যেখানে

আবক্ষমূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন- অলটাইম সাপারস্টার অব লাভ-

লাইলী ও মজনা, শিরি ও ফরহাদ, চন্ডীদাস ও রজকিনী এবং

রোমিও-জুলিয়েট! তাদের পায়ের নিচে প্রভূত মুদ্রা- বহু ও বিবিধ;

গোল্ড, সিলভার, কপার; তাদের ক্ষুধিত চোখে প্রভূত মুদ্রা হাজার বছরের আলো-’

 

আমিনুলের ইসলাম সভ্যতার উৎস খুঁজতে গিয়ে দ্বারস্থ হয়েছে উপমহাদেশের নানা কিংবদন্তি ও মিথের কাছে। সঙ্গে তিনি পারঙ্গমতায় যুক্ত করেছেন নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তিনি বাঙালির সংস্কৃতি খুঁড়ে তা থেকে রসদ নিয়েছেন। ঐতিহ্য ভেঙে ভেঙে ইতিহাসের মহাকালকে জীবন্ত করতে চেয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় কবির চিন্তাবিশ্বে নবরূপায়ণ ঘটেছে ঐতিহ্যের। সেই অর্থে তাকে ঐতিহ্যের কবি বললেও অত্যুক্তি হয় না। তবে সার্বিক অর্থে তিনি নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও বোধের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। এ প্রক্রিয়া কবির অশেষ শিল্পপ্রজ্ঞারই সাক্ষ্য বহন করে।

আমিনুল ইসলামের কবিতা পাঠে এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, নিজস্ব সংস্কৃতি ও মিথের উদ্ভাসন তার কবিতাকে করেছে প্রাঞ্জল। আবার এই নবতর ফর্মের উদ্ভাসনে তার কবিতা কিছুটা হলেও স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। বলাই বাহুল্য, কবিতায় যখন কোনো বস্তু বা বিষয়ের রূপান্তর ঘটে, তখন ভাব-ভাবনার উদ্দীপনা বা উদ্ভাসন প্রক্রিয়ায় পাঠক হৃদয়েও সৃষ্টি হয় এক ধরনের ব্যঞ্জনার। যা সতত সুন্দরেই প্রত্যাশা করে। এক্ষেত্রে কীটসের উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর। এর অর্থ দাঁড়ায় কবিতায় জীবন আর শিল্প, দুটোরই নান্দনিক স্ফূরণের প্রয়োজন রয়েছে। কবির সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও কেউ কেউ উল্লেখ করেন। অন্যদিকে কবিতা কেন সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে প্রণীত হবে- এমন প্রশ্নও রয়েছে। এ কথাও ঠিক যে, কবি নিজের এবং স্বসমাজের মুখোমুখি দাঁড়ান। প্রবল আত্মক্ষরণের মধ্যদিয়ে জন্ম দিতে জন্ম দেন মহার্ঘ কবিতার। যা কালাতিক্রমের দাবি রাখে। আমিনুল ইসলামের কবিতা কাল অতিক্রমণের ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগামী, এ নিবন্ধে সে প্রসঙ্গও অযৌক্তিক। তবে এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যেতে পারে, আমিনুল ইসলাম শেকড় সন্ধানী কবি। তার কবিতাগুলোর পরতে পরতে সে সাক্ষ্য নানা ব্যঞ্জনায় প্রতিফলিত। কবির ‘অবুঝ স্বপ্নের সমীকরণ’ কবিতা থেকে পাঠ নেয়া যেতে পারে-

 

স্বপ্ন দেখি- ছুরিগুলো স্যালুট করছে গোরুগুলোর পায়ে

আর গোরুমশায়েরা ডান পা উঁচিয়ে গ্রহণ করছে সালাম;

স্বপ্ন দেখি- নেকড়েরা রাখি বাঁধছে হরিণের গলায় আর

হরিণ-নেকড়ের নাচের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে বাঘ;

স্বপ্ন দেখি- সামরিক কারখানাগুলো উৎপাদন করছে

গোলাপগন্ধী পারফিউম আর কামানগুলো লিখছে কবিতা;

স্বপ্ন দেখি- পেন্টাগনে পড়ানো হচ্ছে প্রেমের বর্ণমালা

আর সৈন্যরা পরে আছে বেহুলা-লখিন্দর ইউনিফরম।

স্বপ্ন দেখি- বাংলাদেশের রাজনীতিকরা একতাবদ্ধ হয়েছেন

জাতীয় স্বার্থের এজেন্ডায় আর নদীগুলো ফিরে পাচ্ছে জল।

স্বপ্ন দেখি- দ্বিধার শহর থেকে ফিরে আসছো তুমি আর

তোমার জন্য কফির মগ নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি দুয়ারে।

 

পঞ্চাশের কবি শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’য় যে স্বপ্নের কথা বলেছেন, নব্বইয়ের সময়পর্বের কবি আমিনুল ইসলামও যেন ‘অবুঝ স্বপ্নের সমীকরণ’ কবিতায় একই স্বপ্নের পুনরুল্লেখ করেছেন। আমিনুল ইসলামের এই স্বপ্ন বিশ্বশান্তির আহ্বানকেই ত্বরান্বিত করে। আমিনুল ইসলাম রোমাণ্টিক কবি হলেও তিনি শুধু প্রকৃতির জয়গান করেননি; তার রোমাণ্টিসিজমের মূলে রয়েছে মানুষের যাপিত জীবনের বিবিধ প্রপঞ্চ। রয়েছে বিশ্বঐতিহ্য, রাজনীতি এবং সংস্কারের ইতিবাচক ইঙ্গিত। রয়েছে নানাবিধ হতাশা, ক্ষোভ, যন্ত্রণা, পাওয়া না-পাওয়ার অভিনিবেশ। যা তার কবিতাকে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে।  

কথা উঠতে পারে কবিতার দায় কী? আসলে কবিতা কি কোনো দায়ের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত! মানুষ যেমন ধর্মের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে প্রশান্তি খোঁজে, তেমনি কাব্য পাঠকও কবিতার সমীপে উপনীত হয়ে আত্মিক সুখ খোঁজে। কবিতার শরীরে সৃষ্ট সৌন্দর্য এবং তার প্রাণে প্রবাহিত নান্দনিক রসই পাঠককে মোহাবিষ্ট করে। আমিনুল ইসলামের কবিতা কীভাবে পাঠককে মোহাবিষ্ট করে সে পাঠ নেয়া যাক তার ‘কুয়াশার বর্ণমালা’ শীর্ষক কবিতা থেকে-

 

‘প্রথম শীতের হাত; সেই হাতে রচিত আস্তানা।

তথাপি সংহার নয়, ফসলের পক্ষে ছিল গান।

উন্মুক্ত চলনবিল- বাতাসে ডানার ধ্বনি

আর জলজুড়ে মুগ্ধতার ছবি; খুশি ফলে

ঈর্ষাতুর আলোরাও। আর ছায়ার পাশে

জমেছিল অকৃত কর্তব্য। প্রকৃতির জবাবদিহিতা?

কিন্তু কে নেবে? বসন্ত করেনি ভুল।

অথচ এখন কোথায় পাখি! শূন্যবিলে

যতসব বিভ্রান্তির ছায়া; রৌদ্রের গায়ে রঙ;

নিঃসঙ্গ দু’হাতে পালক কুড়িয়ে রাখি।

ধূসর শিল্পীর হাতে গড়ে ওঠে যাদুঘর।

পুনঃপুনঃ বিজ্ঞাপন কিউরেটের পদে;

তবু একমাত্র অ্যাপ্লিকেন্ট- আমাদেরই দুখু বাঙাল।

 

কবি আমিনুল ইসলাম

কবির বিচিত্র দৃশ্যকল্প এবং উদ্ভাবন ঘনিষ্ঠতার সৌকর্যে কবিতার প্রথম দুই পঙক্তিই পাঠকে টেনে নেয় এক আবছায়া ও রহস্যময়তার জগতে। কবিতায় তিনি চলনবিলের প্রকৃতির এক ভিন্নরূপ উন্মোচন করেছেন। আর কবিতাটি যেন পর্যায়ক্রমে নগর যন্ত্রণার প্রচ্ছন্ন স্মারক হয়ে ওঠে। যেখানে সান্ত্বনা হয়ে দেখা দেয় চলনবিলের অপরূপ দৃশ্যাবলি। প্রকৃতি, প্রেম, রাজনীতি কিংবা কোনো ধরণের জীবনদর্শন এড়িয়েই কবিসৃষ্ট চিত্রকল্প পাঠককে এক অনিঃশেষ সৌন্দর্যে টেনে নিতে সক্ষম। এখানেই কবির সার্থকতা প্রতিফলিত।

লুইসের ভাষায় ‘কবি একটি উপমা, রূপক, সমাসোক্তি কি উৎপ্রেক্ষার আশ্রয়ে এমনভাবে কোনো চিত্রনির্মাণ করেন, তা পাঠকের সামনে উন্মোচিত করে নতুন অভিজ্ঞতার আবরণ। এই প্রক্রিয়া হচ্ছে সজীবতা, প্রাণময়তা। উপমান চিত্রের শরীরে যখন আরোপ করা হয় নবত্ব, চমৎকারিত্ব ও মাধুর্যগুণ, তখন চিত্রকল্পের মধ্যে এসে যায় আন্তরিকতার বেগ। উপমেয় উপমানের বিপ্রতীপ চরিত্রের মধ্যে কল্পনার আলোক সম্পাত করে অভিনব সাদৃশ্য সৃষ্টির মাধ্যমে কবি যখন কোনো বস্তু বা বিষয়ের রূপান্তর সাধন করেন, তখন ভাব-ভাবনার উদ্দীপনা বা উদ্ভাসন প্রক্রিয়ায় পাঠক হৃদয়ে সৃষ্টি হয় মনন দ্যোতক ব্যঞ্জনা।’ কবি আমিনুল ইসলামও কবিতার এসব অলঙ্কার প্রয়োগে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার কবিতার চিত্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সৃষ্ট চিত্ররূপময়তার অতিরিক্ত সাংকেতিকতা ও গূঢার্থের সম্ভাবনা। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক:

 


ক.

‘মরুর গুহায় প্রথম উচ্চারণতুল্য

দু’ঠোঁটের কম্পিত সাফল্যে রচিত

তালগাছে ঝুলে থাকা শিল্পের উপমায়

কালবোশেখি প্রণতি জানিয়ে গেছে-

এ কথা আমার মতো তুমিও জানো।

(নীড়বিষয়ক/কুয়াশার বর্ণমালা)

খ.

‘বদলে এসেছে রোদের রঙ

বনসাইয়ের ছায়ায় বসে কবি

দেখছেন-

সন্ধ্যাপূর্ব উলঙ্গ ঊরুর উজ্জ্বল দৌড়।’

(বাঁশি/শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ)

 

গ.

‘ঘুমিয়েছে গণতন্ত্র অ্যাফ্রো-এশিয়ায়

হরিণ শিশুর মতো কোমলশরীর

তাই দেখে লোভ জাগে জলে ও ডাঙায়

থাবা আর দাঁত নিয়ে সমান অধীর।’

(আঁধারের জানালায়/স্বপ্নের হালখাতা)

 

কবির মনের রঙের সঙ্গে পাঠকের মনের রঙের একটি সেতু গড়ে ওঠে ভালো কবিতা হলে, তারই সম্প্রসারণে বলতে হয় কবির অনুভবের গভীরতার সঙ্গে অনিবার্যভাবে প্রয়োজন হয় জ্ঞানের এবং একই সঙ্গে দক্ষতার। চিত্রকল্প তৈরির দক্ষতাকে মনের স্তরের গভীরতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে, যথেষ্ট সমৃদ্ধ গভীর অন্তর্দেশ না থাকলে চিত্রকল্প তৈরি করা যায় না। আমিনুল ইসলামের কবিতার ইমেজ দৃশ্যময়তার অপরূপ দ্যুতি ছড়াতে সক্ষম।

জীবনানন্দ দাশের মতে- ‘উপমাই কবিতা’। আমিনুল ইসলামের কবিতায় উপমায় অভিনবত্ব লক্ষণীয়। তার কবিতা থেকে কিছু উপমার উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে

 

ক.  উদাসীন মালির মতো বাগান হারিয়ে আমি নিজগন্ধে ঘুরপাক খাই

    (প্রেম/তন্ত্র থেকে দূরে)

খ.  উত্তর-দক্ষিণ দুই মেরু আমরা মিলেছিলাম প্রার্থনার হাতের মতোন

    (ভালোবাসার তাড়াহুড়ো/তন্ত্র থেকে দূরে)

গ.

বৃদ্ধার স্তনের উপমায়

ফালগুনের সব নদী;

শুধু তোমার চুল জড়িয়ে

শ্রাবেণের এক যমুনা।

(নদী ও খালের গল্প/শেষ হেমন্তের জোছনা)

 

ঘ.

কোথায় তোমার ময়ূরপঙ্খীদিন

গওহরজানসন্ধ্যা মসলিনরাত?

(বিনিয়োগ/জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)

 

ঙ.

পুরাতন বোঝায় ঘাড় দিয়ে

এ পাড়ে জয়নুলের ছবি এক রাত।

(স্রোত ও ঢেউ-দুই/কুয়াশার বর্ণমালা)

 

আমিনুল ইসলাম অসংখ্য সমাসবদ্ধ শব্দ বা শব্দসমষ্টি সৃষ্টি করেছেন। যা অভিনব এবং এর যথার্থ ব্যবহার তার কবিতাকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। তার কবিতা থেকে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে-

 

খ. শোষণের হাত দ্যাখো জোটবদ্ধ অভিন্ন মুদ্রায়

   (নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ/ মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

গ. শুকিয়েছে সম্পর্কের  মধু, আমরা চুষছি কৈফিয়তের কড়ে আঙুল

   (যে চিঠির আজ কোনো প্রাপক নেই/জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)

ঙ. যখন সে যৌবনের দুলদুল হয়ে উঠেছে, আমরা তাকে ধোপার গাধার লিভ সাবস্টিটিউট

    বানিয়েছি  (আমাদের সম্পর্ক সুলতানা/স্বপ্নের হালখাতা)।

 

আমিনুল ইসলামের কবিতায় বার বার উচ্চারিত হয়েছে ‘নদী প্রসঙ্গ’ এবং ‘বরেন্দ্রভূমি’। কবি বার বার তৃষ্ণা, অভিমান ও কান্না লুকাতে ছুটে গেছেন নদীর কাছে। কেননা, আমাদের জনপদে নদীই হলো প্রকৃতির প্রধান রূপকার। নদীর সঙ্গে মানুষের আত্মিক যোগাযোগও নিবিড়। ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’- তার কবিতাগ্রন্থের নামকরণের মধ্যদিয়ে নদীর সঙ্গে কবির সখ্যের বিষয়টি স্পষ্ট। আমিনুল ইসলামের কবিতায় কখনো কখনো নদী হয়ে ওঠে বিবিধ ঘটনার সমীকরণ, নদীই হয়ে ওঠে নারী বা জীবনেরই সমার্থক।    

আমিনুল ইসলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। কবির দেখা বাঙালির উত্থানের সবচেয়ে বড় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ; বয়সের কারণে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্ভব না হলেও শৈশবের অনেক স্মৃতিই কবির মনে উজ্জ্বল। মুক্তিযুদ্ধের আবেশ ও প্রেরণা তার কবিতায় ঘুরেফিরে স্থান পেয়েছে। শৈশবে দেখা, আর পরবর্তীতে শোনা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা তার কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে, গৌরবের অতীত হয়ে উঠেছে রোমাঞ্চকর বর্তমান। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশ নেননি ঠিকই, কিন্তু বাঙালির গৌরবের ওই যুদ্ধে যেতে না-পারা কিংবা মুক্তিযোদ্ধা হতে না-পারার আক্ষেপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ‘আমার মুক্তিযোদ্ধা হতে পারা না-পারার গল্প’ কবিতায়-

 

‘আমাদের গ্রামটি ছিল রাষ্ট্রীয় সীমান্তের কাছাকাছি

অভিন্ন অক্সিজেনে বেড়ে উঠতো দু’পারের শিশুরা;

রাতের বেলায় গ্রামটি ছিল মুক্তিযোদ্ধার ব্যাংকারহীন দুর্গ;

অবশ্য দালালেরা- দিনের বেলায়- দু’একবার

পাকবাহিনি নিয়ে এসে- ছিন্নভিন্ন করেছিল- সে-দুর্গের

উপরিকাঠামো। সন্ধ্যারাতে ক্রসফায়ারের শব্দে

কেঁপে উঠতো গ্রামের আকাশ; ক্রশফায়ারের ঝুঁকির নিচেই

সংসারের কাজ সেরে নিতেন গ্রামের মানুষ- বৃদ্ধশিশুনারী।’

 

এভাবেই তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। এ কবিতায় গ্রামের অসহায় মানুষের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থান যেমন উঠে এসেছে, তেমনি এ কবিতাটি সাক্ষী হয়ে আছে এদেশের অসংখ্য দালাল এবং পাক হানাদার বাহিনীর নারকীয় তান্ডবের। পর্যায়ক্রমে কবির গ্রামের এ কবিতাটিই যেন হয়ে ওঠে একাত্তরে পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসরদের নৃশংস নির্যাতনের শিকার এদেশের প্রতিটি জনপদেরই প্রতিচ্ছবি। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আমিনুল ইসলামের কবিতার বড় অংশ দখল করে আছে প্রেম-ভালোবাসা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র এক হুঁশিয়ারী। বিশ্বভ্রমণের মধ্যদিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের ভংঙ্কর থাবার বিস্তার। দেখেছেন বিশ্বপ্রভুদের ক্ষমতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বার্থের হোলিখেলা। তিনি তাই সব ধরনের কুটিলতা, ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদ কিংবা নব্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। জাগতিক অন্যায়-অপকর্মের বিপক্ষে কবি বিপ্লব করেছেন। তবে তিনি বুঝেছেন, একমাত্র প্রেমই জয় করতে পারে সবকিছু। যে কারণে তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে নয়, গেয়েছেন প্রেমের জয়গান। কবি মনে করেন, প্রতিটি মানুষের অন্তরে প্রেমের ফল্গুধারা প্রবহমান হলে সমাজ-রাষ্ট্র-বিশ্বে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আমিনুল ইসলাম সমকালীন ভাষাভঙ্গির মধ্যে এমন এক শব্দের ব্যঞ্জনা তুলে আনেন, যা অনেকের চেয়ে আলাদা। নিজস্ব ভাষাভঙ্গির ব্যাপারে তিনি আপোসহীন। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙতে সচেষ্ট থাকেন। ফলে তার কবিতা যেন কবিতার বাঁকবদলের ধারাকেও স্পর্শ করে। তার কাব্যভাষা যে নিরীক্ষাধর্মী, তা কয়েকটি পঙ্ক্তি তুলে ধরলেই স্পষ্ট হতে পারে-

 

১. ‘প্রেয়সী ঠোঁটের লালে মোড়লেরা জুড়ে দেয় শর্ত

    কুটির প্রাঙ্গণে দীপ নিবু নিবু আক্রান্ত সঞ্চয়

 মৌরসি সিন্দুক ঘিরে চোরাদ্বন্দ্ব সিঁদকাটা গর্ত

 বর্গীর রেকর্ড মোছে বিশ্বব্যাংক ধূর্তহাতে জলে ও ডাঙায়।’

[- অক্ষম উচ্চারণ}

২. ‘যাও হে আটপৌরে আলো

 যুগজীর্ণ, নতুনত্বহীন।

 আর নয় মুগ্ধ বন্দনা।

    পৃথিবীর শরীর নিয়ে মাতামাতি,

    ঊন্মোচন নিষিদ্ধ সবুজের ভাঁজ

    প্রকাশ্য আঙুলে,

    এও এক ব্যাভিচার,’

[আঁধার বন্দনা]

৩. ‘দেখে যাও- সোনালি দানায় ভরে

   গেছে ঘরদোর। তবু জুমে আছে

   কতিপয় বেয়াড়া বিচালির গোড়া;

 

   চৈতের খৈলানে এবার বহ্নুৎসব।’

   [স্রোতের ভাঙন চরের উৎসব]

 

এটা মনে হওয়া অমূলক নয় যে, আমিনুল ইমলাম কবিতায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী। এরপরও তিনি নান্দনিক শব্দের সমাহারে কবিতার শরীরে শিল্পসুষমার শেষ আঁচড় টানেন। আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও সতর্ক। তার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ-সমবায় অর্থের বহুমাত্রিকতা নির্দেশক। আবার ব্যঙ্গাত্মক, পরিহাস এবং তীর্যক স্তবকও তিনি রচনা করেছেন।  কবির এ প্রবণতা বিশ্বায়নের সঙ্গে ইতিবাচক যোগসূত্র স্থাপনেরই ফল বলে মনে করা যেতে পারে। ‘তিনি সহজেই উচ্চারণ করতে পারেন বিশ্বব্যাংকের কারসাজি, নব্য উপনিবেশিকতাবাদ বা নব্য সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে তিনি অতি মাত্রায় সচেতন। বরং তিনি আন্তর্জাতিকতার ক্ষেত্রে যে বিষয়ে পজেটিভ ধারণা ব্যক্ত করেন তা হচ্ছে বিশ্বঐতিহ্য। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক যোগাযোগ খুঁজে পেতে আগ্রহী। মুসলিম বিশ্বের অনেক মিথকেই তিনি সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করেন তার কবিতায়। সেইসাথে আরবি ফার্সি শব্দ, ইসলামের নানা প্রসিদ্ধ স্থান ও ব্যক্তিত্ব সহজ স্বাভাবিকতায় ব্যবহৃত হয় তার কবিতায়।’ আবার আমিনুল ইসলামের কবিতা একজন কবির ব্যক্তিগত হাসি-কান্না এবং জীবনাভিজ্ঞতার সাড়ম্বর প্রকাশ হলেও কালক্রমে তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন; পাঠকের অন্তর্দেশে আলোড়ন তুলতে সক্ষম তার কবিতার মর্মবাণী। তবে একথাও ঠিক যে, আমিনুল ইসলামের কবিতার পূর্ণ রসাস্বাদন করতে হলে পাঠককেও দীক্ষিত হতে হয়। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পাঠকের পাঠ প্রস্তুতির বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না।

সর্বোপরি বলা যেতে পারে, মানবজীবনের যে গূঢ়ত্ব তা নিজস্ব প্রক্রিয়ায় কবিতা অবয়বে একে একে উন্মোচন করেন আমিনুল ইসলাম। জীবনের গ্লানি, ক্লেদ, নিরাশ্রয় ও নিষ্ঠুরতার যে জীবন্ত ছবি তিনি এঁকেছেন কবিতায়, তাতে যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের সম্যক আর্তিই ফুটে ওঠে। তিনি সমাজ সভ্যতার বিচিত্র অসঙ্গতি অন্যায়, শোষণ ও লাঞ্ছনার বিষয়ে সংবেদনশীল, ক্ষুব্ধ এবং দ্রোহী। মাটি-মানুষ-প্রেম ও প্রকৃতির আর্তিতা কবিতার মূল সুর হলেও ‘আত্ম-অভিজ্ঞতার মর্মকথা এবং সমকালীন জীবনের চিত্র’ই তিনি এঁকেছেন বিশ্ববাস্তবতার মিথষ্ক্রিয়ায়। কবিতায় দেশজ ও বিশ্বপ্রপঞ্চের এই মেলবন্ধন আমিনুল ইসলামের কবিতাকে পৃথক করেছে নিঃসন্দেহে।

বীরেন মুখার্জী

Author: বীরেন মুখার্জী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts