আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কূর্ণিশ

বিশ্বসাহিত্যে একেক সময় এক এক ধরণের ইজমের বা দার্শনিক মতবাদের প্রভাব এসেছে। কখনও সুপিয়ারিলিজম, কখনও মিস্টিসিজম,কখনও ফিউচারিলিজিম।এমন শতাধিক ইজম আবর্তিত হয়েছে সৃজনশীল মননে। মানুষের চিন্তা উপলব্ধি ও বোধ পরিবর্তিত হয়ে এগিয়ে যায় পরিপক্কতার দিকে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ইজমের প্রভাব ব্যাপক হয়ে ওঠে।এরকম একটি ইজম বা দর্শন হ’ল অস্তিত্ববাদ, ইংরেজি ‘এক্জিসটেনশিয়ালিজম’।মানব হৃদয়ের ক্ষরণে জর্জরিত আত্মা , এক সময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অস্তিত্ববান হয়ে ওঠে এবং শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। কখনও প্রতিবাদী, কখনও সংগ্রাম মুখর হয়ে ওঠা।বেঁচে থাকাটাই চরম সত্য।এ বোধ কার্যকর হয়, একনিষ্ঠ হয়। এ বোধ থেকেই অস্তিত্ববাদের সোনালী যাত্রা শুরু।

এই অস্তিত্ববাদী চেতনাই বিদ্রোহের তূর্যবাদক, সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুলের শিল্পিমানসকে আলোড়িত ও উদ্বেলিত করেছে।অস্তিত্ববাদ সাধারণ মানুষের ভিতর অদম্য স্পৃহা জাগিয়েছে।ব্যক্তি হৃদয় থেকে সামষ্টিক হৃদয়ে আচ্ছাদিত হয়েছে।ধ্বংস মৃত্যুর ভয়াবহতা ও যন্ত্রণার অগ্নিকুন্ড থেকে আত্মা বেরিয়ে এসে নবতর চেতনায় বিকশিত হয়ে অস্তিত্ববান হয়েছে।ব্যক্তির বিদ্রোহ হয়ে উঠেছে গণবিপ্লব ও জনতার মুক্তির সংগ্রাম। সে সংগ্রামে বহু শিল্পি ও সাহিত্যিক নিজেদের একীভূত করেছেন। সত্য উন্মোচনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন ।তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

“আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ”,  কাজী নজরুলের   বিদোহী কবিতার এই একটি মাত্র পংক্তি প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর ব্রিটিশ ভারতের যুব সমাজকে দুর্বিনীত করে তুলেছিল।১৯২২ সলের ৬ জানুয়ারি বিদ্রোহী কবিতাটি প্রকাশিত হলে সাহসী বাঙালি তরুণ কবি হিসেবে বাঙালি মনীষার অনন্য নিদর্শন কাজী নজরুল ইসলামের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন,“আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্ণিশ” পংক্তিটি অসম্ভবভাবে তরুণদের মনে গেঁথে গেলো এবং তরুণদের মধ্যে ‘করিনা কাহারে কুর্ণিশের’ মত প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলো”। সে সময়ের বিশিষ্ঠ আলোচক পরিমল গোস্বামী  লিখলেন, “অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এমন ভাষায় আর কোন বাঙালি কবি চ্যালেঞ্জ জানাননি।” বিদ্রোহী কবিতায় কাজী নজরুলের কবি মানসের বিপ্লব ও বিদ্রোহ বিচিত্র ও বিবিধ ভঙ্গিতে বিভাসিত ও বিধৃত হয়েছে।

“ আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি ছল করে দেখা অনুখন / আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা , তার কাকন চুড়ির কন কন” লিখে কবি বুঝাতে চাইলেন, তিনি শুধু দূরন্ত দুর্বারই নন, তিনি রোমান্টিক চেতনারও অধিকারী। যে কোন সৃষ্টির পিছনে প্রেমের প্রয়োজন রয়েছে, আর এ বোধ যাতে সবার উপলব্ধিতে ধরা দেয় কবি তারই প্রয়াস রাখলেন।

কাজী আব্দুল ওদুদ  বিদ্রোহী কবিতার ভাব সম্পর্কে লিখলেন,বিদ্রোহী কবিতাটি প্রকৃতই কোন বিদ্রোহ-বাণীর বাহক নয়। এর মর্ম কথা হচ্ছে  এক অপূর্ব উন্মাদনা, এক অপূর্ব আত্মবোধ।সেই আত্মবোধের প্রচন্ডতা ও ব্যাপকতায় কবি উচ্চকিত, প্রায় দিশেহারা । এর মনে যে ভাব সেটি এক সুপ্রাচীন তত্ত্ব” ।কবি জীবনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সর্বশেষ উপলব্ধি শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা।সমস্ত শোষণ নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে সমাজ ও জাতিকে  মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কবিতার মাধ্যমে। কবি মননে দেশপ্রেমের যে  উপলক্ষ ধ্বনিত হতো তার মাধ্যমে তিনি  সাম্প্রদায়িক ভাবমুক্ত একটি শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন।তাঁর রাজনৈতিক দর্শন সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় গিয়ে মিলিত হয়। প্রথম যুদ্ধোত্তর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব (১৮৯৯-১৯৭৬)।সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমিই ছিল  রচনার বিষয়বস্তু। নজরুল প্রমাণ করলেন, “অসির চাইতে মসি ক্ষুরধার ও শক্তিশালী”। কলম ধরলেন অত্যাচারী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে।জাগিয়ে তুললেন মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা বিপ্লবী চেতনাকে।তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আন্দোলনই হচ্ছে  পরাধীনতার শৃ্ঙ্খল থেকে মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই কবি বারবার রাজশক্তির রোষানলে পড়লেন।শুধু ব্রিটিশ বিরোধী নয়, রাজনৈতিক সামাজিক সব শত্রুর বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছিল  তাঁর কন্ঠে।বিদ্যমান সকল শোষণ, উৎপীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান রেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনের প্রেরণার উৎস। অন্যদিকে ছাত্র শ্রমিক মজদুরের তিনি সমব্যথী এবং আন্দোলনের  সহযাত্রী। তিনি যেমন সর্বহারার পক্ষে বন্দনার গান করেন, তেমনি জাগ্রত বাংলার তরুণ সমাজেরও আশা আকাঙক্ষার প্রতীক হয়ে যান।

ভারতীয সেনাবাহিনীতে প্রায় আড়াই বছর কাজ করার পর কলকাতায় এসে কবি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।সে সময় তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য  সমিতির অফিসে কমরেড মুজাফফর  আহমদের  সাথে বাস করছিলেন।মুজাফফর আহমদ ছিলেন ভারতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। তাঁর সাথে বিভিন্ন সভা সমিতি ও বক্তৃতায় অংশ নিয়ে কবি নজরুল সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাথে পরিচিত হন।১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাঁকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর ‘লাঙ্গল’ ও ‘গণবানী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সাম্যবাদী ও সর্বহারা কবিতাগুচ্ছ, কম্যুনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এর অনুবাদ জাগো অনশন বন্দী জাগো ও রেড ফ্লাগ কবিতা অবলম্বনে রচিত রক্তপতাকার গান।মার্কসবাদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও কবি কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা তথা স্বরাজ অর্জনের পক্ষে ছিলেন।যা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস দর্শনের বিপরীত ছিল্। আবার মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদের  মাধ্যমে  নতুন তুরস্ক গড়ে তোলার  আন্দোলনের প্রতি নজরুলের সমর্থন ছিল।তার পরেও তিনি   মহাত্মা গান্ধীর  অসহযোগ ও মওলানা মোহাম্মদ আলী-শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। কারণ এই সংগ্রাম দুটি ভারতীয় হিন্দু মুসলমানের  সম্মিলিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত ছিল। এ পর্যায়ে কবি মানসে স্ববিরোধিতা ও অস্থিরতার প্রকাশ ঘটে।নজরুলের যুগপৎ ইসলামী গজল ও শ্যামা সঙ্গীত রচনা নিয়েও কথা আছে।তবে সে যুগে অবশ্য এটা কোন বিরল ঘটনা ছিলনা।অস্তিত্ববাদের জনক এডমুন্ড হুর্সাল (১৮৫৯-১৯৩৮) এর অনুসারী ও মার্কসবাদী দার্শনিক  ও অস্তিত্ববাদের প্রবক্তা জাঁপল সাঁত্রের শিক্ষাগুরু মার্টিন হাইডেগার  ছিলেন নাৎসী।১৯৩৩ সালে ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেক্টর পদাভিষিক্ত হওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নাৎসী পার্টিতে যোগদান করেন।  ২য় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও তিনি হলোকাস্ট সম্পর্কে কিছু বলেননি। কারও কাছে ক্ষমাও চাননি। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে ক্ষমা করা যতটা অসম্ভব, তাঁর যুগান্তকারী দর্শনকে অবহেলা করাও ততোটাই অসম্ভব। তেমনি  এক সময়ের  ভোকাল এথিস্ট ও তুখোড় স্যোসালিস্ট ক্রিস্টোফার  হিচেন্স এর ইরাকযুদ্ধ সমর্থনকে ক্ষমা করা ও তার কর্মকে অবহেলা করাও তেমনি অসম্ভব।হিচেন্স তার অতীত চিন্তাভাবনাকে “পয়জন” আখ্যায়িত করে চরম দক্ষিণপন্থী রক্ষণশীলে পরিণত হন।পৃথিবীর অনেক বিদগ্ধজন্ই জীবনের এক পর্যায়ে নিজেকে এভাবে বিতর্কিত করেছেন!

বিংশ শতাব্দির বাংলা সাহিত্য মননে কাজী নজরুর ইসলামের  মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম।একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ,   সাংবাদিক , সম্পাদক , রাজনীতিবীদ এবং  সৈনিক হিসাবে  অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। অগ্নিবীণাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মত তাঁর প্রকাশ।কারাগারে বসে লিখেছিলেন রাজবন্দীর রোজনামচা।  তাঁর তৎকালীন সব সাহিত্য কর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট।ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় হিন্দু জনগণের  সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল্ ।তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ ।ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন।ছোট গল্প, উপন্যাস ,নাটক লিখলেও তিনি মূলতঃ কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন।ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল  এর পাশাপাশি অনেক  উৎকৃষ্ট শ্যামা সঙ্গীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন।তাঁর রচিত তিন হাজার গানের  অধিকাংশেই তিনি নিজে সুরারোপ করেছেন।তিনি হিন্দু মুসলমানের প্রেম প্রীতি ভালোবাসা দিয়ে গড়া সম্প্রীতি সৌজন্যের উঠোনে অপশক্তির গড়া বিভেদ প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। সেই মুক্তাঙ্গনে সহধর্মিনী প্রমীলা দেবীর প্রেমালিঙ্গনে জীবন কাটিয়েছেন।তাঁদের সেই প্রেমকাননের চারটি ফুল : কৃষ্ঞ মুহাম্মদ,অরিন্দম খালেদ(বুলবুল), কাজী সব্যসাচী  ও কাজী অনিরুদদ্ধ । অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনালী ফসল !

কবি অস্তিত্ববাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন কিন্তু নাস্তিক্যবাদকে বরণ করেননি।পুরান,বেদ, ঊপনিষদ, বাইবেল ,কোরাণে অবাধ স্বাচ্ছন্দে বিচরণ করে খুঁজেছেন ঈশ্বরকে।খুঁজেছেন পরমেশ্বরকে। পেয়েছেন কী তাঁকে ? –হ্যাঁ পেয়েছেন।তবে, সাত আসমানের উপরে না। ধূলার ধরণীতে। মাটির পৃথিবীতে। মানুষে  আপন সত্তায়।-“ কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই , আকাশ পাতাল জুড়ে,/ কে তুমি ফিরিছ বনে জঙ্গলে/কে তুমি পাহাড় চূড়ে?/হায় ঋষি দরবেশ, বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খো্জ তাঁরে  দেশ দেশ/সৃষ্টি আছে তোমা পানে চেয়ে / তুমি আছ চোখ বুজে/ স্রষ্টারে খোঁজ ?  আপনারে তুমি  আপনি ফিরিছ খুঁজে!”এরই পাশাপাশি রয়েছে তাঁর  আরও সাহসী  উচ্চারণ,- “পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল, /মূর্খরা সব শোন /মানুষ এনেছে গ্রন্থ/ গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন”!                                                                                                       

পুরাণে তিনি আবিষ্কার করেছেন তাপস ঋষি সর্বত্যাগী মুনি দধিচীকে। কবি জেনেছেন বজ্রের জন্মকথা।চেতনায় ধারণ করেছেন দধিচীর ত্যাগের মহিমাকে।বজ্র থেকে বিদ্যুৎ। উন্নত আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বের চালিকা শক্তি।কোটি যুগের মা্নব তপস্যা ঋদ্ধ  সেই অর্জন পুঁজিবাদের পিঞ্জরে শৃঙ্খলিত হতে দেখে কবি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।“যে দধিচীদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প শকট চলে/বাবুসাব এসে চড়িল তাহাতে কুলিরা পড়িল তলে”।পদার্থ অবিনাশি।বস্তু অনশ্বর।বস্তুর বিনাশ নেই। আছে রূপান্তর্। সেই বিবর্তনে নব নব সৃষ্টি।সভ্যতার অগ্রযাত্রা।কোটি কোটি বছর কেটেছে পদার্থ ও বস্তুর সেই রূপান্তরের আবর্তনে।মানুষ শুধু নয়, সকল জীব সকল প্রাণী,বৃক্ষরাজি, লতা গুল্ম অরণ্য যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে ফিরে গেছে মৃত্তিকায়। জন্মান্তরে ফিরে এসেছে নতুন রূপে। নব নব রূপে নব বৈচিত্রে বিকশিত হয়েছে। এই বস্তুতান্ত্রিক চেতনার সার সঙকলন করে কার্লমার্ক্স  প্রাচীন  দার্শনিক হেগেলের চিন্তা চেতনার  বিপরীতে স্থাপন করেছেন তাঁর কালজয়ী দর্শণ দন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। অমানবিক অনৈতিক  শ্রম শোষণে পুঁজির অন্যায় স্ফীতি বিদ্রোহী কবিকে ক্ষুব্ধ করেছে।  এ সম্পর্কে অতি দুর্বোধ্য ও জটিল মার্ক্সীয় ‘শ্রম-পুঁজি-শোষণ তত্ত্বকে প্রাঞ্জল করে কবি লিখেছেন,“ কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত  ক্রোর  পেলি বল?/রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,/রেলপথে চলে বাষ্প শকট, দেশ ছেয়ে গেলো কলে /বলো  তো   এসব কাহাদের দা?” সামন্তবাদের অস্তাচল পর্বে  শিল্প বিপ্লবের সূচনাকালে  ও পুঁজিবাদী যুগের উন্মেষলগ্নে শোষণ নির্যাতন ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে সর্বহারা শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সপক্ষে কবি নজরুল তাঁর বিদ্রোহী কন্ঠ সোচ্চার রেখেছেন।

তূলনামূলক চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন সামগ্রিকভাবে  ভোগবাদ বিরোধী ভাববাদী মহাকবি, তেমনি নজরুল সাম্তবাদ,সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী নিষ্পেষণ বিরোধী বস্তবাদী কাব্যসারথী। দুজনই ঈশ্বরপ্রেমী যুগমানব। দুজনই ধর্মীয় কুসংস্কারের  বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছেন।কবি নজরুলের ‘নোবেল ভাগ্য’ অনেকটা বিশ্বখ্যাত রুশ লেখক তলস্তয়ের মত।দুজনাই নিজের ভাগ্য নিজে লিখেছেন।তলস্তয় শ্রেণীচ্যুত হয়ে সাম্যের গান গেয়েছেন্।কবি নজরুল জন্মের পর থেকে অভাব অনটন ও দারিদ্র্যের সাথে লড়া্ই করে নাৎসীবাদ ও পুঁজিবাদী দর্শন,‘সারভািইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ তত্ত্বের  বিপরীতে সমাজবাদী সমবায় দর্শন,“লিভ এন্ড লেট লিভ” তত্ত্বের জয়গান গেয়েছেন।শুধু পরিমানগত ভাবে্ না, গুণগতভাবেও নজরুল প্রতিভা মোটেও অকিঞ্চিতকর ছিলনা।রবীন্দ্রযুগের  স্ফুরিত  প্রায় সব কবি প্রতিভা রবির কিরণে ঝলসে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। কাজী নজরুল্ই ছিলেন কেবল আপন মহিমায় উজ্জল্। স্বাতন্ত্রে বলীয়ান ।দারিদ্রে বিব্রত সংগ্রামী জীবনে  কবি নজরুলের (দুখু মিয়া)অপরিসীম অনুশীলন সম্ভব ছিল না সে কথা সত্য । অরুণরবি তখন মধ্যগগনে ।তারই মাঝে কবি নজরুলের বীরোচিত মহাউত্থান ছিল এক  অসামান্য ব্যতিক্রম! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের  গগনচুম্বি মূল্যায়ন করেছেন ,-“ নজরুল হলেন কবি ভগবানের বিচ্যুত অংশ । তাঁর্ খন্ডিত রূপ ।নজরুল জন্মেছেন কবি হয়ে। আমি রবি ঠাকুর জন্মের পর কবি হয়েছি।” কবিগুরুর এই  উদার প্রশস্তি ও মহানুভবতার কোন তূলনা মেলেনা।

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts