আমি কি বহুবিশ্বের নাগরিক নই?

আমি কি বহুবিশ্বের নাগরিক নই?

মহাবিশ্ব কি অনেকের মাঝে একটি? পদার্থবিজ্ঞানের রথী-মহারথীরা এরকম কথা কখনো কখনো বলেন বলে, ঝেড়ে কাশেন না। আর তাই প্রশ্নটা ব্যাপক জ্বালাচ্ছে। আমি কি বহুমহাবিশ্বের নাগরিক নই?

উত্তরটা হতে হবে, হয় ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।

তার আগে, বুঝিয়ে বলি বহুমহাবিশ্ব বলতে আমি কি বুঝতে চাচ্ছি। আমাদের মহাবিশ্বটা যদি একটাই মহাবিশ্ব মাত্র না হয়, তবে কি এটি অনেকগুলো মহাবিশ্বের মাঝে একটি? অনেকগুলো মহাবিশ্ব বলতে কি বুঝতে চাই? অসীম সংখ্যার মহাবিশ্ব কি আসলেই বাস্তবতা, আর এর একটি বাস্তব হয়েছে আমাদের চেনা মহাবিশ্বতে?

অসীম সংখ্যার মহাবিশ্বসমূহ যদি হয় বাস্তবতা, আর সেই বাস্তবের অংশ তো আমিও। তবে কেন বলব না ‘বহুমহাবিশ্ব’-এর নাগরিক আমি?

এরকম প্রশ্ন তো এমনিতে আসেনি। পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলো তত্ত্ব এই প্রশ্নটাকে উস্কে দিয়েছে। আর তাই দৃশ্যমান নয় বা লুকিয়ে আছে বলে আমাদের বিশ্বের মতো বিশ্ব আরও আছে কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে ‘না’ বলাটা ঠিক হবে না।

মহাবিশ্ব কি অসীম? এখনো তো বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না, স্থান-সময়ের আকারটা কী রকমের। জনপ্রিয় মত হচ্ছে, এটি সমতল। গোলকীয়, এমনকি ডোনাটের আকারেও এর আকার নির্দিষ্ট করার পক্ষে যুক্তি দুর্বল। আর স্থান-সময়ের ছড়িয়ে পড়ার ভাব কায়দা যে অসীমের পথে, সে কথাও বলতে হবে। যদি স্থান-সময় চিরকাল চলতেই থাকে, তাহলে একে তো সমতলের কোন এক সমান মাত্রার বিন্দুতে গিয়ে আবারো পুনরাবৃত্তি করতে হয়। কেননা, কণা স্থান এবং সময়ের ভেতর বিন্যস্ত হতে পারে কেবলমাত্র সসীম সংখ্যক উপায়ে।

আরও দূরে তাকাই? তাহলে যে আমার অন্য সংস্করণ  চোখে পড়ে! সত্যি বলতে কি, এসব আমারই অসীম সংখ্যক সংস্করণ। এদের কেউ কেউ ঠিক আমি যা করছি এখন, তা-ই করছে। অন্য অনেকে হয়তো অন্য কিছু করছে। আমি শাড়ি পড়ি, আরেক সংস্করণ হয়তো টিশার্ট আর জিন্সেই কমফোর্টেবল। অন্য কেউ হয়তো অন্য ভাবে আছে, অন্য রকম জীবনে, অন্য রকমের কোন পেশায়। আমার সাথে আমার সংস্করণগুলোর মিল নেই, অসীম সংখ্যক জীবনের মাত্র একটির স্বাদ নিতে পারছি কেবল। অসীম সংস্করণের আর একটিও কি আমি পেতে পারি না? যে জীবন ফড়িঙের—না না, জীবনানন্দীয় হাহাকার নয়, যে জীবন আমারই জীবনের সংস্করণ, তার সাথে কভু হবে না কেন দেখা? বহুমহাবিশ্বের নাগরিক হিসেবে এই দেখা পাওয়াটা আমার অধিকার। আমি যদি এক না হই, বহু হই, জীবন তবে কেন এক? কেন নয় বহু? কেন সে বহু আমি টের পাব না? এ অন্যায়! এ আমি মানি না।

মহাবিম্ফোরণের পর পরই যে আলো যাত্রা শুরু করেছিল, ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পার করেছে, সে কেবলি দৃশ্যমান মহাবিশ্বকে দেখায় ১৩.৭ বিলিয়ন আলোক-বর্ষের হিসেবে। স্থান-সময় এই দূরত্ব পেরিয়েও আরও বেশি কিছু বলে বিবেচ্য হয় এর নিজস্ব ভিন্ন মহাবিশ্বে। আর এই ভাবনাতেই মহাবিশ্বের বি–শা–ল প্যাঁচ লেগে গেছে মহামহাকাশে, যার দৃশ্যরূপ কিছুতেই ফুটিয়ে তুলতে পারি না আমি। পারি না বলে কি প্যাঁচ নেই কোথাও?

আচ্ছা, মানলাম প্যাঁচ নেই। তবে কি বহুসংখ্যক বিশ্ব বুদবুদের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে না? ‘অনন্ত স্ফিতি’ নামে পদার্থবিজ্ঞান অসীমে বিস্তৃত বিশ্বের আরেকটি ধারনাও যে দিতে চাইছে।

মহাবিস্ফোরণের পর থেকে বিশ্বের স্ফিতি ঘটছে, বেলুন যেভাবে ফোলে, সেভাবে। তুফত্স য়্যুনিভার্সিটির মহাকাশবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ভিলেনকিন ‘অনন্ত স্ফিতি’র ধারনাটি প্রথম বলেছিলেন এভাবে যে, মহাকাশে কোন কোন পকেটে স্ফিতি বন্ধ হয়ে গেছে, ওদিকে আবার কোন কোন পকেটে স্ফিতি চলছেই। এর ফলে অনেক অনেক বুদবুদের সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো একেবারে আলগা হয়ে আছে বলে কারোর সাথে কারোর হয় না কো দেখা। এই বুদবুদ-ই মহাবিশ্ব, একের অধিক তো অবশ্যই।

যখন আমাদের নিজস্ব বিশ্বটির স্ফিতি থেমে যাবে, তখন শুরু হবে নক্ষত্র আর ছায়াপথ তৈরির খেলা। হয়তো তখন, দূর মহাকাশের কোন এক বিন্দুতে ছোট ছোট আরও কিছু বুদবুদ তখনো ফুলছে। আমাদের বিশ্বের মতো বুদবুদগুলোও বিশ্ব, হয়তো আমাদেরটার মতো নয়, হয়তো সেখানে পদার্থের সূত্ররা অন্য রকম, বিজ্ঞানের মূল সত্যও অন্য রকমের। চেনা বিশ্ব নয় সেগুলো, তা-ই কি তার উপর দাবি খাটে না?

বুদবুদের মতো উবে যায় স্বপ্নরা, দাবি-দাওয়া-অধিকার সব। চলতে হয় সমান্তরালে। তাই কি সমান্তরালে চলছে বিশ্বসমূহ? স্ট্রিং তত্ত্ব থেকে জন্ম নেওয়া সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারনা বিষণ্নতার মূল কারণ, আর এর জন্য দায়ী প্রফেসর পল স্টিনহার্ট এবং নিল টুরক। তাঁরা বলছেন, সমান্তরালে চলছে বলে বিশ্বদের একটির সাথে আরেকটির দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে না। আমাদের বিশ্বের আরও অনেক অনেক মাত্রা থাকার সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন এঁরা। ত্রিমাত্রিক বিশ্বে বসবাস আমাদের। তিনটি স্থান আর একটি সময়ের মাত্রায় টিকে আছি। তিনের অধিক মাত্রার স্থান-সময়ের ভাবনা মাথার উপর দিয়ে যায় যে! আর তাই অতি উচ্চ মাত্রিক মহাকাশে একটি সুতোর উপর একটি বিশ্ব ঝুলছে, পাশাপাশি ঝুলছে বিশ্বধারণকারী সুতারা, এই দৃশ্য হজম হয় না। আবার কলম্বিয়া য়্যুনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী ব্রায়ান গ্রীন যখন বলেন, মহাকাশে ‘স্লাব’ ঝুলছে আর এই স্লাবগুলোই এক একটি বিশ্ব, এরাও দুলছে। দুলতে দুলতে সুতা বা স্লাব কখনো কখনো নাকি একে অন্যের সাথে মাখামাখি করে। তখন ঘটে যায় অন্য মাত্রার বিশ্বের সাথে সাক্ষাৎ। ঘটনা বেশি জোরদার হলে ঘটে মহাবিস্ফোণ। শূন্য ঘটে যায়, শূন্য থেকে শুরু হতে থাকে সব। একই কাহিনি আবারও শুনতে হয়।

মহাবিশ্ব কি আমার কন্যা? কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্বে অতিপারমানবিক কনার যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগৎ দেখেছি, তা আবারো মনে করিয়ে দেয় বহুবিশ্ব থাকার সম্ভাবনা সত্যিই আছে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তো বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে সম্ভাবনার ভিত্তিতে, সুনিশ্চিত ঘটনা ঘটবেই বলে নয়। এর অঙ্কটা বলছে, কোন একটি ঘটনার সবগুলো সম্ভাবনার উদ্ভব ঘটতে পারে কেবলমাত্র এর নিজস্ব বিশ্বে। দুই রাস্তার মিলন বিন্দুতে দাঁড়িয়ে ভাবছি, যাব কোন্ দিকে, ডানে বা বামে—সেভাবেই বর্তমান বিশ্ব জন্ম দিচ্ছে দু’টি কন্যার, দু’টি বিশ্বের। একটিকে পাবো যদি ডানে যাই, আরেকটিকে পাবো বামে গেলে।

এরপরও আছে বহুবিশ্ব নিয়ে আরও কিছু কথা। বিশ্ব কি গাণিতিক?—বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্ন তুলে বলছেন, গণিত মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে চমৎকার হাতিয়ারই কেবল, নাকি গণিত নিজেই বিশ্বের মৌলিক বাস্তবতা? মহাবিশ্বকে আমরা যেভাবে দেখছি, তা কি আসলে এর সত্যিকারের গাণিতিক স্বভাবের খুঁতওয়ালা, মনগড়া ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়! তাই যদি হয়, নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামো আমাদের মহাবিশ্বকে তৈরি করলেও এটাই একমাত্র অপশন হতে পারে না। সত্যি বলতে কি, সব সম্ভাব্য গাণিতিক কাঠামো যার যার নিজস্ব বিশ্বে অস্তিত্ববান। আর গাণিতিক কাঠামেটাই বা কি? এমআইটি’র প্রফেসর ম্যাক্স টেগমার্ক গাণিতিক বিশ্বের দারুণ ভাবনাটি তুলে ধরে বলেছিলেন, এই কাঠামোতে মানুষের কোন অস্তিত্ব নেই। বলেছেন, বিশ্ব স্বাধীনভাবেই টিকে থাকতে পারে, টিকে থাকবে, যদি সেখানে কোন মানুষ না থাকে, তবুও।

আহা, বিশ্ব আছে কিন্তু সেখানে কোন জীবনানন্দ নেই, এমন কি হতে পারে? বহুমহাবিশ্বের নাগরিক হতে চাই, আর সেইখানে শুনতে হচ্ছে, আমাকে ছাড়াই বিশ্ব টিকে থাকে, বিশ্বের অস্তিত্ব আমার অস্তিত্বের ধার ধারে না। এরকম নিষ্ঠুরতা কি হতে পারে?

উত্তরটা কিন্তু হতে হবে, হয় ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা

Author: নাসরীন মুস্তাফা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment