আমি চাঁদ নহি চাঁদ নহি অভিশাপ

আমি চাঁদ নহি চাঁদ নহি অভিশাপ

এ বছরের ৭ আগষ্ট চন্দ্রগ্রহণ। চন্দ্রগ্রহণের সময় দেখা মিলবে ‘চাঁদ’কে। চন্দ্রগ্রহণের স্থিতিকাল হবে ১ ঘন্টা ৫৭ মিনিট। অর্থাৎ ৭ আগষ্ট রাত ১১টা ২২ মিনিটে চন্দ্রগ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হবে ৮ আগস্ট রাত ১টা ১৯ মিনিটে। চাঁদ গ্রাস হওয়া দেখতে দেখতে ভাবনায় দেখা দিবে শুধুই চাঁদ।

রাতের ঘন অন্ধকার দূর হয় চাঁদ উঠলে, পূর্ণিমার দিনে চাঁদের শান্ত সিন্ধ আলোয় পৃথিবী প্লাবিত হয়। এসব দেখে নাকি আদিম মানুষ ভয়ে-বিস্ময়ে চাঁদকে দেবতা বলে ভাবতে শুরু করে। পৃথিবীর সমস্ত প্রাচীন সভ্যতায় চাঁদের বন্দনা-গান গাওয়া শুরু হয়। ইংরাজী Month (বাংলায় মাস) শব্দটি এসেছে চাঁদের ইংরেজি প্রতি শব্দ Moon থেকে। একদা মানুষ দেখেছিল, এক পূর্ণিমা বা অমাবস্যা থেকে আর এক পূর্ণিমা বা অমাবস্যা  আসতে সাড়ে ২৯দিন সময় লাগে। একে ভিত্তি হিসেবে ধরেই ৩০দিন মাসের গণনা শুরু করেছিল এই ধরনীর মানুষ। পৃথিবীর জোয়ার ভাটার উপরে চাঁদের প্রভাব রয়েছে। সূর্যের আলোর কারণে ঘটে চন্দ্রগ্রহণ। ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী যখন চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে, তখন পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদের উপর – হয় চন্দ্রগ্রহণ। গানের কথায়- “চাঁদ ডুবে যাবে ফুল ঝরে যাবে মধুরাতি হবে ভোর”……. আর এই ধারায় চলবে এই ধরণী। চাঁদ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার তো শেষ নেই। তেমনি রমজান শেষে চাঁদ দেখার প্রতীক্ষা থাকবে যতদিন এই ধরণী থাকবে। তখনতো মনে পড়বেই – “ রমজানের দিন শেষে এলো কি মোর চাঁদ হেসে…. ঈদের চাঁদ হেরি নভো তলেরে হিয়া দোলেরে…” গানের এই কথাগুলি। আবার এ-ও অনুশোচনা জাগবে” বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা – কাজলা দিদি কই?”

শরৎচন্দ্রের চিরদিনের উপন্যাস দেবদাস নিয়ে নির্মিত ছবিতে চাঁদ দেখা যায় ১৯৩৫ সালে। কলকাতা গিয়ে (১৯৯৪ সালে) ১২ সি চক্রবেক্রিয়া রোডের বাড়িতে পার্বতী রূপী যমুনা দেবীর সাথে চাঁদ নিয়ে আলাপ হতেই তিনি জানান, “জানো, দেবদাস আমাকে বললো, শোনো পার্বতী, অতটা রূপ থাকা ভালো নয় … দেখতে পাওনা চাঁদের অত রূপ হলে তাতেও কলংকের দাগ। এসো তোমার মুখে কিছু কলংকের দাগ দিয়ে যাই…। এরপরই রূপালী পর্দায় দেখানো হয় আকাশের গায়ে চাঁদ। আমাদের কালের ছবি মানেই রোমান্টিক দৃশ্যে চাঁদনী রাতে নায়ক-নায়িকার দেখা সাক্ষাত ও গোপন অভিসার। চাঁদ- এর সাথে কলংক সংযোগ করে প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়া বানালেন চাঁদের কলংক – এই ছবির এক দৃশ্যে নায়ক প্রমথেশ চন্দ্র বড়ৃয়া আমাকে কি বললো জানো- উঁনি বললেন, আপনার যে টুকু পরিচয় পেয়েছি সেই পরিচয়ই যথেষ্ট। চাঁদের কলংক থাকলেও আমি চাঁদকে ভালোবাসি।” চাঁদকে ভালোবেসে অনেকেই তার ছেলে মেয়ের নাম রাখেন চাঁদ। লখিন্দরের বাবার নামও ছিল চাঁদ। তিনি সপ্তডিঙ্গা মধুকর সাজিয়ে সমুদ্রের বূকে ভাসতে ভাসতে এক এক বন্দরে গিয়ে মালবাহক হয়ে জীবিকা উপার্জন করতেন বলেই তাকে বলা হয় – চাঁদ সদাগর। রমজানের শেষে আসে মুসলমানদের বড় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর। এই রাতকে বলা হয় চাঁদরাত, কেউবা আদর করে চাঁনরাইত বলেন। চাঁদপুরকে দেখলে মনে পড়বে চাঁদ এর কথা। জমিদার তাঁর পুত্রের নাম রাখেন চাঁদ। পরবর্তীতে চাঁদ রায় জমিদারও হয়েছিলেন, কেউ বলেন তাঁর নামেই হয়েছে চাঁদপুর। আবার কেউবা বলেন, দরবেশ চাঁদ ফকিরের নামানুসারে চাঁদপুর নামকরণ হয়েছে। ভারতের মধ্য প্রদেশে চাঁদ নামে এক গ্রামও রয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার এক গানের শুরুতে চাঁদ নামটি উল্লেখ করে – “ চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো / ও রজনীগন্ধা , তোমার গন্ধ সুধা ঢালো …” লিখেছিলেন । আর ১৯৪৪ সালে উদয়ের পথে ছবিতে নায়িকা বিনতা বসু এই গানে কন্ঠ দিয়ে স্মরণীয় হয়ে রইলেন। কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন – “আমি চাঁদ নহি চাঁদ নহি অভিশাপ/ শূন্য হৃদয়ে আজও/ নিরাশার আকাশে করি বিলাপ শত জনমের অপূর্ণ সাধ লয়ে/ আমি গগনে কাঁদিবো ভূবনের চাঁদ  হয়ে….”। ১৯৪১ সালে রেকর্ডে এই গানে কন্ঠ দিয়ে কমল দাসগুপ্ত হয়ে রইলেন সংগীত প্রেমিকদের হৃদস্পন্দন।

ইতালীয়  বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যলিলি পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে ১৬০৯ খিষ্টাব্দে দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করে বলেছিলেন , চাঁদে পৃথিবীর  মতোই পাহাড় পর্বত আছে। সেই থেকে মানুষের মনে ধারণা, চাঁদে পৃথিবীর  মতোই নদ-নদী-হ্রদ-পাহাড় -আগ্নেয়গিরি রয়েছে। চাঁদ সম্পর্কে মানুষের বহু ভ্রান্ত ধারণা্ প্রথম দূর হতে শুরু করে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে চাঁদের মাটিতে মানুষের পদার্পণের পর। সে বছর চাঁদে পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। প্রায় ২ ঘন্টা চাঁদের বুকে কাটিয়ে আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিন আবার ঈগলে চেপে বসেন, অবশেষে এরা আটলান্টিক সাগরের বুকে নেমে আসেন। সেই নীল আর্মস্ট্রং এর জন্ম ১৯৩০ সালের ৫ আগষ্ট আমেরিকার ওহিওতে। মৃত্যু ২০১২ সালের ২৫ আগষ্ট। এডুইন অলড্রিন এর জন্ম ১৯৩০  সালের ২০ জানুয়ারী  নিউ জার্সির গ্নেন রিজে। বর্তমানে তার বয়স ৮৬ বছর। মাইকেল কলিন্স এর জন্ম ১৯৩০ সালের ৩১ অক্টোবর ইটালির রোমে ।বর্তমানে তিনি আমেরিকায় বসবাস করছেন।

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র  উপগ্রহ। আকারে পৃথিবীর প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। চাঁদের গড় ব্যাস ৩,৪৭৫ কি.মি. । চাঁদের মহাকর্ষ বলের পরিমাণ পৃথিবীর ৬ ভাগের ১ ভাগ – তাই চাঁদের সব কিছুই পৃথিবীর তুলনায় অনেক হালকা লাগে । চাঁদ সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ ছোটো, তবে চাঁদ সূর্যের চেয়ে পৃথিবীর প্রায় ৪০০ গুণ কাছে আছে- এ জন্যই পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদকে একই আকারে দেখা মেলে। চাঁদের পৃষ্ঠ দেশে রয়েছে বিভিন্ন আকৃতির অসংখ্য গহ্বর। এদের অধিকাংশই বৃত্তাকার। চাঁদের মহাকর্ষক বল খুব কম বলে সেখানে কোনো বায়ুমন্ডল নেই। তাই পৃথিবীর  মতো মেঘ বা বজ্র-বিদ্যুৎ-বৃষ্টিপাত সেখানে হয় না। চাঁদে কোনো গোধূলি  হয় না, সকাল হয় হঠাৎ। বায়ুমন্ডল না থাকায় চাঁদে কোনো শব্দ নেই।  সেখানে বেতার যন্ত্রের সাহায্যে কথাবার্তা বলতে হয়। চাঁদ নিয়ে আছে কত শত গান, স্মরণীয় কিছু গান হলো – “আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে” (শিল্পী – জগন্ময় মিত্র, ১৯৫১) ; “সে দিন  মাধবী রাতে যবে বাঁকা চাঁদ খানি ছিল নভে” (শিল্পী – অনিমা দাশ গুপ্তা, ১৯৪৩) ; “ও তো নহে চাঁদ  ও যে আমার তৃষিত আঁখি” (শিল্পী – গৌরি কেদার ভট্টাচার্য , ১৯৪৯) ; “ মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে ” (শিল্পী –  সুধীর লাল চক্রবর্তী , ১৯৫১) ; “চাঁদ ভোলে নাই চামেলী যে তার ” (শিল্পী – সুপ্রভা সরকার , ১৯৪২ ) ; “চাঁদ হাসে মোর গগণে তুমি আছো বলে ফুল দোলে মোর কাননে” (শিল্পী – রবীন মজুমদার, ১৯৪৩); “এখনই উঠিবে চাঁদ আলো আলো আধো ছায়াতে” (শিল্পী – কুন্দন লাল সায়গল, ১৯৩৮) ; “ তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে ” (শিল্পী – তালাত মাহমুদ, ১৯৬০) “ লতার কোলে চাঁদনী রাতে বাসর জাগে চাঁদের দেশে… আমি বনফুল গো” (শিল্পী- কানন দেবী, ১৯৪২) ; “মন চলে যায় চাঁদের দেশে মন হারাবার ছন্দ দোলে” (শিল্পী- রবীন মজুমদার ও সুপ্রভা সরকার, ১৯৪৮) – ইত্যাদি।

লিয়াকত হোসেন খোকন
লিয়াকত হোসেন খোকন

 

Author: লিয়াকত হোসেন খোকন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment