আরজ আলী ও লামচরি সন্দর্শনে 

দেশের ক্ষণজন্মা, স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। বরিশালের লামচরি গ্রামে তাঁর নিবাস। প্রথমে কৌতূহল তারপর খোঁজখবর অবশেষে গবেষণা। আমাদের পশ্চাদপদ সমাজে তাঁকে পরিচয় করানো দরকার। তাঁর দার্শনিক তত্ত্বে সমৃদ্ধ রচনা সামগ্রি মেলে ধরাও দরকার। এই তাড়নায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এই টানা প্রায় বছর ধরে ঢাকাবরিশাল যাতায়াত। উঁইকাটা জীর্ণশীর্ণ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আরজ আলীর যাবতীয় পাণ্ডুলিপি এখানে সেখানে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল। সেগুলো কয়েক বছর ধরে অনুসন্ধানে উদ্ধার করা গেল। অতপর জীবনী রচনা করা হলে বাংলা একাডেমি তৎকালীন মহাপরিচালক মাহমুদ শাহ কোরেশী সাহেব অতি আগ্রহে তা গ্রহণ করে স্বল্পতম সময়ে প্রকাশ করেন। (এই ফাঁকে তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি) জীবনী গ্রন্থ প্রকাশের পর বেশ সাড়া পড়ে গেল। ইতোমধ্যে আরজ আলি সকল পাণ্ডুলিপি একত্র করে চার ভাগে ভাগ করে পাণ্ডুলিপি তৈরি হলে খন্ডাকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পাঠক সমাবেশ বিজু চুক্তিবদ্ধ হলেন। তিনি বেশ যত্ন নিয়ে আমার সম্পাদনায় রচনা সমগ্র প্রকাশ করতে থাকেন। তিন খণ্ড প্রকাশ পেল। (একখণ্ড অপ্রকাশিত
এরপর দীর্ঘদিন আর কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত লামচরি যাওয়া হয়নি। বন্ধুবর জাহিদুল ইসলাম সুযোগ করে দিলেন। তাঁর সুবাদে বরিশাল গিয়ে লামচরি আরজ স্মৃতি বিজড়িত আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরি, প্রতিকী সমাধি তাঁর বাড়ীঘর দেখা হল দুদিন। জাহিদসহ প্রশাসনিক কয়েকজন কর্তা ব্যক্তি এবং আরও কয়েকজন ছিলেন সঙ্গী। আরজ আলি স্মৃতি এবং লাইব্রেরিটি দেখাশুনা পরিচর্যা করছেন তাঁর নাতি শামিম মাতুব্বর। নিবেদিত আন্তরিকতায় স্বেচ্ছামুলকভাবে তিনি কাজ করছেন। অনেক পরিকল্পনার পাশাপাশি বিস্তর অভিযোগও উত্থাপন করলেন তিনি। বিশেষত বিজুর বিরুদ্ধে। কেবলমাত্র আরজ আলী মাতুব্বরের বইব্যবসা করে তিনি মস্ত ধনী বই ব্যবসায়ী হয়েছেন। অথচ চুক্তি অনুসারে ট্রাস্ট বা লাইব্রেরিতে কোনও আর্থিক সহহায়তা করেননি, করেননা। বহুবার বহুভাবে যোগাযোগ করেছেন শামিম। কোন লাভ হয়নি। একসেট বই আর লাইব্রেরিয়ানের ভাতা হিসেবে হাজার করে মাস টাকা দিয়েছেন। এইমাত্র। অথচ লক্ষ লক্ষ টাকা বইগুলো থেকে আয় করেও অন্তত লাইব্রেরি সচলায়নে কোনও সহায়তার মনোভাব দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। জানালেন শামিম। ব্যাপারে শামিম মাতুব্বর সমাজের সকল স্তরের মানুষের উদ্যোগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার আহবান জানান। 
আরজ আলি বাসস্থানের ঘরটি নড়বড়ে অবস্থায় এখন, যেকোনো সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়বে। লাইব্রেরির কাজ অসমাপ্ত। আশপাশের পরিবেশটাও দৃষ্টিনন্দন নয়। লাইব্রেরিতে বইএর সংখ্যা যৎসামান্যই। পাঠক সৃষ্টি এবং আরজ আলি দর্শন প্রচারণার উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না সামর্থে্্যর অভাবে। না, প্রয়োজনীয় অনেক কাজই অর্থাভাবে করতে পারছেন না শামিমসহ অনুরাগী স্থানীয়রা। কেউ কি ভাববেন বা করবেন, এগিয়ে আসবেন আরজ আলী তাঁর অবদান সমুন্নত চলমান রাখার জন্য।
আরজ আলী মাতুব্বরের একত্রিশতম মৃত্যুবার্ষিকী চলে গেল কিছুদিন আগে। বিনত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি মহতি এই দার্শনিকের স্মৃতি কর্মের প্রতি। 
 (আরজ আলী মাতুব্বর দেশের প্রথম মরণোত্তর দেহদাতা। আরজএর নাতি শামিম মাতুব্বর এই অসামান্য অবদান স্মরণ করে নিম্নোক্ত কবিতা লিখেছেন)
আরজ আলি দেহদান


আরজ আলি তিন ছেলে নয়ন, মানিক, কাঞ্চন
বাবাকে ডেকে বলে কি নিয়ে এত টেনশন
বাবা বলে শোন পুত্ররা তাহলে
একে একে দিন যায়, চলে আসে রাত্রি
আমিতো হয়ে গেছি মরণেরই যাত্রী
মরে যাব পচে হয়ে যাব মাটির শ্মশান
তাই ভাবছি নিজে করব মানুষের কল্যাণে দান
যদি তোমরা থাকো রাজী উইল করব কাল কিবমা আজই
ছেলেরা বলে, শোনেন বাবাজান
আপনার সাথে একমত মোরা করতে পারেন দান
অবশেষে পাঁচ বারো একাশি সনে
নিজেকে উইল করে দিল মানব কল্যাণে
চক্ষু দুটি করে দিল চক্ষু ব্যাঙ্কে দান
প্রমাণ করিল সাহস বুদ্ধি দুটোই সমান
সূর্য যেমন উদয় হয়ে অস্ত যেতে পারে
মানুষ তেমনি জন্ম নিলে মৃত্যুবরণ করে
সূর্য উদয় হয় যখন চারিদিক হয় আলো
অস্ত গেলে অন্ধকারে চারিদিক হয় কালো
আসে একটি নতুন প্রভাত
প্রত্যেক প্রাণী গ্রহণ করবে মৃত্যুর স্বাদ 
বাঁচতে পারেনি কোন গাউস কুতুব অলি
কি করে বাঁচবে কৃষক আরজ আলী

Author: আইয়ুব হোসেন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment