ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ কি অপরাধ?

মানুষের দুঃখ বেদনায় আমি অস্থির হই । মানুষের জন্য কিছু করা দরকার এই ভাবনা মনের মধ্যে আসে, ঘুরপাক খায় । অন্য মানুষের ছেলেমেয়েদের কথা ভাবতে গিয়ে নিজের দুজন ছেলে মেয়ের জীবন নিয়ে ভাবি । তারা বড় হয়েছে এখন তাদের জীবন নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে, প্রতি মুহূর্তেই তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবি । আমার ছেলেমেয়ের জীবনের সমস্যাই বৃহত্তর পর্যায়ের সারা দেশের তরুণ সমাজের সমস্যা । এই একটি একক সমস্যা থেকে সারা জাতির মেধাবি তরুণদের বিভিন্ন রকম সংকটকে তুলে ধরা যায় ।

প্রতিটি পরিবারে তরুণদের নিয়ে চিন্তাটা একরকম । গুম হয়ে যায় কী না, কারো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারো রোষের শিকার হয় কি না ? কোনো অপরাধের ঘটনা নিজের চোখে দেখে ফেলে কি না । কারো কারসাজিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিখোঁজ করে দিয়ে এক সময় জঙ্গীরূপে লাশ দেখতে পাওয়া যায় কী না? অথবা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে গিয়ে কোপাকুপির শিকার হয় কী না । ক্রসফায়ারের সময় বিনা দোষে মরে কি না  অথবা খুন রাহাজানিতে লিপ্ত হয়ে একসময় ক্রসফায়ারের শিকার হয় কি না। অথবা কোনো ধর্ষণকারীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন হয়ে যায় কী না !! আর রাজনৈতিক সমস্যা তো আছেই।

তরুণীদের নিয়ে চিন্তাটা আর একরকম । তরুণীরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষিত হচ্ছে,অল্প বয়সেই বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে অথবা তাদেরকে খুন করে মেরে ফেলা হচ্ছে। এখন তো খুন, হত্যা,  ধর্ষণকে অতিক্রম করে প্রেমের নামে বিশ ত্রিশটি কোপ দেবার প্রচলন শুরু হল । এরা আওয়ামী লীগ না বিএনপি, না জামাত শিবির সেটা আবিষ্কার আমার উদ্দেশ্য নয় । একটি বিষয় আবিষ্কার যে হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল হিসেবে  সে আওয়ামী লীগেরই হোক অথবা অন্য দলেরই হোক । কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখন আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে কেউ পারেনি । তবে তাতেও যে সুরাহা হয় তা না। তারপরেও  ক্ষমতার জোরে আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় ।

 

তরুণদের সমস্যা দুই রকম:
এক. তাদের জীবনের নিরাপত্তা  বা বেঁচে থাকা
দুই. তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম বা সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার নিরাপত্তা ।

শিক্ষাজীবন শেষে প্রত্যেকটি পরিপূর্ণ মানুষের জীবনপ্রবাহে সামিল হতে  কর্মসংস্থান জরুরী । এর সাথে আছে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা ।( ছাত্রজীবনটাকে টানতে টানতে জ্যামে জটে ফেলে এবং কোর্সগুলিকে বড় করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছে যে পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়সেও ছাত্রজীবন শেষ হয় না। ছাত্রীরা অবশ্য লেখাপড়ার মাঝেই অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বিয়ে করে ফেলে )
কিন্তু একই বয়সের ছেলেরা এই বয়সের বিয়ে করতে পারে না । নারী এবং পুরুষের বিয়ের প্রয়োজন শুরু হয় আঠারো থেকে সাতাশের মধ্যে । অথচ এ বয়সে লেখাপড়া এবং জীবনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠাতেই বয়স শেষ । এই ছাত্রজীবনের যত শক্তি এবং সময় কোথায় ব্যয়িত হয় ? মিছিল মিটিং এবং রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণায় । এতে দেখা গেল ব্যক্তিগতভাবে তারা যা চায় তা তারা পায় না । স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখন রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনায় ব্যবহৃত হয় । ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন আছে । তার থেকেও বেশি প্রয়োজন তরুণদের কর্মসংস্থান । সব মানুষ রাজনীতিতে জড়িত হতে পারে না ।

শিক্ষক হিসেবে আমার কাজ হলো ছেলেমেয়ে এবং জাতির একটি অংশের লেখাপড়া শেখানো। একুশ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি । দেশের ছেলেমেয়েদেরকে লেখাপড়ায় সহযোগিতা করেছি । নিজের ছেলেটাকে আগলে রেখেছি যাতে বাইরের কোনো খারাপ প্রভাব ওর উপরে না পড়ে । পরের ছেলেকে এবং মেয়েকে নিজের সন্তানের মত দেখেছি এখনও দেখছি ।
আমি দেখেছি বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন পরিবারের ছেলেরা কীভাবে মাদকাসক্ত হয় । একদিকে মাদকাসক্তি অন্যদিকে মৌলবাদি ধর্মাসক্তি,  আরেকটি হল নানাদলের  অপরাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির প্রতি আসক্তি।  এইসব বিষয়ে যারা একবার জড়িত হ্য়, তাদের দ্বারা এক একটি পরিবার,  এলাকা, সমাজ দেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়,  পরিবার কীভাবে বিপন্ন হয় । তারপর নিজের ছেলেকে সেইসব থেকে রক্ষা করার জন্য ভাল ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে  থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যন্ত পড়িয়েছি।  ইংরেজি মাধ্যমের ছেলে মেয়েরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগে ভর্তি হবারই সুযোগ পায় না বললেই চলে । সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করে । বাংলাদেশের শিক্ষাবিভাগে  যেহেতু  ইংরেজি মাধ্যমটি সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষেই চালু হয়েছে, সুতরাং এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করার পরে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বড় বড় নীতিমালা প্রণয়ন যারা করেন তাদের করার কথা । এদেরকে লেখাপড়া করাবার জন্য প্রতিটি পরিবার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে । এতে শিক্ষাক্ষেত্রে যেমন একটি উন্নত আন্তর্জাতিক মানের অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে তেমনি একশ্রেণির শিক্ষিত মানুষদের কর্মসংস্থান, ব্যবসা সংস্থান এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে । কিন্তু আমার প্রশ্ন হল ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের উপযোগী বা তাদের সিলেবাস এবং লেখাপড়ার ধরন অনুযায়ী কোনো প্রশ্ন বা সিলেবাস নিয়ে কি এদেশের চাকরিতে নিয়োগের জন্য অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য  কোনো প্রশ্ন করা হয় ? যদি না করা হয় তাহলে জাতির একটি উন্নত অংশের সাথে এমন বিমাতাসুলভ আচরণ কি সাজে ?

তাদের বিষয়ে সুন্দরভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখে ভুল করেছি তা বলবো না । কারণ আমাদের দেশের সব সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি । আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নানাভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা বিষয়ে উৎপাদন এবং উন্নয়নের দিকে বিশেষভাবে মনোযোগী। বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক কাঠামোর উন্নয়নের জন্যই তিনি চিন্তিত । কিন্তু জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা জ্ঞানে বিজ্ঞানে উজ্জ্বল তরুণ সমাজের একটি অংশকে অবহেলার মধ্যে রেখে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয় । নিয়োগ সংক্রান্ত পরীক্ষায় তাদের সিলেবাস অনুযায়ী প্রশ্ন করারও একটি বিধান থাকা উচিত । নাহলে অনেক কারণেই এইসব ছেলেমেয়েরা আত্মবিধ্বংসী চিন্তা করতে পারে । অথবা প্রগতিবিরোধী চিন্তায় জড়িত হয়ে পড়তে পারে । এইসব ছেলেমেয়ের মধ্য থেকেই বাংলাদেশের স্বার্থ পরিপন্থি কাজ যারা করে তারা এদেরকে দিয়ে নানারকম কাজ করিয়ে নিতে পারে । নেতিবাচক কাজে যারা জড়িত হয় তাদেরকে হত্যা করা কোনো সমাধান নয় । প্রিভেনটিভ ইজ বেটার দ্যান কিওর ।
আমাদের তরুণ সমাজকে কাজে লাগাতে হবে । এইসব সুন্দর ঝরঝরে তরুণদের জীবন আনেক হতাশায় নিমজ্জিত । তাদেরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত করা প্রয়োজন ।

ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়ার ব্যবস্থা এ দেশে আছে কিন্তু এদেশের চাকরিতে নিয়োগের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের সিলেবাস অনুযায়ী প্রশ্ন করা হয় না। কারণ হিসেবে যা বোঝা যায় তা হল যারা প্রশ্নকর্তা তাদের কেউ ইংরেজি মাধ্যমের সিলেবাস জানে না । বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়  যে মাধ্যমটির জন্য অনুমোদন রয়েছে, যে মাধ্যমটি সরকার কর্তৃক স্বীকৃত এবং একটি শ্রেণি এ দেশে এই মাধ্যমটির মাধ্যমে ভালভাবে টিকে আছে এবং দেশকে শিক্ষায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে সাফল্যের মুখ দেখাচ্ছে সে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো রকম ব্যবস্থা নেই ।  এদেশের বিসিএসসহ যেসব চাকরির জন্য নিয়োগ পরীক্ষাগুলো হয় তাতে আবশ্যিক বাংলা এবং ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্ন থাকে ।  সেখানে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম অথবা অন্য যে কোনো একজন লেখকের কোনো একটা বিশেষ গ্রন্থের রচনাকাল অথবা কোনো চরিত্রের নাম অথবা কোনো অখ্যাত বিষয়ের নাম জানতে চাওয়া হল যার সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা আধুনিক বিজ্ঞান নির্ভর আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই। তাহলে  একজন ইঞ্জিনিয়ারকে কি এখন কারক,  বিভক্তি, সমাস এবং বাংলাদেশের এত লেখকদের বইয়ের নাম এবং চরিত্রের নাম মুখস্থ করে চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে ?
এভাবে কি মানুষের মেধা যাচাই হয়?

যে ধরনের প্রশ্ন করা হয় তা হল বাংলা মাধ্যমের সিলেবাসের পুরনো মান্ধাতা আমলের ট্রেডিশনাল প্রশ্ন। প্রশ্ন করার সময় বাংলাদেশে প্রচলিত সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী প্রশ্ন করা দরকার । এখানে মাদ্রাসা থেকে আসা ছাত্র কারিগরি বিভাগ থেকে আসা ছাত্র ইংরেজি মাধ্যম থেকে আসা ছাত্র ইত্যাদি ছাত্রদের জন্য প্রশ্ন থাকতে হবে । এজন্য ঐসব বিষয়ের শিক্ষকরা প্রশ্ন করবেন । এক প্রশ্নের সাথেই বিভিন্ন ভাগ থাকবে । এক বিভাগের ছাত্ররা আর এক বিভাগের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না । প্রশ্নকর্তাও বিশেষ জাতিগোষ্ঠির না । সবার জন্যই এ দেশে সুযোগ উন্মুক্ত রাখতে হবে ।

প্রশ্নের ধরন এবং বিভিন্নরকম শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ  অনিশ্চিত । এ দেশে নাকি ত্রিশ লক্ষ তরুণের বয়স হল চব্বিশ থেকে ছাব্বিশের মধ্যে । এরা বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি ।দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠিকে উন্নয়নের গতিধারায় সম্পৃক্ত করতে না পারলে উন্নয়নের চাকা ঘোরাবে কারা ?  উন্নয়নের চাকা যদি এরা না চালায় তাহলে চাকার তলায় পড়ে এরা পিষ্ট হবে । অথবা চাকাকে অচল করে দেবে । আমাদের বৃহত্তর অর্জন যেন তরুণদের দীর্ঘশ্বাসে চোখের জলে ভেসে না যায় ।

জাহিদা মেহেরুন্নেসা
জাহিদা মেহেরুন্নেসা

 

Author: জাহিদা মেহেরুন্নেসা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

One thought on “ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ কি অপরাধ?