ঈদ ও আমার মা

ঈদ ও আমার মা

‘ও মন রমজানের ঐ রেজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। খুব ছোটবেলায় যতটুক মনে পড়ে। ঈদে সবচেয়ে বড় আনন্দের ছিল ঈদের জামা আর ঈদের দিন বিকেলে বিটিভিতে নতুন সিনেমা দেখা আর যদি সুযোগ পাওয়া যায় তো ঈদ আনন্দমেলা । ঈদের নাটক বা  ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির কথা  হয়ত  ভুলে যেতাম । আর যদি ইত্যাদি দেখতে পারতাম তাহলে সেই ঈদটাই হতো সবচেয়ে স্মরণীয়। এখন ঈদ আসে, ঈদ যায় স্মরণীয় কিছু রেখে যায় না । তবে আমাদের ছ্টবেলার মত এখন যাদের ছোটবেলা তারা হয়ত আমাদের সেই আনন্দটা পায়। কারণ বাঙালির ঈদ আর কোরবানি ছাড়া ধর্মীয় বড় উৎসব আর নেই। মমতাজ আপার একটা গান শুনে খুব ভাল লাগল ” হইতো যতি প্রতিটা দিন ঈদের দিনের মত, দুঃখ ভুইলা হাসতো সবাই গরিব ধনী যত’’। ঈদের জন্য কত যে অপেক্ষা! সেই প্রথম রোজা থেকে শুরু করে প্রতিটি রোজা গুনতাম কখন্ও বা দেয়ালে দাগ কেটে রাখতাম রোজা কয়টা শেষ হলো । রাতে সেহেরি যদি খেতে পারতাম তো ওই দিন রোজা আর ভাঙতাম না।  তাই মাঝে মাঝে সেহরিতে আমাকে ডাকা হতো না। কিন্তু কিভাবে যেন সেহরির সময় ঠিকই ঘুম ভেঙে যেত। এমন অনেক রমজানে প্রচন্ড শীতের মধ্যে মা চুলায় পানি গরম দিয়ে রাখতেন । যাতে ওযু করতে কোন কষ্ট না হয়। আর ভোররাতে আমাদের বাড়িতে যে আগে সেহরি রান্না করতে উঠতো, সে সবাইকে ডেকে তুলতো। এটা সওয়াব এর আশায় কি না জানিনা।  তবে এতে সবাই খুব মজা পেত এটা ভেবে যে, আমি আজকে সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছি। এমন ছোট ছোট আনন্দ আমাদের কত যে ভাল লাগত বোঝানো যাবে না। শহর জীবনে প্রতিবেশির খবর রাখা যত কঠিন আমাদের গ্রামে পাশের বাড়ির খবর রাখা তার চেয়ে অনেক সহজ ছিল । গ্রামের মানুষের সেহেরি ছিল  ভাত এবং সামান্য মাছের তরকারি। আবার ইফতার এ ছোলা মুড়ির চেয়ে বাড়তি কোন কিছু থাকলে সেটা যেন ইফতার এ ভাত না খাওয়াকে উৎসাহিত করতো। অনেকেই হয়ত  ইফতার এ ভাত পছন্দ করেন না কিন্তুু ভাত এর বিকল্প ভাবতে গেলে গ্রামে বাড়তি খরচ লেগে যেত। সেটা হয়ত সবার পক্ষে বহন করা অসম্ভব মনে হত। সারাদিন রোজা রেখে মৌসুমি ফল জোগাড় করে রাখতাম ইফতার এ খাবার জন্য। যেমন আম, বরই, লিচু। দুর্ভাগ্য যে ইফতার এর সময় খেতে ভুলে যেতাম । আর যখন মনে পড়তো তখন পরের ইফতার এর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় থাকতো না। মসজিদে ইফতার করতে খুব ভাল লাগত। যে যা পারতো তাই মসজিদে নিয়ে এসে সবাই মিলেমিশে ইফতার করতাম । এখন আধুনিক যুগে সেই স্মৃতি ‍গুলো খুবই বেমানান। তখন ইফতার দেয়ার প্রতিযোগিতা ছিল না।  যে যা ইফতার  দিত মন থেকেই দিত। রোজার শেষের দিকে আমার ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যেত । নতুন জামা কবে পাব তার যেমন একটা টেনশন ছিল, আবার আমাদের ঘরটা বিশেষ করে আমার রুমটা সুন্দর করে সাজানোর চেষ্টা করতাম । কাগজ কেটে ফুল বানিয়ে সারা ঘর আরো সুন্দর করার বাড়তি চেষ্টা  আমাকে ফুরসত দিত না।

একবার ঈদে নতুন জামা পেলাম না তাই মনটা ভীষণ খারাপ ছিল । তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র, কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম।  আমাদের বাড়ি থেকে গোপালগঞ্জ প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে । ভাবলাম আর কোনদিন-ই বাড়ি ফিরবো না । নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে সময় কাটালাম। বিভিন্ন মানুষের ঈদ উদযাপন দেখলাম । যখন সন্ধ্যা হয়ে এল হঠাৎ মা’র কথা মনে পড়লো আর ভাবলাম আহারে মা হয়ত আমাকে খুঁজছে ! আমি দ্রুত বাড়ি ফিরে আসলাম।এসে দেখলাম সত্যিই মা আমার জন্য কোন কিছু খায় নাই। আমি আসামাত্র আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘কোথায় ছিলি বাবা’? আমি মাকে সত্যি কথাটা বললাম না । বললাম, মা আমি পাশের বাড়ি গিয়েছিলাম। সত্যি বললে মা কষ্ট পেত । আমার প্রথম আয়ের টাকা দিয়ে ঈদে মার জন্য শাড়ি কিনলাম। তখন আমি ঢাকায় পড়াশুনা করি আবার টিউশনিও করি ।  ঈদে বাড়িতে গেলাম। মার কি আনন্দ শাড়ি দেখে। এমন হাসিমুখ আর কখনও আমি দেখিনি। প্রতি ঈদে মায়ের জন্য নতুন টাকা নিয়ে যেতাম।  মা সযত্নে সেগুলো তুলে রাখতো । আবার ঢাকায় ফেরার পথে বলতো, ‘তোমার গাড়ি ভাড়ার জন্য টাকা নাই আমি জানি। তাই এই টাকাটা নাও।’  আমি সত্যিই অবাক হতাম এই ভেবে যে আসলেই তখন আমার পকেট খালি। আমার মায়ের জন্য আমি কোন সন্মান  সন্তান হিসেবে অর্জন করতে পারি নি। কিন্তু দয়া করে আমার মাকে কেউ অপমান করবেন না যে তিনি সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করতে পারেননি। এমন অনেক অসহায় সময় আমার মা পার করেছেন যখন আল্লাহ’র কাছে  শুধু অভিযোগ করেছি। খাদ্যাভাব কখনই আমাদের ছিল না কিন্তু সহযোগিতার প্রচন্ড অভাব ছিল আমাদের। মা নেই। ২০১৩ সাল থেকে আমার ঈদও শেষ। আমি সিগারেট খেতাম । মা মারা যাবার পর আর সিগারেট স্পর্শও করিনি। আমার কেন জানি মনে হয় আমার কারণে মা যদি কবরে ভাল না থাকে।  তাই সবসময় সতর্ক থাকি। এখন ঈদ আসে যায়, কিন্তু আমার জীবনে হয়ত কোনদিন আর ঈদ আসবে না। আমি সৃষ্টিকর্তাকে বলি, আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা আমার কল্পনারও বাইরে । কিন্তু আমার মাকে যদি আমি সবকিছুর বিনিময়ে ফিরে পেতাম তাহলে আমার আর নতুন জামা চাই না । আমি শুধু মার কাছে থাকতে চাই। ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল আমার মা আমাদের মাঝে ফিরে আসেন । কি অদ্ভুত ! তার চাহনি অবয়ব সব মায়ের মতো । আরও অবাক হই তার গায়ের ঘ্রাণ অবিকল মায়ের মতো। তার সাথে আমি যখন কথা বলি মনে হয় মায়ের সাথে কথা বলছি । মাত্র ১ বছর তিন মাস বয়স তবুও যেন সে মায়ের মতো আদর করে শাসনও করে। সৃষ্টিকর্তা কত মহান!  তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। এই ঈদে আমি ভীষণ খুশি  মা পাশে আছে বলে। আর যে চলে গেছে সে যেন জান্নাত থেকে এই মায়ের মাঝে  ফিরে আসে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ।

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন​

 

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment