একজন জরিনা/ আফরোজা অদিতি

ঈদ উপলক্ষে ছোট-বড়-মাঝারি দোকান, ফুটপাত সেজে উঠেছে নানা রকমের নতুন পোশাকে; এমন কি ভ্যানগাড়িতে করেও জামা-কাপড় বিক্রি হচ্ছে; বস্তির সামনেও ভ্যানগাড়িতে বসেছে বাজার। অনেকেই কিনছে তবুও বাচ্চা দুটো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে কিন্তু কোন আবদার করছে না! জরিনা একটা ছোটখাটো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে। বেতন যা পায় তা দিয়ে বাসা ভাড়া, খাওয়াই ঠিকমতো হতে চায় না, নতুন কাপড় কোথা থেকে হবে; তবুও মায়ের মন, ইচ্ছা করে ঈদ-পরবে ছেলেমেয়েকে নতুন পোশাকে সাজাতে। চিন্তিত বিষণ্ন জরিনা কাজ করছিল; ওভারটাইম করছে ছেলেমেয়ের নতুন জামা কেনার জন্য; ভেবেছিল ঈদের আগে বোনাস পাবে কিন্তু সে ভরসা কমে আসছে। বোনাস-বেতন পাবে কি পাবে না এই অনিশ্চিয়তার মধ্যেও ছেলেমেয়ে দুটোর খুশিতে ঝলমলে মুখের কথা ভেবে আগামি মাসের বেতন থেকে কেটে নেওয়ার শর্তে কিছু টাকা ধার দেওয়ার জন্য সুপারভাইজারকে বলেছে  জরিনা; যদি দেয় তবে নতুন জামা হবে ওদের।

 

  জরিনার অবস্থা এমন ছিল না। জমি ছিল, বাড়ি ছিল; ছিল সুখের সংসার। স্বপ্ন ছিল মনে। স্বামী, মইনুদ্দিনের মুদিখানার দোকান থেকে ভালোই আয় হতো, আয় হতো জমি থেকেও। জরিনা নিজেও বসে থাকতো না, আঙিনায় সবজি লাগিয়ে যেমন আয় করতো তেমনি সংসারের তরকারির চাহিদা মিটিয়ে ফেলতো। ছেলে-মেয়ে দুটোকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা ছিল; ওদের ঘিরেই ছিল জরিনার স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্ন চোখের বাইরে আসতে পারেনি তার আগেই সব শেষ। দাউদাউ আগুনে শেষ হলো স্বামীর মুদির দোকান, অসহায়  স্বামী সহ্য করতে না পেরে ওদের কষ্ট সাগরে ডুবিয়ে চলে গেল আর ছেলেমেয়ে নিয়ে জরিনা উড়ে এসে পড়লো অপরিচিত এই রাজধানী শহরে।

 

  অপরিচিত শহর, কর্মহীন তবুও হাল ছাড়েনি জরিনা; ছাড়তে পারেনি সন্তানদের জন্য। নিরাশ্রয় জরিনা, না- খেতে পাওয়া জরিনা নিজের জন্য নয় সন্তানদের জন্য মনে বেঁচে থাকার আশা জাগিয়ে রেখে ছেলেমেয়েকে নিয়ে উড়াল সেতুর নিচে রাত কাটিয়ে দিলো কয়েকদিন! কিন্তু হাত পা ছেড়ে শুয়ে বসে থাকলে যে জীবন চলে না তা বুঝেই উড়াল সেতুতে ইট টানার কাজ করতো দুইজন মহিলা, ওদের বলেকয়ে কাজ নিয়েছিল, তারপর বাসা বাড়িতে; সময় গড়িয়েছে সঙ্গে ওর জীবন। সময়ের ট্রেনে আজ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। মেশিনে বসে ভাবছিল জরিনা। কাজের হাত থেমে গেছে কখন বুঝতেই পারেনি। সুপারভাইজার দেখলেই তো তুলকালাম  ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলতো।

 

  ‘কী ভাবতেছ জরিনা।’ মেহেরুনের কথায় চমকে ওঠে জরিনা। তারপর বলে, ‘কিছু না গো বইন। ঈদ আইসা পড়লো পোলামাইয়ার জন্যি দুইখান কাপড় কিনবার পারলাম না। এই কথাখানই ভাবতেছি।’ মেহেরুন ওকে স্ান্ত্বনা দেয়। ‘চিন্তা করো না জরিনা, বোনাস দিবো শুনতাছি, সরকারও কইছে, এবারে মনে হয় ঈদের আগেই পাইয়া যামু।’ মেহেরুনের কথায় আশ্বস্ত হতে পারে না পোড় খাওয়া মেয়ে জরিনা।  আশ্বস্ত না হলেও আশায় বুক বাঁধে; আশা করতে তো দোষ নেই।

 

  রাত নয়টা পর্যন্ত কাজ করে জরিনা। মেহেরুনও। কাজ শেষে বের হয় দুজনেই। সুপারভাইজার বেশ ভালো ব্যবহার করলো আজ, জরিনাকে ডেকে টাকা দিলো। হাত পেতে টাকা নিয়ে মেহেরুনকে বলল, ‘বইন তুমি একটু যাইবা দুইডা কাপড় কিনুম, দেরি হইবো না পছন্দ কইরাই রাখছি।’ মেহেরুন মেয়েটা ভালো, না করে না। দুজনে মিলে কাপড় কিনে বাসে ওঠে। একই রুটের বাস। প্রত্যেকদিন দুজনে একই সঙ্গে যাওয়া-আসা করে। মেহেরুন হাতিরঝিলের কাছে থাকে আর জরিনা থাকে ওয়াপদা রোডে। যার যার স্টপেজে নেমে যায় ওরা। মেহেরুন নেমে যাওয়ার পরেই নামবে জরিনা।

 

  ছেলেমেয়ের জন্য জামা কিনতে পেরে খুশি উপচে পড়ছে জরিনার মনে; ভাবছে এই লাল রঙের ফ্রকটাতে ওর মেয়েকে পরীর মতো লাগবে আর  হলুদ রঙের এই জামাটায় ছেলেকে লাগবে রাজপুত্রের মতো। ওর সোনা-রাজপুত্র আর পরী- রাজকন্যা! ওদের কথা ভাবতেই আনন্দে টগবগ করে মন। উচ্ছল জরিনা জামাদুটো বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে বসে থাকে; নতুন কাপড়ের গন্ধ নিতে নিতে ছেলেমেয়ের খুশি উপচে পরা মুখ দেখতে পায় মানসচক্ষে। ঐ আনন্দ ভাবনায় কখন স্টপেজ এসেছে টের পায়নি। বাসের হেলপারের বাসের গায়ে থাপ্পড় দিয়ে ‘নামেন, নামেন, নাইমা পড়েন’ কথায় চমক ভাঙে জরিনার। লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু নামতে পারে না। বাসগুলোতে ওঠা যেমন কঠিন, নামাও তেমন কঠিন।  যানজটে নাকাল শুধু যাত্রীরা নয়, বাসের ড্রাইভারও বিরক্ত হয়ে থাকে; ঘন্টার পর ঘন্টা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থেকে ছাড় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের গ্যাপ পূরণ করতে সময়ের আগে ছুটতে চায়! অপেক্ষা করার ধার ধারে না। যাত্রীরা নামতে পারলো কি পারলো না সেদিকে খেয়াল না করেই টান দিতে থাকে। ওদের মনে তখন থাকে শুধু টান আর টান!

 

  জরিনা এসব জেনেও পা নামিয়ে দেয়। পেছনে কয়েকজন নামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে; ওদিকে বাস টান দিয়েছে হেলপার  ‘লেডিস নামবে’ বলে বাসের গায়ে চাঁটি মারাতেও শেষ রক্ষা হলো না। বাস ড্রাইভার একটু জোরেই ব্রেক কষে, তার নড়েচড়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে পেছনের কয়েকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে জরিনার ওপর আর জরিনা ছিটকে পড়ে রাস্তায়। ‘গেল গেল’ শব্দ ওঠার আগেই পেছনের একটি বাস ওভারটেক করে চলে যায়। আর বাসের চাকার নিচে এক নিমেষে রাস্তা হয়ে যায় জরিনা!

afroza aditi আফরোজা অদিতি
আফরোজা অদিতি

Author: আফরোজা অদিতি

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts