একজন সৎ মানুষের যাপিত জীবনের ক্ষণিকাংশ

একজন সৎ মানুষের যাপিত জীবনের ক্ষণিকাংশ

প্রতিদিন কাজ শেষে রেলস্টেশন থেকে পোস্টাল সার্ভিসের বাস নিয়ে মাত্র ১০ মিনিটেই আমি ঘরে পৌঁছে যাই। কাজে যাওয়ার সময়ে এ সার্ভিসটি থাকে না বলে একাধিক বাস পরিবর্তন করে শহরকেন্দ্র ঘুরে রেলস্টেশনে পৌঁছুতে আমার প্রায় আধাঘন্টা লেগে যায়। আমার আলোচ্য সৎ মানুষটি ৮০ উর্দ্ধ একজন বৃদ্ধা, তিনি আমার ঘরে ফেরার এই পোস্টাল বাস সার্ভিসের নিত্যকার একজন সহযাত্রী। সম্ভাশন বা শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়া আগের ৫/৬ বছরে ওনার সাথে বাড়তি কোন কথা কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। সপ্তাহান্তের এক অলসবেলায় গ্রামের এক বারের টেরাস বা খোলাচত্বরে পান করছি, এমন সময়ে আমার আলোচ্য সৎ মানুষটি কোণার এক টেবিল থেকে উঠে এসে আমার অনুমতি নিয়ে আমার সামনে বসে পড়লেন।

 

-শুভ অপরাহ্ন, কেমন আছেন আমার ফাদার ? ( বোন আপরে-মিডি,কোমো তালে ভু মো পের )। 

 

ওনার ফাদার সম্ভাশনে বেশ কিছুটা অবাক হলেও কৌতূহল চেপে উত্তর দিলাম… 

 

-আমি ভাল আছি মাদাম, ধন্যবাদ। আপনি ?

 

-শুনেন আমার ফাদার, আমি বেশ একটা জটিল সমস্যায় পড়ে আপনার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছিলাম। আমি দেখেছি আপনি প্রায়শই চার্চ থেকে বেরিয়ে এসময়ে এখানে বসেন। আমি ঠিক কনফেস করতে নয়, একটি জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য আপনার পরামর্শ চাইতে এসেছি।

 

এতক্ষণে আমাকে ফাদার ডাকার রহস্যটি আমার কাছে উন্মোচিত হলো। পোস্টাল সার্ভিসের বাসটির স্টপেজ আমার ঘর লাগোয়া একটি চার্চের সামনে। বাস থেকে নেমে আমি চার্চের আঙ্গিনায় ঢুকে ২ মিনিটে ঘরে পৌঁছানোর একটি সর্টকাট রাস্তা ধরি, তাছাড়াও কাজে যেতে আমার ফর্মাল ড্রেস এই বৃদ্ধার কাছে আমাকে চার্চের ফাদার বলেই ধারণা তৈরি করতে সহায়ক হয়েছে।

যাই হোক ওনার ভুল ধারণা ধরিয়ে দেয়ার আগে ওনার জটিল সমস্যাটি জানার ভীষণ কৌতূহল থেকেই জানতে চাইলাম,

 

-ঠিক আছে, আপনার সমস্যাটি আগে বলুনতো শুনি।

 

-আপনার কি মনে আছে ফাদার, গত সপ্তাহে আমাদের বাসে টিকেট-চেকার উঠেছিলেন ?

 

-হ্যা, মনে আছে। আরো মনে আছে,আপনি আপনার বাস-পাসটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না ।

 

-হ্যা সঠিক বলেছেন, আমি নিয়মিত যাত্রী বলে টিকেট-চেকার আমার বাস পাস আছে জেনেই আমাকে কিছু না বলেই চলে গিয়েছিলেন।

 

-সেটি আমার জানার কথা নয়, কারণ আমিতো তার আগেই আমার স্টপেজে নেমে গেলাম। কিন্তু এখানে সমস্যা কোথায় সেটি কিন্তু এখনো আমার বোধগম্য নয়। 

 

-সেটাই বলছি। আপনি তো জানেন যে ,আমার বাস-পাসটি আপনার ন্যায় বাৎসরিক কার্ড নয়। আমারটি মাসিক । সেদিন ঘরে ফিরে দেখি আমার বাস পাসটির মেয়াদ দুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ ওইদিন আমার বৈধ কোন বাস-পাস ছিল না। আমার সমস্যা এটাই। কিন্তু সমস্যাটি কি করে জটিল হলো, সেটাই এখন আপনাকে বলছি। বাস-পাস নবায়ন করতে নগর পরিবহন অফিসে গেলাম, নবায়ন শেষে জানালাম আমার বিনা টিকেটে ভ্রমণ ও ভুল করে টিকেট চেকারের জরিমানা না করার বিষয়টি। অনুরোধ জানালাম ,আমার ভুল বা অপরাধের নির্ধারিত জরিমানার ৮০ ফ্রাঙ্ক জমা নিতে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী জানালো,যেহেতু আমার নামে কোন জরিমানা জারি করা হয় নাই, সেহেতু কথিত এ জরিমানা তারা নিতে অপারগ। তিনি ভবিষ্যতে আমাকে সময়মত নবায়নে সচেতন থাকার কথা বলে বিষয়টি ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দান করে বিদায় করে দিলেন। কিন্তু যত সহজে উনি বিষয়টি ভুলে যেতে বললেন, আমি তত সহজে আমার এই অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অপরাধের কথা ভুলতে পারছি না। বিবেক আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এখন আমাকে একটি সহজ ও সরল পথ বাৎলে দিনতো ফাদার, আমি বিবেকের এই তাড়না থেকে কি ভাবে মুক্তি পেতে পারি ?

 

বৃদ্ধার কথা শুনে আমি ক্ষণিকের জন্য নির্বাক হয়ে ভাবছিলাম ‘‘তার সমস্যাটির সমাধান জটিল” মনে করে নয়, ভাবছিলাম ‘‘একজন মানুষ তার যাপিত জীবনে কত খানি সৎ ও নিষ্ঠাবান হলে এ রকম একটি অনিচ্ছাকৃত সামান্য ভুলে প্রতিনিয়ত বিবেক দ্বারা তাড়িত হতে পারেন”!  

আমার বিবেচনা মতে বৃদ্ধাকে সম্ভাব্য সমাধান দিতে গিয়ে বললাম,

 

-দেখুন, আমার বিবেচনায় নগর পরিবহনের সংশ্লিষ্ট কর্মচারির পরামর্শটি যেমন আমার কাছে আইনানুগ ও যুক্তিযুক্ত, ঠিক তেমনি আপনার অনিচ্ছাকৃত ভুলটির জন্য আপনার বিবেকের তাড়নাটিও আরো বেশী যুক্তিযুক্ত। সেক্ষেত্রে আপনি ক্ষুধার্থ শিশুদের রুটি সরবরাহকারী কোন স্বেচ্ছাসবী সংগঠনকে আপনার কল্পিত এই জরিমানার ৮০ ফ্রাঙ্ক দান করে আপনার বিবেকের তাড়না থেকে মুক্তি পেতে পারেন । 

আর আমি আপনাকে আর একটি ভ্রম সংশোধন করে দিতে চাই। সেটি হলো, প্রতিদিন বাস থেকে আমি এই চার্চের আঙ্গিনায় নামি বলেই হয়তো আপনি ধারনা করেছেন যে ,আমি এই চার্চের প্রিস্ট বা ফাদার। আসলে আমি এখানে নেমে ঐ যে পায়েচলা পথটি দেখছেন,ওটি ধরে সর্টকাট রাস্তায় আমার ঘরে পৌঁছাই। আমি চার্চের ফাদার নই, এমনকি ধর্মমতে আমি খৃস্টান ও নই।

 

বৃদ্ধা বেশ কিছুক্ষণ নির্বাক আমার পানে চেয়ে থাকলেন, চোখটি হয়তো কিছুটা সিক্ত হলো….নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন,

 

-দেখুন ফাদার….প্রথমত আপনার দেয়া সমাধানটি এত সহজ অথচ এটি আমার মাথায় আসেনি, আমি তাই করবো যা আপনি বললেন। দ্বিতিয়ত, আপনি খৃস্টান নন অথচ ভ্রমবশত আপনাকে ফাদার বলে ডেকে ফেলেছি। আমার এ ডাকে আপনি যদি আহত না হন, আমিও কিন্তু অতৃপ্ত নই….আমার ভালই লাগছে। আমি বা আমার পরিবার নিয়মিত কখনো চার্চে যাই না, সেই কবে মা বাবার হাত ধরে দু একটি পর্বে এসেছি তাও মনে নাই। তবে আমার জীবন যাপনে জ্ঞানত আমি অন্যায়,অপরাধ ও অনিষ্ট থেকে দুরে থাকতেই সচেস্ট থাকি, এবং বাকিটা পথ যেন সেভাবেই চলতে পারি সেই শুভেচ্ছা আমি আপনার কাছে কামনা করি। আপনি ভাল থাকুন ফাদার। 

 

একথা বলে উনি চলে গেলেন। এরপর থেকে প্রতিদিন আমার শুভেচ্ছার জবাবে ফাদার শব্দটি বাড়তি যোগ হলো , বজ্যু মো পের ( সুপ্রভাত আমার ফাদার)।

 

প্রায় ক’বছর পেরিয়ে গত শুক্রবারও বৃদ্ধাকে বাসে দেখেছি, রোজকার মত শুভেচ্ছা বিনিময় ও করেছি। 

 

আজ ছিল সপ্তাহান্তের ছুটির দিন। অভ্যাস মত শ্যালিকার কুকুর ‘‘ডিয়ান‘‘ কে নিয়ে পোস্টাল বাসে চড়ে বসলাম, গন্তব্য দুস্টপ পেছনে যেপথে বৃদ্ধাকে নিয়ে পোস্টাল বাসটি রোজ চলে যায়, সেপথে একটু ওপরে পাহাড়ে নেমে হেঁটে হেঁটে আবার ঘরে ফিরবো। ফেরার মাঝপথে একটি বাড়ির আঙ্গিনায় অনেকগুলি ফুলের তোড়া দেখে থমকে দাঁড়ালাম। ফুলের স্তূপের ওপর সেই বৃদ্ধার ছবি, সবাই ফুলের তোড়া দিয়ে তার মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে গেছেন। আশেপাশে কেউ নেই, নেই কোন ফুলের দোকান। রাস্তার গোল চত্বরে অনেকগুলি গোলাপ গাছ দেখে এগিয়ে গেলাম। অনেক গাছের মাঝে একটি মাত্র প্রস্ফুটিত গোলাপ যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পরম যত্নে ফুলটি এনে ওনার ছবির কাছে রাখলাম। নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা আমার শ্রদ্ধাবনত অবস্থা হয়তোবা কুকুর ডিয়ান এর মাঝে সংক্রামিত হলো। চার পা ভেঙে বসে পড়ে মাথাটি সে মাটিতে এলিয়ে দিল। আমি রওনা হতেই সে মাথা উঁচু করে ঘেউ শব্দে হয়তোবা তার শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমার পিছু নিল।

 

যেখানেই থাকুন, আপনি ভাল থাকুন।

 

hasan imam হাসান ইমাম খান​
হাসান ইমাম খান 

 

Author: হাসান ইমাম​ খান​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment