একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর/ দীলতাজ রহমান

একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ঠিক তিনদিন আগে আব্বা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকে বললেন, পাকিস্তানী মিলিটারি চলে আসছে! রক্ত ছাড়া কোনো দেশের স্বাধীনতা আসেনি। আমাদেরও আসবে না!

আমরা তখন টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম, এ মজিদ মিঞা স্কুলের ঠিক সামনের বাড়িটাতে থাকি। মাত্র তিনমাস হয় আব্বা খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছেন নতুন করে আটঘাট বেঁধে তার ব্যবসাটা শুরু করবেন বলে।

আমার মনে আছে, আব্বা যুদ্ধের কথা বলতে বলতে একটা চাদর ঘরের মাঝখানে বিছালেন। তার ভেতর যা কাপড়- চোপড় ধরে, চারকোনা এক করে কষে দুটো গেরো দিয়ে বিরাট গোল একটা গাট্টি বাঁধলেন। তারপর ভারী ভারী দুটো নতুন তালা কিনে এনে বাসা এবং গেটে লাগালেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে একটা খালি ট্রাক পেয়ে তাতে আমাদের সবাইকে ওঠালেন। তারপর সদরঘাটে গিয়ে আমরা লঞ্চে  উঠলাম। পরের দিন কোন ঘাটে নেমেছিলাম, তা মনে নেই।

গ্রামে ঢুকলে ছিন্নমূল মানুষের মতো আমাদেরকে ওভাবে দেখে পথের চেনা সব মানুষ হাসাহাসি করছিলো। আমার আব্বা তাদেরকে জোর দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে, ‘ঢাকায় মিলিটারি চলে এসেছে। এখন তারা সবাই সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়বে…।’

কে শোনে কার কথা! মোটামুটি সবাই জানে আমার আব্বার মরার ভীষণ হয়। দু’দিন ধরে সেটাই সবাই রসিয়ে রসিয়ে চাউর করলো। তার দিন তিনেক পর থেকে যখন দিকে  দিকি আগুনের দাউ দাউ অবস্থা দেখতে লাগলো, তখন মানুষ আসল বিষয়টি বুঝলো। না হলে রেডিওতে শুনে শুনেও তো মানুষ অতোটা বুঝতে পারেনি!

তারপর নয়মাসের টানা যুদ্ধে সবার সাথে আমরা তো দৌড়েছিই, আব্বার অতিরিক্ত মৃত্যু ভয়ের কারণে আমরা একটু বেশিই দৌড়েছি। দেখা যাচ্ছে, সবাই যার যার মতো পলো নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে, বা ক্ষেত নিড়াতে বা দূরের কোনো হাটে যাচ্ছে। বাড়িতে চাচীরা রান্নাবান্নার আয়োজন করছেন। আমরা শুধু একারা কখনো মাঠ-ঘাট-চষা ক্ষেতের বিরাট বিরাট ডেলার ভেতর দিয়ে, আবার কখনো আলপথ বেয়ে দূরের কোনো গাঁয়ে গিয়ে কারো পড়ো পুকুরপাড়ে বসে আছি একেবারে না খেয়েদেয়ে!

গ্রামে সবসময় তরুণেরা আব্বার খুব ভক্ত ছিলো। কারণ আমার আব্বা একজন আধ্যাত্মিক পুরুষ ছিলেন। নিজের মতবাদকে পরবর্তী প্রজন্মের ভেতর রেখে যেতে তরুণেরাই তার টার্গেট ছিলো। তাই সবাইকে মুক্তিবাহিনী হিসাবে ট্রেনিং নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি নিজে তখন আটটি কন্যার জনক। নাহলে হয়তো তিনিও যুদ্ধে যেতেন।

সবধেন নীলমনি এগারো বছরের একটি সৎভাইও ছিলো আমার! নয় বছরের এই আমার তার সাথে খুব ভাব ছিলো। দূরের পুকুরপাড়ের ঘন কোনো ঝোঁপের পাশে যখন আব্বার সবাইকে নিয়ে নিগিঢিগি অবস্থা, তখন একমাত্র সেই ভাইটিরই গর্জে ওঠার সাহস ছিলো। বলতো, ‘আল্লাহ, আইজ যেনো সব কয়ডারে মিলিটারিরা শ্যাষ কইরে দেয়। পত্তেকদিন ওনার কারো বাড়ি বাঁশ ফাঁটানুর এট্টু শব্দ পালিও সবগুনোরে নিয়ে দৌড়োয়া গ্রাম ছাড়া অওয়া! অথচ অন্যরা নাতিছে খাতিছে…।’

সৎ ভাইয়ের সাথে তখন আমিও মিউ মিউ করতাম। আর এই কথা সত্যি, এখনো স্পষ্ট মনে আছে, না খেয়ে হাঁটার কষ্টের জন্য আমারও মরে যেতে ইচ্ছে করতো! আমার মায়ের তখন ভরা পেট! পিঠাপিঠি দুটো মেয়ে তার কোলে ছিলো। তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুকটা মুচড়ে ওঠে মার কথা মনে হলে।

গোপালগঞ্জ শহর ঘেঁষে ভেড়ার হাট। পাশে রুট ক্যানেল। নদী। এপাশে আড়পাড়া। ভেড়ার হাট নামকরা এক হাট। আর নদীর কূলের হাটে তো মানুষের সমাগম বেশিই হয়। তো মুক্তিযুদ্ধের সময় এক হাটের দিন, পুরো হাট মিলিটারিরা ঘিরে ফেলে। কারো এদিক ওদিক নড়বার উপায় ছিলো না। কারণ আটপাড়ার কাছে খাগাইল নামে আরেকটি গ্রাম আছে। সেই পুরো গ্রামের মানুষ ছিলো রাজাকার। অতএব তাদের আন্তরিক সহযোগিতায় হাটের সেই দিনই ওই হাটভরা মানুষের শেষ দিন হওয়ার কথা ছিলো। ওই হাটের ভেতর, হাটের মানুষের সৌভাগ্যবশত আমার আব্বাও ছিলেন। সবাই আব্বাকে ধরাধরি করে একটি টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে দিলো। আমার আব্বার বক্তৃতা দেয়ার ক্ষমতা ছিলো ঈর্ষণীয়। তিনি ইংরেজির মতো উর্দুতেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি সেদিন যা বলেছিলেন, তাতে এইকথাগুলো ছিলো, আমরা পাকিস্তান চাই। আমরা পাকিস্তানের পক্ষের মানুষ। আমরা মুক্তিযুদ্ধ চাই না! ঘন্টাখানেকে বক্তৃতা শেষে মিলিটারিদের বন্দুকের নল ধীরে ধীরে নিম্নমুখি হতে থাকে। একটিও প্রাণহানী না ঘটিয়ে তারা সরে যায়। বেঁচে যায় কয়েক হাজার মানুষ! আমার আব্বা জহুরুল হক ভূঁইয়ার নামে তখন ধন্য ধন্য পড়ে যায় দশদিকে। কিন্তু গোপালগঞ্জের কোনো ইতিহাসে আমার আব্বার এই কৃতিত্ব ও বীরত্বের কোনো উল্লেখ নেই!

যা হোক, যুদ্ধেও সময় অন্য সবার চেয়ে বেশিই ভয়াবহ গেছে আমাদের দিন-রাত্রি। শিশুরা ভয়ের ভেতর ভয়ই পায়। আনন্দের ভেতর আনন্দ! কারণ তাদের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ থাকে না। এর ভেতর আমি আর আমার বছর তিনেকের বড় সৎভাই সারাদিন গলাগলি করে ওই বুলিই আউড়েছি, ইলিশ মাছের ত্রিশকাঁটা/ বোয়াল মাছের দাড়ি/ওয়াহিদুজ্জামান চাকর থাকবে শেখ মুজিবের বাড়ি…।’ এমনি একদিন সন্ধ্যাবেলা আব্বা গোপালগঞ্জ থেকে ফিরে এসে সবাইকে ডেকে বললো, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে গেছে।  আর আমাদের এই দেশের নামও আর পূর্ব পাকিস্তান নেই। এর নাম বাংলাদেশ’!

ষোলোই ডিসেম্বর এলে মনে পড়ে যায়, একাত্তরের সেই দিনটিও ষোলোই ডিসেম্বর ছিলো, যেদিন আব্বা ভয়হীন চিত্তে সবাইকে ডেকে বলেছিলেন,‘ আমাদের এই দেশের নাম আর পূর্ব পাকিস্তান নেই..’. ।

দীলতাজ রহমান
দীলতাজ রহমান

Author: দীলতাজ রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts