এক শহীদ ভগিনির কথা

Saif Mizan

আমি এক শহীদের বোন। সেই শহীদ যে মুক্তিযুদ্ধে জীবন দেয়ার জন্যই ছেলেবেলা থেকে নিজেকে তৈরি করেছিল। তাই সরকারি কর্মকর্তা হয়েও খুলে দিয়েছিল ট্রেজারির দরজা। নিজ হাতে ট্রেজারির অস্ত্র তুলে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। নিজের জীবনের পরোয়া করেনি। ভাবেনি তার কিছু হলে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর কি হবে , বাবা- মা, ভাই- বোনের কি হব! একবারও ভাবেনি, সে পরিবারের বড় ছেলে। পরিবারের প্রতি তার অনেক দায়িত্ব আর  তাকে ঘিরে পরিবারের  অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। অথচ সে ছিল একজন পরিবার অন্তঃপ্রাণ মানুষ। সে সময় তার একটা কথাই মনে ছিল , সে এ মাটির সন্তান ।দেশ পাকিস্তানিদের শৃঙ্খলে বাধা।  শৃঙ্খলমুক্ত করতে হবে দেশকে । তার জন্য যে কোন ঝুঁকি নিতে হবে তাকে। নেবে। যেমন নিয়েছে আগে। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করার কারণে বার বার জেল খেটেছে । বৈরি পুলিশ রিপোর্টের কারণে ভাল রেজাল্ট করার পরও কেন্দ্রীয় সরকারের সুপিরিয়র সিভিল সার্ভিসের চাকরি  জোটেনি ।  ব্যাংকের  মোটা বেতনের  চাকরি ছেড়েছে অবাঙালি বস বাংলায় নাম স্বাক্ষর করতে দিতে অস্বীকার করায়।

সেই শহীদের ভগিনি আমি, যাকে বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করেছিল পাকিস্তানিরা পিরোজপুরের বলেশ্বর নদীর ঘাটে ৫ মে ১৯৭১। যার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। যার কাফনের কাপড় খুলে মুখ  দেখেনি স্বজনরা , ভাই-বোনরা হাহাকার তোলেনি , মা অজ্ঞান হয়নি , বাবা বুক চাপড়ায়নি। এসবের কোন সুযোগ পাকিস্তানিরা দেয়নি। তার মৃতদেহটা ওরা কোথায় ফেলেছে , লুকিয়েছে নাকি টুকরো করেছে আমরা জানতে পারিনি।

আমি সেই শহীদের ভগিনি যাকে হত্যার আগে জিপের পেছেনে বেধে সারা পিরোজপুর শহরে  দৌড়াতে বাধ্য করেছিল পাকিস্তানি আর তার দোসররা। নবাব সিরাজউদদৌলার পর এমন ঘটনা আর কখনও ঘটেনি। তবে এ ঘটনা সিরাজের চেয়েও মর্মান্তিক। কারণ সিরাজকে যখন  গাড়ির পেছনে বেধে টানা হয় তখন তিনি  ছিলেন  মৃত আর আমার ভাই ছিল জীবিত।

আমি সেই শহীদের ভগিনি, যার  হত্যার সাথে প্রতিকার পাবার জন্য বিয়াল্লিশ বছর ধরে দিন গুনেছি আমরা। দিন গুণতে গুণতে আমার বাবা-মা পরলোকে চলে গেছেন । মৃত্যুর আগে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে গেছেন একবুক হাহাকার। তাদের তরতাজা ছেলেটাকে যারা মারল তাদের কোন সাজা কেন হল না ,কেন তারা এদেশের মাটিতে সদর্পে ঘোরে , কেন? কেন ওদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ে? আমার বাবা-মার ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাসে  কবরের মাটি কেঁপে কেঁপে ওঠে কিনা কে জানে!

আমি সেই শহীদের ভগিনি, যার মৃত্যুর কারণে থমকে গিয়েছিল আমাদের পরিবারের জীবনযাত্রা।  পেট্রল ঢেলে জ্বালানো হয়েছিল আমাদের ঘর-বাড়ি।  আব্বা আইন ব্যবসা ছেড়েছিলেন ,রাতারাতি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।  মা শয্যা নিয়েছিলেন। আর আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল ছাত্র, সব চেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ‘ছোটদা’ নিজের দিকে না তাকিয়ে, পরিবারকে বাঁচাবার জন্য উজ্জ্বল  কেরিয়ারের সম্ভাবনা  জলাঞ্জলি দিয়ে ধরেছিল পরিবারের হাল।তার সাথে ছিল আমাদেও বিবাহিত বড়বোন।  তাদের কারণে আমরা কিছুটা দাঁড়ালেও সেই উচ্চতার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারিনি যা আমাদের বড় ভাই বেঁচে থাকলে অবধারিতভাবে  পারতাম। আমার শহীদ ভাইয়ের বন্ধুদের অধিকাংশই সচিব হয়েছেন , কেউ কেউ মন্ত্রী হয়েছেন , বড় লেখক , সাংবাদিক হয়েছেন। আমার ভাই হারিয়ে গেছে চিরকালে মত , কোথায় কে জানে।   

শহীদের ভগিনি আমি ,  ভুলিনি ২০০৯ সালের সাধারণ  নির্বাচনের কথা। বিদেশে ছিলাম চিকিৎসায় । থাকবার কথা  ছিল আরও কিছু দিন।  থাকতে পারিনি । বার বার মনে হচ্ছিল  দেশে ফিরতেই হবে । এক দলের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা আছে। আমার পরিবারের তিনটে ভোট বড় দরকারি।  চিকিৎসা বাকি রেখে  চলে এলাম দেশে শুধুমাত্র ভোট দেবার জন্য। আমার পুত্র প্রথম ভোটার হয়েছে । সে  সুদৃঢ় কন্ঠে বলল , ভোট দেবো আমি । যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই-ই চাই ।  

যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে, হচ্ছে । শহীদের বোন আমি , আমার চোখে জ্বলে উঠেছে  আশার আলো , হাজার মোমবাতি। হবে , এবার বিচার আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর। যে ভাই আমাকে বিয়াল্লিশ বছর ‘পপী’ বলে ডাকেনি। যারা আমার মুখ থেকে ‘বড়দা’ ডাকটা কেড়ে নিয়েছে চিরতরে।  

শহীদের ভগিনি আমি,  প্রতিটি বিচারের  রায় শোনার জন্য উদগ্রীব অপেক্ষায় থাকি। রায়  বের হয় জেগে ওঠে শহীদ ভগিনির  চোখের আলো। জ্বলে হাজার বাতি , আশার আলো।

তারপরও দুঃখ থেকে যায়,  অনেক কিছু জানার পরও  কেউ কেউ   ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দেননি, গা বাঁচিয়ে চলেছেন । অথচ  তারাই  সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে মঞ্চ কাঁপান। তারাই এদেশে মুক্তিযুদ্ধের বড় সপক্ষ।  

আমি  অবহেলিত  শহীদ সাঈফ মীজানুর রহমানের  ভগিনি। যে শহীদ ছিলেন অত্যন্ত তুখোড় ছাত্র।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ এমএ পাশ করেছিলেন।  ইংরেজি আর বাংলা ভাষাতে লিখেছিলেন অর্থনীতির অনেকগুলো  পাঠ্যপুস্তক । স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত এদেশের জাতীয় দৈনিকগুলিতে যার  লেখা কবিতা আর ছোটগল্প নিয়মিত ছাপা হত। যার লেখা নাটক মঞ্চস্থ  হত। যিনি ছিলেন ছাত্রলীগের হার্ডকোর সদস্য। ছাত্র লীগের ব্যানারে ফজলুল হক হলের নির্বাচিত পত্রিকা আর সাহিত্য সম্পাদক।  কনভোকেশন আন্দোলনের শীর্ষ নেতা। মুক্তিযুদ্ধকালে পিরোজপুরের ১ম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রেজারি অফিসার। যিনি জীবনের মায়া তুচ্ছ করে ট্রেজারির তালা খুলে দিয়েছিলেন।  কিন্তু সেই হতভাগ্য শহীদকে  তুলে ধরার মত কেউ ছিলনা বলে এদেশের চেনা  বুদ্ধিজীবীদের মাঝে  তার নাম উচ্চারিত হয়না । শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তাকে স্মরণ করা হয়না।  আমরা কোন ভাতা নিইনি , কোন রাস্তা হয়নি , বাড়ি পাইনি, পদক হয়নি , পুরস্কার হয়নি। আমার শহীদ ভাই  এতদিন   ছিল  অনাদরে ,আবহেলায়, বিস্মরণে । আমি শুধু কেঁদেছি একা একা , পাশে পাইনি কাউকে।

আজ সরকার তাঁকে স্বীকুতি দিয়েছে । অতটুকুই। কিন্তু শোক আর গর্ব রয়ে গেছে আগের মতোই, ব্যক্তিগত। আজও শহীদ বুদ্ধিজীবী ‍দিবসে তার নাম কেউ স্মরণ করে না।

বিনম্র শ্রদ্ধা সকল শহীদের প্রতি।

আফরোজা পারভীন​
আফরোজা পারভীন

 

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment