ওরা যে ভালোবাসার কাঙাল

দ্রোপদিসহ পঞ্চপান্ডবের ১২ বছরের  অজ্ঞাতবাস শেষ হতে তখন মাত্র ১ বছর বাকি। তাদের পরম মিত্র ‘বিরাট  রাজ‘তাদের আশ্রয় দিলেন বলেই রক্ষে । নইলে দুরযোধনের হাতে তাদের চরম সর্বনাশ হয়ে যেত।দুরযোধন খুজতে খুজতে বিরাট রাজার দেশে হাজির হ’ল। বিরাট রাজার চাইতে ক্ষমতাবান ছিল তার সেনাপতি।  সে আবার দুরযোধনের সকল নষ্টামির দোসর, হৃদ্যিক মিত্র। তারই কারসাজিতে ‍দুরযোধনের জন্য রাজকীয় সম্বর্ধনার আয়োজন হ’ল।পান্ডবরা সবাই ছিল বিভিন্ন ছদ্মবেশে । নাচগানের আয়োজনেও তারা অংশীদার। সেই আয়োজনে অর্জুন অবস্থান নিয়েছিল বৃহন্নলা ছদ্মনামে নপুংসক বেশে।মহাভারতের কল্পকাহিনীর বাইরে সর্বযুগে সর্বকালে  সর্বদেশেই বৃহন্নলরা বিরাজমান ছিল এবং এখনও আছে।নারীও না পুরুষও না।মানুষ বটে। যার মধ্যে নারী হরমন বেশি তাকে অনেকটা মেয়েরমতই দেখায়। পুরুষ হরমনের আধিক্যে অবয়ব পুরুষালি।স্বভাবে আচরণে চালচলনে এমনকি সাজগোজেও নারীকেই তারা নানা অঙ্গভঙিতে অনুকরণ করার প্রযাস রাখে। অর্জুনের ছদ্মবেশটাও ছিল শাড়িপরা নারীর। এরাও নারীবেশেই চলাফেরা করে। এদের সমাজ জগৎ সংসার নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তাদের জীবন জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা চিনি হিজড়া নামে।নানা অপ্রীতিকর পট সৃষ্টি ও বিড়ম্বনার কারণে  সমাজের বিদ্বেষ ও অবহেলার পা্ত্র ­­­­ হয়েছে জনমদুঃখী এই লিঙ্গ প্রতিবন্ধী মানুষগুলো। আমাদের মত দেশে, য়েখানে এখনও সভ্যতা হামাগুড়ি দিচ্ছে , এরা মানুষের মর‌্যাদা থেকেই বঞ্চিত !কিন্তু কেন?জন্মের ওপরতো কারও হাত থাকেনা !আর একটি বিষয় স্মরণ করা দরকার, যেটা তথাকথিত সভ্য সমাজ এড়িয়ে চলে, সেটা কী জানেন ?সেটা খুবই বেদনাভরা এক বাস্তবতা যে ওরা আমাদেরই স্বজন, কারওনা কারও আত্মজ !বুঝতে সহজ হবে আর একটি সত্য তুলে ধরলে । হিজড়া বলুন বৃহন্নলা বলুন , এরা কেউ হিজড়া মায়ের পেটে জন্মায়না। এদের জন্মদাতা পিতাও একজন স্বাভাবিক বীর‌্যবান পুরুষ।বৃহন্নলারা বংশবৃদ্ধি বা প্রজনন ক্ষমতার অধিকারীই নয়।তাহলে এই সম্প্রদায়ে জনসংখ্যা বাড়ছে কী ভাবে?সেটাও আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলেছে। কিন্তু সবার চোথে সত্যটা ধরা পড়ছেনা।গর্ভধারিণী একজন দুঃখী মাই লিঙ্গপ্রতিবন্ধী নিজ সন্তানকে সবার অগোচরে হিজড়াদের হাতে তুলে দিচ্ছে।এটা গচ্ছিত রাখা নয়,চিরতরে বিসর্জন! সর্বসত্বত্যাগী সম্প্রদান । আমরা শুধু একটা দৃশ্যই অবলোকন করি যা বহির্দিৃশ্য।  যে বাড়িতেই লিঙ্গপ্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নেয় সেখানেই সদলবলে বৃহন্নলঅরা ছুটে যায়। নাচগানে মাতিয়ে তোলে। লেনদেনটা হয় গোপনে , সবার অলক্ষে অগোচরে।জন্মদাতা বাবা অন্য সন্তানদের মঙ্গল চিন্তা করে নির্দয় হন। মা বুকে পাথর বাঁধেন। আমাদেরমত দরিদ্র প্রতিবন্ধী সমাজ,সংসার এবং ‘যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই , প্রীতি নেই ,করুণার আলোড়ন নেই‘’ তেমন কিছু আত্মবিস্মৃত নির্দয় মানুষের কর্তৃত্বাধীন সরকার এদের অকুলপাথারে ভাসিয়ে দেয় সমাজের দেশের ও জাতির আবর্জনা ও বোঝা মনে করে।

আমি কোন উল্লেখযোগ্য নামীদামি লেখক নই। একজন নগন্য সাংবাদিক ও ইদানিংকালের ফেসবুকার। আমার এক স্নেহাষ্পদ বন্ধু তার পোস্টে প্রশ্ন রেখেছেন,“রাস্তায় হিজড়াদের অসভ্য ভীতিকর নোংরা আচরণ থেকে মুক্তি পাবো কবে?”তার ছেলেরা রাস্তায় যে সব অপ্রীতিকর অবস্থার শিকার হয় তার বিবরণ দিয়েছেন।তাতে মায়ের মনে যে প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক সেটাই তিনি ব্যক্ত করেছেন ।আজকাল ঢাকার রাস্তায় হিজড়াদের দ্বারা কিছু বিরক্তিকর টানাহিচড়া, অর্থ চেয়ে জোরাজুরি , অসভ্য আচরণ, এমনকি প্রকাশ্য ছিনতাই ঘটতেও দেখা যায়। কলকাতায় বৃহন্নলাদের পুনর্বাসনের জন্য তাদেরকে ট্রাফিক পুলিশের চাকুরি দেয়ার কথা শুনেছি।বন্ধুর পোস্টে মন্তব্য হিসাবে আমি লিখেছি :

বর্ণিত পরিস্থিতি সত্যিই বিব্রতকর এবং দু:খজনক !রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পুনর্বাসনই এর একমাত্র সমাধান !তবে সহানুভূতির সাথে বিষয়টাকে দেখতে হবে। বিকলাঙ্গ ভিক্ষুকরা যেমন কোন গডফাদারের অধীনে সংঘবদ্ধচক্রের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তেমনি জন্মপ্রতিবন্ধী কথিত হিজড়ারাও স্বার্থান্বেষীঅপশক্তির হাতের ক্রীড়ানক হয়ে পড়েছে বিশেষকরে বাংলাদেশ ও ভারতে। জন্মের সাথে সথে শিক্ষা-সংষ্কৃতির বিশেষায়িত প্রক্রিয়াধীণ করা গেলে এই লিঙ্গপ্রতিবন্ধীরাও সমাজের আবর্জনা ও জাতির বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। এদের মধ্য থেকে স্ফুরিত হতে পারে সঙ্গীত প্রতিভা , নাট্যপ্রতিভা এবং চিত্রকলা পারদর্শী গুনী মানুষ।তার অনেক বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত রয়েছে।যেমন আমাদের দেশের একজন খ্যাতিমান পানি সম্পদ চ্ছিবিশেষজ্ঞ এবং ওপার বাংলার একজন খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকারের কথা সবার জানা রয়েছে।এদের শিক্ষা-দীক্ষায় জারিত করে কর্মশক্তিতে রুপান্তরিত করার কথাই ভাবতে হবে।ওরা যে ভালোবাসার কাঙাল! ভালোবাসা দিয়ে আইনী সুরক্ষা দিয়ে ওদের সমাজে আদরণীয় করে তুলতে হবে। বিদেশে বহু সংস্থা রয়েছে যারা এদের নিয়ে কাজ করছে।সরকার প্রধান নিশ্চই এদের নিয়ে ভাবছেন!কারণ একটি সমৃদ্ধউন্নত জাতি গড়তে হলে তার সর্বাঙ্গ সুন্দর ও সাবলীল করে তুলতে হবে।

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts