কঠিনেরে ভালবাসিলাম

আমার আমি ফিরোজ শ্রাবন

কঠিনেরে ভালবাসিলাম

‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি ত দাম/ সোনা কিনিলাম নাকি রূপা কিনিলাম/ ভালবেসেছ বলে ভালবাসিলাম।’ সিনেমার এই গানটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয় আর এই গানের হাত ধরে কত প্রেম যে তার সার্থকতা খুঁজে পেয়েছে তার হিসাব মেলানো যে কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের স্কুল থেকে কলেজ জীবনে এই গানের প্রভাব ছিল ব্যাপক। গানটি কি অর্থ বহন করে বা গানের বার্তা আমরা তখন না বুঝলেও প্রেম করেছি এই জাতীয় গানেরই হাত ধরে। ক্লাসের ভিতরে শিক্ষকদের কঠিন শাসন আর নজরদারি আমাদের  আশাহত করেছে বারংবার।  তবুও যদি ক্লাসের খাতার ভিতরে কোন চিঠি বা কিছু লিখে দিয়ে তার( সেই মেয়েটির) নজরে পড়া যায় সেই অবিরাম চেষ্টা। আর সেই ছোট্ট লেখা ”তোমাকে আমার খুব ভাল লাগে”, আমি তোমাকে ভালবাসি এটা বলা তো কঠিন তাই ঘুরিয়ে বলা আর কি । আর সেই লেখা তার নজরে পড়লো কি না বা ওই পৃষ্ঠায় তার বিচরণ ঘটলো কি না তা জানার  জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। হয়ত বা তার নজরে এখনও পড়েনি । এভাবে একদিন দুইদিন তিনদিন করে অপেক্ষা করে, অবশেষে নিয়তির হাতে নিজেকে অসহায় সমর্পণ।  হয়ত আর কোনদিনই আমার আর্জি তার চোখে পড়বে না অথবা সে জেনেও না জানার ভান করে আমাকে উপেক্ষা করছে। কারণ এতদিন তার নজরে না পড়লে সেই খাতার পৃষ্ঠা শেষ হলে তো  খাতা চলে যাবে কেজি দরে বিক্রি হয়ে মুদি দোকানদারের হাতে । আর সেই নিষ্ঠুর হাত আমার ভালবাসার বার্তাটি ছিঁড়ে মুচড়িয়ে কাউকে বেঁধে দেবে জিলাপি বা চানাচুর। আমি জানি তার কাছে আমার এই বার্তাটির কোনো মূল্য নেই । তবে তাদের হাত দিয়ে আমার এমন সহজ সরল ভালবাসার শুভ সূচনার এক করুণ পরিনতি ঘটবে তা আমি মেনে নিতে ও পারি না।

আসলে আমরা অসহায় ছিলাম বলতে পারি। কারণ তখনকার সময় তো আর ক্লাসে বসে কাউকে প্রেম নিবেদন করতে পারতাম না।  আর তখনকার দিনে প্রেম করা  যে কত বড় অপরাধ ছিল  তা ভুক্তভোগি ছাড়া কেউ জানে না। তবে সময় পাল্টেছে। এখনকার শিক্ষকগণ অতীব মহান । তারা প্রেম ভালবাসাকে এখন আর অপরাধ হিসেবে দেখেন না। কখনো কখনো প্রেমকে তারা উস্কানি দিয়ে থাকেন। আমি এমন ও দেখেছি যে, কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রবেশে বান্ধবী থাকা বাধ্যতামূলক। এমনকি বিবাহিত বা অবিবাহিত শিক্ষকগণ ছাত্রীদের ওই সব অনুষ্ঠানে বান্ধবী বলে নিজেদেরে ভীষণ উদার আর মহৎ বলে পরিচয় দেন।। এমন আত্মত্যাগ কেউ দেখেনিকো আগে! শিক্ষক ছাত্রিদের এই যে সেতুবন্ধন এটা মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ শিক্ষককে বন্ধু হিসেবে পেয়ে কোন ছাত্রি মনের সুখে গাইতেই পারে, ‘সার্থক জন্ম আমার জন্মেছি এই দেশে, সার্থক জন্ম মাগো তোমার দেশের শিক্ষককে ভালবেসে।’

কিছুদিন আগে টেলিভিসন, পত্রিকায় দেখলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ছাত্রিদের ভালবাসা পাবার জন্য শ্বশুরের দেয়া ফ্লাট ব্যবহার করছেন। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়,  আমাদের সেই সকল সেকেলে শিক্ষকদের এনে যদি দেখাতে পারতাম । স্যার দেখেন, এখনকার স্যারদের মনের বিশালতা,  এ যেন আকাশকেও হার মানাবে! কত শত ছাত্রিকে তারা এক সুতায় গাঁথার কথা ভাবছেন ! তারা নিশ্চয়ই আপনাদের মত সংকীর্ণ হৃদয়ের নয়। তাদের এ অর্জনকে আপনারা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন। আর তাদের জনপ্রিয়তাও আপনাদের চাইতে অনেক অনেক বেশি। আপনারা যদি বলেন, যা  তারা করছে তা  ঠিক করছে না বা তারা পরিণতি নিয়ে ভাবছে না। তাহলে আমরা নচিকেতার সুরে বলবো,  ‘যারা ভালবাসতে জানে না তারা ভালবাসাকে সহ্য করতে পারে ন ‘। আর তাই ইহাই বলিব ”বাজারে যাচাই করে দেখেছি তার দাম/ সোনা নয় রূপা নয় হীরা কিনিলাম/ তবে মাঝে মাঝে মনে হয় কঠিনেরে ভালবাসিলাম”।

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন

 

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts