কল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা: প্রসঙ্গ সুইজারল্যান্ড

সুইজারল্যান্ড

মানব সভ্যতার সুচনাপর্বে প্রকৃতির বিরূপতাকে উপেক্ষা করে গুহাবাসী মানুষ ধীরে ধীরে খোলা আকাশের নিচে বেরিয়ে এসে প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপায় এবং উপাদানে আহার, আচ্ছাদন ও পোশাক পরিচ্ছদের পদ্ধতি উদ্ভাবন করলো বনজি আহারের পরিবর্তে শুরু হলো বন্যপ্রাণী শিকার ও ভক্ষণ তারপর এলো রন্ধন জেড়ায় জোড়ায় বন্যপ্রাণী তাদের বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই বোধহয় নর ও নারী তাদের নিজ নিজ সন্তান নিয়ে একত্রে বসবাসের বাসনা থেকেই সুচনা হলো আধুনা পরিবার প্রথা প্রাকৃতিক উপায়, উপাদান প্রাপ্তির অপেক্ষাকৃত ভাল স্থানগুলিকে ঘিরে এধরনের কয়েকটি পরিবার নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো ছোট ছোট গোত্রভিত্তিক জনপদ এইসব ছোট ছোট জনপদের বিস্তৃতি ঘটে একসময় নগর সভ্যতার জন্ম দিল এই নগর সভ্যতার বিকাশ ও ব্যাবস্থাপনার চিন্তা-চেতনা থেকেই বলতে গেলে আজকের দুনিয়ার আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার উদ্ভব হয়েছিল

এ রাষ্ট্রচিন্তার ইউরোপীয় ভাবনার ভিত্তিভুমি ছিল প্রাচীন মিশরের ফারাওদের আমল হাজার বছর ধরে ফারাওদের সে চিন্তা ও তাদেই উদ্ভাবিত লিপির মাধ্যমে প্রজন্ম প্রজন্মান্তরের সে তাত্ত্বিক চেতনা আরো শাণিত হলো এথেন্সে গ্রীকদের হাত ধরে,যার ব্যাবহারিক প্রয়োগ হাতেনাতে শুরু করলো রোমের রোমান শাসকেরা নগর ব্যবস্থাপনার জন্য নেতা/ শাসক নির্বাচন ও বিচার ব্যবস্থার প্রচলনসহ আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি বৈপ্লবিক সুচনা হয়েছিল সেই রোমাদের হাত ধরেই সেই রাষ্ট্রচিন্তা বা চেতনার আধুনিক ফসলই হলো আজকের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা

হাজার বছর ধরে ইতিবাচক রাষ্ট্রচিন্তার মূল লক্ষ্যই ছিল রাষ্ট্রের অধিকতর মানুষের পছন্দ ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা সেক্ষেত্রে বেশকিছু দেশ ইতিবাচক ও সঠিক রাষ্ট্রচিন্তা এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে অত্যাধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করেছে

তেমনি একটি দেশ সুইজারল্যান্ড যার দাপ্তরিক বা আনুষ্ঠানিক নাম « কনফেডারেশন হেলভেটিক » যদিও দেশটির নামের পুর্বে ভুস্বর্গ বিশেষণটি না দিলে কেমন যেন অপূর্ণতা থেকে যায়প্রকৃতি যেমন তার দু হস্ত উজাড় করে পরম মমতায় দেশটিকে সাজিয়েছে, তেমনি এদেশের আদি হেলভেটিক মানুষ আর এখানে আগত অভিবাসিরা তাদেরশ্রম, মেধা ও মননের পরিচর্যায়, গণতন্ত্র ও সহনশীলতার চর্চায়,দক্ষ ওসুশৃঙ্খল এক প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থপনায় দেশটিকে করে তুলেছে একটি অত্যাধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের রোলমডেল হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার এদেশে ঠিকানা বা বাসস্থানহীন, প্রাপ্তবয়স্ক আয়হীন ও স্বাস্থ্যবীমাহীন কোন নাগরিক নেই প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য বিদ্যুৎ ও আনুসঙ্গিক ব্যবস্থাসহ বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বীমা, আহার ও হাতখরচসহ মাসিক সর্বমোট আনুমানিক ২ হাজার ২ শত ৫০ সুইস ফ্রাংকের নুন্যতম খরচটুকু রাষ্ট্র কতৃক গ্যারান্টেড বা নিশ্চিত করা আছে বেকারত্বের হার অনুর্ধ ৪% মাত্র কর্মক্ষম নাগরিক বেকার হলে আছে বেকার ভাতার বাধ্যতামূলক বীমা সুবিধা,যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৮ মাস পর্যন্ত সর্বশেষ আয়ের ৮০% বেকারভাতা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা আছে

মধ্যপশ্চিম ইউরোপের আল্পস ও জুরা পর্বতমালায় শোভিত দেশটির আয়তন মাত্র ৪১ হাজার ২৯০ বর্গকিলোমিটার জনসংখ্যা ৮০ লক্ষ ৩৬ হাজার জনসংখ্যার ২০% এখানে কর্মরত বিদেশী ফেডারেল রাজধানীর নামবার্ন অর্থনৈতিক প্রধান কেন্দ্র জুরিখ, কুটনৈতিক শহর হিসেবে খ্যাত জেনেভা ও শিল্পশহর ব্রাসেল

দেশটির পুর্বে অস্ট্রিয়া ও প্রিন্স শাসিত লিনচেনসস্টাইন, উত্তরে জার্মানি,পশ্চিমে ফ্রান্স ও দক্ষিণে ইটালী অবস্থিত ল্যান্ডলক বা ভূপরিবেষ্টিত দেশ বিধায় এদের কোন সমুদ্রবন্দর নাই আমদানী রপ্তানীর জন্য প্রধানত ইটালীর জেনোয়া বন্দর ব্যবহার করে থাকে

নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পরিচিতির কারনণই হয়তো অনেকে ধারণা করে থাকেন যে, এদের কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী নাই ধরণাটি একেবারেই অমূলক বা ভুল এদের নিয়মিত সেনাবাহীনি তথা পদাতিক, নৌ ও বিমান বাহিনী আছে ৩ বাহিনীর জন্যই আছে ট্যাংক,আর্টিলারী,ফ্রিগেট ও নৌজান,এফ-১৮ ফাইটার জেটসহ  অত্যাধুনিক সকল সমরাস্ত্র সমুদ্রসীমা না থাকায় এদের নৌ কন্টিজেন্ট ইটালীর জেনোয়া বন্দরের একটি এলাকায় অবস্থিত, যা দীর্ঘমেয়াদি লিজ বা ভাড়াচুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত নিয়মিত ছোট ও চৌকশ সেনাবাহিনীর বাইরে, দেশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সর্বমোট ২ বছর বাধ্যতামূলক দেশরক্ষা বিভাগে সেবা দিতে বাধ্য ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ও তার রাষ্ট্র ভ্যাটিকান এর নিজস্ব কোন সেনা বাহিনী না থাকায় সুইস গার্ড নামে একটি বাহিনী পোপ ও ভ্যাটিকানের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত আছে সুইস গার্ড বাহিনীতে একমাত্র সুইসের নাগরিকেরাই নিয়োগের জন্য যোগ্য হয়

দেশটি তার নিরোপেক্ষ চরিত্র ধারণে ২০০২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের সদস্যপদ গ্রহণ করে নাই যদিও আন্তর্জাতিক এই সংস্থার প্রথম প্রধান কার্যালয় এদেশের কূটনৈতিক শহরখ্যাত জেনেভাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বর্তমানে এ সংস্থার অধীন বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব মানবধিকার সংস্থা, বিশ্ব শ্রম সংস্থা, বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংস্থা, বিশ্ব আবহাওয়া দপ্তর, আন্তর্জাতিক পোস্টাল ইউনিয়নের প্রধান দপ্তর, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রধান দপ্তর, বিশ্ব অলিম্পক ও ফুটবল সংস্থার প্রাধান দপ্তরসহ বহু আন্তর্জাতিক ও বিশ্বসংস্থার প্রধান দপ্তর এদেশেই অবস্থিত দেশটি একাধিকবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ গ্রহণে ও মুদ্রা হিসেবে ইউরো জোনের অন্তর্ভুক্তি প্রাত্যাখান করেছে

সুইসের রাস্ট্রভাষা চারটি, যার মধ্যে জার্মানভাষায় ৬৭%, ফরাসী ভাষায় ২৬%, ইটালীয় ভাষায় ৬% ও রোমশ ভাষায় ১% মানুষ কথা বলে নিজ মাতৃভাষায় ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক বাধ্যতামূলক আছে মাতৃভাষার বাইরে যে কোন একটি রাষ্ট্রয় ভাষা শিক্ষাও বিভিন্ন সার্ভিস সেক্টরে উচ্চশিক্ষিত অধিকাংশ মানুষই ইংরেজি ভাষায় বেশ দক্ষনির্ধারিত ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষা শেষে ৮০% শিক্ষার্থী যে কোন কারিগরী বা পেশাজীবি দক্ষতা অর্জনের জন্য তালিকাভুক্ত হয় ও সেখান থেকে জবমার্কেটে ঢুকে পড়ে মেধানুয়ায়ী বাকি ২০ ভাগ শিক্ষার্থী কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ কারে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষেই ১৪% শিক্ষার্থী আবার সরাসরি জব মার্কেটে ঢুকে পড়ে ও বাকি মাত্র ৬% অতিমেধাবী শিক্ষার্থীই কেবলমাত্র স্নাতোকত্তর পর্যায়ের উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পেয়ে থাকে জবমার্কেটের চাহিদানুয়ায়ী ঢেলে সাজানো এ শিক্ষাব্যাবস্থা থেকেই  মাথাপিছু উদ্ভাবন বা ইনটেলেচুয়াল প্রপার্টি নিবন্ধনে এরা বিশ্বে ১ম স্থান নিয়ে বসে আছে বিগত দশক জুড়ে

 

hasan imam হাসান ইমাম খান​
হাসান ইমাম খান​

Author: হাসান ইমাম​ খান​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts