কল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা: প্রসঙ্গ সুইজারল্যান্ড

কল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা: প্রসঙ্গ সুইজারল্যান্ড

(পূর্ব প্রকাশিতর পর)

দেশটির মুদ্রার নাম সুইস ফ্রাংক, মুল্যমান ১ সুইস ফ্রাংক= ১.১০ ইউএস ডলার বছরে জনপ্রতি গড় আয় ৭১ হাজার সুইস ফ্রাংক নাগরিকদের গড় আয়ুস্কাল ৮১.৩ বছর২০১৬ বছর শেষে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমান ছিল ৬৯১ বিলিয়ন সুইস ফ্রাংক, এর বাইরে ব্যাংকটির সংরক্ষিত সোনার পরিমাণ ৩ হাজার মেট্রিক টন ন্যাশনাল ব্যাংকের বাইরে আছে ইউবিএস বা ইউনাইটেড ব্যাংক অফ সুইস, সারা বিশ্বে যাদের সম্পদের পরিমাণ ৯৪২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাংক আছে ক্রেডিট সুইস ব্যাংক, সারা বিশ্বে যাদের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১৫৯ বিলিয়ন সুইস ফ্রাংক পুর্নবীমা বা রিইনসুরেন্সে এদের আছে বিশ্বখ্যাত সুইস রে,যাদের সারা বিশ্বে সম্পদের পরিমাণ ১.৪১৫ বিলিয়ন সুইস ফ্রাংক এর বাইরেও আছে ২ শতাদিধক প্রাইভেট ব্যাংক, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার বিলিয়ন ইউএস ডলারের কাছাকাছিএখানে অবশ্য অনেকেই মনে করে থাকেন যে, সারা বিশ্বের রাজা /রাজন্য স্বৈরশাসকদের লুন্ঠিত অর্থসম্পদ গচ্ছিত রেখেই সুইজারল্যান্ড তার সহায় সম্পদ বাড়িয়েই চলেছে যারা এমনটি মনে করেন, তাদের ভুল সংশোধনে তারা সুইসের জাতীয় আয়/ব্যয় তথা রপ্তানী আয় ও আমদানী ব্যায়ের খাতওয়ারি সংক্ষিপ্ত খতিয়ানে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন

বিগত ২০১৬ অর্থ বছরে সুইসের মোট রপ্তানী আয় ছিল সর্বমোট ৩০৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার, আমদানী ব্যয় ছিল ২৫৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং নেট উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলারএখানে ব্যাংক, বীমা,পর্যটনসহ সমগ্র সেবা সেবা খাতের আয় ছিল ৩৩.২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার যা তাদের মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ১১% ২০১৬ সালে সুইসের প্রধান রপ্তানী পণ্য গুলি ছিল (১) প্রক্রিয়াজাত মুল্যবান ধাতু ৯৮.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (২) ঔষধজাত পণ্য ৬৭.১ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৩) যন্ত্র/যন্তাংশ ও প্রযুক্তি পণ্য ২২.৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৪) ঘড়ি ও ঘড়ির যন্তাংশ পন্য ১৯.৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৫) রাসায়নিক পন্য ১৯.৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৬) অপটিকাল, কারিগরী ও চিকিৎসা যন্ত্রাংশ পণ্য ১৫.৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৭) বৈদ্যুতিক পণ্য ও যন্ত্রাংশ ১২ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৮) প্লাস্টিকজাত পণ্য ৪.৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার, (৯) সুগন্ধী ও কসমেটিক পণ্য ২.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার (১০) প্রক্রিয়াজাত লৌহ পণ্য ২.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার,(১১) বিবিধ পণ্য ৫.১ বিলিয়ন ইউএস ডলার,(১২) ব্যাংক বীমা সহ সেবা খাত ৩৩.২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার সবচেয়ে বড় কথা হলো,একমাত্র খনিজলবণ ছাড়া উল্লেখ করার মত এদের কোন খনিজ সম্পদ নাই

একটি কল্যাণমুলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সুইসফেডারেল সরকারের মুল স্তম্ভ হলো মুলত ৩ (তিন) টি শাখা

১) উচ্চ/ নিম্নকক্ষের লেজিসলেটিভ কাউন্সিল

২) বিচার ব্যাবস্থা, ও

৩) প্রশাসন বা ব্যুরোক্রেসি

দেশটির অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো তাদের প্রবর্তিত সরাসরি গণতন্ত্র বা ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি পদ্ধতি যা প্রবর্তিত হয়েছিল ১৮৯৭ সালে আর এইতো সেদিন,অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে মহাসমারোহে তারা পালন করলো তাদের সুপ্রাচীন গণতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গৌরবজনক ৭০০বছরের পুর্তি

১২৯৭ সালে উরি, সুইটস ও উনটেরভালডেন নামক ৩ টি রাজ্য নিয়ে প্রথম গঠিত হয়েছিল সুইস ফেডারেশন তারপর শত শত বছর ধরে একে একে এদেশ সংলগ্ন বিভিন্ন রাজা ও রাজপুত্রদের শাসিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি এ ফেডারেশনে যোগদান করতে থাকে বর্তমানে মোট ২৬ টি স্বশাসিত রাজ্য (রিপাবলিক স্টেট/ক্যান্টন) নিয়ে ফেডারেল বা যুক্তরাস্ট্রীয় ব্যাবস্থাধীনে মাত্র ৭ জন ফেডারেল মন্ত্রী দেশটি পরিচালনা করেন

জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির প্রাপ্তভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী ফেডারেল মন্ত্রীসভা গঠিত হয় এই ৭জন ফেডারেল মন্ত্রীসভার সদস্য পর্যায়ক্রমে উচ্চ ও নিম্নকক্ষ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে একজন একবছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেনফেডারেলের মন্ত্রীরা ২০০ সদস্যের নিম্নকক্ষ (ন্যাশনাল কাউন্সিল) ও ৪৬ সদস্যের উচ্চকক্ষের (স্টেট কাউন্সিল) কাছে দায়বদ্ধ ৪ বছরের মেয়াদকালের নিম্নকক্ষ গঠনের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক জনগণ ভোট দেয় তার পছন্দের রাজনৈতিক দলগুলিকে দলগুলি তার প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে তাদের প্যানেলের তালিকানুযায়ী সদস্যবৃন্দকে নিম্নকক্ষে পাঠায় আর উচ্চকক্ষ বা স্টেট কাউন্সিল গঠিত হয় ২০ টি স্টেট/ ক্যান্টন থেকে ২ জন করে প্রতিনিধি ও ৬ টি ছোট স্টেট/ ক্যান্টন থেকে ১ জন করে মোট ৪৬ নির্বাচিত সদস্য নিয়ে একটি অদ্ভুত ব্যাপার হলো,  এদেশে নিয়মিত কোন বিরোধী দল নাই তবে যে কোন দল সরকারের বিরোধিতার জন্য বিরোধী আসনে বসতে পারে, যার নজীর ২/৩বারের অধিক কখনো দেখা যায়নি নিম্নকক্ষ আইন পাস করে, উচ্চ কক্ষ তার পরীক্ষা ও অনুমোদন দান করেযদিও এদেশের উচ্চ বা নিম্নকক্ষের কোনটিই কিন্তু সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নয় সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলো এদেশের জনপরিষদ, যাকে এরা ডাইরেক্ট ডেমেক্রেসী বলতে অভ্যস্ত জনপরিষদের সদস্য এদেশের প্রাপ্তবয়স্ক সকল ভোটার সরকার পরিচালনায় বা নিম্ন/ উচ্চকক্ষ প্রণীত আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় এই জনপরিষদ এদেশের ৪ (চার) ঋতুতে ৪ (চার)টি নির্ধারিত অধিবেশনে মিলিত হয় নিম্ন ও উচ্চকক্ষ সেখানে তাদের প্রণীত আইন বা আইনের সুপারিশমালা সমূহ চূড়ান্ত অনুমোদন বা প্রত্যাখান করে এই জনপরিষদ গণভোটের মাধ্যমে এজন্য প্রতিবছর এদেশে নিয়মিত ৪ টি গণভোট অনুষ্ঠিত হয় বিগত ১০০ বছর যাবৎ এই জনপরিষদ বা ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসী নিয়মিত গণভোটের মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় তাদের ভূমিকা রেখে আসছে ফেডারেল ব্যাবস্থার অনুরূপ আছে ২৬ টি ক্যন্টন/ স্টেটের ২৬জন নির্বাচিত সংসদ ও সরকার প্রতিটি ক্যান্টন/স্টেটের অধীনে আছে সর্বমোট ৩ সহস্রাধিক কমিউনের নির্বাচিত সরকার

কল্যাণমুলক এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় ২য় ভিত্তি হলো এদেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন এই বিচার ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হলো, একজন নিরাপরাধী যেন কোন অবস্থাতেই অপরাধি সাব্যস্ত না হয়, এবং সেটা করতে গিয়ে কোন লঘু অপরাধী সাজামুক্ত থেকে গেলেও ক্ষতি নাই এজন্য তারা যে পদ্ধতি দুটি ব্যাপকভাবে অনুসরণ করে তা হলো, সাসপেন্ডেড সেন্টেন্স বা স্থগিতকৃত রায় ও আর্থিক জরিমানা যে কোন অপরাধির ১ম লঘু অপরাধ অথবা বিধি মোতাবেক যে কোন লঘু অপরাধের জন্য এরা সাধারণত খুবই সংক্ষিপ্ত বিচারে স্থগিতকৃত সাজার রায়/ জরিমানা ঘোষণা করে নির্ধারিত ২/৩ বছরের মেয়াদে ঐ অপরাধী ২য় কোন অপরাধ না করলে তার জরিমানা ও সাজা মাফ হয়ে যায়, কিন্তু নির্ধারিত ঐ ২/৩ বছর মেয়াদের মাঝেই ২য় অপরাধ করলে তার সাজা/ জরিমানা একসাথে  ২য় অপরাধের সাথে ১ম অপরাধের সাজা জরিমানা যোগ হয় এজন্য এধরনের স্থগিতকৃত ১ম অপরাধের সাজা/ জরিমানার রায় মাথায় নিয়ে অধিকাংশ অপরাধী সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে বাধ্য হয় এক পরিসংখ্যনে দেখা গেছে, আপরাধীর সাজা প্রদান/ ভোগের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির প্রসিকিউশনের সফলতার হার ৩৭% হলেও সুইসে এ সফলতার হার মাত্র ১৩% যদিও এই স্বল্প সফলতা নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির তুলনায় সুইজারল্যান্ডের অপরাধপ্রবণতার হার অনেক কম

অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত বড় কমিউন অথবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একাধিক কমিউনের সমন্বয়ে গঠিত ডিস্ট্রিক বা জেলা ট্রাইবুনাল এদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর তার ওপরে প্রতিটি স্টেট বা ক্যান্টনের জন্য আছে স্টেট বা ক্যান্টনাল ট্রাইবুনাল আর সবার ওপরে সুপ্রীম বা ফেডারেল ট্রাইবুনাল স্টেট বা ক্যান্টনাল ট্রাইবুনালের বিচারক নিয়োগে তদারকি করে থাকে প্রতিটি স্টেট/ক্যান্টনাল পার্লামেন্টের সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগীয় কমিটি অনুরূপভাবে ফেডারেল পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ বা স্টেটস কাউন্সিলের তদারকিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন ফেডারেল সুপ্রীম ট্রাইবুনালের বিচারকবৃন্দ এদেশের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণরূপেই স্বাধীন

এদেশের প্রশাসন বা বুরোক্রাসীর সবচাইতে আকর্ষণীয় দিকটি হলো, প্রতিটি স্তরেই ওয়ানস্টপ সার্ভিস প্রশাসনের যে কোন স্তরে যে কোন সাধারণ সেবাপ্রার্থী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাউন্টার বা টেবিলে যার কাছে পৌঁছুবেন তিনি একাই সেবাপ্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট সেবা/ সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম কমিউন থেকে শুরু করে স্টেট/ ক্যান্টন ও সর্বোপরি ফেডারেল সরকারের সংশ্লিষ্ট নির্বাচিত কমিটিসমূহ প্রশাসন/বুরোক্রাসীর নিয়োগদানে তদারকির ভূমিকা পালন করে

আশা করি এ নিবন্ধের পাঠকবৃন্দ ইতিবাচক ও সঠিক রাষ্ট্রচিন্তার ব্যবহারিক প্রয়োগে কিভাবে সুইজারল্যান্ড একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপদ্ধতির নমুনা হিসেবে বিশ্বে তার পরিচিতি তুলে ধরেছে তার একটি সাম্যক ধারণা পেয়ে যাবেন

hasan imam হাসান ইমাম খান​
হাসান ইমাম খান​

Author: হাসান ইমাম​ খান​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment