কার্ল মার্কস মেহনতি মানুষের সুজন

১৮১৮ সালের ৫ই মে প্রুশিয়ার ট্রিয়ের শহরে জন্মগ্রহণ করেন কার্ল মার্কস। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় দু‘শ বছর। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই সুদীর্ঘকাল ধরে মার্কস  পৃথিবীর সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব। শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অসাম্যের  অবসান ঘটিয়ে যারা এই পৃথিবীর বুকে সাম্যের রাজ্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিয়োজিত হযেছিলেন তাদের পুরোধা কাল মার্কস। একই ভাবে যারা আজও এই সংগ্রামে লিপ্ত আছেন  তাদের শিক্ষক, পথপ্রদর্শক, অনুপ্রেরণার উৎস  কার্ল মার্কস তাঁর শিক্ষা। অন্যদিকে,  পৃথিবীর  সমস্ত শোষকদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কার্ল মার্কস মার্কসবাদ।  বিগত দুশ  বছর ধরে সমগ্র পৃথিবীকে সর্বাধিক আলোকিত করেছে মার্কসবাদ। কাল ছিল এই মহামানবের প্রয়াণ দিবস।

মার্কসরা ছিলেন সমৃদ্ধশালী এবং সংস্কৃতিবান। তাঁর বাবা হার্শেল মার্কস পেশায় একজন অ্যাডভোকেট ছিলেন। তিনি ইহুদি ছিলেন তবে বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে সন্তান জন্মাবার আগেই প্রটেস্টান্ট (খ্রিষ্ট) ধর্মে দীক্ষিত হন।।
ছোটবেলা থেকেই কার্ল মার্কস ভালো ছাত্র ছিলেন।  তিনি  একজন স্বভাব কবিও ছিলেন। প্রেমিকা জেনি ভন ভেস্তফালেন-কে নিয়ে তার লেখা প্রেমের কবিতাগুলো পড়লে আজও অনুভব করা যায় তার কবিত্বকে ! হ্যাঁ, এই দুইশত বছরকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরেও!
লেখাপড়া শেষ করে  মার্কস যোগ দেন  ‘রাইন অঞ্চলের সংবাদপত্র’ নামক পত্রিকায়। ১৮৪২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি এর সম্পাদক হন। সম্পাদক হিসাবে যোগ দেয়ার পর থেকেই মার্কস-এর ধারালো  লেখনীর কারণে কাগজটির প্রতিবাদী চরিত্র দিন দিন বাড়তে থাকে। বিষয়টা সরকারের দৃষ্টি এড়ায় না। সরকার বাহাদুর যথেষ্ট নাখোশ  হন। সুতরাং কয়েক মাসের মধ্যেই কাগজের অফিসে তালা পড়ে যায়। এই সময় মার্কস অর্থশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তার পাঠ নেয়া শুরু করেন

১৮৪৩ সালের ১৯-এ জুন জেনির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন কার্ল। জেনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্যারনের কন্যা। তাঁদের সম্পর্কের বিষয়টি গোপন রাখতে হয়েছিল, কারণ এই বিয়েতে  মার্কস পরিবারের সম্মতি ছিল না

বিয়ের পর তাঁরা চলে আসেন প্যারিসে। প্যারিস  তখন জার্মান, ব্রিটিশ, পোলীয় ও ইতালীয় বিপ্লবীদের সদর দফতর হয়ে উঠেছিল সে সময় ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস প্যারিসে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল  মার্কসকে ১৮৪৪ সালের বাস্তবতায় ইংল্যান্ডে কর্মজীবী মানুষের অবস্থা অবহিত করা ১৮৪২ সালে মার্কসের সাথে এঙ্গেল্‌সের এ নিয়ে কথা হয়েছিল সে পরিচয়ের ভিত্তিতেই এঙ্গেল্‌স এ ধরণের উদ্যোগ নেন এভাবেই ১৮৪৪ সালের ২৮শে অক্টোবর মার্কস ও এঙ্গেল্‌স প্যারিসে তাদের বন্ধুত্ব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা ঘটান এটা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্বের একটি

১৮৪৭ সালে মার্কস এবং এঙ্গেলস যোগ দেন কম্যুনিস্ট লিগ-এ। সেই বছরের নভেম্বর মাসে লিগের দ্বিতীয় সাধারণ সম্মেলনে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে কার্ল মার্কস যৌথভাবে রচনা করেন শ্রমিকশ্রেণীর অমোঘ হাতিয়ার ‘কম্যুনিস্ট ইস্তাহার’ এতে তাঁরা দেখান যে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা হচ্ছে অপর এক শ্রেণীকে দমন করার জন্য এক শ্রেণীর হাতে সংগঠিত ক্ষমতা’ ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত এই ছোট্ট পুস্তিকা ইউরোপ জুড়ে  আলোড়ন তোলেপ্যারিস থেকেই শুরু হয় অপরিসীম দারিদ্র্। আর সাথে ছিল ইউরোপীয় রাষ্ট্রশক্তির প্রবল বাধার মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই। যে লড়াই তাঁদের লড়তে হয়েছে  জীবনের শেষ দিন অবধি । এই লড়াইয়ে মার্কস এবং জেনির পাশে এসে দাঁড়ান তাঁদের অকৃত্রিম বন্ধু কমরেড ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। ১৮৪৫ সালে মার্কসকে তাঁর পরিবারসহ প্যারিস থেকে নির্বাসিত করে প্রাশিয়ান সরকার।  তাঁরা চলে যান ব্রাসেলস-এ

১৮৪৮ সালে জার্মানি এবং অস্ট্রিয়াতে বুর্জোয়া বিপ্লব শুরু হলে মার্কসকে বেলজিয়াম থেকে বিতাড়িত করা হয়। বুর্জোয়া বিপ্লবের ঝড় ঝাপটা পেড়িয়ে সপরিবারে মার্কস পৌঁছান জার্মানির কোলোন শহরে। সেখানে তিনি ‘রাইন অঞ্চলের নতুন সংবাদপত্র’ নামে একটা পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। তবে খুব বেশি  দিন তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি প্রতিক্রিয়াশীলরা।  প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কারণে আবার তাঁকে বেছে নিতে হয় নির্বাসিতের জীবন। মার্কসরা চলে যান প্যারিসে সেখান থেকে আবার নির্বাসিত হয়ে লন্ডনে। বাকি জীবনটুকু তাঁদের সেখানেই কাটে

১৮৬৪ সালে মার্কস এবং এঙ্গেলস তৈরি করেন শ্রমজীবী মানুষের প্রথম আন্তর্জাতিক সংঘ।  ১৮৭১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিকের ফরাসি বিপ্লবীরা প্রতিষ্ঠা করেন প্যারিস কম্যুন। কম্যুনার্ডদের হঠকারী সিদ্ধান্তের সাথে মার্কস-এঙ্গেলস একমত না হলেও, তাঁরা তাদের স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।  যাইহোক, খুব বেশিদিন টেকেনি এই সংগঠন। ১৮৭২ সালে হেগ সম্মেলনে রুশ নৈরাজ্যবাদী নেতা বাকুনিনের সাথে মার্কস-এর প্রবল বিতর্ক হয় এবং বাকুনিন বিতাড়িত হন। বাকুনিনপন্থীদের হাত থেকে সংগঠনকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিকের কার্যালয় স্থানান্তরিত করা হয় আমেরিকার ন্যুইয়র্ক-শহরে।। ১৮৭৬-এর ফিলাদেলফিয়া সম্মেলনের পর প্রথম আন্তর্জাতিকের পতন ঘটে—শেষ হয় শ্রমিক আন্দোলনের এক বৈচিত্র্যময় অধ্যায়

মার্কস ও জেনি মোট ছয় সন্তানের জন্ম দেন— জেনি ক্যারোলিন(১৮৪৪-১৮৮৩), জেনি লরা (১৮৪৫-১৯১১), এডগার(১৮৪৭-১৮৫৫), হেনরি এডওয়ার্ড গাই (১৮৪৯-১৮৫০), জেনিইভলিন ফ্রান্সেস (১৮৫১-১৮৫২), জেনি জুলিয়া এলিনর(১৮৫৫-১৮৯৮) এছাড়াও আরও একটা পুত্র সন্তান তাঁদের হয়েছিল। পর্যাপ্ত খাদ্য না পেয়ে সে জন্মের এক সপ্তাহ পরেই মারা যায়। ফলে নামকরণের আর সময় হয়ে ওঠেনি!

গ্রন্থাবলী
১৮৪৮-এ প্রকাশিত ‘কম্যুনিস্ট ইস্তাহার’ ছাড়াও মার্কস বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ১৮৪৪ সালে  রচনা করেন ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খসড়া’ ঐ বছর ব্রুনো বাওয়ার-এর মতামতের সমালোচনা ক’রে তাঁর প্রবন্ধ ‘ইহুদী প্রশ্ন প্রসঙ্গে’ প্রকাশিত হয়। ১৮৪৫ সালে তিনি লেখেন ফয়েরবাখ-এর উপর তাঁর বিখ্যাত থিসিস। সেই বছরই এঙ্গেলস-এর সাথে মিলে রচনা করেন ‘পবিত্র পরিবার’ এবং ‘জার্মান মতাদর্শ’ নামে দুটো বই। ১৮৪৭-এ প্রুধোর ‘দরিদ্রের দর্শন’ নামক ইস্তাহারের সমালোচনা ক’রে মার্কস রচনা করেন ‘দর্শনের দারিদ্র’ ঐ একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর ‘মজুরি শ্রম ও পুঁজি’ পুস্তিকা। ১৮৫২-তে মার্কস লেখেন ‘লুই বোনাপার্টের আঠারোই ব্রুমিয়ের’

৫0-এর দশকের শেষ থেকে মার্কস অর্থশাস্ত্র বিষয়ে বিভিন্ন বই ও পুস্তিকা রচনা করেন। ১৮৬৭-তে প্রকাশিত হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ ‘পুঁজি’(প্রথম খণ্ড) এখানে মার্কস পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাটা-ছেঁড়া ক’রে তার শোষণের দিকগুলো উন্মোচিত করেন। তবে মার্কস পুঁজি শেষ ক’রে যেতে পারেননি। মার্কস-এর পাণ্ডুলিপির থেকে বই-এর পরের দুই খণ্ড সম্পাদনা করেন এঙ্গেলস। ১৮৭১ সালে প্যারিস কম্যুন সম্পর্কে মার্কস তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন ‘ফ্রান্স-এ গৃহযুদ্ধ’ বইতে। ১৮৭৫ সালে ল্যাসাল-এর মতাদর্শের আদলে গড়ে ওঠা কর্মসূচির সমালোচনা ক’রে তিনি লেখেন ‘গোথা কর্মসূচির সমালোচনা’

এছাড়াও মার্কস অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা এবং প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর চিঠিপত্রের সংকলন এবং গাণিতিক পাণ্ডুলিপিটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতবর্ষ নিয়েও মার্কস ছিলেন অত্যুৎসাহী। ভারতের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ, ব্রিটিশ শাসনের চরিত্র ইত্যাদি নিয়ে তিনি গভীর ভাবে চর্চা করেন এবং কিছু কালজয়ী নিবন্ধ রচনা করেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর যৌথ সংগৃহীত রচনাবলীর সংখ্যা মোট ৫০

মার্কসবাদমেহনতী মানুষের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হাতিয়ার

মার্কসবাদের মর্মবস্তুকে মার্কস নিজেই তুলে ধরেছেন, ‘‘দার্শনিকরা এতকাল নানাভাবে দুনিয়াটাকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু আসল কথা হলো একে পরিবর্তিত করা।’’ শোষণহীন উন্নততর পৃথিবী গড়ার মতাদর্শ হলো মার্কসবাদ। সমগ্র দুনিয়ার মেহনতী মানুষের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হাতিয়ার হলো মার্কসবাদ।

এটা সত্য যে, পৃথিবীব্যাপী ধনিকশ্রেণী শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলনের শক্তিকে  ভয় পায়। ওরা ভয় পাক। ওরা কাঁপতে থাকুক। শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিকশ্রেণীর হারাবার কিছু নেই।জয় করার জন্য রয়েছে সমগ্র জগৎ।

মৃত্যু

১৮৮১ সালের ডিসেম্বরে জেনি মারা যাওয়ার পর মার্কস এক ধরণের catarrh-য় আক্রান্ত হন এই রোগ তাঁকে জীবনের শেষ ১৫ মাস অসুস্থ করে রাখে এই রোগ পরবর্তীতে ব্রঙ্কাইটিস ও সব শেষে pleurisy তে পরিণত হয়  pleurisy-র কারণেই ১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়মৃত্যুর আগে শুধু রোগ নয়, ছিল চরম অর্থ কষ্ট।  তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় তাঁর স্ত্রীর সমাধিস্থলের পাশে, হাইগেট গোরস্থানে

মৃত্যুর সময় মার্কসের কোন জাতীয়তা তথা দেশ ছিল না। তাঁর সমাধি ফলকে দুটি বাক্য লেখা আছে প্রথমে লেখা, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ লাইন ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ (Workers of all land unite), এরপরে লেখা ১১তম থিসিস অন ফয়ারবাখ-এর এঙ্গেলীয় সংস্করণের বিখ্যাত উক্তি, ‘এতোদিন দার্শনিকেরা কেবল বিশ্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করে গেছেন, কিন্তু আসল কাজ হল তা পরিবর্তন করা’ (The Philowophers have only interpreted the world in various ways – The point however is to change it.)

মার্কসের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে মাত্র ১১ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এ সম্পর্কে এঙ্গেল্‌স লিখেন,

১৪ই মার্চ বিকেল পৌনে তিনটায় জীবিতদের মাঝে সেরা চিন্তাবিদ তাঁর
চিন্তার পরিসমাপ্তি ঘটান। মাত্র দুই মিনিটের জন্য আমরা তাঁকে রেখে
বাইরে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে তাঁকে তার আর্মচেয়ারে বসা অবস্থায়
পেলাম, তিনি ততক্ষণে শান্তিতে নিদ্রায় গিয়েছেন- চিরদিনের জন্য।

 

১৯৭০ সালে  ডাকাতেরা ঘরে তৈরি বোমার মাধ্যমে তার কবর ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা করেএঙ্গেল্‌স ছাড়া শেষকৃত্যে উপস্থিত অন্যান্যরা হলেন, মেয়ে এলিনর (সমাজবাদী ও বাবার সম্পাদনা সহযোগী), মেয়েদের ফরাসি সমাজবাদী স্বামী Charles Longuet ও Paul Lafargue, Liebknecht (জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা), Longuet (ফরাসি শ্রমজীবী রাজনীতির বিখ্যাত ব্যক্তি); Friedrich Lessner (১৮৫২ সালে Cologne-এ সাম্যবাদীদের বিচারের পর তিন বছর কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন), G. Lochner (কমিউনিস্ট লিগের অন্যতম প্রবীণ সদস্য), Carl Schorlemmer (ম্যান্‌চেস্টারে রসায়নে অধ্যাপক, রয়েল সোসাইটির সদস্য এবং কমরেড); Ray Lankester, স্যার জন নো এবং লিওনার্ড চার্চ। ফরাসি ও স্পেনীয় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আসা দুটি চিঠি পড়ে শোনানো হয়। আর এঙ্গেল্‌স বক্তৃতা দেন, এ-ই ছিল শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা।

 

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts