কোথায় গেলো সিনেমার জোয়ার?

কোথায় গেলো সিনেমার জোয়ার?

জোয়ারের পর আসে ভাটা আর ভাটার পরেই-জোয়ার। এইতো প্রকৃতির নিয়ম। সিনেমার জগতেও তাই হওয়ার কথা। একদিন জোয়ার ছিলো, ব্যাপক জোয়ার ছিলো সিনেমা জগতে। ব্যাপক জোয়ারে ছবিঘরের সামনে উপচে পড়তো দর্শকের  ঢল। ঈদে-পূজোয় নতুন ছবি মুক্তি উপলক্ষে টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন যেনো জনতার ঢল নামতো। সিনেমার জোয়ারের সেই যুগে ছবিঘরে মাসের পর মাস এক ছবি চলতো, তবুও সর্ব শ্রেণীর দর্শকের ভিড় সামাল দেয়া সম্ভব হতো না। এমনকি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেও এ জন্য হিমশিম খেতে হতো। এদিকে তখনকার দিনে সিনেমা হলের সামনে ঢাক-ঢোল বাদ্যের তালে তালে থাকতো নৃত্য, এরই সঙ্গে মাইকে বাজানো হতো- ‘মনে যে লাগে এত রং ও রঙিলা’ সহ কতনা গান। যুগের পর যুগ ধরে সিনেমার বহু গান শুনেছে দর্শক-শ্রোতা। সিনেমা নিয়ে কত গবেষণা, প্রিয় তারকাকে নিয়ে ভক্তরা একে অপরের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়তো। দুঃখ হলেও সত্য যে, আজও ছবি হয়-কিন্তু ছবিঘর যায় ফাঁকা। নেই দর্শকের ভিড়-আগ্রহ জাগে না মানুষের মনে সিনেমা-টিনেমা নিয়ে। কোনো ছবিই যেনো এখন আর দর্শক টানতে পাড়ছে না। আমরাতো জানি, ভাটার পরে আসে জোয়ার, সর্বক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটা দেখা গেলেও বর্তমানে শুধু সিনেমা শিল্পেই নেই আর জোয়ার। শুধুই যে বইছে ভাটা আর ভাটা। এখন যারা সিনেমা বানান তাদের মধ্যে মেধার অভাব আছে তাও বলবো না। যথেষ্ট মেধাবান তারা-তারপরেও তারা ভালো ছবি উপহার দিয়ে দর্শককে টেনে নিতে পারছে না-এইতো হলো এখনকার সিনেমা শিল্পের বাস্তব ঘটনা। ৩০-৩৫ বছর আগে কিংবা তারও আগে ‘জোয়ার এলো’ নামেসহ অসংখ্য ছবি সেদিন জোয়ার বইয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশের প্রতিটি ছবিঘরে।

আবদুল জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’- এর পরে নির্মাণ করেছিলেন ‘জোয়ার এলো’। দুই বছর ধরে ছবির শ্যুটিং শেষে ‘জোয়ার এলো’ মুক্তি পায় ১৯৬২ সালে। বছরের পর বছর এই ছবি চলেছে ছবিঘরগুলোতে। বান ডাকে সাগরে, জোয়ার আসে নদীতে। প্লাবিত হয়ে যায় দেশ। নতুনরূপ ও শ্রী নিয়ে আবার জেগে উঠে দেশ। তেমনি জোয়ার আসে মানুষের জীবনেও -এমনি এক প্রণয় মধুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো ‘জোয়ার এলো’র কাহিনী। বেদের মেয়ে তারাবানুর সংগে প্রথম পরিচয় হয় জমিদার পুত্র হারুনের সাথে। হারুন জানতো না  তারাবানু বেদে দলের ভবিষ্যত সরদার বাহাদুরের বাগদত্তা। হারুন ও তারাবানুর প্রেমের আনা গোনা অনেক দূর এগিয়ে যায়। এদিকে তারাবানুর বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায় বাহাদুরের সাথে। বেদের বহরে চলে আনন্দের ফোয়ারা। নাচে গানে ভরে তোলে বিয়ের দিনটিকে-কিন্তু তারা বানুর চোখের জলে দরিয়া বয়ে যায়। বাহাদুর ভাবে-তারাবানু কাঁদে কেন? তবে কি সে এখনও জমিদার পুত্র হারুনকে ভালোবাসে? অন্তর্দ্বন্দ্বে হেরে যায় বাহাদুর। যেভাবেই হোক তারাবানুকে সে খুশি করবে, তারাবানুই যে তার সব। পরদিন সরদারকে জানায় সে তারাবানুকে বিয়ে করবে না। সরদার ভীষণ রেগে যায় বাহাদুরের উপর। সরদারকে বাহাদুর বোঝায় তারাবানু জমিদার ছেলে হারুনকেই ভালোবাসে, তাকেই সে পেতে চায়। সরদার ভাবে সে সামান্য বেদে আর হারুন বড়লোক জমিদার না-না এ অসম্ভব। বাহাদুর সরদারকে স্মরণ করিয়ে দেয় জমিদারের প্রতিশ্রুতির কথা। বেদের দল বহর নিয়ে আবার ফিরে এলো কমলা ঘাটে। কিন্তু জমিদার প্রতিজ্ঞা পালনে অক্ষমতা জানায়। কলমা ঘাট ছেড়ে বেদের বহর আবার ফিরে চলে নিরুদ্দেশের পানে। নৌকার ভিতরে ডুকরে কেঁদে উঠে তারাবানু। এদিকে প্রেমের কাছে নতি স্বীকার করে অভিজাত্য। ঘোড়া নিয়ে ছোটে হারুন তারাবানুকে ফিরিয়ে আনতে। দূর থেকে হারুনকে দেখে তারাবানু ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে-হারুন বুকে টেনে নেয় তারাবানুকে। ঘটে উভয়ের মিলন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে বাহাদুর।

‘জোয়ার এলো’র মতো পরবর্তীতে সিনেমা জগতে জোয়ার এনেছিলো- ‘রূপবান’, ‘চান্দা’, ‘বঁধুবিদায়’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘অবুঝ মন’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’- এরকম বহু ছবি। বহু দর্শকের স্মৃতিতে স্মরণীয় হয়ে থাকলো, সিনেমা দেখার গৌরবোজ্জ্বল সেই দিনগুলি। অথচ এখনও ছবি হয়, নেই কোন আলোচনা, পড়ে না কোন হৈ চৈ। আজকাল দর্শক বিমুখ সিনেমা দেখতে-মুলতঃ ছবিতে ভালো গল্প, সংলাপ, শ্রুতিমধুর গানের অভাবেই সিনেমা জগতে এখন চলছে ভাটা, বড়ই ভাটা বইছে চিত্রজগতে। কিন্তু আমরা সিনেমা প্রেমিকরা এ থেকে উত্তরণ চাই-সিনেমা জগতে আবার ফিরে আসুক জোয়ার। সেই অনাগত দিনটির অপেক্ষায় এখন।

লিয়াকত হোসেন খোকন
লিয়াকত হোসেন খোকন

 

Author: লিয়াকত হোসেন খোকন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts