গৃহপালিত দুঃখের ফেরিওয়ালা

গৃহপালিত দুঃখের ফেরিওয়ালা

দুঃখ কী তবে কোনো মোহমন্ত্র-বাণী এর সুর স্পর্শ পেয়ে শান্ত-শিষ্ট পৃথিবীর হঠাৎ মাতাল কোনো তরী বোবা-কালা রাত্রিও হয়ে ওঠে ছলনাসুন্দরী। একটি পুরনো দুঃখ কোনোকালে গেঁথেছিল মনের কফিনে এখন সে লাশ হয়ে কেঁদে ওঠে যখন-তখন। বলছিলাম কবি আমিনুল ইসলাম সেলিম, একজন নিভৃতচারী কবি, সংগঠক এর কথা। তাকে নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়নি। তিনি প্রচারবিমুখ, নীরবে কবিতার চাষাবাদ করা এক কবি।

কবি আমিনুল ইসলাম সেলিম সাহিত্যের নানামাত্রিকতায় যুক্ত একজন মুক্ত, স্বাধীনচেতা মানুষ। তবে তিনি নিজেকে নিজেই বার বার খুঁজে   ফেরেন কবিতার ভেতর। তার প্রকৃতি কবিতার ভেতর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন নিত্যদিন। কবিতার ভেতর ডুবে থেকেই তিনি খুঁজে ফেরেন স্বদেশের পুণ্য মুখ, বৈশ্বিক প্রাণের মেলবন্ধন। পৃথিবীর সব সত্য ও সুন্দরকে তিনি তুলনা করেন কবিতার সাথে। তিনি মনে করেন কবিতাই হচ্ছে সত্য ও সুন্দরের সাধনা। আর সে বিশ্বাস বুকের ভেতর ধারণ করেই তিনি নিরন্তর হেঁটে বেড়াতে চান বিশুদ্ধ পাঠকের প্রশস্ত মনোভূমিতে। আমরা তার কবিতা পাঠে খানিক দুঃখের সাথে পরিচিত হই

 

পালিয়েই যাবে যদি

বৃথা কেন উড়ালে ফানুস

 

আমাকে কী দেবে

আমি আর কতোটা মানুষ?

[ আমাকে কী দুঃখ দেবে ]

 

আমি তো ঘুমিয়ে থাকতি চাই শান্তিনিন্দ্রায়

আমার একাগ্রচিত্ত শীতলপাটি বিছানায়

তোমরা কেনো জাগাও আমাকে অকস্মাৎ?

চিৎকার করে যখন সিথানে আমার

কেনো তোমরা অনর্থক ভেঙে দাও ঘুমের সংসার?

[ ঘুমন্ত সত্তা ]

 

কবি আমিনুল ইসলাম সেলিম তার ‘গৃহপালিত দুঃখ’ কবিতাগ্রন্থে দুঃখের সাথে তার বসতি আর দুঃখগুলোকে সে জীবনের সাথে গাঁটবাধা করে রেখেছেন কবিতার অনাবিল পঙ্ক্তিমালায়। আমরা তার কবিতাগ্রন্থটির পুনঃপাঠ করলে তারই অনুরণন দেখতে পাই, খুঁজে পাই কবিতার ভেতর মাটি-মানুষ আর যাপিত জীবনাচারের দুঃখে ঘেরা আলেখ্য।

 

ছুঁবো না ছুঁবো না বলে কতোবার ছুঁয়েছি হৃদয়

ছুঁয়ে দেখি স্বপ্নেরও প্রতারণা আছে

যন্ত্রণার বেহিসেবি বাড়াবাড়ি আছে

ভুলের নেকাব পরে অসময়ে কাঁদে সুসময়

মনে হয় সকল হৃদয় যেনো বানে ভাসা ঘর

[ প্রত্যার্পন ]

 

আজ রাতে হঠাৎ তোমাকে খুব করে মনে পড়লো

চোখের কোণ বেয়ে নির্লজ্জের মতো নেমে যাওয়া

কয়েক ফোটা জলের কণা সাক্ষী

খা খা রোদে পোড়া স্তব্ধ দুপুরের মতো

রাতের অন্তহীন নির্জনতা সাক্ষী

আনমনে ঢুকে পড়া আমার গৃহবন্দি

একমাত্র উড়ন্ত জোনাকপোকাটি সাক্ষী

কবিতা লেখার নিষ্পাপ কলম আর

চেপে ধরা তিনটি আঙুল সাক্ষী

আমার জানালায় বসে থেকে আজ সারাটি রাত

কেবল অন্ধকারের গল্পই শুনেছে

[ অপেক্ষার গল্প ]

 

আমিনুল ইসলাম মামুন এর কবিতায় নারী, দুখঃবোধ আর সময়ের ঘটে যাওয়া চলমান জীবনের বেদনাহত কষ্টগুলোকে গভীর মমতায় লালন করেছেন কবিতার পঙ্ক্তিমালায়। দুঃখকে যে লালন করা যায়, পালন করা যায়, তারই সরল পটভূমি এঁকেছেন কবিতার উর্বর জমিনে

 

একটি পুরনো দুঃখ হলুদ পাতার মতো

লক্ষ্যহীন পাক খেয়ে উড়ে উড়ে গেলে

স্নায়ুর পৃথিবীটাকে আলোড়িত করে

নৃত্যামোদী শূন্যতায় গড়ে ওঠে ঘুমগ্রস্থ আকাশ গহ্বর

[ একটি পুরনো দুঃখ ]

 

কার কান্না শব্দ তুলে বুকের মিনারে?

বিপরীত বিন্দু বিন্দু থেকে বেজে চলে কার বাঁশি

এমন আকুল?

 

[ নারী ]

 

কবি দিনের শুরুতে ভোরের জানালায় হায়েনার রক্তলোভী নখের আঁচড় থেকে বাঁচতে চান। কবি রক্তমাখানো ভোরের আঁচড় না নিয়ে কী খুঁজে ফেরেন? কবি সত্যানুন্ধানে খুঁজে ফেরেন নারীর মমতামাখা হাত, স্নেহের পরশ মাখানো মুখচ্ছবি। কবি তো এসব ধারণ করতে চেয়েছেন, এসবই লালন করতে চেয়েছেন। কবির দুঃখের কথা দুঃখের বেসাতি কেউ খোঁজ নেয়না। তাইতো তিনি কাঁটাভরা পথ থেকে অাঙুলে অনন্ত সময়কে গেঁথে নিয়ে তার নিজস্ব পথের সন্ধানে ফেরি করেন অনন্ত সময়কে।

 

এখন প্রতিটা ভোরে জানালায় লেগে থাকে

হায়েনার রক্তলোভী নোখের আঁচড়

মনোদেহে ক্ষতচিহ্ন বেড়ে যায় রোজ

আমি এই রক্তমাখা ভোর তো নেবো না

 

এখন সকালজুড়ে অকালের চোখ লাল

ফুলের বাগানে হাঁটে জলজ্যান্ত সাপ

কলিজায় অহরহ বিঁধে যায় বিষাক্ত ছোবল

আমি এই বিষমাখা সকাল নেবো না  

[ কী নেবো, কী নেবো না ]

 

অফুরান কাঁটাভরা পথ হোক

আঙুলে আঙুল গেঁথে হেঁটে যাবো অনন্ত সময়

হেঁটে যাবো আমাদের গন্তব্যের খোঁজে

এমনই তো কথা ছিলো?

[ নিঃসঙ্গতা ]

কবির দুখের সাথে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা জাগ্রত থাকে। সমাজের নানান অসঙ্গতি আর বঞ্চনার করাল গ্রাসে যেখানে অপশক্তি আর অপরাজনৈতিক ঝঞ্ঝাটে দেশ-জাতি জর্জরিত, ঠিক তখনই দেশি বিদেশি কুচক্রীদের পেতাত্মা ভর করে স্বদেশের পবিত্র ভূমিতে। কবির মন বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। তাইতো কবি বিদ্রোহে আর বিপ্লবে তার প্রাণের আলোর ছোঁয়া জাগ্রত হয়। হাওয়ার সাথে সাথে নতুন ভোরের ইঙ্গিতের আভাস অনুভব করেন।  

 

বিদ্রোহ আর বিপ্লবে জাগে প্রাণ

জাগে তিতুমীর ঈশাখাঁর সন্তান

স্বদেশি শকুন ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় মাটি

মাঠে ময়দানে প্রেতাত্মাদের ঘাটি

ফুলে ফুলে ওঠে শহর গঞ্জ গ্রাম

রাখবেই তারা মাটি ও প্রাণের দাম

[ শুনেছি যখন সমুদ্রগর্জন ]

 

হাওয়ার কোনো ঘ্রাণ থাকে না

আলোর কোনো রঙ থাকে না

বদলে যাবার আগেই তুমি বলেছিলে

সকাল হবার অনেক আগেই ভোর দেখাবে

[ হাওয়ার কোনো ঘ্রাণ থাকে না ]

 

আমাদের সমাজের মানুষের বেড়ে ওঠা আর অনিশ্চয়তার দোলাচল কবিকে তাড়িত করে। কবির হৃদয়ে অনুরণিত হয় জীবনের গন্তব্য কথা বার্তাহীন পড়ে থাকা মাটির সিথানে। অথবা কবিকে পোড়ায়, কবিকে জ্বালিয়ে অঙ্গার করে ঋদ্ধ করে কবি মনন। সে কারণেই তার ব্যাকুল হৃদয়ের গোপন জমিনে পুষে রাখা বেদনার নির্যাসটুকু নিংড়ে দেন অপার আনন্দলোকে।

 

মানুষেরা ক্রমশই বেড়ে ওঠে কোনোরূপ নিশ্চয়তাহীন

ধাবমান ট্রেনের শেষ স্টেশনের মতো আমরাও জানি

জীবনের গন্তব্যকথা, জানি আছে নিশ্চিত অবসর

জানি, চিরদিন থাকে না সবুজ নির্মল বৃক্ষলতাপাতা

হলুদ খামের মতো বার্তাহীন পড়ে থাকে মাটির সিথানে

[ লোকান্তর ]

 

আজন্ম আগুনের সঙ্গে থেকে থেকে

আমি আজ নিজেই আগুন

কার সাধ্য আমাকে পোড়ায়?

[ নিজেই আগুন ]

 

কবিরা সব সময়ই সুন্দরের পূজারী হন। তার লালিত স্বপ্নগুলো সবসময় সুন্দর আর সত্যের আবরণে মায়াবী শরীর হয়ে লেপ্টে থাকে। কবি তার কল্পনায় প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নিজস্ব ভঙ্গিমায় অপরূপ মাধুর্যমন্ডিত করে তুলে অানেন। যা কবিতার পাঠকমাত্রই তার রসবোধ উপভোগ করেন।

 

তোমার সুতীক্ষ সৌন্দর্যের সুঁচ

আমূল বিদ্ধ করে আমার হৃদয়

আমি যন্ত্রণায় ছটফট করে বারংবার

নির্লজ্জের মতো তাকাই তোমার দিকে

তোমার উদার কৃপাদৃষ্টির আশায়

[ সৌন্দর্যসুঁচ ]

তবু এই ভেবে ভালো লাগে

স্বপ্নেরও হাত আছে, চোখ কান নাক আছে

কাক্ষিত ফুলের প্রতি পক্ষপাত আছে

তাই সব সুখ-দুঃখ কল্পনার রঙে অমলিন।

[ কল্পনার রঙ ]

 

কিছু কিছু বিরহকে না পুষে উপায় নেই

যতোদিন পোষ মেনে প্রিয় পাখি ফিরবে না নীড়ে

কিছু কিছু ভালোবাসা রাত জেগে কাঁদে

দুচোখে আঁদার-কালি, দেখে না সকাল

[তোমাকেই চাই ]

 

প্রতিদিন লুট হয় জোসনাপ্রহর

প্রতিদিন লুট হয় আনন্দবাহার

লুট হয় মানবতা

সুখের কবিতা

আমাদের আজ বড় দুঃসহকাল!

আমরা কি তবে প্রতিবন্ধি হয়ে যাবো?

[ দুঃসহকাল ]

 

কবিরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হন। কবি আমিনুল ইসলাম সেলিমও তেমনি। তার কবিতার পরতে পরতে আবেগ, প্রেম, দ্রোহ আর বেদনার রসায়ন পাওয়া যায়। যা থেকে পাঠক এক ধরণের ভিন্ন আস্বাদন অনুভব করেন। এখানেই কবি আমিনুল ইসলাম সেলিমের অনন্য স্বকীয়তা প্রস্ফুটিত হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে। কবি অনন্ত আঁধারের গায়ে প্রথম আগুন জ্বেলেছেন আর পুড়িয়েছেন ভেতরের যাবতীয় জঞ্জাল। ভালোবাসার কাঙাল কবি ভালোবেসে অকৃপণ সুরে বাজাতে চেয়েছেন ছন্দের ঝংকার। হয়তো পেরেছেন না হয় পারেননি। এ প্রশ্ন কবির কাছেই থেকে যাক, কবির মনের অগোচরে শিষ কাটুক অনাদিকাল।

 

তোমার ভেতরবাড়ির অনন্ত আঁধারের গায়ে

আমিই প্রথম জ্বেলেছি আগুন

জমিতে শুকানো আগাছা পোড়ানোর মতোই

পুড়েছি তোমার ভেতরের যাবতীয় জঞ্জাল

বুকের খামারে অজান্তেই বেড়ে ওঠা

যাবতীয় ক্লেদ আমিই দিয়েছি তাড়িয়ে

[ অভিমান ]

 

একদিন শিরোনামহীন গল্প ছিলাম আমি

হৃদয়ের শিরায় শিরায় কেবলই প্রবহমান ছিলো

দুঃখ জাগানিয়া রক্তস্রোত

তোমাকে ভালোবেসে হতে চেয়েছিলাম

একটি উৎকৃষ্ট কবিতা

অকৃপণ সুখে বাজতে চেয়েছিলাম ছন্দের ঝংকারে

[ উপসংহার ]

 

Author: আনোয়ার কামাল

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts