গ্রেটওয়ালের দেশে

এক নভেম্বর দুহাজার ষোল।

চীনের সাথে আমাদের দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এতদূর নিবিড় যে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চীন ভ্রমণ আমাদের নাগরিকগণের কাছে একেবারে নস্যিতুল্য। কিন্তু আমার কখনো যাওয়ার সুযোগ হয়নি। সুযোগ এল হঠাৎ । দুহাজার ষোল খৃষ্টাব্দের পয়লা নভেম্বর ফ্লাইট। ঢাকা থেকে সবচাইতে কমন চৈনিক বিমান পরিবহন সংস্থা চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনে আমার যাত্রাসূচি স্থির হলো। আমার সফরসঙ্গী তিনজন কর্মকর্তা সালাউদ্দিন, সুমন দাস ও মিশুডিপার্চার চেকিং সেকশন (ডিসিএস) থেকে ডিপার্চার চেকিং করে মালপত্র কনভেয়ার বেল্টে দিয়ে দিলাম। বোর্ডিং কার্ড ইস্যুকালিন ডিসিএস এর কর্মকর্তাকে বললাম, ভাই প্রথমবার চীনদেশে যাচ্ছি, একটু উইণ্ডো সিট দেবেন। তিনি বললেন, সরি আপনার সিট দেয়া হয়ে গেছে, সিট নং ৪৭ জে। ঠিক আছে, বলে চললাম ইমিগ্রেশন সেকশনে। এখানে এসে দেখি একেবারে ফাঁকা। কোনো ভিড় বা কিউ না দেখে ভাবলাম এখানে হয়ত ইমিগ্রেশন হচ্ছে না। আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। এমন সময় একটি কাউন্টারে উপবিষ্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ আহবান করল, স্যার, এদিকে আসুন।

-বলছেন কি?আমি তো কোনো কিউ না দেখে কনফিউজড ছিলাম এখানেই সঠিক জায়গা, না কি সময় হয়নি ইমিগ্রেশনের।

তিনি একবার ক্যামেরার দিকে তাকাতে বললেন। অফিসিয়াল পাসপোর্ট দেখে জি.ও.-র কপি চাইলে, কোর্টের পকেট থেকে এক কপি বের করে দিলাম। তিনি ডিপার্চার সিল মেরে ফেরত দিলেন পাসপোর্টখানা। এরপর হ্যাণ্ডলাগেজ নিয়ে ওয়েটিং লাউঞ্জে গিয়ে বসতেই লক্ষ্য করলাম বেইজিং ও কুনমিং এর অন্যান্য যাত্রীরা সব আসতে লাগলো। ফ্লাইট ০২টা ৪৫ মিনিটেফাইনাল সিকিউরিটি চেক এর গেট খুলতে ঢের দেরি আছে।

 

আমি বসে বসে অপেক্ষা না করে  ফ্লোরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সাজানো ডিউটিফ্রি শপ ও অন্যান্য শপগুলো ঘুরে দেখতে মনস্থ করলাম। যাত্রাপথে আগ্রহের কোন বই কিনে পড়বার অভ্যাস আমার বহুদিনের এমনকি সড়ক বা রেলপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও তাই। কোন বুক শপ খুঁজে না পেয়ে একটি ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম ,  ভাই এখানে বুকশপ কোথায়? দোকানি উত্তর দিলেন, ভাই আগে একটি ছিল, বর্তমানে উঠে গেছে। কেন ভাই, সব দেশের বিমানবন্দরেই তো বুকশপ থাকে। যেখানে সে দেশের এবং বিদেশের বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর বই, পত্রিকা, জর্ণাল বা ম্যাগাজিন থাকে। ভারতের কলকাতা বা ভুটানের পারো বিমানবন্দরেও দেখেছি, দিল্লী মুম্বাইয়ের কথা বাদই দিলাম। বিদেশি ভ্রমণকারীরাও এখান থেকে সেই দেশের বই এবং পত্র-পত্রিকা কিনে থাকে। এবারে কণ্ঠে খেদ মিশিয়ে দোকানি বললেন, স্যার আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু কী করে বুকশপ থাকবে বলুন। এখানে আমার এই ছোট্ট ফাস্টফুডের দোকানের জন্য মাসে দেড়লক্ষ টাকা ভাড়া গুণতে হয়। আমাদের লাভ না হলেও পুষিয়ে যায়। কিন্তু বইয়ের ক্রেতারা তো পাঠক, যারা রুচিশীল সংস্কৃতিমনা, এরকম যাত্রী তো খুব কম। যদি দোকানের ভাড়া কমত, তবে বুকশপ দিয়ে টিকে থাকা যেত। সরকার যদি এদিকে নজর না দেয়, তবে বইয়ের দোকান কে করবে? বোঝা গেল ভদ্রলোক খানিকটা দরদ ও খানিকটা বাস্তবতা মিশিয়ে খেদের সাথে কথাগুলো বললেন। আমি আহা! চুচুচু, আফসোস করতে করতে  দোকানের সামনে থেকে অন্তর্হিত হলাম।

সময়মত ফাইনাল সিকিউরিটি গেট ওপেন হলে আমরা কোট, বেল্ট, ওয়ালেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি সব ট্রে-তে রেখে গেট পেরিয়ে দুহাত উঠিয়ে চেকড হয়ে এয়ারক্র্যাফট পরিবহনের বাসে গিয়ে আরোহন করলে বাস আমাদেরকে এয়ারক্র্যাফটের ঠিক সামনে এনে নামিয়ে দিল। বিমানের সিঁড়ি দিয়ে উঠলে গেটের মুখে বিমানবালারা স্বাগতসূচক সম্ভাষণ করলেন।

 

চায়না ইস্টার্ণ এয়ারলাইনের বিমানখানা অপরাহ্ন ঠিক সোয়া তিনটায় নড়ে উঠে চাকায় ভর করে চলতে শুরু করল। সাড়ে তিনটায় ওটা টেক-অফ করে আকাশে উঠে গেল কুনমিং এর পথে। দৈবক্রমে  আমার নির্ধারিত সিট ৪৭ জে উইণ্ডো-সাইড সিটই ছিলফলে ভূমিতে ম্যাচবক্স বাড়ি-গাড়ি আর ঊর্ধ্বাকাশে পেঁজা তুলোর বিছানা আর তার ওপরে দিগন্ত ছোঁয়া পরিচ্ছন্ন নীল আসমান কোনটি দেখতেই কোনো অসুবিধে হলো না।

দু’ঘন্টা দশ মিনিট পর আমরা কুনমিং বিমানবন্দরে অবতরণ করলামকুনমিং এ এসে কুনমিংযাত্রীদের সাথে বেইজিংযাত্রী সকলকেই এয়ারক্র্যাফট থেকে নামতে হলো চীনদেশে আমাদের প্রথম চেক-আপের জন্যএখানে আমাদের নতুন করে কুনমিং টু বেইজিং এর বোর্ডিং কার্ড ধরিয়ে দেয়া হল। ইমিগ্রেশন ও সিকিউরিটি চেক এর পর আমাদের একুশ নং গেট দিয়ে বের হয়ে এয়ারক্র্যাফটে উঠতে হবে, তাও বলে বলে দিলেন বোর্ডিং কার্ড দাত্রী চীনা লেডি।

আমরা চারজন এবং আরো দুজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ভদ্রলোক একসাথে যাচ্ছিলাম এসব কাজ দ্রুত সম্পন্ন করবার জন্য। হঠাৎ মিশু তার বোর্ডিং কার্ড সামনে ধরে লেবাসধারী একজন চীনা এয়ারপোর্ট কর্মকর্তাকে  জিজ্ঞেস করে বসলো, এক্সকিউজ মি, হোয়্যার ইজ দ্য গেট নং টুয়েন্টি ওয়ান?  তিনি আমাদেরকে যে পথ দেখালেন, তা ছিল একটি ভুল পথ। ওই পথে গিয়ে আমরা আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও একুশ নম্বর গেট পাই না। সুতরাং আবার একই পথে পুরো এলাকা ঘুরে এসে  ফাইনাল সিকিউরিটি পয়েন্ট পেলাম। এখানে আমাদের জুতো ওয়ালেট পর্যন্ত খুলে  দেখিয়ে পার হতে হলো।

বিমানে উঠে দেখি এয়ারক্র্যাফট একই আছে, কেবিনক্রু সব চেঞ্জ হয়ে গেছে। কুনমিং থেকে বেইজিং চার ঘন্টার উড়ালকিন্তু আমাদের রাতের খাবার হিসেবে দিল শুধু একটি কেক আর একটি পাউরুটি। সালাহউদ্দিন ব্যাঙ্গ করে বলল, ‘স্যার এটি কি ডিনার না এপেটাইজার’?

-নিশ্চয় এপেটাইজারই হবে, আমি উত্তর দিলাম। কিন্তু হা হতোস্মি! চা-কফি ছাড়া আর কিছু এল না।

 

বেইজিং বিমানবন্দরে এসে ইমিগ্রেশন সেরে সিকিউরিটি পেরিয়ে যখন ভাবছি আমাদের কে রিসিভ করতে আসছে কে জানে, তখনই মিস লিউ রুমং এসে সম্ভাষণ করল ‘আর ইউ মিঃ ইউদিং, স্যার?’বলে। স্বস্তি পেলাম যে এত রাতে আর খোঁজাখুঁজি করে কাল কাটাতে হলো না। আমাদের পরিচয় নিশ্চিত হতেই ড্রাইভারও এগিয়ে এল। মালপত্র দিয়ে সবাই গাড়িতে উঠলাম। নিশুতি রাত। যানবাহন কম রাস্তায়। হোটেলে যাবার পথে মিস রু মং কেএফসি থেকে আমাদের জন্য চিকেন বার্গার, ফ্রেঞ্চফ্রাই, চিকেন উইংস ও কোক নিয়ে নিল। কারণ অত রাতে হোটেলে খাবার পাওয়া যাবে না। পঁয়তাল্লিশ মিনিটে তাইশুন বিজনেস হোটেলে চলে এলাম। হোটেলে পৌঁছে দেখি রাত দেড়টা আর তাপমাত্রা মাইনাস তিন ডিগ্রী সেলসিয়াস। এয়ারপোর্ট থেকেই আমরা অতিরিক্ত গরম কাপড় গায়ে চড়িয়েছিলাম। তাছাড়া হোটেল লবি সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশন্ড, হিটিং সিস্টেমযুক্ত। কাজেই আমাদেরকে আর শীতে কাঁপাকাঁপি করতে হলো না।

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

One thought on “গ্রেটওয়ালের দেশে

  1. শরীফ শেখ

    শেয়ার করলাম।

মতামত দিন Leave a comment