গ্রেটওয়ালের দেশে- পর্ব১২

এক ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। আজ সকালে সিসিটিভি আমেরিকা চ্যানেলে দেখছিলাম বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে শিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং আরেকজন বিশেষজ্ঞ আলোচককে আনা হয়েছে। আলোচনায় প্রকাশ পেল যে, চীনে গত সেপ্টেম্বর দুহাজার ষোল পর্যন্ত মোট সাড়ে ছয় মিলিয়ন এইচ আই ভি এইডস রোগের বাহক পাওয়া গেছেএ রোগের হার মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে তিনগুণ। আরো জানা গেল,  এখানে male to male sex এর জন্য এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। চীনা সরকার বিভিন্ন কলেজসমূহে  এইচ আই ভি টেস্ট কিট দিচ্ছে। ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে তিরিশ আরএমবি দিয়ে টেস্ট কিট কিনতে পাওয়া যাবে এবং টেস্ট এর ফলাফল অনলাইনে জানা যাবে। এইচ আই ভি পজিটিভ কিভাবে দূর করা যাবে সে বিষয়ে আলোচনাকালে আলোচকদ্বয় বললেন যে, চীনে এখনো সেক্স-এডুকেশনের ব্যাপারে জড়তা বা শাইনেস কাজ করে। তারা কন্ট্রাসেপটিভ ব্যবহার এবং এ বিষয়ে সচেতনতার ব্যাপারে জোর দিলেন। লক্ষ্য করলাম, আলোচনায় ধর্মীয় বিধিবিধান মান্য করার মাধ্যমে এর থেকে উত্তরণের যে একটা পথ হতে পারে সে বিষয়ে কেউই বললেন না। কমিউনিস্ট দেশে তা না হয় নাই বললেন, কিন্তু নীতি নৈতিকতা পরিপালনের বিষয়েও কিছু বললেন না। এটাই আশ্চর্য লাগলো।

চীনের সামাজিক ভায়োলেন্স এর অবস্থা যথেষ্ট খারাপ মনে হলো। ক’দিন আগেই এই চ্যানেলে CEDAW এর ওপর একটি আলোচনা শুনছিলাম। সেখানে বলা হয়েছিল যে, চীনে প্রতি চারটি বিয়ের ক্ষেত্রে একটিতে নারীরা ভায়োলেন্স এর শিকার হয়। চীনের রাস্তাঘাট, অবকাঠামো এত উন্নত আমাদের দেশের তুলনায় চিন্তাই করা যায় না। চলাফেরায় সামাজিক নিরাপত্তাও আছে। বেইজিং এর সব রাস্তায় সিসি ক্যামেরা আছে। জ্ঞান বিজ্ঞান, সমরাস্ত্র, মহাকাশ গবেষণায় বহুদূর এগিয়েছে দেশটি। এর পরেও নারীরা ভায়োলেন্স এর শিকার, এর পরে নৈতিক চরিত্রের অধঃপতনের বিস্তার। তাহলে কি বাহ্যিক উন্নয়ন নারীদের প্রকৃত অবস্থাকে উন্নত করতে পারে না?

 

দুই ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

শুক্রবার।সকাল সাড়ে ন’টায় রওয়ানা দিয়ে আমরা চাওইয়াং জেলার তাইশুন বিজনেস হোটেল থেকে হাইদিয়ান জেলার অন্য একটি হোটেলে উঠে পড়লাম। এখানে  পাশাপাশি দুটি হোটেলে আমাদের আবাস হলো। একটি হোটেল জিন তান বিন লুব, অন্যটি হোটেল জুন শিন। আমার আসন হলো হোটেল জুন শিন(Jun Xin)-এ। আমাদের এখন ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ হবে পাওয়ার প্লান্টে, যেটি হাইদিয়ান জেলার এই স্থান থেকে অপেক্ষাকৃত কাছে, তাই এখানে আসা। এখানে এসে আমার রুম নাম্বার হলো ৮৪০৫। তাইশুন বিজনেস হোটেলের তুলনায় এই হোটেলের সুবিধে কম। যদিও সৌভাগ্য বশতঃ আমার রুমটি ভাল পড়েছে, উইণ্ডো-সাইটে। কিন্তু অনেকের কক্ষে জানালা নেই। এবং অনেক ছোট রুম। সে কারণে বেশিরভাগ প্রশিক্ষণার্থী অসন্তুষ্ট। বিষয়টি আমাদের গাইড ও সমন্বয়ক এলিসকে জানানো হলে সে জানালো যে সে তার কর্তৃপক্ষের কাছে অসুবিধেগুলোর বিষয় উত্থাপন করবে।

 

তিন ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। শনিবার। যেহেতু এই হোটেলটি আগের হোটেলের তুলনায় সাব-স্ট্যান্ডার্ড, সেহেতু আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে এ হোটেলে থাকা হবে না। সি এন টি সি’র লোকেরা বলল যে, ভাল হোটেল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কাজেই আজ আবু বকর, আরিফ সাহেব ও সালাহউদ্দিন এই তিনজনের একটি কমিটি করে দিলাম নতুন হোটেল খুঁজে বের করার জন্য। তারা ফিরে এসে চং ইউ সেঞ্চুরি গ্রান্ড হোটেল নামে একটি হোটেল পছন্দ করে এল। সিদ্ধান্ত হলো যে, আগামী সোমবার নতুন হোটেলে শিফট করা হবে। হোটেল অনুসন্ধানকারী টিম যখন হোটেলের সন্ধানে যায়, তখন আমরা Carrefour নামে একটি চেইনশপে যাই। এখান থেকে আমি দু’মেয়ের জন্য দুটো শীতের জ্যাকেট কিনে নিলাম।

বিকেলবেলা সবাই মিলে আবার Yifu মার্কেট নামে একটি মার্কেটে যাই। এখান থেকে একটি কেবিন সাইজ ট্রলি ব্যাগ কিনি।  চাল ৫৬০ আরএমবি আর কিনলাম ১৯০ আরএমবি দিয়ে। আজ আমাদের ভিলেজ ট্যুর ছিল কিন্তু হোটেল সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সেটা বাদ দিতে হয়েছে

 

চার ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। রোববার। আজ আমরা গিয়েছি টেম্পল অব হেভেন দেখতে। টেম্পল অব হেভেন আমাদের নতুন হোটেল থেকে ৩০-৪০ মিনিটের ড্রাইভ। টেম্পল অব হেভেনের বিভিন্ন ভবনে প্রাচীনকালে পুজো অর্চনা হত। ভবনগুলোর মধ্যে একটি বিখ্যাত ভবন টেম্পল অব রীচ হারভেস্ট। মিং ও চিং রাজাদের আমলে ১৪০৬-১৪২০ সময়কালে নির্মিত হয়েছিল এসব স্থাপনা। ১৯৯৮ সালে এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে অধিভুক্ত হয়। ভবনগুলোর চারপাশে রয়েছে পার্ক যেখানে  জুনিপার, ওক, সাইপ্রাস ইত্যাদি বৃক্ষের সারি। এ বাগানের লনে দেখলাম মুনিয়া পাখির ঝাঁক। আছে ঘুঘু ও দোয়েল। দোয়েলগুলো আমাদের দেশের দোয়েলের চেয়ে অন্তত পাঁচগুণ বড় আকারে ও ওজনে।

 

আসবার পথে বাসে কথা হচ্ছিল আমাদের গাইড মিঃ ওয়াংবো এর সাথে। জিজ্ঞেস করেছিলাম,  “মিঃ ওয়াংবো, তুমি কি আমায় বলতে পারো, চীনা সিভিল সার্ভিসে যারা নতুন যোগদান করে, তাদের বেতন-কাঠামো কেমন?” সে সিভিল সার্ভিস কী তা বুঝতে পারলো না। গভঃ সার্ভিস বলাতে, সে জানালো, একজন চীনা নাগরিক সরকারি চাকরিতে যোগদান করেই প্রথমে ৫-৬ হাজার আরএমবি ( ৬০ -৭২ ) হাজার টাকা) বেতন পায়। আর তারা স্বল্পমূল্যে বাড়ি ক্রয় করতে পারে, তাদের প্রতিবছরের বেতনবৃদ্ধির হার(ইনক্রিমেন্ট)ও আকর্ষণীয়। রাস্তায় চলমান একটি ভক্সওয়াগন কার দেখিয়ে বললাম, এ গাড়িটির দাম এখানে কত? ওয়াংবো যা দাম বলল, তাকে ১২ দিয়ে গুণ করে দেখলাম গাড়িটির দাম বাংলাদেশী টাকায় ১৫- ১৬ লক্ষ টাকা। আমাদের দেশে ঐরূপ একটি গাড়ি ২৫-৩০ লক্ষ টাকায়ও পাওয়া যাবে না। এখানে সবাই ব্রাণ্ড নিউ গাড়ি কিনে থাকে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি এখানে নেই। ভক্সওয়াগনের প্লান্ট আছে সাংহাইতে। বেইজিং এ হোণ্ডা, হিউন্দে, মারসিডিজ বেঞ্জ ইত্যাদির ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট আছে।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment