গ্রেটওয়ালের দেশে – পর্ব ১০

Tianjin-china

ছাব্বিশ নভেম্বর দুহাজার ষোল।

আজ আমাদের তিয়ানজিন সফর। ০১ নভেম্বর চীন দেশের রাজধানী বেইজিং এ আসবার পর এই সফরই আমাদের বেইজিং এর বাইরে চীনের অন্য একটি প্রদেশ ভ্রমণ। তিয়ানজিন বেইজিং এর খুব কাছের একটি প্রভিন্স। বেইজিং থেকে মাত্র ১৩৭ কিলোমিটার দূরে তিয়ানজিন শহর। তিয়ানজিন একই সাথে একটি শহর ও একটি প্রদেশ যা কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক শাসিত। এ শহরটি চীনের চতুর্থ বৃহত্তম শহর। আয়তনের দিক থেকে সাংহাই, বেইজিং, গুয়াংজু এর পরেই এর অবস্থান। তিয়ানজিন প্রদেশের পূর্বে বোহাই উপ-সাগর, উত্তর-পশ্চিমে বেইজিং এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে হেবেই প্রদেশ। উত্তর দিকের বিখ্যাত গ্রাণ্ড ক্যানেল দ্বারা প্রদেশটি ইয়াংসি ও হোয়াং-হো নদীর সাথে যুক্ত।

তিয়ানজিনের তাপমাত্রা এখন বেইজিং এর চেয়ে শীতল ও শুষ্ক। তেমনিভাবে গ্রীষ্মকালে বেইজিং এর চেয়ে উষ্ণ থাকে এবং গোবি মরুভূমি থেকে উঠে আসা ধুলিঝড় দ্বারা প্রায়শ আক্রান্ত হয়।

বেইজিং থেকে সকাল ৯টা নয় মিনিটে বাসে যাত্রা করে আমরা সকাল ১১টা তিরিশ মিনিটে তিয়ানজিন পৌঁছে যাই। তিয়ানজিন হাই-হো নদীর পাড়ে অবস্থিত একটি পোর্টসিটি। তিয়ানজিন খুব সুন্দর একটি শহর। এ শহরে অনেক কিছুই আছে পর্যটকদের আকর্ষণ করবার জন্য। আমাদের বাসটি শহরের শেনইয়াং রোডের বিখাত Tianjin Antique City মার্কেট এর কাছে এসে থেমে গেল। মার্কেটের প্রবেশ পথের সামনে রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় দেখি একজন বহুবর্ণিল পোষাকে সজ্জ্বিত সঙ সেজে দাঁড়িয়ে আনন্দ দিচ্ছে পথচারির ও পর্যটকদের। সঙ এর মাথায় বাহারী টুপি ও হরিণের ন্যায় ডালপালা। এর সাথে যুগলবন্দী হয়ে ছবি তুলতে তুলতে দেখি এসে গেল আরেকজন ডানাকাটা জীবন্ত পরীসেও এসে অবলীলায় কাঁধে বাহু রেখে ছবিতে পোজ দিতে লাগলো। যেন কতকালের পরিচিত এরা। ছবিটবি তোলা শেষ হলে আমরা মার্কেটের ভেতরে ঢুকে গেলাম। এখানে অ্যাণ্টিক ছাড়াও সব কিছু পাওয়া যায়। তবে এটি চীনের সবচাইতে বৃহৎ এ্যাণ্টিক মার্কেট। এই মার্কেটটিতে এ্যাণ্টিক এর দোকান আছে তা প্রায় শ’চারেক। যাদের অ্যাণ্টিক সংগ্রহের বাতিক আছে, তাদের জন্য এটি একটি স্বর্গরাজ্যএখানে এলে আপনার মনে হবে যেন সেই রূপকথার দেশের সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে। বিশাল মার্কেট এরিয়ার অলিতে গলিতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছে তিয়ানজিনের বণিক নারীরা। বড় বড় নামী দামী শো-রুম ছাড়াও বিশাল ফাঁকা জায়গা যার ফ্লোর পাথরের স্ল্যাব বসিয়ে এমনভাবে রাখা হয়েছে যেন পুরো ফ্লোরটাই এন্টিক ফ্লোর। আর এই ফাঁকা ফ্লোরেও আছে প্রচুর দোকান। মনে হবে যেন এন্টিকের হাট বা মেলা। মরচে পড়া লোহার ড্যাগার থেকে শুরু করে একেবারে চকচকে রাজকীয় ব্রোঞ্জের সিংহমূর্তি পর্যন্ত যার যা প্রয়োজন পাবেন। কাঠের, ধাতব, পাথরের, পোর্সেলিনের, বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী পাবেন। আর সব ধরনের সামগ্রীই এখানে বেইজিং এর চাইতে কম দামে পাওয়া যায়। চিতাবাঘ, হরিণ, ব্ল্যাক পান্থার, সজারু, পুরোনো লোহার কবজা, চাপাতি, পিস্তল, তলোয়ার, ড্রাগণ, বিভিন্ন বুনো ফলের বিচি, বিভিন্ন রকমের লাঠি, বিভিন্ন পুরনো অলংকার ইত্যাদি দেখতে লাগলাম প্রাণভরে। ঘুরতে ঘুরতে দেখতে দেখতে ফুটপাতে এক দোকানে গিয়ে কাসার তৈরি দুটো ফুলদানির দিকে আমার দৃষ্টি আটকে গেল। ফুলদানি দুটোর গায়ে খোদাই করা নয় বরং রিলিফ-ম্যাপের মত উৎকীর্ণ ড্রাগণ ও ফিনিক্স পাখির কারুকার্য করা মূর্তি। আইডেন্টিক্যাল ফুলদানি দুটোর একটিতে ড্রাগণ এবং অপরটিতে ফিনিক্স পাখি।  চীনা মিথ অনুযায়ী একটা অপরটার পরিপুরক। ফলে একটি বিক্রী হবে না। নিলে দুটোই নিতে হবে। ওজনও দুটো মিলে চার কেজির বেশি সই কম না দাম জিজ্ঞেস করলাম। চাইলো ১২০০ আরএমবি। আমি এ ক’দিনে বুঝে গেছি চীনের বারগেইনিং মার্কেটে কি করে দামাদামি করতে হয়। আমি প্রথম চোটে দাম বললাম দুটো ১৫০ আরএমবি। দোকানি এবং আমি কেউ কারো ভাষা বুঝি না। দুজনেই ক্যালকুলেটরের বাটন টিপে দামাদামি করছি। আমি ইশারা ইঙ্গিতে  একটি নিতে চাইলে সে তার ভাষায় ও বডি-লাঙ্গুয়েজে বুঝিয়ে দিল- হবে না, দুটোর একটা অন্যটার পরিপূরকনিলে দুটোই নিতে হবে। দামাদামি করতে করতে সে ৬৬০ আরএমবিতে নামলো। আমি ভাবলাম ৫০০ আরএমবিতে হয়ত দিয়ে দেবে। কিন্তু আর দামাদামি না করে ফিরে চললাম। কারণ আমার পকেটে প্রয়োজনীয় আরএমবি নেই। তিয়ানজিনে এসে যে শপিং করব এ ধরণের চিন্তা মাথায় ছিলও না, তাই এ অবস্থা। প্রধান গলিতে গিয়ে দেখি নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল সাহেব, আরিফ সাহেব, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আজাহার সাহেব আরো কয়েকজন একসাথে হাঁটছেনআমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, কিছু কিনেছি কি না। উত্তর দিলাম, কিনিনি, তবে একটা জিনিস পছন্দ হয়েছে, কিন্তু পকেটে আরএমবি নেই। উত্তর শুনে জহুরুল সাহবে বললেন- স্যার, আমরা আছি না। কত লাগবে বলুন? জহুরুল সাহেব খুবই ভদ্রলোক।  ৫০০ আরএমবির একটি নোট বের করে দিয়ে বললেন, স্যার চলবে? আমি বললাম, হ্যাঁ, চলবে মানে? – একেবারে দৌড়োবে। আমি তৎক্ষণাৎ ফিরে গিয়ে আবার দামাদামি শুরু করলাম। দোকানি বুঝল, এ লোক যখন ফিরে এসেছে তার মানে এর কেনার খুব আগ্রহ। আমাদের দেশে হলে হয়ত দোকানি মনে করত, বেটা যখন নেবার মনস্থ করেছেই, দাম আর কিছুতেই কমাবো না। কিন্তু এই চীনা দোকানি সে রকম মনে না করে বার্গেনিং এর সুযোগ থেকে আমাকে বঞ্চিত করলো না। শেষমেশ ৩০০ আরএমবিতে ফুলদানি দুটো হস্তগত করে খুশি মনে অকুস্থল ত্যাগ করলাম।  

কিন্তু এই বেঁচে যাওয়া দুশ’ আরএমবি আর পকেটে আগে থেকে থাকা দেড়শত আরএমবি আমাকে কুটকুট করে কামড়াতে লাগলো যেন আমি আরো কিছু কিনে ওদের পকেট থেকে বিদেয় করিকী আর করার? ভাবলাম আমার জন্য ফুলদানি কেনা হলো, কাজেই বাদবাকী অর্থ দিয়ে বৌ-ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু কেনা কাটা করা যাক। কেনাকাটা ক্ষান্ত হলে বিকেল সাড়ে চারটেয় গেলাম ‘ইটালিয়ান স্টাইল সিটি’ নামে একটি এলাকায়। শহরের এ জায়গার ভবনগুলো পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে ইউরোপের রোমান স্টাইলে পুরো এলাকা বিভিন্ন ভাস্কর্য ও ক্যাফে ইত্যাদি দিয়ে সাজানোবিশাল খোলা চত্বরের বেশ কয়েকটি স্থানে উন্মুক্ত-বক্ষ এবং অর্ধউন্মুক্ত-বক্ষ ফুলপরীর ভাস্কর্য(Flower Fairy) স্থাপন করা হয়েছে। ফুলের ঝুড়ি উর্ধ্বে তুলে ধরে আছে শ্বেত পরীরা বিভিন্ন কর্ণারে। এসব ভাস্কর্যকর্ম শ্বেত মর্মর পাথরে তৈরি। রয়েছে ইটালিয়ান ও ফ্রেঞ্চ রেস্তোরা ও কফি শপ গোটাকয়েক। একটি কফিশপের সামনের খোলা জায়গায় দেখলাম একজন চিত্রকর একজন নারীর ছবি ছবি এঁকে দিচ্ছেন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। ফ্রাগ্র্যাণ্ট হিল থেকে নামার পথেও এরকম একটি দৃশ্য দেখেছিলাম।

 

ইটালিয়ান স্টাইল সিটি দেখার পর আমরা এলাম বিখ্যাত ‘তিয়ানজিন আই’ দেখতে। সন্ধ্যে আসন্ন। সন্ধেবেলায়ই এটি দেখতে হয়। তাই ইটালিয়ান সিটিতে ঐ সময়টুকু কাটানো। হাই-হো নদীর ওপর বিশাল আকৃতির নাগরদোলা সদৃশ রিং-এ বহুসংখ্যক কাচঘেরা আধুনিক ঘর, যেগুলোর প্রত্যকটিতে  আটজন করে বসা যায়। একজনের টিকেটের দাম ৭০ আরএমবি, কিন্তু পুরো একটি ঘর রিজার্ভ নিলে ডিসকাউন্ট দিয়ে ৮*৫০= ৪০০ আরএমবি। আমরা ৩২ জনে চারটি ঘর রিজার্ভ নিলাম। আলোঝলমল এই নাগরদোলাই ‘তিয়ানজিন আই’দূর থেকে এই নাগরদোলার রিংটিকে বিশাল চোখ সদৃশ মনে হয়। আবার এতে চড়ে অনেক ওপরে গিয়ে পুরো তিয়ানজিন সিটিটা নিরীক্ষণ করা যায়। সে অর্থেও এটি তিয়ানজিন আই। আমরা প্রত্যেকে পুরো একঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কেটে তিয়ানজিন আইয়ে চড়ে শূন্যে ভ্রমণ শেষে যখন নেমে আসি তখন ক্ষুধায় আমাদের প্রত্যকের পেটে চামচিকে লাথি মারছে।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts