গ্রেটওয়ালের দেশে-১৩

পাঁচ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। আজ থেকে আমাদের চায়না হুয়াদিন পাওয়ার করপোরেশন এর পাওয়ার প্লান্ট চত্ত্বরে প্রশিক্ষণ ক্লাস। ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য আমাদের এখানে আনা হয়েছে। সেই সাথে সিমুলেশন ক্লাস। আমরা এখন মোট চল্লিশ জন প্রশিক্ষণার্থী। প্রথমদিন পাওয়ার স্টেশন সেফটি রুলস এর ওপর ক্লাস নিলেন করপোরেশনের মহিলা কর্মকর্তা মিস ওয়াং লি এবং একজন পুরুষ প্রধান প্রকৌশলী মিঃ চ্যান হুইবো। কোন চা-বিরতি ছাড়া বেলা সাড়ে বারোটা পর্যন্ত একটানা ক্লাস। তারপর বাসে করে হোটেলে ফিরে লাঞ্চ। লাঞ্চের পর প্রায় পঁচিশ মিনিটের হাঁটা পথে আমরা ক’জন গেলাম ইফু মার্কেটে। আমার কোনো কেনাকাটা নেই। তবুও গেলাম, স্রেফ হাঁটাহাঁটির উদ্দেশ্যে। আবুবকরকে তিনিটি জ্যাকেট কিনে দেয়া হলো। একটি তার জন্য, আর দুটি তার জমজ দুই পুত্রের জন্য। প্রতিটির দাম ১২০ আরএমবি।

মার্কেট থেকে বেরিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করি যে, আমার  ওয়েস্ট ব্যাগটি নেই, যেটা আমি হোটেলকক্ষের বাইরে বেরুলেই কোমরে আটকে রাখি। খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাগ। আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। আবুবকর বলল, ভাল করে ভেবে দেখুন, ওটা কোথায় পড়তে পারে। সালাহউদ্দিন বলল, এটা কি করে সম্ভব, ব্যাগটি পড়ে গেলে শব্দ হবে না? আর আমরা তো আপনার সাথেই সবসময় আছি। আমি বললাম, এটি এমনভাবে বাকলস সিস্টেমে আটকানো থাকে, এটা পড়বার কথাও নয়। তবে কি আমি রুমে রেখে এলাম? তাই বা কী করে হয়? সবসময় তো এটিকে নিয়েই বেরোই। আবু বকর বলল, চলুন আবার মার্কেটে ঢুকে খুঁজে আসি। সালাহউদ্দিন বলল, এটা কি ইউরোপ পেয়েছেন? পড়ে থাকলে এটা বেইজিং এ পাওয়া যাবে না, কেউ না কেউ নিয়ে নিয়েছে। ভাবলাম, পড়বেই বা কিরূপে? চীনে কোন হাত সাফাইকারী নেই তো যে ভীড়ের মধ্য বাকলস খুলে নিয়ে নিয়েছে টের পাইনি এমনভাবে? আমি দ্রুত হোটেলে ফিরে চলি যাতে করে রুমে ফেলে আসলে যেন সেটা রুমে পাওয়া যায়। হাউজকিপিং এর লোক রুমে গিয়ে যদি ব্যাগ খুলে মূল্যবান কিছু নিয়ে নেয়। হাঁপাতে হাঁপাতে রুমে গিয়ে কার্ড পাঞ্চ করে ঢুকেই টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখি না ব্যাগটি আছে। বিধাতার প্রতি হাজার শুকরিয়া আদায় করলাম।

 

সাত ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। ব্যবহারিক ক্লাস ও সিমুলেশন এর জন্য আমাদের কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করা হুয়েছে। আমি গ্রুপ-২-এ। সে হিসেবে আমাদের ক্লাস আজ বিকেলের শিফটে আড়াইটা থেকে সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত। সুতরাং আমার আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ফ্রি-টাইমব্রেকফাস্ট করে ঘন্টা খানেক চক্কর দিয়ে এলাম নতুন জায়গাটা চিনবার জন্য। রুমে ফিরবার পর হাউজকিপিং এলো। মহিলাটি মোটামুটি বয়স্ক, কোমরে ওয়াকিটকি, পরণে প্যান্ট ও হোটেল স্যুট। মহিলা হাউজকিপিং, তাই রুমের দরজা খোলাই রেখেছি। দেখি সালাহউদ্দিন বাইরে যাচ্ছে। আমি ওকে ডাক দিয়ে আটকালাম। হাউজকিপিং টাইডি-আপ করছে, এ সময় রুমে থাকতে ইচ্ছে হলো না। সালাহউদ্দিনকে বললাম, দাঁড়াও। চলো, আমিও বেড়িয়ে আসি আবার।

এবার হাঁটতে হাঁটতে একটি ফলের দোকান পেয়ে গেলাম। ফ্রেশ ফ্রুটস, সবজি, ড্রায়েড ফ্রুটস, হানি ইত্যাদিতে ঠাসা দোকানটি। আমি হানি, কালো আঙ্গুরের কিসমিস, এক কৌটা পেস্তা বাদাম, দুটি কিউই ফল ও আটটি সবুজ নাশপাতি কিনলাম। সালাহউদ্দিনও কিছু কিনলো। ফিরবার পথে দেখি একজন বাঁশিওয়ালা রাজপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাঁশি বাজাতে বাজাতে। দেশের কথা মনে পড়লো। ঢাকায়ও দেখেছি কত এরকম দৃশ্য। যখনই এ দৃশ্য দেখি, তখনই ইচ্ছে করে, ইশ যদি আমিও অমন সুর করে বাঁশি বাজাতে পারতাম। ঢাকায় এরকম পরিস্থিতিতে বেশ ক’বার বাঁশি কিনে ফুঁ ফাঁ করে বাঁশী বাজাবার কত কোশেশ করেছি । আজও সেরকম ইচ্ছে করলো। সালাহউদ্দিন বলল, স্যার আমার ভায়রার ছেলে ভাল বাঁশি বাজায়। দেখি, একটা কিনলে ওকে গিফট দেব। আমরা দ্রুত হেঁটে বাঁশিওয়ালার পাশে গিয়ে সুন্দর ও বড় দেখে একটি বাঁশির দাম জিজ্ঞেস করলাম। দাম চাইল ২০০ আরএমবি, মানে বাংলাদেশি টাকায় দুহাজার চারশত টাকা। সালাহউদ্দিন সাহস করে জিজ্ঞেস করলো, ১০ আরএমবিতে দেবে কি না। বাঁশীওয়ালা হেসে ঝোলা থেকে একটি ছোট সাধারণ বাঁশি বের করে দেখিয়ে বলল, এটির দামই ২০ আরএমবি।

লাঞ্চের সময় সমাগত। লাঞ্চের পর বাসে করে যেতে হবে পাওয়ার স্টেশনে। আমরা রাস্তা পার হয়ে বিপরীত দিকের ফুটপাত ধরে দ্রুত হেঁটে চললাম আমাদের হোটেলের দিকে ।

 

আট ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

শিশুরা যে কত সুন্দর! আজ সকালের নাশতা শেষে হোটেল লবিতে দেখলাম এক চীনা মায়ের হাত ধরে হাঁটছে একটি শিশু। বয়স বড়জোর দু’বছর হবে। আমি শিশুটিকে কোলে তুলে নেবার লোভ সংবরণ করতে ব্যর্থ হয়ে শিশুটিকে কোলে তুলে নিলাম। শিশুটিকে কয়েকবার উর্ধ্বে তুলে ধরে  বুকের সাথে সেঁটে ধরলাম। তারপর বললাম, চলো আমার সাথে। বলে কোলে করে কিছুদূর হাঁটলাম। শিশুটির মা পেছন পেছন আসতে লাগলো। শিশুটি ভয় পেলো না, কাঁদলোও না। তবে হাত বাড়ালো তার মায়ের দিকে। তারপর আমি তার মায়ের কাছে শিশুটিকে অর্পণ করে একা আমার পথ ধরলাম। দুহাজার ন’ থেকে এগারো সাল অব্দি ভূটানে থাকাকালিন আমি, আমার স্ত্রী এবং আমরা যারা বাংলাদেশি পরিবার পাশাপাশি থাকতাম তখন ভুটানি শিশুদের সম্পর্কে আমাদের মন্তব্য ছিল – ভূটানি বাচ্চারা কাঁদতে জানে না। এবারে প্রথমবারের মত চীনদেশে এসে  একইরকম  ধারণা হলো চীনা বাচ্চাদের নির্ভীক নির্বিকার ভাব দেখে। ক’দিন পূর্বে এখানকার একটি শপিংমলে একটি শিশুকে দেখেছিলাম তার বাবার কোলে। শিশুটি আমাকে দেখে খলখলিয়ে হাসছিল তার সাথে যখনি বন্ধুত্বসুলভ অঙ্গভঙ্গি করে খেলছিলাম। হাত বাড়ালেই শিশুটি আমার কাছে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। অথচ আমাদের দেশের বাচ্চারা  নিজের আত্মীয়-স্বজনের কাছেই যেতে চায় না এবং সামান্য কিছুতেই কঁকিয়ে ওঠে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয় কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর এই চীনা বাচ্চারা যেন পড়ে গেলেও কাঁদে না। আরেকদিন বেইজিং এর সামার প্যালেসে গিয়ে একটি শিশুর নির্ভীক সরল হাসিতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমরা শুধু অপরিচিত তাই নয়, গায়ের রং, গঠনও চীনাদের চেয়ে আলাদা। অথচ আমাদেরকে এই শিশুরা আপন করে নিতে চায়। এসব শিশু দর্শনের অভিজ্ঞতা যেন রবীন্দ্রনাথের ঝর্ণাধারা দেখার মতই-

হেসে খলখল গেয়ে কলকল

তালে তালে দিব তালি

কত কথা আছে কত গান আছে মোর

প্রাণ হয়ে আছে ভোর –

শিশুটির সাথে যেন আমাদের সেরকমই একটা ভাব। আজকের এই চীনা শিশুটিকে কোলে নিয়ে সেরকম একটা ভালো লাগার অনুভূতি হৃদয়কে আচ্ছন্ন করলো আমার সহ-প্রশিক্ষণার্থী বিপিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল সাহেব বললেন, স্যার! আমাদের বাঙালি শিশুরা যেরূপ সবার ভীষণ আদর আহ্লাদ পায়, চীনা বা বিদেশের শিশুরা তেমন পায় না- তাই কেউ যখন এদের আদর করে, তখন এরা খুব উৎফুল্ল হয় বলে আমার ধারণা। জহুরুল সাহেবের ধারণা কতটুকু সত্য জানি না। তবে, আমার ধারণা –  আমাদের দেশে বা সমাজে যে একধরণের সামাজিক অনিরাপত্তাবোধ, শিশুর জন্যও যে আমাদের দেশের মানুষ খুব বেশি নিরাপদ নয় সে বিষয়টা বোধহয় অবচেতনভাবে শিশুমন টের পেয়ে যায়, ফলে এখানে শিশুরা অপরিচিত মানুষের প্রতি আস্থা রাখতে পারে কম। সামাজিক নিরাপত্তার কারণে শিশু কেন, আমরা মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদেরও একা স্কুলে পাঠাতে আশঙ্কা করি এবং পরিবারের আবাল বৃদ্ধ বণিতা সকলের মাঝেই সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলো আলোচিত হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গত একটা বিষয়ের অবতারণা করি। আমাদের সাথে দুটি চীনা মেয়ে গাইড, সমন্বয়ক ও অনুবাদক হিসেবে কাজ করছে। একজনের ডাক নাম এলিস আরেকজনের রুমং। এদের কথাই বলি না কেন। দুজনই অবিবাহিতা, সদ্য স্নাতক। এলিস অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ আর রুমং ইংরেজী সাহিত্য পড়েছে। এরা দুজনই বেইজিং থেকে অন্ততঃ পনেরশ’ কিলোমিটার দূরের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ থেকে এসেছে। এক কথায় বলা যায়, শুধু ঘুমের সময়টুকু বাদ দিয়ে দিন রাত আমাদের সাথেই আছে। আমাদের ক্লাসে নিয়ে যাওয়া, হোটেলে থাকা খাওয়া দাওয়া তত্ত্বাবধান করা, সাইটসিইং, ফিল্ড ভিজিট, বাসে সবাই উঠলো কিনা গুণে গুণে দেখা- সব করছে। প্রতিদিন বাস ছাড়ার পূর্বে ক’বার করে যে গোণে- ই আর সান সি… (এক দুই তিন চার……), কী বলব আর। কোথাও ফিল্ডভিজিটে গেলে বড় বড় ব্যাগ পর্যন্ত কুমারী মেয়ে এলিস টেনে বাসে তুলছে বা বাসের পেটের মধ্যে দিচ্ছে সাজিয়ে। বাসের তো হেল্পার নেই এসব কাজের জন্য। ভারী আশ্চর্য হলাম, ওদের বাবা মায়েরা ওদের জন্য চিন্তা না করে একলা এই কাজে পাঠিয়ে দিয়েছে। এলিস মেয়েটা লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুটের ওপরে, স্মার্ট, স্লিম ফিগার। মুখে তেমন হাসি নেই, দুঃখও নেই। আর রুমং কিঞ্চিৎ শর্ট। মুখে হাসি সবসময়ই, এত নরম প্রকৃতির যে কেউ জোরে কথা বললে কেঁদে ফেলবে এমন। এই মেয়েটির নরম স্বভাবের জন্য ওকে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে বয়স্ক একজন মামনি বলেও অভিহিত করে। কিন্তু এখানে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে না কেউ।

 

আজ পাওয়ার প্লান্টে আমাদের দ্বিতীয় দিনের মত ক্লাস। আমাদের এ ব্যাচে দশ জনের মধ্যে সাত জন ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি হলো তার নীল হেলমেট পরে প্লান্টে ঢুকবে না। উল্লেখ্য, পাওয়ার প্লান্টে আমাদের সেফটি ড্রেস, সেফটি শুজ এবং সেফটি হেলমেট পরে প্রবেশ করতে হয়। ওয়ার্ল্ডওয়াইড প্রটোকল অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ারগণ সাদা হেলমেট এবং অপারেটরগণ নীল হেলমেট পরে থাকে। কিন্তু এই প্রটোকল এরা সঠিকভাবে মানছে না। আমাদেরকে এরা দিয়েছে নীল হেলমেট। এরা বলছে- আমাদের পাওয়ার প্লান্ট অথরিটির নিয়ম অনুযায়ী আমরা চলি। ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড কি চলে এটা আমরা দেখবো না। ওরা বলছে- তোমরা ট্রেইনি, আর আমাদের কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভিজিটর’স হেলমেট হিসেবে বরাদ্দ নীল হেলমেট। শেষমেশ আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি হলো ঠিক আছে তোমরা নীল হেলমেটের ওপরে ভিজিটর স্টিকার মেরে দাও। অবশেষে তাই করা হলো। আজ পাওয়ার প্লান্টে আমরা CW Boiller, Hot Water Boiler, Gas Turbine, High pressure turbine, low pressure turbine, intermediate pressure turbine ইত্যাদি যন্ত্রসমূহ পরিদর্শন করলাম। এসব কিভাবে ফাংশন করে তাও জানা হলো।

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment