গ্রেটওয়ালের দেশে-১৪

নয় ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। আজ আমাদের হোটেল পরিবর্তনের দিন। চাওইয়াং জেলার তাইশুন হোটেলে একমাস চারদিন কাটিয়ে আমরা হাইদিয়ান জেলার  জিন তান বিন লুব হোটেল এবং জুন শিন হোটেলে উঠেছিলাম প্রতিটিতে ষোল জন করে। কিন্তু তাইশুন এর তুলনায় এ হোটেল দুটির মান নিম্ন। তাই এ হোটেলে মাত্র সাতদিন থেকে আজই নতুন হোটেলে যাচ্ছি। আমাদের নতুন হোটেলটির নাম চং ইউ সেঞ্চুরি গ্রাণ্ড হোটেল। এ হোটেলটি অপেক্ষাকৃত ভালো। এখানে আমি পেলাম ১১০৬ নং কক্ষ। বারোতলা হোটেলটির এগারোতলা। বড় জানালা থাকায় আলো বাতাস ভাল আর জানালাটি দক্ষিণ পাশে হওয়াতে জানালা দিয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। হো্টেলের লবি  অনেক বড় এবং লবিতে একটি বেশ বড় সেলস সেন্টার আছে যেখানে ব্যাগ শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের স্যুভেনির আইটেম কিনতে পাওয়া যায়।

আজ শুক্রবার, তাই আমরা জুমার নামাজ পড়তে গেলাম একটি মসজিদে। এই মজজিদটি অনেক বড় গম্বুজওয়ালা অর্থাৎ চীনা ট্রাডিশনাল নকশার নয়। এখানে আমাদের মত বা নিউজি মসজিদের মত ইমাম সাহেব কিতাব দেখে খুৎবা পাঠ করেন না। ইমামসাহেব চীনা ভাষায় দীর্ঘক্ষণ ইসলামের ওপর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিলেন। খুৎবার স্থানটি ইমামের ইমামতির জন্য দাঁড়ানোর স্থান থেকে আনুমানিক দশ গজ পূর্ব দিকে একটু বাঁ পাশে। সুন্দর কারুকাজ করা ধাতব ফ্রেমের গেটসহ সিঁড়িযুক্ত বক্তৃতামঞ্চ বা মিম্বর। মিম্বরের পাশে রাখা আছে একটি কারুকার্যখচিত লাঠি। প্রথমে ইমামসাহেব মিম্বর বরাবর ডানদিকে স্থাপিত একটি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চীনা ভাষায় এবং মাঝে মাঝে আরবী ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। এরপর টেবিলটি সরিয়ে নেয়া হলো। মুয়াজ্জিন দাঁড়িয়ে সানি(দ্বিতীয়)আজান দিয়ে নিজেই খুৎবার মঞ্চে উঠে ডানহাতে লাঠি নিয়ে সূরা ফাতিহা মুখস্ত পাঠ করলেন। তারপর তিনি গিয়ে ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে ইকামাত দিলে সমস্ত মুক্তাদীগণ নামাজের জন্য কাতার সোজা করে দাঁড়িয়ে যান। ইকামাত শেষ হবার কিছু পূর্বে ইমাম সাহেব  আল্লাহু আকবার বলে তাকবীরে তাহরীমা বাঁধেন। ইকামাত শেষ হলে মুক্তাদীগণ নামাজের নিয়ত করে তাকবীরে তাহরীমা বেঁধে নামাজ শুরু করেন। নামাজ শেষ হয়ে গেলে ইমামসাহেব সালাম ফিরিয়ে মুনাজাত ছাড়াই নামাজ শেষ করেন।

 

দশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। শনিবার।

আজ আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় বেইজিং ব্যাডমিন্টন ক্লাবে। আমাদের প্রশিক্ষণার্থী ও চায়না হুয়াদিয়ান কোম্পানীর ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে ব্যাডমিন্টন টুর্ণামেন্ট আজ। বিপিডিবি বনাম সিএইচডি । বিপিডিবির পক্ষে সহকারি প্রকৌশলী আশরাফুল ও রুকনুজ্জামান খুব ভালো খেলেছে। তিনটি ম্যাচে বিপিডিবি সিএইচডিকে হারিয়ে দেয়। কিন্তু চতুর্থ ও চূড়ান্ত ম্যাচে বিপিডিবি পরাজিত হয়।

 

এগারো ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

আজ আমাদের সফর ছিল Beijing Badaling Safari World (উচ্চারণ- বেইজিং পাদালিং সাফারি ওয়ার্ল্ড)। গ্রেটওয়ালের পাদালিং পয়েন্ট থেকে পাঁচমিনিটের ড্রাইভ দূরত্বের এই সাফারি পার্কে হোটেল থেকে বাসে করে যেতে ঘন্টা দেড়েক সময় লেগে গেল। সাফারি ওয়ার্ল্ডের শুরুতে পাথরের তৈরি সুবিশাল আকৃতির কয়েকটি হাতি আমাদের স্বাগত জানালো। মূল প্রবেশপথের বিশাল তোরণ, টিকেট ঘর সবই হাতির আকৃতি দিয়ে নির্মিত। তোরণ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই সাফারি ওয়ার্ল্ডের একটি গাড়ি অপেক্ষমাণ পেলাম। গাড়িতে আগে থেকেই বেশ কিছু চীনা ও অন্যান্য দেশের দর্শক বসা ছিল। কেউ কেউ ছোট ছেলেমেয়ে নিয়েও এসেছেন। সাফারি পার্কের গাইড হ্যাণ্ডমাইক দিয়ে চীনা ভাষায় বর্ণনা দিচ্ছিলেন কী কী দেখনো হবে আর জন্তু জানোয়ারদের মধ্যে কোন্‌টি কোথায় পাওয়া যায় ইত্যাদি। গাইড মহিলার কথা একবর্ণও বুঝতে না পারলেও মানজালা শব্দটি বুঝলাম। কারণ এদেশে আসার পর থেকে জেনে আসছি, আমাদের বাংলাদেশের চীনা নাম হলো মানজালাগুয়ো। মানজালা অর্থ বেঙ্গল আর গুয়ো অর্থ দেশ। বেইজিং সাফারি ওয়ার্ল্ডে কয়েকটি বেঙ্গল টাইগারও আছে। তাই মানজালা শব্দটি উল্লেখ করেছে গাইড বলেছেন, সাফারি পার্কের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবার সময় জানালা খোলা যাবে না। উল্লেখ্য, গাড়িটির কোন জানালাতেই খুলবার কোন সিস্টেমই রাখা হয়নি। কেননা জানালার কাচ স্থায়ীভাবে সাটানো।

প্রথমেই দেখা মিললো সাইবেরিয়ান শাদা-কালো ডোরাকাটা বাঘেদের। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জঙ্গলে এই বাঘ আছে বলে এর গেটে লেখা দেখা গেল। প্রতেকটি সেকশনের প্রবেশমুখে চীনা ও ইংরেজী ভাষায় সংশ্লিষ্ট প্রাণিদের আবাসস্থলের নাম লেখা আছে। সাইবেরিয়ান বাঘ দেখার পর পেলাম সাইবেরিয়ান ভল্লুক। আরো কিছুদূর গিয়ে দেখা মিললো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। জেব্রা, জিরাফ, রেইণ্ডিয়ার, বানর ও হিংস্র প্রাণিকুল দেখার এলাকা ছাড়িয়ে আমরা এসে পড়লাম অহিংস্রপ্রাণি দেখবার এলাকায়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ময়ূর, তিতির, কালেম পাখি, ক্যাঙ্গারু ইত্যাদি অনেক বন্যপ্রাণী ও পাখি দেখা হলো। ময়ূরগুলো এত সুন্দর যেন এত সুন্দর ময়ূর কখনো দেখিনি। ঢাকা চিড়িয়াখানাতেও না, ভারতের আগ্রায়ও না। খু্ব ছুঁতে ইচ্ছে করছিল। সুন্দর পাখির প্রতি আমার দুর্বলতা একেবারে শৈশব থেকে। যখন স্কুলের যাবার বয়স হয়নি, তখনো গ্রামের বাড়ির ঝোঁপে বা গাছের শাখায় সুন্দর ছোট একটি পাখি দেখলেও হাত বাড়াতাম আয় আয় বলে, এগিয়ে যেতাম ধরতে যেতে কিন্তু পারতাম না-সে সব স্মৃতি আমার মনে আছে। দুহাজার চার সালে একবার সুন্দরবনের কচিখালিতে চিত্রল হরিণ ধরতে চেয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ দৌড় দিয়েছিলাম চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সেও। কাজেই আজও লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। রাজকীয় ধীর পদক্ষেপে পায়চারীরত কয়েকটি ময়ূর-ময়ূরীর পেছনে আস্তে আস্তে গিয়ে ধরে ফেলতে প্রয়াস পেলাম। পুরোপুরি ধরতে না পারলেও স্পর্শ করতে পারলাম। এতেই আমার বিরাট আনন্দ। মনে হলো হিমালয়ের বেইজ-পয়েন্টে চলে গেছি। নাই বা পারলাম চূড়ায় উঠতে।

 

মায়া আর সম্বর হরিণগুলো বন্ধুর মত আচরণ করলো। এদের গলা একটু লম্বাই মনে হলো। অনেক পর্যটক গাড়ির জানালা খুলে দিলে হরিণগুলো জানালা দিয়ে গাড়ির ভেতর মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে। খুব মায়াময় এদের চোখ মুখ চাহনি। আমার চোখের সামনেই একজন মহিলা তার গাড়ির জানালা দিয়ে কলা ছিলে ধরলে একটি হরিণ কলাটির পেছনে লেগে থাকা কলার খোসাসহই খেয়ে ফেললো। হরিণগুলোর স্বাস্থ্য কিন্তু ভালই, দেখতে ক্ষুধার্ত নয়। কিন্তু এরা যেন মানুষের হাতে খেয়ে মানুষের সাথে মিশে মানুষকে আনন্দ দিতে চায়। একবার দেখলাম কয়েকটি হরিণ একটি গাড়ির পথ আগলে দাঁড়িয়ে গেল। গাড়িগুলোও এখানে সাবধানে চলে। বড় গাড়ি এখানে প্রবেশ নিষেধ, শুধু প্রাইভেট কারই এখানে নির্ধারিত ফি দিয়ে ঢুকতে পারে। দুহাজার পাঁচ সালে একবার থাইল্যাণ্ডের পাতায়াতে সাফারি পার্কে যাবার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আমরা গাড়িতে থেকেই হিংস্রপ্রাণিসহ সকল প্রাণি দেখেছিলাম। একজন থাই মেয়েকে দেখেছিলাম একটি হুডখোলা জীপগাড়িতে লোহার খাঁচাসম পেছনের অংশ থেকে ওপর দিকে লোহার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে কাচা মাংস  ছিটিয়ে দিচ্ছিল আর বাঘ সিংহ ইত্যাকার প্রাণিগুলো গাড়িটির পাশ থেকে বা ওপরে চড়ে সেই সব খাবার, তাজা গোশত তৃপ্তিসহ খাচ্ছিল।

আর আজ বেইজিং এ এসে দেখলাম হরিণের সাথে মানুষের সখ্য। এত কাছে থেকে ময়ূরই শুধু  দেখলাম না,  স্পর্শও করলাম। সুন্দরবনের কচিখালিতে ডালপালাযুক্ত শিং-ওয়ালা চিত্রল হরিণের ঝাঁক দেখে বিমোহিত হয়েছিলাম। আর আজ যে সব হরিণ দেখলাম তার অধিকাংশই সম্বর জাতের, শিং প্রায়ই অনুল্লেখযোগ্য, এবং মানুষ দেখে পালায় না। এটার আরেকধরনের আনন্দ, ভিন্ন এক বৈচিত্র্য। শরৎচন্দ্রের মত করে বলতে ইচ্ছে করে, বিধাতা এই চোখ দুটো তুমি দিয়েছিলে, আর আজ তুমিই তাদের সার্থক করলে।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

 

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment