গ্রেটওয়ালের দেশে- ১৫তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

বারো ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

আজ পাওয়ার প্লান্টে পৌঁছুতে সকাল দশটা দশ বেজে গেল। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম ছিল।আজ সকালে টীম এ, বি ও সি এর ক্লাস ছিল।এর মধ্যে অর্ধেকের প্লান্ট ভিজিট, বাকী অর্ধেকের সিমুলেশন ক্লাস। পাওয়ার প্লান্ট কিভাবে চালানো হয়, তারই গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশনই হলো সিমুলেশন। ক্লাস শেষে হোটেলে এসে সরাসরি তৃতীয় তলায় ডাইনিং রুমে। লাঞ্চ সেরে নিজ রুমে একটু বিশ্রাম নেয়া হলো। তারপরই আমরা বেরিয়ে পড়লাম সাবওয়ে ধরে ওয়াং ফু জিং স্ট্রীটের উদ্দেশ্যে। হোটলের পাশেই বেইজিং ওয়েস্ট রেলওয়ে স্টেশন। এখান থেকে  নয় নং লাইন ধরে মিলিটারি মিউজিয়াম স্টেশন। তারপর লাইন ট্রান্সফার করে এক নম্বর লাইন ধরে ওয়াং ফু জিং অভিমুখে চললাম। মুশিদি, নানলিশিউ, ফুশিংমেন, শিদান, তিয়ান’আনমেন ওয়েস্ট, তিয়ান’আনমেন ইস্ট আর তার পরেই ওয়াং ফু জিং। ওয়াং ফু জিং থেকে আমরা Exit B দিয়ে বের হই। ফলে ওয়াং ফু জিং স্ট্রীট মার্কেটটি আর খুঁজে পাই না। ফুটপাতে অনেক শিক্ষিত চীনা পুরুষ ও মহিলা হাঁটছে। কাউকে জিজ্ঞেস করে যে জেনে নেব তার জো নেই। ভাষার জটিলতা। অগত্যা আমাদের কোর্স সমন্বয়ক এলিসকে ফোন করা হলো। তার সাথে এক অচেনা চীনা পথচারীর কথা   বলিয়ে দিয়ে ব্যাপারটির সমাধান করার চেষ্টা করি।কাজ হলো, অচেনা চীনা ম্যান আমাদেরকে পথ দেখিয়ে সামনে সামনে চললে আমরা তার পিছে পিছে চলি। তিনি আমাদের মার্কেটটি দেখিয়ে দিয়ে বিদেয় হলেন। এখানে আমরা সাতজন একটি নির্দির্ষ্ট স্থানে নির্দির্ষ্ট সময়ে মিলিত হব এই মর্মে ঠিক করে যে যার ধান্ধামতো মার্কেটে সেঁধিয়ে গেলাম। আমি নির্দিষ্ট কিছু কেনার মানসে আজ আসিনি। আমার উদ্দেশ্য হোটেলে বসে না থেকে বেইজিং শহরটাকে যতদূর দেখা যায় তাই দেখা। প্রথমে সিল্ক মার্কেটে সিল্কের কাপড় দেখে, তারপর গেলাম টয় শপে। তারপর গেলাম বেইজিং আর্ট এণ্ড ক্র্যাফট মার্কেটে। এখানে দ্রব্যাদির একদাম এবং জেনুইন। ঠকা বা জেতার সম্ভাবনা নেই। পছন্দ হওয়ায় এখান থেকে স্ত্রীর জন্য কিছু জুয়েলারি আইটেম ক্রয় করা হলো।

 

তেরো ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

আমাদের নতুন হোটেলটির নাম চুংগিউ সেঞ্চুরি গ্রাণ্ড হোটেল। বারোতলা হোটেলটির ষষ্ঠ ও এগারো তলায় আমরা থাকি। তিনতলায় খাবারের হল বা ডাইনিং হল। ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। অন্তত তিরিশ আইটেমের ব্রেকফাস্ট। সব তো খাওয়া যায় না। যার যার পছন্দ অনুযায়ী আইটেমই খেয়ে থাকে সবাই। অবশ্য আমার মত কেউ কেউ থাকতে পারেন, যারা স্রেফ পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন আইটেম নিয়ে থাকেন। পরীক্ষামূলকভাবে নিলেও আমি যা নেই তা সবই খাই, কেননা খাদ্যদ্রব্য অপচয় করা আমার ধাতে সয় না। আজকের ব্রেকফাস্টে যা যা খেলাম তার নামগুলো বলছি- পাঠক দয়া করে ভিরমি খাবেন না। আইটেমগুলো হলো- সিদ্ধ ডিম, লিলি রুটস, জেলিফিশ ক্যাবেজ, স্পীনিজ, চাইনিজ স্টীম-বেক্‌ড সুইট ব্রেড, কাসাভা, যাদু স্যালাড, মিলেট স্যুপ, ভেজ স্যুপ, ইয়োগার্ট, হামি মেলোন ও ওয়াটার মেলোন। ব্যতিক্রম ছাড়া ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেরিতে আসা আমার নিত্যদিনের অভ্যাস। এ কারণেই সময় অভাবে আজ চা-কফি বা লেমন ওয়াটার কিছুই খাওয়া হলো না।

ক্লাস শেষে হোটলে ফিরে ডাইনিং হলে গিয়ে লাঞ্চ সেরে রুমে এলাম। একটি জ্যাকেট ও একটি জিনস প্যান্ট দিয়ে এলাম এলিসকে লনড্রি-তে দেবার জন্যে আর রুমংকে দিলাম দুশ’ মার্কিন ডলার ব্যাঙ্ক থেকে আরএমবি করিয়ে আনয়নের জন্য।

তিনবেলা পুষ্টিকর খাবার হচ্ছে প্রতিদিন।ফলে গত দেড়মাসে কেজি পাঁচেক ওজন যোগ হয়ে টামির ঊর্ধ্বমুখী বিকাশ ঘটাচ্ছে। শীতের ভেতর হাঁটাহাঁটি করা যাচ্ছে না। ফলে শরীর ঘামছে না, বার্ন হচ্ছে কম। কোনো সুইমিং পুল বা জিমও নেই হোটেলে যে সাঁতার কেটে বা  এক্সারসাইজ করে  ফিট রাখবো শরীরকে। রুমে ইয়োগা করার চেষ্টা চালাচ্ছি, কিন্তু ফায়দা খুব একটা হচ্ছে বলে বলা যাবে না।

 

ষোল ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। আজ আমাদের মহান বিজয় দিবসের দিনটি পার করলাম বেইজিং এ । বেইজিং এ বাংলাদেশের একটি দূতাবাস আছে। দূতাবাসের একজন উর্ধ্বতন কূটনীতিক আমার বিশেষ পরিচিত। আমি বড় মুখ করে প্রশিক্ষণার্থীদের বলেছিলাম, এবারের বিজয় দিবসটি আমরা বেইজিং-এ আমাদের একটুকরো স্বদেশ আমাদের দূতাবাসে পালন করার ব্যবস্থা করব। আমি কলকাতা ও থিম্পুতে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে এরকম জাতীয় দিবসে ঐ শহরে বসবাসরত বাংলাদেশীদের দাওয়াত করতাম এবং তারা আমাদের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকত। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা এতে অনেক আপ্লুত হত, তারা মনে করত – হ্যাঁ, এখানে আমাদের এক টুকরা দেশ আছে যেখানে আমরা এসে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে পতাকা উত্তোলন করতে পারি। এ কথা ভেবে আমি দূতাবাসের সাথে আলোচনা না করে প্রশিক্ষার্থীদের উপযাচক হয়ে এরকম অঙ্গীকার করেছিলাম। বিশেষত এই মিশনে আমার একজন বন্ধুসম কূটনীতিক আছেন কাজেই একটা ভরসাও ছিল মনে।

বিজয় দিবস যখন আসন্ন, আমি আমার ওই বন্ধু কূটনীতিককে বললাম- ভাই, আমরা দূতাবাসে যেতে চাই, যদি অনুমতি দেন, তো আমাদের জন্য কিছুই করতে হবে না। আমরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় যাব, আসব। তিনি বললেন, তিনি রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের সাথে আলাপ করে জানাবেন। পনের ডিসেম্বর যায় যায়, তার ফোন পাই না। লজ্জার মাথা খেয়ে আমি নিজেই ফোন করে জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রতুত্তরে জানালেন, মান্যবর রাষ্ট্রদূত মহোদয় বলেছেন, তাদের দূতাবাস ঠিক কলকাতার মত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে না। স্থানাভাবে তারা মিশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়ে আর হোস্ট কান্ট্রির অল্প কিছু সংখ্যক সিলেক্টেড গেস্ট নিয়ে অনুষ্ঠানটি করে থাকেন। আমরা যেহেতু সংখ্যায় চল্লিশ জন, তারা আমাদের অংশগ্রহণটাকে স্বাগত জানাতে পারছে না। আমার বেশ খারাপ লাগলেও জিনিসটা হজম করে নিলাম। প্রশিক্ষার্থীরা সবাই দেখলেন যে, একজন কূটনৈতিক কাজে ইতোপূর্বে দায়িত্বপালনকারী সরকারি কর্মকর্তা তাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাতে পারলেন না। খামোখাই বলেছিলেন, অযথাই উৎসাহিত করেছিলেন বিদেশে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণার্থে। আর আমি উঁচু মুখ নিচু করে চুপ থাকলাম।

 

আজ ক্লাসের ফাঁকে যে সমস্ত চীনা ভাষা শিখলামঃ

Spicy beef noodles = La niuro mian

Fish = Ya

Water = Shui(উচ্চারণ- শুএ)

Rice = Mi fan

Chicken = Ji

China = Zhong guo (উচ্চারণ – চুং-গুয়া)

Washroom = Ce suo(ছে ছুয়া)

বাংলাদেশ = Meng jia la guo(মান জা লা গুয়া)

আমেরিকা = Mei guo

England = Ying guo

India = Yingdu

Pakistan = Baji ji sitan

Day = Tian

Month = Yue

Year =Nian

Week = Xing qi (শিং ছিয়ে)

 

ওপরে বর্ণিত কতিপয় চীনা ভাষা থেকে যে ধারণা পেলেন তার মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে একটু বলি। বাংলাদেশকে চীনারা বলেন মাংজালাগুয়া। উল্লেখ্য, মাংজালা অর্থ বাংলা বা ইংরেজীতে Bengal আর guo লিখলেও এরা উচ্চারণ করে গুয়া যার অর্থ দেশ। সেভাবেই মাংজালাগুয়া অর্থ বাংলাদেশ। চীনা বা China হলো Zhong guo(বাংলা উচ্চারণ চুং গুয়া)। চুং অর্থ চীন গুয়া অর্থ দেশ। অর্থাৎ চীনকে তারা চীনা ভাষায় চীন বলে সন্তুষ্ট নয়, চীনদেশ বলে থাকে।লক্ষ্য করেছেন হয়ত যে, ইংরেজীতে লিখছে Zhong আর উচ্চারণ করছে চুং। শতকরা একশতভাগ যে চুং উচ্চারণ করে তাও নয়। চুং এবং টুং এর মাঝামাঝি উচ্চারণ করে থাকে। একবার একটি ভোজ সভায় চীনা ও মালয়েশিয়ান কিছু সংখ্যক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য অনেক মালয়েশিয়ান আর চীনাদের অবয়ব দেখে আমার মত লোকের পক্ষে সম্ভব নয় বুঝতে পারা কে চীনা আর কে মালয়েশিয়ান। এমতাবস্থায়, আমি কৌতুহল বশত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, আর ইউ এ চাইনিজ? ভদ্রলোক নির্বিকার বুঝতে পারলেন না আমার প্রশ্ন। আমি এবার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল আমার দিকে নির্দেশ করে বললাম, আই এ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ আর তর্জনিটি তার দিকে নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করলাম, আর ইউ ফ্রম চায়না? কোনও কাজ হলো না। মুসিবতে পড়ে গেলাম। আমি সুবিধেমত এক ফাঁকে উঠে গিয়ে মিস রুমংকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম, রুমং, হোয়াট ইজ ‘চাইনিজ’ ইন ইয়র ল্যাঙ্গুয়েজ? আমাকে বুঝিয়ে দিলো তখন, ‘চাইনিজ’ হলো চুংগুয়ারিয়ান আর ‘চায়না’ হলো চুংগুয়া। আমার আগের আসনটি তখনো খালি পড়ে আছে। আমি আস্তে গিয়ে বসে কথাচ্ছলে আবার জিজ্ঞেস করলাম আগের মত আমার দিকে বৃদ্ধাঙ্গুল আর তার দিকে তর্জনি নির্দেশ করে। এবারে ইংরেজীর কোনও বালাই রাখলাম না। শুধু বললাম, মাংজালা আর চুংগুয়া। এবারে ভদ্রলোক সহাস্যে উত্তর দিলেন, চুংগুয়া।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment