গ্রেটওয়ালের দেশে-১৬তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

আজ শুক্রবার হওয়ায় আমাদের আবার সুযোগ হলো ক্লাস শেষে নিউজি মসজিদে নামাজ আদায় করতে যেতে। আমি যেহেতু খুব বেশি জানপেহচান নামাজি নই, এ বিষয়ে নিজের দুর্বলতা আছে, অস্বীকার করি না। একজন সাধারণ নামাজি আমি। তাই নামাজের জন্য আগেই মসজিদ অভ্যন্তরে গিয়ে ইবাদতে মগ্ন হই না। এ কারণে নামাজের আগে বেশ খানিকটা সময় পাওয়ায় আজও মসজিদের সেলস সেন্টারটিতে প্রবেশ করে এটা সেটা দেখছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে সহকারি প্রকৌশলী আরিফ এসে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার আপনি যে ইতোপূর্বে জায়নামাজ কিনেছিলেন, তা কোথায় পাবো?’ –‘এখানেই পাবে,’ বলে আমি সেলস-লেডির উদ্দেশ্যে বললাম, ‘জায়নামাজ?” সেলস-লেডি কিছুই বুঝলেন না। আরিফ নিজে দুহাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করল, কাজ হলো না। সেলস-লেডি একবার দোকানের টুপির দিকে আরেকবার অন্য দ্রব্যাদির দিকে তাকালেন। এবারে আমি ফ্লোরে জায়নামাজ বিছানোর ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে দুহাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে তাকবীরে তাহরীমা বাধার মত অভিনয় করলাম। কাজ হলো এবার। সেলস-লেডি এবার চীনা ভাষায় ‘ওকে, ওকে, দিচ্ছি’ এধরণের কথা বললেন হেসে। একটি জায়নামাজ দেখে ‘হাও মাচ?’ বলে দাম জিজ্ঞেস করলে ক্যালকুলেটরে 40 লিখে চোখের সামনে ধরলো। অর্থাৎ জায়নামাজটির দাম চল্লিশ আরএমবি বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পাঁচশত টাকা। আরিফ বলল, ‘স্যার দুটো নেব।’ আমি দোকানি ভদ্রমহিলাকে বললাম, ‘প্প্লিজ ব্রিং ওয়ান মোর।’ তিনি কিছুই বুঝলেন না। অদূরে একজন অতিশয় সুন্দরী মহিলা স্কার্ফ দেখছিলেন। তিনি আমাদের ভাষা-সঙ্কট বুঝতে পারলেন। তিনি চীনা ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন যে, আমাদের আরেকটি জায়নামাজ চাই। দোকানি যা বললেন, তা শুনে ওই সঙ্কটমোচনকারিণী বললেন,  ‘প্লিজ ওয়েট, দে উইল ব্রিং ফ্রম স্টোর ফর ইউ।’ থ্যাঙ্কস জানালাম স্মিত হেসে। কপোলে টোল খেলিয়ে অপাঙ্গে ধনুক রেখা উঠিয়ে ভদ্রমহিলাও ওয়েলকাম জানালেন। ভদ্রমহিলার সম্পর্কে খানিক কৌতুহল হলো। তিনি সাধারণ চীনাদের চেয়ে একটু বেশি সুন্দরী এবং দেহবল্লরী অনেক বেশি সুডৌল, স্বাস্থ্যবতী। কৌতুহলকে স্থান দিতে চাইলাম না মনে, বিশেষত যেখানে জুনিয়র অফিসার একজন সাথে, কী মনে করে আবার তাই ভেবে। জায়নামাজ ক্রয় শেষ হলে আরিফ, ‘স্যার যাই’, বলে সেলস-সেন্টারটি থেকে নিষ্ক্রান্ত হলো।

 

অনেকদিন থেকে একটি জিনিস কিনবো মনে করছিলাম। চীনা ও ইংরেজী যুগপৎ ভাষার অনুবাদসহ পবিত্রগ্রন্থ আলকুরআনের একটি কপি সংগ্রহ করতে মনঃস্থ করেছিলাম যেদিন প্রথম এ চত্ত্বরে আসি সেদিনই। যে কোন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের প্রতি আমার ঝোঁক বেশি। যখন কলকাতায় ছিলাম, তখন সেখানে পুরনো পুঁথি সাহিত্যের খোঁজ করেছিলাম। ওয়েলিংটন স্ট্রীট থেকে খুঁজে খুঁজে দুষ্প্রাপ্য গানের সিডি যোগাড় করেছি, পুরনো কলের গানের যন্ত্র সংগ্রহ করেছি এখান থেকে। আজ তাই, সেলস-লেডিকে জিজ্ঞেস করলাম, ওই ধরণের পবিত্রগ্রন্থের কপি আছে কি না। এবারেও সেলস-লেডি যথারীতি কিছুই বুঝলো না। কী করে বোঝাই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পেছন ফিরতেই একেবারে চোখে বিদ্যুৎ ঝলকানির মত এসে লাগলো। দেখি ওই সুডৌলিনী তার তরঙ্গায়িত কেশদাম ঠিক করছে দুহাত গলদেশের পেছনে দিয়ে আর তার বেয়াড়া লাল ওভারকোটের সামনের অংশ ফাঁক হয়ে আঁটোসাঁটো পরিচ্ছদে ঢেকে রাখা সুরক্ষিত সামনের ঊর্ধ্বাংশের আকৃতি নিরাবরণ করে সৌন্দর্য বিকিরণ করছে। সলজ্জ আমি তাড়াতাড়ি দৃষ্টি নামিয়ে দোকানির দিকে ফিরলাম। তারপর বোঝানোর পুনঃপ্রয়াস পাচ্ছিলাম আমার চাহিদা কী তা। মুহূর্তেই আবার সেই ট্রানস্লেটর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন কাছে এসে। তিনি আবারো চীনা ভাষায় সেলস-লেডিকে বোঝালেন আমি কী চাই। তারপর উত্তর শুনে আমাকে ইংরেজিতে বললেন, ‘স্যরি, দে ডু নট হ্যাভ ইট।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, পরের সপ্তাহে এলে পাবো কি? এবারে উত্তর নিয়ে জানালেন, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। নামাজের সময় আসন্ন। আমি মসজিদে নামাজের জন্য সেলস-সেন্টারটি থেকে বের হয়ে এলাম ট্রান্সলেটরকে ধন্যবাদ দিয়ে। কিন্তু ট্রান্সলেটর যেন মনে এক স্থায়ী রেখাপাত করলো। একবার ইচ্ছে হলো ফিরে যাই, একদু’মিনিটে জেনে আসি তার নাম পরিচয়। কী বিচিত্র মানব মন! পোস্টমাস্টার আর রতনের ঘটনার মতই মনে মনে বললাম, নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করে কী আর হবে? কে কোথায় চলে যাব আমরা। পৃথিবীতে কে কাহার?

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment