গ্রেটওয়ালের দেশে – ১৭তম পর্ব

Tianjin-china

সতেরো ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

প্রতি উইকেণ্ডে বেড়ানোর সুযোগ নিয়ে থাকি। আজ গিয়েছিলাম বেইজিং এ্যাকুয়ারিয়াম(Beijing Acquarium)সকাল সাড়ে ন’টায় বেইজিং ওয়েস্ট রেলওয়ে স্টেশনের পাশের আমাদের হোটেল থেকে বাসে যাত্রা করে এক ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত বেইজিং এ্যাকুয়ারিয়াম। আমাদের সাথে আজ রয়েছে গাইড মিস জেসি। একুয়ারিয়াম বলতে আমরা ঢাকার বাসাবাড়িতে বা দোকানে বা হোটেল রেস্তোরায় যে সব এ্যাকুয়ারিয়াম দেখে থাকি, পাঠক দয়া করে সে রকম ভাববেন না। কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারবেন এই এ্যকুয়ারিয়ামের বিশালত্ব আর প্রকার। জনপ্রতি ১৬০ আরএমবি করে টিকেট কেটে গেটের অভ্যন্তরে প্রবেশাধিকার পেলাম। গাইড মিস জেসি গেটে আমাদের ছেড়ে দিয়ে বলল, তোমাদের জন্য তিন ঘন্টা বরাদ্দ করা হলো। সব কিছু দেখেটেখে ঠিক বেলা দেড়টার সময় আবার এখানে জমায়েত হবে যাতে করে তোমাদের লাঞ্চে নিয়ে যেতে পারি। আমরা তথাস্তু বলে আমাদের দেখার পালা শুরু করলাম।

এখানে মোট আটটি গেট আছে, আটটি সেকশনের বিভিন্ন জলজ প্রাণিদের আবাস রয়েছে। সমুদ্রের নীচে কিভাবে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণি থাকে তারই এক অল্টারনেট প্রদর্শনী এটা।

এখানে রয়েছে Coral reef এবং এর মাঝে আছে বিচিত্র সব মাছ, হাঙ্গর ও অন্যান্য প্রাণি। একটি কাঁচঘেরা বিশাল একুয়ারিয়ামে দেখলাম একজন আস্ত মানুষ ডুবুরির মত সাঁতার কেটে কেটে বড় বড় শার্ক ও মাছগুলোকে খাবার দিচ্ছে। এখানে কিছু মাছ দেখলাম একেবারে রাশান ফাইটার বিমানের মত আবার কিছু দেখলাম বিশাল আকৃতির উড়ন্ত পেঁচকের মত। এসব দেখে তাজ্জব বনে গেলাম। আরেক সেকশনে দেখলাম জেলিফিস। জেলিফিস যে কত প্রকারের, কত রঙের আর কত আকারের হতে পারে তা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে থাকলো। অন্তত কুড়ি প্রকারের বিভিন্ন রঙের আর আকৃতির জেলিফিস ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির বিভিন্ন রঙের অপূর্ব সব মাছ সাঁতার কেটে নয়ন জুড়িয়ে দিচ্ছে বিশাল বিশাল সব একুয়ারিয়ামে। একুয়ারিয়াম নয় যেন সত্যিকার সমুদ্রের তলদেশে ঘুরছি আর দেখছি। কোথাও কোথাও এস্কেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে  উঠতে ও নামতে হলো। এপথের দুপাশ দিয়েই  স্বচ্ছ কাঁচঘেরা একুয়ারিয়াম। মনে হলো যেন সমুদ্রের তলদেশের পানি ভাগ করে মাঝখান দিয়ে পথ করা হয়েছে, আর এই বুঝি কোন বিশাল মাছ হা করে এসে আমাকে গিলে ফেলবে।

এসব একুয়ারিয়াম দেখতে দেখতে চলে এলাম একটি বিশাল স্থানে যেখানে নিচে কৃত্রিম হ্রদ করা হয়েছে। চারদিকে পানির চেয়ে যৎসামান্য উঁচু পাড়যুক্ত এ হ্রদটা যেন একটি খেলার মঞ্চ আর তার সামনে বামে ডানে দর্শকদের বসবার জন্য গ্যালারি। বেলা সাড়ে এগারোটায় শুরু হবে ডলফিন শো। হাতে মাত্র পনের মিনিট। গ্যালারি প্রায় পূর্ণ দর্শকে।তাই আমরা গ্যালারির যে যেখানে ফাঁকা আসন পেলাম বসে গেলাম। আমি সৌভাগ্যবশতঃ একপাশে একেবারে সামনে থেকে তৃতীয় সারিতে জায়গা পেলাম ।আমার ডানপাশে উপবিষ্ট চৈনিক ভদ্রলোক উঠে গিয়ে অন্যত্র বসলেন সম্ভবত; তার বন্ধু বা পরিজন কারো সাথে। আমি এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। পেছন থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকরকে ডেকে এনে সেখানে বসালাম।

 

ঘড়ির কাটা ঠিক সাড়ে এগারোটায় পৌঁছানোর সাথে সাথে একজন চীনা তরুণী লেকের মঞ্চে এসে মাইক্রোফোনে সবাইকে চীনা ভাষায় স্বাগত জানালো। দেখলাম সকল চৈনিক দর্শকই দুহাত তুলে ওয়েভ করছে, দেখাদেখি আমরাও তাই করলাম। এরপর হ্রদের পেছনের একপাশের গেট খুলে দিলে দুটো সাদা ডলফিন সাঁতরিয়ে  আমাদের এই লেকের পাড়ের এই তরুণীটির কাছে চলে এলো। শুরু হলো ডলফিনের বিভিন্ন খেলা। সাদা ডলফিন দুটোর পর এলো দুটো শ্যামলা ডলফিন। এরা এসেই একসাথে লাফ দিয়ে অনেক ওপরে উঠে আবার ডাইভ দিল। অপূর্ব লাগলো এই ক্রীড়াশৈলী। মেয়েগুলো তাদের হাত ওপরে উঠিয়ে নাচের ভঙ্গিতে ডানে বামে ওয়েভ করলে ডলফিনগুলোও তাদের ফিন ডানে বামে দোলাতে লাগলো। তরুণীটি হাত দিয়ে টাটা বাই বাই দিলে ডলফিনও তার সামনের দুটো ফিন দিয়ে টাটা বাই বাই দিচ্ছে। একটি ছেলে পানিতে নেমে সাঁতার দিলে ডলফিন তাকে পিঠে উঠিয়ে দ্রুত অন্য পাড়ে পৌঁছে দেয়। খুব আনন্দিত উল্লসিত সব দর্শক।

মনে আছে ২০০৫ সালে থাইল্যান্ডের পাতায়াতে একবার ডলফিন শো দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে অবশ্য ডলফিন আরো কিছু ক্রীড়া প্রদর্শন করেছিল। যেমন একটি মেয়ে হাতে একটি রিং নিয়ে দাঁড়িয়েছিল আর ডলফিন সার্কাসের প্রাণিদের মত লাফ দিয়ে রিং এর ভেতর দিয়ে অন্যপাশে গিয়েছিল, ইত্যাদি।  থাইল্যান্ডে এলিফ্যাণ্ট শো এবং অন্যান্য খেলা যেমন আগুনের ভয়ঙ্কর শ্বাসরুদ্ধকর খেলা দেখেছিলামএলিফ্যাণ্ট শো শুরু হবার পূর্বে একজন ভারতীয় ভদ্রলোক গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে বললেন, all Indians! Please stand up and dance…আর যায় কোথা? গ্যালারিতে থাকা সব ভারতীয় নাগরিক হিন্দী গানের সাথে নাচতে লাগলো, নারী পুরুষ, শিশু, যুবা, বৃদ্ধ সবাই একসাথে নাচাগানা শুরু করলো। এই স্মৃতিটা আমি কোনওদিন ভুলতে পারবো না। আমি ইন্ডিয়ানদের এই প্রতিভা আর ঐক্য দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। সেবারে থাইল্যান্ডে গিয়েছিলাম মাসখানেকের জন্য আর এবার চীনে এসে মাস দেড়েক পার করে দিলাম। দুটি অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পর্যটনের দিক দিয়ে থাইল্যাণ্ড চীনের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। শুধু একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই।  থাইল্যান্ডের মার্কেট প্লেসে হোক আর যেখানেই হোক – টয়লেট বা ওয়াশরুম দেখলেই বুঝা যায় এরা কত প্রফেশনাল। প্রত্যেকটা জায়গা ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, অতি সুন্দর। ব্যাংককের তুলনায় বেইজিং এর ওয়াশরুমগুলো দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা বললে অত্যুক্তি হবে না। থাইল্যান্ডে ট্যুরিস্টও যায় অনেক বেশি। অনেকে বলেন, সেদেশে সেক্স-ট্যুরিজম থাকার কারণে এত বেশি ট্যুরিস্ট যায়। কথাটা ঠিক নয়। আমি দেখেছি ইউরোপ আমেরিকার বা অন্যান্য দেশের ট্যুরিস্টদের মধ্যে বেশিরভাগ যায় হানিমুন ট্যুরে বা অবিবাহিতদের মধ্যে অনেকেই তাদের গার্লফ্রেণ্ড বা বয়ফ্রেণ্ড নিয়ে যায় এবং অনেক আছে ফ্যামিলি ট্রিপ। তাছাড়া ধর্মে অবিশ্বাসীরাও প্রোস্টিটিউশনকে সমর্থন করে না, যতই সেক্সওয়ার্কার বা যৌনকর্মী নামে এ পেশায় জড়িতদের বলা হোক না কেন। থাইল্যাণ্ড বা ভারতে ধর্মীয় সফর বা রিলিজিয়াস ট্যুরিজমও টোটাল ট্যুরিজমের একটি বিরাট অংশ কিন্তু কমিউনিস্ট দেশ চীনের বেইজিং-এও যা দেখেছি তা চিন্তা করলেও অনেকের চোখ ছানাবড়া হতে পারে। বেইজিং-এর সব হোটেলের আশেপাশের সব রাস্তার ফুটপাতে  তথাকথিত কলগার্ল ও সেক্সওয়ার্কারদের ন্যুড ছবি সম্বলিত অজস্র কার্ড ছড়িয়ে দেয়া হয় প্রতি অপরাহ্নে। বিভিন্ন হোটেল রুমের দরজার নিচ দিয়েও এসব ন্যুড কার্ড পাস করে দেয়া হয়। এসমস্ত কার্ডে থাকে তাদের ফোন ও ই-মেইল আইডি। তাহলে সেক্স-ট্যুরিজমই যদি বলেন, তবে চায়নাই বা কম কোথায়? আর থাই মেয়েদের তুলনায় চীনা মেয়েরা মোটেই কম  সুন্দরীও নয়। কিন্তু তবুও ব্যাংককের তুলনায় বেইজিং-এ পর্যটক লক্ষণীয়ভাবে কম। তবে শুনেছি চীনের হারবিন, হাংজু, সাংহাই, হংকং, কুনমিং এ সমস্ত শহরে অনেক বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন।

যারা বলেন, আমাদের দেশে ডব্লিউ-ডব্লিউএর অবাধ সুবিধে না থাকার কারণে এখানে পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে না, তাদের শুধু একটা কথাই বলা যায়, ‘মশাই, আপনারা হলেন ওয়ান-ট্র্যাক-মাইণ্ডেডআপনাদের মন ও মস্তিষ্কের চিকিৎসা করান, দেখবেন সব বুঝতে পারবেন।’ আমাদের দেশের যে ঐতিহ্য আর কৃষ্টি সভ্যতার নিদর্শন আছে, আর যা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আছে সেদিকে দৃষ্টি দিয়েই দেশ পর্যটকে ভরিয়ে দেয়া সম্ভব। ধর্মীয় পর্যটনও এখানে দেদার চলতে পারে বুদ্ধিষ্ট আর হিন্দু পর্যটক দ্বারা। শুধু দরকার সব কিছুর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা । ভারত যদি জয়পুরে আন্তর্জাতিক সভা সেমিনার ওয়ার্কশপ করতে পারে, তো আমরা কেন শুধু ঢাকা নির্ভর করি এসব। আমাদের নাটোর রাজবাড়ির সংস্কার করে এখানেও তো করতে পারি আমরা আন্তর্জাতিক সভা সেমিনার। বিদেশীদের শুধু চেনাবেন যানজটের ঢাকা, তাহলে কি করে হবে। আমাদের পর্যটন বিকাশ আর সংস্কৃতি উন্নয়নের জন্য বাজেটের শতাংশের কথা চিন্তা করুন আর বিদেশে এ খাতে কতভাগ রাখা হয় তার তুলনামূলক চিত্রটা মাথায় নিলেই সমস্যার অনেকটা সমাধানের দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।

 

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment