গ্রেটওয়ালের দেশে -১৮তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে

যাহোক, আজ দুপুরে ফু চেং লু সড়কে অবস্থিত একটি রেস্তোঁরায় মধ্যাহ্নভোজ হলো। রেস্তোঁরাটি একটি মুসলিম রেস্তোঁরা, নাম Xi Bei Zha ma-san-Ting. রেস্তোঁরার মালকিন একজন মুসলিম লেডি। নাম –ঝু মা। তার সাথে তার বোনও দোকান চালায়। দুজনেই মাথায় স্কার্ফ পরা। তবে এ স্কার্ফ শুধু মাথার চুলই ঢেকে রাখে, ঘাড়, গলদেশ বা শরীরের কোনো অংশ নয়। মালকিন মহিলা বেশ সুন্দরী। সাধারণ চৈনিক চেহারা নয়, অনেকটা ককেশীয় মুখাবয়ব। খাবার ভাল ছিল। ফোন নং-কে চীনা ভাষায় বলে দিয়াম হুয়া। রেস্তোঁরার বিজনেস কার্ড চাইলে সে চীনা ভাষায় দিয়াম হুয়া লিখে দিল ০১০ ৬৫৪৩২০০৯। প্রসঙ্গত একটা বিষয় পাঠককে এখানে জানিয়ে রাখা ভালো। সেটা হলো সমগ্র চীনে মুসলিম রেস্তোঁরার ছড়াছড়ি এবং মুসলিম রেস্তোঁরাগুলো এখানে খুব জনপ্রিয়। এসব স্থানে বীফ, মাটন, চিকেন, ফিশ পাওয়া যায় ট্রাডিশনাল চীনা আইটেমের সাথে। ফলে সব ধর্মের পর্যটকদের কাছে এসব রেস্তোরাঁ যেমন জনপ্রিয়, তেমনি আধুনিক চীনাদের কাছেও জনপ্রিয়। প্রত্যেকটি মুসলিম রেস্তোঁরা আপনি সহজেই চিনবেন। কেননা এসব রেস্তোঁরার গেটের সামনে আরবীতে, অধিকাংশক্ষেত্রে এরাবিক ক্যালিওগ্রাফিক হরফে রেস্তোঁরার নাম লেখা থাকে চীনা ভাষার পাশাপাশি। এছাড়া রেস্তারার গেটে আরবীতে ‘হালাল’ শব্দটিও লেখা থাকে। তবে রেস্তোঁরা যতই হালাল হোক, এসবের একটি কর্ণার শেলফে কিন্তু হার্ড ড্রিংকসের বোতলও সাজানো থাকে।এমনকি আমরা  বড়সড় যে হোটেলটিতে থাকি, তার মূল ক্যাণ্টিনের পরে আরেকটি ছোট রেস্তোঁরা আছে, যেটার নাম ইংরেজীতে লেখা দেখেছি ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট। ভেতরে প্রবেশ করে এখানেও দেখেছি একটি কর্ণারে হার্ড ড্রিংকসের বোতল সাজানো আছে। তবে একটা বিষয়ে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, মুসলিম নামধারী কোনো রেস্তোঁরাতেই আপনি পর্ক বা শুকরের মাংস পাবেন না।

 

আঠারো ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। আজ সকালের ব্রেকফাস্টের বর্ণনাটা একটু দিয়ে নেই প্রথমে। আজ যা যা আমার রিজিক থেকে খেলাম সকালবেলা সেগুলো হলো- (১)একটি Chinese Yellow Sweet Cake, (২)কিছু পার্সলে পাতা, (৩)কিছু Silk Tofu, (৪)কিছু Jellyfish Head Cabbage, (৫)একটি সিদ্ধ ডিম, (৬) এক বাটি Millet Congee(হলদে কাউনের জাউ), (৭)এক বাটি Plain Rice Congee(সাধারণ আতপ চালের জাউ), (৮) কয়েক টুকরা তরমুজ, (৯)কয়েক টুকরা Hami Melon ও (১০) এক বাটি Yogurt ব্রেকফাস্ট শেষ হলে আমরা বাসে গিয়ে বসলাম। আজ আমাদের যাওয়ার কথা ছিল ভিলেজ ট্যুরে। কিন্তু গতকাল একুইরিয়াম দেখে অনেকেই ক্লান্ত। ফলে, দূরে যেতে চাইলো না অনেকেই। তাই কাছাকাছি মার্কেটে আর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে যেতে সিদ্ধান্ত হয়।

 

কারো কারো জন্য প্রথমবার হলেও আমার জন্য বেইজিং হংসিয়াও পার্ল মার্কেটে আসাটা দ্বিতীয়বারমাত্র চারতলা মার্কেটটিতে লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি দুই-ই আছে। বেইজিং এর অন্যতম দর-কষাকষির শপিংমল এটি। পর্যটকরা মনে করে থাকেন, এটি সস্তায় কেনাকাটা করার মত একটি জায়গা। তাই সাদা চামড়া থেকে কালো চামড়া সকল বিদেশী অতিথিদের কাছে খুব পপুলার এ মার্কেট। আর এখানকার মহিলা দোকানিরাও একটু খোলামেলা লাস্যময় আচরণ করে পণ্য বিক্রি করার কায়দা জানে। লাস্যময় আচরণ কীরকম একটু বলি। প্রথমবার যখন এই শপিংমলে আসি, তখন আমি সবার থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। কেননা আমার কেনাকাটার দরকার ছিল না, কী কী পাওয়া যায়, তাই শুধু জানা দরকার ছিলতো আমি বিভিন্ন ফ্লোরে দেখছিলাম বিভিন্ন দ্রব্য। একটি ফ্লোরে হেঁটে যাবার সময় আমি খুব সুন্দর একটি জ্যাকেট দেখে বলে উঠি, ‘বিউটিফুল।’ সেখানে একটি তরুণী দুহাত ওপরে তুলে গলদেশের পেছনে তার কেশ পরিচর্যা বা অন্য কিছু করছিল। আমি কিন্তু তার পাশে ঝোলানো সুন্দর জ্যাকেটটির দিকে তাকিয়েই ‘বিউটিফুল’ শব্দটি উচ্চারণ করে চলে যাচ্ছিলাম। আচম্বিতে মেয়েটি একটি দুষ্টু হাসি দিয়ে করল কি, দৌড়ে এসে আমার পৃষ্ঠদেশে তার নরম হাতের একটি কিল দিয়ে দৌড়ে চলে গেল তার পাশে বসা সখির কাছে। আমি তো অবাক। ঘটনা আরো আছে, একটু পরে বলছি।

আজ আমার সাথে ছিল প্রকৌশলী আবু বকর। তার কাছে তিনটি হাতঘড়ির দাম হাঁকালো ৭০০ আরএমবি। আবু বকর তার দর কষাকষির অপূর্ব দক্ষতা বলে তিনটি ১৪৫ আরএমবিতেই কিনে নিল। আমার ভাতিজির জন্য একটি চীনা ড্রেস কেনার রিকুইজিশন ছিল। আমি দোকানিকে দাম জিজ্ঞেস করলে দাম চাইলো ৬০০ আরএমবি। আমি ইতোমধ্যে আবুবকরের সাথে ঘুরে ঘুরে দর দাম করার কৌশল কিছুটা আয়ত্ব করে ফেলেছি।তারপরেও আবুবকরের দিকে তাকালাম একবার আরেকবার দোকানির দিকে। আবুবকর আস্তে করে আমাকে বলল, বলেন পঁচিশ টাকা(আরএমবি)। আমি বিসমিল্লাহ বলে বুকে থুথু দিয়ে সাহস সঞ্চয় করে দাম বললাম তিরিশ আরএমবি। দোকানি ক্ষেপে উঠে বলল, ‘ইউ আর ক্রেইজি ; আর ইউ জোকিং?’ বলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমিও ছাড়লাম না। ‘আমার মনে হয়, তুমিই ক্রেজি আর তুমিই মশকরা করছো’ , বলতে বলতে ওই দোকান থেকে অন্তর্হিত হলাম।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment