গ্রেটওয়ালের দেশে -১৯তম পর্ব

Great-wall-of-China-beijing-bookmundi

অনেকদিন ভেবেছি, নিজের জন্য একটা ভাল বাইনোকুলার কিনব। তাই বাইনোকুলারের দোকানে গিয়ে একটি পছন্দ করে দাম জিজ্ঞেস করলাম। এবারের দোকানিটি পুরুষ। সে প্রথমে একটু অবজ্ঞার দৃষ্টিতে চাইলো মনে হলো। ভাবখানা এমন যে, এটা তো অনেক মূল্যবান বস্তু, তোমরা তো নিতে পারবে না এত টাকা দিয়ে। প্রথমে সে শুনেও না শোনার ভান করল। আবার জিজ্ঞেস করলাম, ভাই দাম কত?  তখন সে বাইনোকুলারের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ছোটখাটো একটা ‘বক্তিমা’ ঝেড়ে বলল, এটির দাম একহাজার আরএমবি। স্পেশ্যাল ডিসকাউন্টে এখন দাম ৪৮০ আরএমবি। শেষ পর্যন্ত বাইনোকুলারটি ১৫০ আরএমবি দিয়ে কিনলাম। আবুবকর এবার আমার বার্গেইনিং ক্যাপাসিটি দেখে বেশ সন্তুষ্ট হলো। এরপর আবার গেলাম সেই চীনা ড্রেসের দোকানে। এবারে সে বলল, ঠিক আছে, তুমি যখন আবার এসেছো, তোমাকে আমি কেনা দামে দিয়ে দেব। ৩৫০ আরএমবি। আবু বকর বলল, না না, ওই ৩০ আরএমবিতেই দাও। আমি চিন্তা করলাম, ঐ দামে দিলে তো তখনি দিত, তাই একবারে দশ বাড়িয়ে বললাম, লাস্ট প্রাইস ৪০ আরএমবি। দোকানি দাঁত বের করে দিয়ে দিল।

 

আমার আর কেনাকাটার কিছু নেই। আবুবকর কেনাকাটা শেষ করলে আমরা বাসে গিয়ে উঠব, প্লান করতেই দেখি আমার ব্যাচমেট উপসচিব মফিজ। সে আবার বিরাট ধার্মিক। সে বলল, ‘দোস্ত, নামাজ পড়বা না’? ‘জোহরের নামাজ?’, আমি জিজ্ঞেস করলাম। নামাজের মত একটি ভাল কাজে কেউ আহ্বান জানালে কি না বলা যায়? আমি আবুবকরকে বললাম, চল যাই। আমি আর মফিজ ছাদে নামাজ পড়লাম আর আবুবকর জুতা খুলে ওজু করার অসুবিধের অজুহাতে  আমাদের ব্যাগট্যাগ দেখার নিমিত্ত দাঁড়িয়ে রইল অদূরে। এবারে চারতলার ছাদ থেকে নেমে নিচতলা আসতেই দেখি ‘মিনিসো’ নামে একটি দোকান। নিচতলার এক কর্নারে। আমি কিছু আণ্ডারগার্মেন্টস আর কিছু কসমেটিক্স দেখছিলাম। হঠাৎ একটি সুন্দরী তরুণীকে দেখলাম বাস্কেট নিয়ে দাঁড়ানো। কিন্তু এমনভাবে ধরেছে বাস্কেটটা যেমনভাবে ফ্লাওয়ার বাস্কেট নিয়ে মালিনীরা বাগান থেকে ফুল তোলে। সে এগিয়ে এসে আমাকে বলল, ‘নাও ঝুড়িটা, এখানে রাখো, সুবিধে হবে দেখতে।’ আমি হাতের পণ্যগুলো ঝুড়িতে রেখে আরো কিছু দ্রব্য দেখে টেখে বিলিং কাউণ্টারের দিকে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ সে আমাকে বলল, ‘ইউ আর মাই সানশাইন’, বলেই একটা জোছনা-ঝরানো হাসি। টসটসে গোলাপি একটি তরুণী যদি একজন মধ্যবয়স্ক লোককে বলে এরকম একটি বাক্য, তাহলে বলুন পাঠক, এদের এ আচরণ লাস্যময় ব্যতিরেকে আর কীই-বা বলতে পারি। আমি তাড়াতাড়ি বিল পে করে মিনিসো চত্ত্বর থেকে বাইরে এসে মফিজ আর আবুবকরকে খুঁজতে লাগলাম।

 

লাঞ্চের পর আমরা আমাদের বাসে করে গেলাম বেইজিং ন্যাশনাল স্টেডিয়াম বা অলিম্পিক স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামটির ডিজাইনটা এমন যে, অনেক দূর থেকে বা আকাশ থেকে এটাকে পাখির বাসা সদৃশ মনে হয়, তাই এটাকে অনেকেই বার্ড’স নেস্ট বলে থাকে। উল্লেখ্য যে, ২০০৪ সালের বেইজিং অলিম্পিক গেমস এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ডিসেম্বরের শীতে এই স্টেডিয়ামে কোন খেলাধুলা বা টুর্ণামেন্ট হয় না। তবে বড় বড় কনসার্ট বা ফাংশন হয়ে থাকে। আর দর্শনীয় স্থান হিসেবে এটা দেখানো হয়। আমরা  ৮০ আরএমবি করে টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। এই স্টেডিয়াম আমাদের ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে অনেক উঁচু। তাই উঁচু সিঁড়ি বেয়ে আমরা ওপরে উঠে গ্যালারিতে প্রবেশ করলাম। স্টেডিয়ামটি এত বড় যে একসঙ্গে এক লক্ষ দর্শক গ্যালারিতে বসে খেলা বা অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারে। এই স্টেডিয়ামের পাশেই রয়েছে ইনডোর স্টেডিয়াম, যেখানে রয়েছে সুইমিং পুল। আর ইনডোর স্টেডিয়ামের চারদিকের দেয়াল মোটা কাঁচের তৈরি যা ক্রিস্টালের ঢেউ খেলানো। দূর থেকে এর দিকে তাকালে মনে হয় পানিতে ঢেউ খেলছে। তাই ইনডোর স্টেডিয়াম এখানে ওয়াটার কিউব নামে পরিচিত।

 

১৯ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।সোমবার। আজ সকালে পাওয়ার প্লান্টে ক্লাস ছিল। ক্লাস শেষে হোটেল ফিরতে ফিরতে বেলা সোয়া একটা। লাঞ্চ সেরে সেলফোনে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কমে খবরের আপডেট দেখলাম। রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ টিভিতে চীনা চ্যানেলগুলো ব্রাউজিং করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ইদানীং প্রায়ই ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখছি। মাঝে মাঝে হালকা দুঃস্বপ্নও দেখি। আজ এই স্বল্পকালিন বৈকালিক ঘুমে আমার স্ত্রীকে স্বপ্ন দেখলাম। ঘুম থেকে উঠে আসরের নামাজ পড়ে আবার টিভিটা অন করলাম। দেখি চীনা আর্মি চ্যানেলে সৈনিকদের মার্শাল আর্ট, এক্সারসাইজ ইত্যাদি হচ্ছে। মার্শাল আর্ট ও শারীরিক কসরৎ যারা করছে তাদের মধ্যে কোন মহিলা সৈনিক দেখা গেল না কিন্তু পরিচালনা করছে দেখলাম একজন মহিলা। মহিলাটি সৈনিক নাকি সিভিলিয়ান তা বোঝা গেল না। আমাদের দেশে সৈনিকদের বিভিন্ন সংস্থা আছে যারা ব্যবসায়িক বা মুনাফাভিত্তিক কাজে আছে। কিন্তু চীনে ঠিক তা নেই। আর আর্মি চ্যানেলটি সরকারি চ্যানেল। আর এতে দেশের বিভিন্ন সামরিক অগ্রগতির খবরও প্রচারিত হয়ে থাকে।দেশের গুণীজনেরা  মনে করে থাকেন, আর্মির বা দেশের নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের কোন ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি বা ভেঞ্চার থাকা উচিত নয়, যেমনটি আমাদের দেশের আছে। জনৈক ভারতীয় নাগরিক একবার প্রসঙ্গক্রমে আমাকে বলেছিল, তোমাদের আর্মি দেশ রক্ষা করবে কিভাবে? তোমাদের আর্মি তো সেনাকল্যাণ সংস্থার নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ী উদ্যোগ পরিচালনা করে থাকে। আমাদের ভারতে এসব পাবে না। আমি অবশ্য বলেছিলাম, আমাদের একজন সেনা সদস্যকে তোমাদের একজনের সাথে মল্লযুদ্ধে লাগিয়ে দাও, দেখবে আমরাই জিতবো। আমার কথায় ঐ ভারতীয় নাগরিক হেসেছিল।

যাহোক,  ডিনার শেষে হাঁটতে বেরিয়ে রেলস্টেশনের দিকে গেলাম। স্টেশনে একটা দোকানের সামনে আরবি লেখা দেখলাম। যের জবর ছাড়া, অনেকটা উর্দুর মতো। বেইজিং এ দেখলাম অনেক মুসলিম রেস্টুরেন্ট। কিন্তু মুসলিম দোকান নজরে পড়লো এই প্রথম। এ সব দোকানের সামনে ও ভেতরে আরবি ভাষায় দোকানের নাম লেখা থাকে চীনা ভাষার পাশাপাশি। অধিকাংশ লেখাই ক্যালিওগ্রাফিক স্টাইলে উৎকীর্ণ থাকে।

চীনে না এলে বুঝতে পারতাম না যে এখানে এত বেশি মুসলিম বসবাস করে। দেশটি কমিউনিস্ট এবং শতকরা পঞ্চাশভাগ লোক এখানে “নো গড” –এ বিশ্বাসী  হলেও এখানে ধর্মের প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা বাঁধা নেই। চীনের শিনচিয়াং প্রদেশটি মুসলিম অধ্যুষিত। শিনচিয়াং এর রাজধানী উরুমচিতে উইঘুর মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজধানী বেইজিং এর তিনটি মসজিদে আমি নামাজ পড়েছি।

আমাদের প্রশিক্ষণ-সমন্বয়ক এলিস ও রুমং দুজনেই “নো গড” এ বিশ্বাসী। রুমংকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, হোয়াট ইজ ইয়র রিলিজিয়ন, সে বলেছিল, আই হ্যাভ নো রিলিজিয়ন, আমি এ্যাম আ কমিউনিস্ট”। প্রিন্স কুংস প্যালেসে বেড়াতে গিয়ে একবার এলিসকে জিজ্ঞেস করাতে সে আমায় জানিয়েছিল, চীনে আনুমানিক ৫০% নো রিলিজিয়ন, ২০% বুদ্ধিস্ট, ১০-১৫ % মুসলিম, ৫% কনফুসিয়ান, এবং ১০% অন্যান্য রিলিজিয়নে বিশ্বাসী।

রেলস্টেশনে এলাকা থেকে আমি আর সালাউদ্দিন এবার ভিন্ন দিকে চলে এলাম হাঁটতে হাঁটতে। একটি সড়কে যাচ্ছিলাম, যেটি একটি আবাসিক এলাকার দিকে চলে গেছে। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তিনজন জিন্স পরা ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা। দুজন পুরুষের একজনের মাথায় টুপি আর মহিলাটির মাথায় ওড়না পেঁচানো। সালাউদ্দিন কৌতুহলবশত বলল, হ্যালো! কোনো কাজ হলো না। তখন আমি বললাম, নি হাও! এবারে তিনজনই আমাদের দিকে তাকালো। সালাউদ্দিন ওদেরকে আসসালামু আলাইকুম বলে সালাম দিলে ওরা উত্তর দিল। এবারে সালাউদ্দিন বলল, উই আর মুসলিমস ফ্রম বাংলাদেশ। কিছু বুঝলো না, তখন বললাম, মানজালাওদের মধ্য থেকে একজন তখন বলে উঠল, ও! মানজালা গুয়ো। যদিও আমার ভেতর একেবারেই সাম্প্রদায়িকতা নেই এবং আমার বিশ্বাস সব ধর্মের মানুষকেই  আল্লাহপাক গভীর ভালোবাসেন, তবুও এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে আমাদের চীনা মুসলিম দেখে বেশ একটা কমিউনিটি ফিলিং হলো- অস্বীকার করা যাবে না। এদের সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে হয়, এরা কি খায়, কিভাবে চলে, এদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার হাল কেমন ইত্যাদি জানতে ইচ্ছে হয়। মুশকিল হলো এরা এক চীনা ভাষা ছাড়া ইংরেজি বোঝে না। কোনো বাক্যালাপই করা সম্ভব হয় না।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment