গ্রেটওয়ালের দেশে-২০তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

এখানে এসে অভিজ্ঞতা হলো, চীনের লেখাপড়া সম্পূর্ণ চীনা ভাষায়। সামাজিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্থাপত্য, শিল্প সাহিত্য সবই চীনা ভাষায়। এর প্রমাণ পেয়েছি একমাসের অপারেশন্স এন্ড মেইনটেনান্স কোর্সে যে ক’জন শিক্ষক শিক্ষিকা ছিলেন তাদের কেউই পড়ানোর সময় একটি ছোট্ট শব্দও চীনা ছাড়া ইংরেজিতে বলেননি। এরা চীনা ভাষায় লেকচার দিত আর এলিস, রুমং বা জেসি আমাদের জন্য ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে দিত। তার মানে কী দাঁড়ায়? বাংলাভাষায় যেমন ইংরেজি, আরবি, সংস্কৃত, উর্দু, চীনা ইত্যাদি ভাষার শব্দাবলী ঢুকে গেছে  চীনা ভাষায় তা হয়নি। অর্থাৎ চীনা ভাষা অন্য কোনো ভাষার ভকাবুলারি গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়নি বরং এটা অন্য কোনো ভাষা থেকে  গ্রহণ না করেই নিজে নিজেই সমৃদ্ধ।

 

বিশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। মঙ্গলবার।

আজ সকালে  সিএইচডি পাওয়ার প্লান্টে ক্লাসে হাজির ছিলাম। সিএইচডি অর্থ চায়না হুয়া দিয়ান। ইংরেজি করলে দাঁড়ায় China North Electrical. Hua অর্থ North আর Dian অর্থ ইলেক্ট্রিক।

যথারীতি ভিজিটর্স ব্লু হেলমেট পরে সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম, স্টিম টারবাইন, হিট রিকভারি স্টিম জেনারেটর(HRSG), বয়লার, কুলিং ওয়াটার মেশিন, গ্যাস টারবাইন, এয়ার ফিল্টার ইত্যাদি অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং ইকুয়িপমেন্টস দেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি বাস্তবে দেখা হলো। রাত আটটা দশে ডিনারে গেলাম। এসময় রুমের বাথরুম শাওয়ারের সমস্যার ব্যাপারে লবিতে কমপ্লেইন সাবমিট করলাম। একজন মহিলা টেকনিশিয়ান এসে ঠিক করে দিয়ে গেল। ষোল জানুয়ারি আমাদের দেশে ফেরার পালা। ঢাকা থেকে আসবার সময়েই আমার লাগেজের ওজন ছিল কুড়ি কেজির কাছাকাছি। আমাদের রুট কুনমিং হয়ে। যাদের রুট সিঙ্গাপুর বা হংকং হয়ে যাবে তাদের ওয়েট এলাউন্স তিরিশ কেজি। কাজেই আমাদেরও তিরিশ কেজি করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে। কোম্পানির কর্মকর্তা লিউ শুয়াই এর সাথে উইচ্যাটে কথা বললাম, বোঝালাম আমাদের ব্যাগেজ এলাউয়েন্স বাড়ানোর জন্য। কিন্তু কিছুতেই তিনি মানছিলেন না। সুকুমার রায়ের মত করে বলতে গেলে আমার ও লিউ শুয়াই এর মধ্যে বাক্যালাপ নিম্নরূপ;

আমি যতই না বোঝাই

তিনি কন উপায় নাই।

আমি কই ছিল তো কথা

তিনি কন ছিল না তো তা।

আমি কই কিছু করেন

তিনি কন পথ ধরেন

আমি কই ব্যাগেজ বাড়ায়ে দেন

তিনি কন ও কথা ছাড়ান দেন

আমি কই মাত্র তো আমরা চারজন

তিনি হেসে কন হলেনই বা একজন

আমি কই হবে না কি তিরিশ কেজি

তিনি কন হতে পারে বিশ-বাইশ কেজি।

 

তেইশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। শুক্রবার

সকালে পাওয়ার প্লান্টে ক্লাস ছিল আমাদের বি গ্রুপের দশ জনের। তার মধ্যে আমরা মাত্র চারজন ক্লাসে গিয়েছি। এ কারণে এ ক্লাসের কো-অরডিনেটর মিস রুমংকে বেশে জব্দ করল তার বস। রুমং মেয়েটি এমনিতেই খুব নরম প্রকৃতিরচীনে বসকে খুব মান্য করা হয়, আমাদের দেশের চেয়ে অনেক বেশি। যেদিন আমাদের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা ছিল, সেদিন দেখেছি আমাদের সাথে একটি ইয়ং ছেলে ক্লাস করে, সে ছিল তার বসের খেলার পার্টনার। খেলার মাঠেও দেখলাম তার বস খুব বকাঝকা করছে খেলায় ত্রুটি বিচ্যুতি হলে। ছেলেটা চুপচাপ বকা হজম করছিল। কোনো প্রকার প্রতিবাদ তো দূরের কথা কোনো আর্গিউমেন্ট বা এক্সকিউজও প্রদর্শন করেনি। রুমং এর বেলায় দেখলাম, পাওয়ার প্লান্টের ম্যানেজার তাকে দীর্ঘক্ষণ বকাঝকা করলেও রুমং নিরুত্তর। শুধু বস যখন কিছু উত্তরের প্রত্যাশা করছিল, তখনই মৃদুস্বরে তার উত্তর দিচ্ছিল। নতুন চাকুরে হলেও মেয়েটি বুঝে নিয়েছে, বসের কোন্‌ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে আর কখন চুপ করে থাকতে হবে।

 

আজকে শুক্রবার হওয়ায় আমাদের মসজিদে যাবার দিন জুম’আর নামাজের জন্য। আজও নিউজি স্ট্রিটের ঐতিহাসিক প্রাচীন নিউজি মসজিদ। মসজিদের মূল ভবনটির মেঝেতে বিছানো কার্পেটগুলোর মধ্যে প্রতিসারিতে পার্পল কালারের কার্পেট বিছানো। এর ওপর দিয়ে অপেক্ষাকৃতি কম প্রস্থের সবুজ রঙ্গের মোটা কার্পেট বিছানো। এই কার্পেটের দু’ধার দিয়ে আরবি ক্যালিওগ্রাফিতে নিউজি মসজিদ লেখা। এই মোটা কার্পেটই মূলত জায়নামাজের কাজ করে। মূল ভবনের সম্প্রসারিত অংশের দ ‘পাশে উন্নত মানের রঙিন কাঠের শেলফ যেখানে মুসল্লিরা জুতো ব্যাগ ইত্যাদি রেখে থাকে। আমাদের দেশের মত মুসল্লিদের সিজদার স্থানের সামনে জুতোর বক্স বা জুতো রাখার কোনো নিয়ম বা ব্যবস্থা নেই।

মসজিদের মিম্বর আমাদের দেশের মসজিদের মিম্বরের তুলনায়  বেশ উঁচু ও প্রশস্ত। এখানে আছে আট ধাপের সিঁড়ি। ইমাম সাহেব চতুর্থ ধাপে দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করেন। খুৎবার মিম্বরের পাশে ইমামের ডানপাশে একটি লম্বা লাঠি রক্ষিত আছে। লাঠিটি ইমাম সাহেব খুৎবা প্রদানকালে ডানহাতে মাঝে মাঝে ধরে খুৎবা প্রদান করেন।

ভিনদেশী মুসল্লিগণের অনেককেই মসজিদের অপূর্ব সুন্দর কারুকার্যময় অভ্যন্তরভাগ এবং বাইরের ছবি তুলতে দেখা যায় ক্যামেরা বা সেলফোন দিয়ে।

একটি পৃথক ভবনে অফিস ও স্যুভেনির বিক্রির স্টল আর একটি পৃথক ভবনে  শুধুই বিক্রয়কেন্দ্র। বিরাট কম্পাউণ্ডে মহিলাদের জন্য পৃথক ভবন ও পৃথক অজুখানা আছে। দেশী বিদেশী মহিলা মুসল্লিদের সবাই সপ্রতিভ এবং স্মার্ট। কেউকেউ হিজাব পরিহিতা আবার কেউকেউ জিনসের প্যাণ্টের ওপর লম্বা কোট বা ওভারকোট এবং মাথায় মস্তকাবরণী বা স্কার্ফ পরিহিতা।

আজ মসজিদের বিক্রয়কেন্দ্রে ঢুকে নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ সাহেব ও জহুরুল সাহেবের সাথে দেখা। জায়নামাজ কিনছিলেনএখানে একজন চীনা ভদ্রলোক বেশ সাহায্য করছিলেন ইংরেজিতে প্রয়োজনীয় ভাষান্তর করে দিয়ে। ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করে জানা গেল তিনি চীনা মালয়েশিয়ান, তাই তিনি চীনা, মালয় এবং ইংরেজি জানেন। তিনি একজন অমুসলিম। মসজিদে এসেছেন তার চৈনিক মুসলিম বন্ধুর সাথে। বন্ধু নামাজ পড়তে মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছেন আর তিনি অপেক্ষা করছেন বন্ধুর জন্য। একজন অমুসলিম হয়েও তার মুসলিম বন্ধুর সাথে এসেছেন মসজিদ চত্ত্বরে। বন্ধুর প্রতি অপূর্ব সুন্দর সহযোগিতা। এই তো বন্ধু, যার মাধ্যমে দুটি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষও একত্রিত হয়ে যায় ভালোবাসার জোরে।

চীনা মুসল্লিদের কেউ ইংরেজি জানে না বলে এদের সম্পর্কে চীনা ভাষা-অজানা আমার পক্ষে কিছুই জানা সম্ভব নয় জিজ্ঞেস করে । তবে যে ক’বার এখানে নামাজ পড়তে এলাম, তার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি ইমাম সাহেব একজনই যিনি খুৎবা পড়েন এবং নামাজে নেতৃত্ব প্রদান করেন। কিন্তু ইমাম ছাড়াও আরো কয়েকজন ইসলামী পণ্ডিত ব্যক্তি আছেন যারা ইমাম সাহেবের মতই লম্বা পাগড়ি পরিধান করেন মাথায়। পাগড়ি আমাদের দেশের হুজুরদের মত ছোট নয়, লম্বায় পৃষ্ঠদেশ ছাপিয়ে কোমর ছুঁইছুঁই। এ সব পণ্ডিতদের একেক জন একেক দিন নামাজ শুরুর আগে মসজিদের অষ্টম-দশম কাতার বরাবর এসে একটি টেবিল স্থাপন করে রীতিমত টেবিলে প্লাষ্টিকের ফাইল রেখে  চীনা ভাষায় চোস্ত বক্তৃতা দিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে কুর’আন বা হাদীসের রেফারেন্স উচ্চারণ করার সময় এই প্লাষ্টিকের ফাইলে রাখা নথির পাতায় রাখা নোটের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে থাকেন। তবে কোরানের অনেক আয়াত ও সমসাময়িক অনেক ইস্যুর আলোকপাত করেন। মাঝে মাঝে  বক্তৃতা শুনে মৃদু হাসির ফোয়ারাও দেখা যায় মুসল্লিদের মাঝে। যারা চীনা জানেন তারাই শুধু এ হাসিতে অংশ নিতে পারেন।

এই মসজিদে অনেক চীনা বয়োবৃদ্ধ এবং পাকা শশ্রুমণ্ডিত মুসল্লিকেও দেখেছি নামাজ আদায় করতে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ইমাম বা মুয়াজ্জিন বা ঐ গোত্রীয় কারো মুখে দাঁড়ি দেখিনি।

মসজিদের শেলফে বেশ কিছু কুর’আনের কপি এবং বেশ কিছু ইসলামী কিতাব দেখলাম। ইসলামী বইপত্রের প্রায়ই সবই আরবি ও  চীনা ভাষায়। অনুল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইংরেজি ভাষায়।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts