গ্রেটওয়ালের দেশে-২১তম পর্ব

আজ মসজিদে নামাজান্তে মিঃ আলিমুল হক নামে একজন বাংলাদেশি ভদ্রলোকের সাথে দেখা হলো। আলিমুল ভাই চীন আন্তর্জাতিক বেতারে চাকরি করেন। উনার সাথে আলাপে জেনে গেলাম পূর্বতন রেডিও পিকিং পরে রেডিও বেইজিং হয়েছিল এবং পরে এটিই চীন আন্তর্জাতিক বেতার নাম পরিগ্রহ করে। ইংরেজিতে চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল (সি আর আই) আলিমুল ভাইয়ের (alimulh@yahoo.com , ফোনঃ ১৩৪৩৯৪১৯৫৪) সাথে তার পরিবারও মসজিদে এসেছিলেন। ভাবিকে দেখলাম মাথায় হিজাব পরা আর পুত্রটি সুন্দর শীতের পোশাকে সজ্জিত। আলিমুল ভাইয়ের কাছে স্বল্প সময়েই জানা গেল বেইজিং আন্তর্জাতিক বেতারে তারা মোট চারজন বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তিনি এবং আরেকজন কুমিল্লার মানুষএকজন টুটুল ভাই সিরাজগঞ্জের এবং চতুর্থজন মান্না নিয়াজী আপা ঢাকার মুন্সীগঞ্জের। আলিমুল ভাই বাংলাদেশে ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি জানালেন যে, বেইজিং এর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ইংরেজি এমনকি বাংলা ভাষার ওপরও বিভাগ খুলে পড়ানো হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং কমিউনিস্ট চীনকে সারা বিশ্বে উন্মুক্ত করতে চাইছেন। প্রসঙ্গত আলিমুল ভাই জানালেন যে, তিনি নিজে বেইজিং-এর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতেন এবং তারই একজন চীনা ছাত্র পাশ করে বেরিয়ে এখন কুনমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক হয়েছেন। বিষয়টা বেশ উৎসাহব্যঞ্জক মনে হলো।

 

আজই প্রথম আমরা বেইজিং-এ একটি বাংলাদেশি রেস্তোঁরায় লাঞ্চ করব। এতদিন জানতাম বেইজিং-এ বাংলাদেশি রেস্তোঁরা নেই। কিন্তু ক’দিন পূর্বে পার্ল মার্কেটে গিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি সেনা সদস্যর কাছে জানা গেছে যে একটি বাংলাদেশি রেস্তোঁরা আছে এখানে, তবে রেস্তোরাটি আমাদের

হোটেল থেকে অনেক দূরে।বাংলাদেশি সেনা সদস্যগণ এখানে তিনমাসের প্রশিক্ষণ সফরে এসেছেন। আমাদের আগ্রহে উনারাই রেস্তোঁরাটির একটি বিজনেস কার্ড দিয়েছেন। গাজীপুরের কালিগঞ্জের মিঃ সাগর শেখ(ফোন নং ১৮৯১১৩৮৭৭৭৪) বলে একজন রেস্তোঁরাটি চালান। রেস্তোরাঁটিতে কাজ করবার জন্য তিনি দেশ থেকে কয়েকজন কর্মচারি এনেছেন, এরা সবাই চীনা ভাষা জানেন। রেস্তোঁরাটির নাম Santoor(santoor28@yahoo.com)মিঃ সাগর বারো বছর ধরে বেইজিং এ আছেন। মাঝে মাঝে তার পরিবার দেশ থেকে বেইজিং এ যান। তিনিও দেশে আসেন। এভাবেই তার রেস্তোঁরা Santoor(No. Jia70,Beiluoguxiang, Dangcheng District, Beijing) চলছে। সান্টুর বেইজিং এর ডাউনটাউনে নয়, বরং সাবার্বান এরিয়ায় অবস্থিত। আশে পাশে কোন আধুনিক বা বহুতল ভবন নেই।

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশি রান্না খেয়ে সবাই খুব তৃপ্ত। টিভির পর্দায় দেখাচ্ছিল বলিউডের নাচ-গানের ডিভিডি। আমি বললাম, সাগর ভাই, প্লিজ আমাদের রবীন্দ্র সংগীত বা নজরুল সঙ্গীতের সিডি রাখবেনআর বাছাই করা কিছু বাংলাদেশি সিনেমার ডিভিডিও রাখতে পারেন। দেশী খাবারের সাথে বিনোদনটাও দেশী হলে জমে ভাল। তিনি আমার কথা রাখবেন বলে কথা দিয়েছেন।

 

চব্বিশে ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। শনিবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আজ ছিল আমাদের নির্ধারিত ভিলেজ ট্যুর । বেইজিং এ যে এলাকায় আমরা থাকি সেই শিচেং ডিস্ট্রিক্ট থেকে পাক্কা আড়াই ঘন্টা লেগে গেল গ্রামটিতে পৌঁছুতে। গ্রামের নাম সুয়ান দিশিয়া। পশ্চিম বেইজিং এর মেনতুগু জেলায় অবস্থিত এ এলাকাটি বেইজিং আরবান এরিয়া থেকে নব্বই কিলোমিটার পশ্চিমে। ৫.৩৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ গ্রামটির পত্তন হয়েছিল আনুমানিক পাঁচশত বছর পূর্বে মিং রাজাদের আমলে । এ গ্রামে আছে ৭৬টি কোর্টইয়ার্ড এবং ৬৫৬টি বাড়ি। দক্ষিণমুখী গ্রামটি লংতু পর্বতের অক্ষ বরাবর একটি পাখার আকৃতি নিয়ে বিরাজমান। গ্রামটি সিনেমা ও টিভি শ্যুটিং এবং পেইন্টিং কাজের জন্য জনপ্রিয়। গ্রীন ভ্যালি, পরিষ্কার ঝর্ণাধারা, পুরনো রাস্তাঘাট ও স্বর্গীয় পুষ্করিণী এ গ্রামের বৈশিষ্ট্য। মিং ও চিং রাজাদের কোনো পুরানো আস্তানায় থাকার ব্যবস্থাও আছে যদি কোনো পর্যটক এখানে রাত কাটাতে চায়। চারটি ঋতুতে চার রকম সৌন্দর্য নিয়ে প্রকৃতি আপনাকে আনন্দ দেবে। শীতে আছে তুষারপাত, বসন্তে বসন্ত উৎসব আর শরতে আছে বাহারি রঙের পত্রপল্লবের আবাহন। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত পর্যটন এলাকা।

 

আমাদের হাতে সময় খবু বেশি ছিল না, তাই পুরো গ্রাম বেড়ানোর সুযোগ কোথায়ডিসেম্বরের শীতে পত্রপল্লবহীন বৃক্ষাদি আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল। সাক্ষাৎ তুষারপাত দর্শনের সৌভাগ্য না হলেও যা দেখলাম তাই আমাদের জন্য বিরল অভিজ্ঞতা। আশেপাশের সমস্ত পাহাড়ি ঝিরি, ঝর্ণা ও নালার পানি ঢেকে দিয়েছে অন্তত চার পাঁচ ইঞ্চি শক্ত বরফের আস্তর। এই বরফের বিছানার ওপরই আমরা সন্তর্পণে হেঁটে বসে ছবি সেলফি তুলে তুষারে ফটোসেশনের খায়েশ মিটালাম। আমরা কিছু বাড়িঘরের পাশ দিয়ে একটি পাহাড়ে ওঠার পাথুরে সিঁড়িপথ আবিষ্কার করলাম। ওপরে উঠে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির পেলাম। কাছেই একটি ভিউপয়েন্ট থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখা হলো ছবির মত সুন্দর সাজানো ঘরবাড়ি। অতি দূরের নাঙ্গা পর্বতমালার চূড়োগুলো দাঁত কেলিয়ে আমাদের অভিবাদন জানালো উত্তুরে ঠাণ্ডার ঝাপটা দিয়ে।

 

নিচে নেমে এলাম সুউচ্চ পর্বতমালার বিশালতা বক্ষে ধারণ করে। জনমনুষ্যবিহীন একটি বাড়ির একটি গৃহে প্রাচীন একটি কাঠের যন্ত্র দেখে ওর হাতল ঠেলে যন্ত্রটি কিভাবে কাজ করে তা পরখ দেখতে অনেকেই মেতে উঠলাম এক এক করে। এটি প্রাচীন আমলে গম বা চাল পেশার যন্ত্র বলেই মনে মনে স্থির করে এর সাথেও ছবি তোলার পাল্লা দিলাম অনেকেই। প্রাচীন আমলের এ বাড়িঘরগুলো সবই কাঠের বেড়াযুক্ত ওপরে মাটির টাইল বা পাথরের পাতলা চাইঁ দিয়ে তৈরি।

এক জায়গায় দেখলাম একজন চীনা ভাই বরফের নালার ওপর দাঁড়িয়ে গাঁইতি চালিয়ে বরফ খুঁড়ে চলেছে। কঠিন শক্ত বরফ। গাঁইতির সূঁচালো ঠোঁটও বাউন্স করে ফিরে আসতে চায়। অনেকক্ষণ গাঁইতি চালানোর পর বেলচা দিয়ে আলগা করা বরফ সরিয়ে দিল। আবার গাঁইতি চালনা। এভাবে এক পর্যায়ে বলক দিয়ে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা হয়ে ধরা দিল। যেন কঠিন পরিশ্রমের পর আনন্দের ফল্গুধারা লাভে লোকটির চোখমুখ ঝিলকিয়ে উঠলো

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment