গ্রেটওয়ালের দেশে-২২তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে

পঁচিশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।রোববার।।সপ্তাহান্তের দ্বিতীয় দিন। আমরা আজ এসেছি ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব বেইজিং-এ। অত্যন্ত সুরক্ষিত এ স্থানটির কাছেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা চেয়ারম্যান মাও সেতুং এর সমাধি সৌধ। সমাধি সৌধ ঠিক বলা যায় না, কেননা এখানে তাঁর মৃতদেহকে কবর দেয়া হয়নি। বিশাল জাদুঘরের একটি বড় কক্ষে চেয়ারম্যান মাও এর মৃতদেহকে মমি করে রাখা হয়েছে। এই সমাধি সৌধের  সামনেই রয়েছে বিখ্যাত তিয়ান’আনমেন স্কোয়ার যেখানে ১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট বিরোধী গণতন্ত্রীপন্থী আন্দোলন করতে গিয়ে কয়েকহাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকার এখানে মিছিলকারীদের ওপর সামরিক ট্রাক উঠিয়ে দিয়েছিল আন্দোলন দমন করতে। তিয়ান’আনমেন স্কোয়ারের অপর পাশে চীনের ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলি ভবন গ্রেট হল। আর এর আরেক পাশে বিখ্যাত ফরবিডেন সিটি।

ন্যাশনাল মিউজিয়ামে প্রবেশ করতে হলো বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে কঠোর নিরপাত্তা চেকিং এর মধ্য দিয়ে। মিউজিয়ামটি এত বিপুলাকার যে, এটি পুরোপুরি দেখতে হলে অন্তত দুটো পূর্ণ দিন দরকার অথচ আমাদের হাতে বরাদ্দ মাত্র আড়াই ঘন্টা। তাই যতটুকু দেখা যায় আর কি। এ মিউজিয়ামে আছে প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে বিকাশের ক্রমধারা । বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, তৈজসপত্র, যানবাহন,মুদ্রার ব্যবহার ইত্যাদির ধারাক্রমিক বর্ণনা বিদ্যমান। একটি ফ্লোরে দেখলাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা অন্য কোন সরকারি ডেলিগেশন প্রদত্ত বিভিন্ন সরকারি উপহার সামগ্রী দিয়ে সাজানো। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১১ সালে কমরেড হু জিনতাওকে যে ধাতব জলপাই শাখা উপহার দিয়েছিলেন তা সাজানো আছে সুন্দরভাবে। বিভিন্ন দেশের পতাকা এ গ্যালারির দেয়ালে টানানো। বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান(১৯৯০), প্রেসিডেন্ট এরশাদ(১৯৮৫) এবং খালেদা জিয়া পার্টিপ্রধান হিসেবে তাঁদের সফরকালীন যে উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন তাও নজরে এলো।

 

ছাব্বিশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। সোমবার।

চীনের অনলাইন মার্কেটিং ব্যবস্থার জনক মা ইয়ুন শুধু চীন নয় আমেরিকাতেও সর্বজনবিদিত একটি জনপ্রিয় নাম।ওরই ওপর ইংরেজি ভাষায় লেখা একটি আত্মজীবনীমুলক বইয়ের নাম মা ইয়ুন’স অর্থডক্স ইনোভেশন।বইখানা সম্প্রতি অনলাইনে অর্ডার করে কিনে দিয়েছে আমাদের গাইড মিস রুমং লিউ। আজ ট্রেনিং ক্লাস থেকে ফিরে হোটেল রুমে ফিরে এ বইটি পড়ছিলাম। একটি সাধারণ মানুষ আন্তরিক প্রচেষ্টায়, নিরলস পরিশ্রম আর সাহসের গুণে কিভাবে অসাধারণ হয়ে উঠে সেই গল্পই এ বইয়ের কাহিনি। এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো পৃষ্ঠা পড়ে ফেললাম। এখন মাগরিবের আজান হয় পাঁচটায়। মাগরিবের পর দেখলাম চীনা কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক চ্যানেলে  রাশিয়ায় প্লেন ক্র্যাশ এর খবর। ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ায় একদিনের শোক ঘোষণা করেছে। রাশিয়ার সামরিক মুখপাত্র এবং ক্রেমলিন জানিয়েছে যে, এ বিমান দুর্ঘটনার পেছনে কোনো টেরোরিস্ট এ্যাক্টিভিটি নেই। এটা নিছক টেকনিক্যাল ফল্ট বলে তারা ঘোষণা করেছে।

 

সাতাশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। মঙ্গলবার।

আজও মা ইয়ুন’স অর্থডক্স ইনোভেশন এর দুটো চ্যাপ্টার পড়া হলো। রাতে ডিনারের পর প্রায়  এগারো পৃষ্ঠার একটি ছোট গল্প লিখে ফেললাম। উইচ্যাটে কথা বলে জানলাম, ঢাকার বাসায় আজ হীরা আপাকে নিয়ে এসেছে শীলা। আজই ও মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করলো।

আটাশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল। বুধবার।

প্রতিদিনই ট্রেনিং ক্লাস শেষ করে হোটেলে ফিরে আসতে দুপুর একটা সোয়া একটা হয়। ফিরেই লাঞ্চ করে রুমে ফেরা হয়। আর বিকেলটা পুরো ফ্রি বিশ্রাম বা ঘুরাফিরার জন্য। আজ আমরা আটজনের একটি গ্রুপ গেলাম হংসিয়াও পার্ল মার্কেটে। বেইজিং ওয়েস্ট রেল স্টেশন থেকে সাবওয়েতে সিকোকু স্টেশন, তারপর ৫ নং লাইন ধরে তিয়ানডিংমেন স্টেশনে নেমে এক্সিট-এ২ দিয়ে বেরুলেই সামনেই পার্ল মার্কেট। এ বিপনী কেন্দ্রটির সামনে স্থাপন করা হয়েছে একটি বিশাল আকারের ঝিনুকের মধ্যে মুক্তোর প্রতিকৃতি। এটা দেখে আমার ঢাকার কথা মনে হয়। ঢাকায় বিজয় সরণীর পূর্ব মাথা থেকে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে আসতে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের আগেই হাতের বাম পাশে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি বৃহদাকৃতির ঝিনুক থেকে মুক্তোদানা বের হচ্ছে এরকম একটি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির নাম রত্নদ্বীপ।

পার্ল মার্কেট একটি বার্গেইনিং বিপনীকেন্দ্র। জনপ্রিয় এ বিপনীকেন্দ্রটি বিদেশীরা হুমড়ি খেয়ে কেনাকাটা করে থাকে। যে জিনিসের দাম চাইবে সাতশ আরএমবি, সেটা হয়ত আপনাকে ১০০ আরএমবিতেই দেবে। বিক্রেতা তো লাভ করবেই যেভাবে যত পারে। কিন্তু বার্গেইনিং করে দাম কমিয়ে কেনার মধ্যে ক্রেতা একধরণের আত্মতৃপ্তি পেয়ে থাকে। এটাই হয়ত বিপনীকেন্দ্রটির জনপ্রিয়তার আসল কারণ। এখানে নীচতলায় মিনিসো নামে একটি জাপানী কোম্পানীর বিক্রয়কেন্দ্রের শোরুম বা কর্ণার আছে। পার্ল মার্কেটের এই মিনিসো’র দ্রব্যাদি একদামে বিক্রি হয় এবং তা বেশ যৌক্তিক দামেই। কাজেই এখানে ঠকার বা জেতার কোনোটারই সম্ভাবনা নেই।

 

ঊনত্রিশ ডিসেম্বর দুহাজার ষোল।

 

আজ আমাদের জন্য চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট এক্সপোর্ট করপোরেশন(সিএনটিআইসি)  এর অফিসে একটি লেকচার সেশনের আয়োজন করা হয়েছে।বিষয় পাওয়ার প্লান্ট ডিজাইন অ্যান্ড প্লান ট্রেনিং। কীনোট পেপার উপস্থাপন করলেন ফুজিয়ান ইলেক্ট্রিক পাওয়ার সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন ইন্সটিটিউট(এফ ই ডি আই)এর প্রকৌশলী মিঃ লিঙ্গিং কাই। সুখের বিষয় তিনি ইংরেজি ভাষায়ই পেপার প্রেজেন্ট করলেন। সিএনটিআইসি ভবনের ১৯ তলায় ক্লাস শেষে আমাদের দোতলায় ডাইনিং/ক্যান্টিন হলে নিয়ে যাওয়া হলো। মধ্যাহ্নভোজনের এক এলাহি কান্ড।শুরুতেই পেয়ালা ভর্তি গৃন টি ।তার পর একে একে বিভিন্ন আইটেম আসতে লাগলো। বিখ্যাত বেইজিং ডাক(হাঁসের মাংস), তিন প্রকারের মাছ, চিংড়ি,কাকড়া ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণি ও উদ্ভিদ, চৈনিক পিঠা ইত্যাদি যার অনেকগুলোই অপরিচিত। যে পানীয় সার্ভ করা হয়েছে তার বোতল বা বোতলের গায়ের লেখা বা ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে কী ধরনের পানীয় আছে। ভরসা একটাই এরা আমাদের হার্ড ড্রিংক দেবে না সে বিষয়ে আমরা সকলেই নিশ্চিত। তারপরেও আমাদের সাথে যে জনাতিনেক প্রকৌশলী সুন্নতের পাবন্দ, তারা এ পানীয় থেকে নিজেদের নিবৃত্ত করল।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts