গ্রেটওয়ালের দেশে-২৩তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

আজ প্রসঙ্গক্রমে আমাদের গাইড মিস রুমং এর কাছে জানা গেল চীনাদের নামকরণের ক্ষেত্রে  কী নিয়ম অনুসরণ করা হয়। সে বলল, চীনাদের নামের তিনটি অংশ থাকে। যেমন তার নাম লিউ রু মং । এখানে লিউ হলো তাদের ফ্যামিলি নেইম। তার বাবা বা দাদার নামের আগেও লিউ আছে । রু হলো তার নিজেদের ভাই বোনদের নাম । আর মং হলো তার নিজের নাম। চৈনিক নামগুলোর অর্থও আছে। অর্থের প্রতি খেয়াল করে তারা নাম রেখে থাকে। তার নিজের নামটি চীনের বিশেষ একটি ফুলের নামে রাখা হয়েছে। ভাবলাম, আমরাও তো সাধারণত অর্থবোধক নামই রেখে থাকি। যেমন বেলি ফুলের নামে কোনো মেয়ের নাম বেলি হয় আবার ডালিম ফলের নামে ছেলেদের নাম ডালিম হয়।

রুমং রা দুই বোন। সে ছোট। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বোন ও ভগ্নীপতি দুজনেই বেইজিং-এ কর্মরত।  তার বোন এখন সন্তানসম্ভবা কারণে চাকরি ছেড়ে নিজ শহর শিয়ানে গেছে। শিয়ানে সে তার নিজের বাবার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়িতে থাকবে এখন। শিয়ান হলো চীনের শাংছি প্রদেশের রাজধানী।

 

পহেলা জানুয়ারি দুহাজার সতের। রোববার।

আজ দুহাজার সতের সালের পহেলা জানুয়ারি। আরো একটি বছর কালের বিবর্তনে বিলীন হয়ে আজ আরেকটি নতুন বছরের সূচনা হলো।পৃথিবীর মানব ও সৃষ্টি জগত নতুন খৃষ্টীয় সাল ২০১৭ তে পদার্পন করলো। ঢাকায় প্রতি ইংরেজী বছরের শুরুতে আমোদ আহ্লাদ হয়, আতশবাজি  পোড়ানো হয়। গুলশান বনানী বা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও কিছু কিছু অশ্লীল বা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটার নজির আমরা প্রত্যক্ষ করি। এবার বিডিনিউজটুয়েন্টিফোর.ডট.কম এ দেখলাম ঢাকার পুলিশ আগেভাগেই সতর্ক ভূমিকা নিয়েছে যাতে ওসবের কিছু না ঘটতে পারে। বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যানবাহন ও লোক চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছেফলে ঢাকায় এবার থার্টিফার্স্ট নাইটে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। এজন্য ঢাকার পুলিশ নিশ্চয়ই ধন্যবাদার্হ।

তবে গতকাল ইস্তাম্বুলের একটি নৈশক্লাবে গুলি হামলার খবর পাওয়া গেল CGTN টিভি চ্যানেলে। পূর্বতন সিসিটিভি দুহাজার সতের সাল থেকে সিজিটিএন(চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। সিজিটিএন এর উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং সিজিটিএনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন যে, চীনের বিশ্ব সম্পর্কে অনেক জানার আছে আবার বিশ্বেরও চীন সম্পর্কের অনেক জানার আছে। তিনি চীনকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য, বিশ্বের খবর বস্তুনিষ্ঠভাবে পরিবেশন করার জন্য সিজিটিএনকে অনুরোধ করেন।উল্লেখ্য চ্যানেলটি  ইংরেজী, ফরাসী, স্প্যানিশ, আরবী ও রুশ ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।

সিজিটিএন থেকে জানা গেলে ইস্তাম্বুলের নৈশ ক্লাবটি খুব অভিজাত ক্লাব। যেখানে দেশী-বিদেশী এলিট ব্যক্তিবর্গের আনাগোনা থাকে।গত রাতে সান্টাক্লজ এর পোশাক পরে কিছুসংখ্যক টেরোরিস্ট  সেখানে প্রবেশ করে এই দুর্ঘটনা ঘটায়। তুরস্কের সরকার এটাকে আইসিল বা পিকেকে এর কাজ বলে ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বেশ কয়েকটা সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলো। তুরস্ক একমাত্র মুসলিম দেশ যেটা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সদস্য। ইইউ এর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা মুসলিম বিদ্বেষী শক্তি চাইছে যেন তুরস্ককে ইইউ থেকে বহিষ্কার করা যায়। তুরস্ককে অস্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক চক্র খুব সক্রিয় । এর আরেকটি কারণ হলো বর্তমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান ইসলামী দল একেকে পার্টি দেশটির ক্ষমতায় আসীন।

 

আজ অপরাহ্নে আমরা দেখলাম চাইনিজ এ্যাক্রোব্যাটিক শো। অত্যন্ত সুন্দর, লোমহর্ষক ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশনা ছিল চাইনিজ সার্কাস ও এ্যাক্রোব্যাটিক-এর। চীনা অ্যাক্রোব্যাটিক ইতোপূর্বে দেখেছি টিভিতে অলিম্পিক বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক গেমসের অনুষ্ঠানে। কিন্তু এই প্রথম লাইভ দেখলাম এ ধরনের শো। অসাধারণ লাগলো। প্রতিটি আইটেমই শ্বাসরুদ্ধকর। তবে সবচাইতে ভয়ানক মনে হলো একটি লোহার গ্লোবের মধ্যে আটজন মোটর সাইক্লিস্ট এর- মোটর সাইকেল চালনা।

 

দুই জানুয়ারি দুহাজার সতের। সোমবার।

বেইজিং ডাউনটাউন থেকে একশ কিলোমিটার  দূরে মিউন কাউন্টিএখানে রয়েছে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা হাইড্রো পাওয়ার স্টেশন।পাওয়ার স্টেশনটি বর্তমানে অপারেশনে নেই। কিন্তু প্রয়োজনে যে কোনো সময় প্রোডাকশনে যেতে পারবে, কেননা নিয়মিত এর মেইন্টিন্যান্স হয়। এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬৪ মেগাওয়াট। প্লান্টের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জেনারেটর, সুইচগিয়ার স্টেশন,  সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম ইত্যাদির ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করলাম। প্লান্ট পরিদর্শন শেষে এর জন্য নির্মিত ড্যাম দেখতে যাই। ড্যামটির মাধ্যমে পাহাড়ি হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রেণ করে এর শক্তিবৃদ্ধি করে পাওয়ার প্লান্টের টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

পাওয়ার প্লান্ট থেকে ড্যামে যাবার রাস্তার দুধারে পাইন ও জুনিপারের উদ্যান। অনেকদূর পর্যন্ত রাস্তার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে থাকে পাইনের মৃত সূঁচালো পাতা।  সেগুলি মচ মচ করে পায়ে দলে আমরা চললাম ড্যাম দেখবো বলে। ড্যামটি ভূমি থেকে ৬৭ মিটার উঁচু করে তৈরি। আমাদের কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ড্যামের উচ্চতা জানা নেইতবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি উঁচু বলে মনে হলো। ড্যামের ওপর উঠবার জন্য সিঁড়ি পথ রয়েছে। অতি উৎসাহী কেউ কেউ  গুণে দেখলো ৩০৩ টি ধাপ রয়েছে। অবে প্রতিটি ধাপ আমাদের বাসাবাড়ির সিঁড়ির ধাপের দ্বিগুণের চেয়ে বেশী বৈ কম নয়। ফলে ওপরে উঠা বেশ কষ্টসাধ্য। উঠতে ঘাম ছুটে গেলেও, ওপরে উঠে ড্যামের ওপারের নীল জলের ঠাণ্ডা হাওয়া আমাদের ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দিল।ড্যামের দৈর্ঘ্য বরাবর দুু’প্রান্তে আছে মিলিটারি চৌকি। যে পাশে স্পীল-ওয়ে সে প্রান্তে যাবার পথে মিলিটারি আমাদের পথ আগলে দাঁড়ালে বুঝলাম এর পর আমাদের অতিক্রম নিষিদ্ধ। তাই অপর প্রান্তের দিকে যাত্রা করা হলো। এত কষ্ট করে এসে খানিকটা অন্তত না দেখেই নেমে যাওয়া ঠিক ভাল হয় না। তাছাড়া যেদিকে তাকাই একটা রহস্যের হাতছানি, সুন্দরের আহ্বান। যেতে যেতে পথে দেখা হয়ে গেল একটি চীনা মুসলিম ফ্যামিলির সাথে। মনে হলো নিম্নবিত্ত একটি পরিবার। পোশাক আশাক দেখে মনে হলো শিক্ষিত পরিবার। একজন ভদ্রলোক, তার স্ত্রী, দুই শিশু কন্যা এবং একজন শ্বেতশশ্রুমণ্ডিত মাথা গোলটুপি আচ্ছাদিত একজন বৃদ্ধ। আমাদের মধ্যে দুজন প্রকৌশলী ছিলেন দাঁড়ি টুপিধারী পরহেজগার। এরা খুব খুশি হলেন পরিবারটি দেখে। এদের সাথে আমাদের কোনো পরিচয় নেই, এরা জাতিগত ভাবে  চৈনিক আর আমরা জাতিগতভাবে বাঙালি। তদুপরি এদের দেখে আমাদের খানিকটা আপ্লুত হবার কারণ কি হতে পারে। কারণ দুই প্রকারের। এক হলো-একটি অমুসলিম প্রধান দেশে একটি মুসলিম পরিবারের সাক্ষাৎলাভে মুসলিম হিসেবে আমাদের একধরণের ফেলো-ফিলিং। আর দু’নম্বর কারণ হলো- আমরা মুসলমান কিন্তু আমাদের গাত্রবর্ণ, অবয়ব, ভাষা আর খ্যাদ্যাভ্যাস একরকম, আবার এরাও মুসলমান অথচ এরা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ওসব দিক দিয়ে। এদেশে এসে ভাষা সমস্যার কারণে কোনো চীনার সাথেই মতামত প্রকাশের বা একজন মানুষ অন্য জনকে জানার যে এক ধরণের তেষ্টা বা অনুভূতি থাকে তা প্রকাশে বিরাট অসুবিধে। তারপরেও মানুষে মানুষে পরিচয়ের আগ্রহই মানুষের ধর্ম। একবার আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল এবং তার গাড়িচালনার দক্ষতার জন্য প্রশংসা করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। শেষে আমাদের গাইড ও অনুবাদকের মাধ্যমে জানালে ড্রাইভারটি খুব খুশি হয়েছিল যা তার উজ্জ্বল আরক্তিম মুখমণ্ডল দেখে বুঝেছিলাম। সেইরূপ আজ এই চীনা মুসলিম পরিবারের সাথে পরিচয় হতে ইচ্ছে হলো। ইংরেজীতে নাম জিজ্ঞেস করলে কিছুই বুঝলো না। ফলে আমরা নিজেদের প্রত্যেকের নাম বললাম এবং বুঝালাম যে আমাদের নাম এই এই, তোমাদের নাম কি কি? বুঝতে পেরে তারা তাদের নাম বললো।লক্ষ্য করলাম, আমাদের গাইডদের যেমন চীনা নামের পাশাপাশি একটা করে ইংরেজী নাম আছে, তেমনি এই মুসলিম যুবকটির চীনা নামের সাথে একটি মুসলিম নাম আছে। তার মুসলিম নাম ইউনুস। এর দু’মেয়ের নাম নূরাহ্‌ ও নূমাহ্‌। স্ত্রীর নাম ও তার শ্বশুরের নাম চীনা ভাষাতেই বললো। উচ্চারণ কঠিন তাই মনে রাখতে পারিনি।পাঠক, এখানে বলে রাখি যে আলোচ্য  চীনা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি যুবকটির পিতা না হয়ে শ্বশুরই হবেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। কেননা তার চেহারা আর যুবকটির স্ত্রীর চেহারার মধ্যে মিল আছে।আমাদের সহকর্মী প্রকৌশলী সুলতান সালাউদ্দিন মেয়ে দুটোর হাতে দুই প্যাকেট ধরিয়ে দিল। আমাদের দেশের একটি বুদ্ধিমান শিশু যেমন এক্ষেত্রে চিপসটি নেবে কিনা তার ইঙ্গিতের জন্য মা বা বাবার দিকে তাকায়, তেমনি এ শিশুরাও ওদের মায়ের দিকে তাকালে মা অনুমতি দিয়ে ধন্যবাদ জানাতে বললে শিশুদুটো ‘সিয়ে সিয়ে’ বলে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলো। উল্লেখ্য, কয়েকটি চীনা শব্দ আমরা শিখে ফেলেছি, যেমন – সিয়েসিয়ে অর্থ ধন্যবাদ, বুকাচি অর্থ স্বাগত( ধন্যবাদের জবাবে), শুয়ে অর্থ পানি, মিফান অর্থ ভাত, ইয়ান অর্থ লবণ ইত্যাদি।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts